আইএমইআই নম্বর — প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি অনন্য পরিচয়। এই নম্বর দিয়েই নির্ধারিত হয় কোন ফোনটি কার, সেটি কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোনো ধরনের অপরাধে সেই ডিভাইস যুক্ত কি না।
নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বের প্রতিটি মোবাইল ডিভাইসের আইএমইআই আলাদা হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক ‘অস্বাভাবিক’ ঘটনা। একটি আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করেই নেটওয়ার্কে নিবন্ধিত হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ডিভাইস।
এর মানে হলো যদি কখনো আপনার ফোনটি হারিয়ে যায় এবং থানায় অভিযোগ করতে যান, তখন আইএমইআই নাম্বার থাকার পরও আপনাকে প্রমাণ করতে বেগ পেতে হবে যে, ফোনটি আসলেই আপনার। আর সেই ফোন খুঁজে পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে এটি শুধু প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক সুরক্ষার জন্য গুরুতর ঝুঁকির ইঙ্গিত।
ভয়াবহ এই বাস্তবতা সামনে এসেছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালুর পর।
শুক্রবার রাতে নিজের ফেiসবুক পোস্টে এসব তথ্য প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে বর্তমানে লাখ লাখ ক্লোন ও নকল হ্যান্ডসেট সক্রিয় রয়েছ- যেগুলোর বড় একটি অংশ কখনোই কোনো ধরনের নিরাপত্তা বা রেডিয়েশন টেস্টের মধ্য দিয়ে যায়নি।
৩ কোটি ৯১ লাখ ডিভাইসের একই আইএমইআই!
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধুমাত্র একটি আইএমইআই নম্বর ‘99999999999999’ ব্যবহার করে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হয়েছে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি বিভিন্ন কম্বিনেশন (Document ID+MSISDN+IMEI)।
এছাড়াও মোবাইল নেটওয়ার্কে বর্তমানে '1111111111111', '0000000000000', '9999999999999' এর মতো অত্যন্ত নিম্নমানের ও অস্বাভাবিক প্যাটার্নের আইএমইআই নম্বর ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানান ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
তিনি জানান, চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে ব্যাপকভাবে সচল এসব ফোন ছড়িয়ে রয়েছে।
ফয়েজ আহমেদ বলেন, শুধুমাত্র ১ ডিজিটের শূন্য আইএমইআই নাম্বারে আছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি। এ ছাড়া আরও কিছু ভুয়া আইএমইআই নম্বরের তালিকা দিয়েছেন তিনি যেখানে এক নাম্বারে এক লাখেরও বেশি নিবন্ধন হয়েছে। এর মধ্যে:
- 440015202000 সাড়ে ১৯ লাখ
- 35227301738634 নাম্বারে সাড়ে ১৭ লাখ
- 35275101952326 নাম্বারে সোয়া ১৫ লাখ
- এ ছাড়াও ১ লাখের বেশি ডিভাইস সচল আছে এমন ফেইক ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বরের দীর্ঘ তালিকা পাওয়া গেছে
“ভয়াবহ এবং দুর্ভাগ্যজনক”
এই সংখ্যাগুলোকে ‘অস্বাভাবিক’ নয়, বরং ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “এটা এক ধরনের সিকিউরিটি ব্রিচ কোনো সন্দেহ নেই। আর যে সংখ্যাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অবিশ্বাস্য। যদি এটা বাস্তবতা হয়ে থাকে, তাহলে এটা ভয়াবহ এবং খুবই দুর্ভাগ্যজনক।”
এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি বলে মনে করেন তিনি। বলেন, “বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ১৯৯৭ সাল থেকেই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এত বছর ধরে একটি ইউনিক আইডেন্টিফায়ার ব্যবস্থাকে এভাবে অবহেলায় ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
“আইএমইআই ইউনিক হয়ে লাভটা কী, যদি আমরা সেটা মেইনটেইনই না করি,” প্রশ্ন তোলেন সুমন আহমেদ।
এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, “আইএমইআই প্রত্যেক ফোনের ইউনিক নাম্বার। কোনো অপারেটরের সিম প্রবেশ করালেই এটা কোম্পানি জানতে পারবে। তাই তারা এক মোবাইল নাম্বারের সঙ্গে এতগুলো ইউনিক নাম্বার যুক্তর ব্যাপারটি অবশ্যই জানতে পারে। সেটা তাদের নোটিফাই করা দরকার ছিল।”
অনিয়মের দায় শুধু একক কোনো পক্ষের নয় বলেও মনে করেন সুমন আহমেদ।
“এটা অপারেটরদের দায়িত্ব ছিল লক্ষ্য করার। একই সঙ্গে রেগুলেটর হিসেবে বিটিআরসির দায়িত্ব ছিল বিষয়টা কন্ট্রোল করা। প্রত্যেকটা ডিভাইসের জন্য একটি ইউনিক আইএমইআই থাকবে, এই সিস্টেমটাই ভেঙে পড়েছে।”

অন্যান্য দেশের ইতিহাস
অনেক দেশেই ক্লোন ফোন, নকল আইএমইআই ও ডিভাইস শনাক্তকরণে দুর্বলতা একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
২০১৯ সালে ভারতে প্রায় ১ লাখ ডিভাইসের একই আইএমইআই নম্বর ব্যবহারের একটি ঘটনা সামনে আসে।
কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাতেও একই আইএমইআই নাম্বারের একাধিক ফোন মিলেছিল ও এর সঙ্গে জড়িত চক্রের হোতাদের গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে বাংলাদেশের মতো এত বিশাল সংখ্যক ক্লোন ফোন পাওয়ার ঘটনা কোথাও পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে গ্রাহকরা
একই আইএমইআই নম্বরে হাজার হাজার, এমনকি লাখ লাখ ফোন সচল থাকার অর্থ হচ্ছে, অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ডিভাইস ট্রেস করাই সম্ভব নয়।
সুমন আহমেদ বলেন, “একই আইএমইআই নাম্বারে একাধিক নিবন্ধন আছে। ফলে দেখা যাবে একজন অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে, এবং সেই ইউনিক নাম্বার একই হওয়ার কারণে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি ফেঁসে যাচ্ছেন।”
“একটা সেটে সিম ঢুকিয়ে কেউ অপরাধ করল। এখন আপনি কোন সেটটা ট্রেস করবেন? একটা নাম্বারে যদি লক্ষ লক্ষ সেট থাকে, তাহলে কীভাবে বলবেন, এই নির্দিষ্ট সেটটাই অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে,” বলেছেন তিনি।
সুমন আহমেদ বলেন, এই ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর তদন্ত যেমন দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি তৈরি হয় ভয়ংকর ঝুঁকি।
স্বাস্থ্যঝুঁকি
নিরাপত্তার পাশাপাশি রয়েছে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক নকল ও নিম্নমানের হ্যান্ডসেট কখনোই কোনো স্বীকৃত নিরাপত্তা বা গুণগত মান পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়নি।
এর মধ্যে রয়েছে রেডিয়েশন টেস্ট ও স্পেসিফিক অ্যাবসরপশন রেট মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা যাচাই।
ফয়েজ আহমদ লিখেছেন, “লক্ষ লক্ষ নাগরিক এসব নিম্নমানের নকল ফোন ব্যবহার করছেন। এসব ফোনের রেডিয়েশন টেস্ট, Specific Absorption Rate (SAR) Testing সহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা টেস্ট হয়নি কখনও।”
সুমন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে রেডিয়েশন লেভেল পরীক্ষা করার কোনো কার্যকর অথরিটি আদৌ আছে কি না, আমি নিশ্চিত না। আর আনঅফিসিয়াল ফোনের ক্ষেত্রে তো এই যাচাইয়ের কোনো সুযোগই নেই।”
ডিজিটাল জালিয়াতির শঙ্কা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে যে দেশের ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে।
বিটিআরসি ও মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে e-KYC জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই ঘটেছিল অবৈধ ফোন, কিংবা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে।
২০২৩ সালে ১৮ লাখ ফোন চুরি যাওয়ার অভিযোগ দায়ের হয় (রিপোর্ট হয়নি এমন সংখ্যা আরও কয়েক লক্ষ) আর এসব ফোনের অধিকাংশই উদ্ধার করা যায়নি।
ফয়েজ আহমেদ লিখেছেন, আমরা অনুমান করেছি যে, ক্লোন ও নকল ফোনের ছড়াছড়ি আছে, তবে বুঝতে পারিনি ভয়াবহতা এতটা গভীর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে এভাবে আন-অফিশিয়াল নতুন ফোনের নামে নকল ফোন বিক্রি করা হয়েছে, এমন প্রতারণা অভাবনীয়, নজিরবিহীন। এই চক্রের লাগাম টানা জরুরি।
কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, সরকার ইতোমধ্যে বৈধভাবে আমদানিকৃত আইওটি (IoT) ডিভাইসগুলোকে আলাদাভাবে ট্যাগ করার কাজ শুরু করেছে।
তবে এই মুহূর্তে এসব IMEI সম্পূর্ণভাবে ব্লক করা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, জনজীবনে অসুবিধা তৈরি হতে পারে এই বিবেচনায় ফোনগুলোকে ‘গ্রে’ হিসেবে ট্যাগ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত মনে করেন সুমন আহমেদ।
“আনঅফিসিয়াল ফোনের এই জায়গাটা আসলে এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে। এখন বন্ধ করা যাচ্ছে না। বন্ধ করলে অনেক গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবে যারা আসলে সরল বিশ্বাসে একটা ফোন কিনেছিল।”
তবে ভবিষ্যতে আরও কঠোর হওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এনইআইআর ব্যবস্থার মাধ্যমে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য সামনে এলেও এই পদ্ধতির বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। অবিলম্বে এনইআইআর কার্যক্রম স্থগিতের দাবি জানিয়েছে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)।
সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি শামীম মোল্লা বলেন, নতুন মোবাইল নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি নেই। তবে কোনো প্রস্তুতি ও নীতিমালা ছাড়াই হঠাৎ করে এই ব্যবস্থা চালু করাই সমস্যার মূল কারণ।
একটি আইএমইআই নম্বরে বিপুল সংখ্যক ডিভাইস শনাক্ত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "এতে আরও অনেক ফোন বন্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে শুরু হয়নি।"
তার মতে, প্রথমে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কেনা-বেচার জন্য একটি স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হওয়া উচিত ছিল।
শামীম মোল্লা বলেন, এনইআইআর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর অনেক গ্রাহকের ফোন বন্ধ হয়ে গেছে, যার দায় এসে পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপর।
“আমাদের কাস্টমাররা এখন আমাদের আসামির মতো দেখছে। তারা বলছে, 'আপনাদের কাছ থেকে ফোন কিনেছি, এখন সেট বন্ধ। টাকা ফেরত দেন, না হলে ফোন বদলে দেন'।”
শামীম মোল্লা অভিযোগ করেন, এতে করে ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছেন। তার কথায়, “প্রায় প্রত্যেকটা ব্যবসায়ীর এখন পথে বসে যাওয়ার মতো অবস্থা। সরকার যদি আমাদের নিয়ে না ভাবে, তাহলে আমরা যাবো কোথায়?”
এই কারণেই মোবাইল ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নেমেছেন বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।



