প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের ‘পিস্তল বিতর্ক’ পদত্যাগ পর্যন্ত গড়ালো

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

গাড়ি থেকে নেমে একজন ব্যক্তি এক হাতে পিস্তল ও এক হাতে হ্যান্ডমাইক নিয়ে মানুষকে ধাওয়া করছেন, দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। ফেইসবুকের এই ভিডিও দিয়েই ঘটনার শুরু।

সেই ব্যক্তি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তার নিজের ফেইসবুক পেইজ থেকেই শনিবার এই ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায় যে ইশরাক হোসেন বলে চলেছেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে চলছে এই অভিযান। পিস্তল হাতে তাদের সতর্ক করে দেন তিনি। ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল আলোচনায় চলে আসে।  

তার দুইদিন পর, সোমবার ১৯এ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ একই ফেইসবুক পেইজ থেকে দেওয়া এক পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।

১৭ই অক্টোবর শনিবার বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ফেইসবুক পেইজ থেকে মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়, যেখানে তাকে এক হাতে পিস্তল, আরেক হাতে হ্যান্ডমাইক ধরা অবস্থায় দেখা যায়।

এরপর শনিবার সন্ধ্যায় আরেকটি পোস্টে ঢাকা-৬ আসন মাদকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যহত রাখার ঘোষণাও দেন তিনি। সেখানে আরও বলা হয়, নিজের দলের কেউ মাদক কারবারে জড়িত থাকলে তার শাস্তি আরও বড় হবে।

একজন প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে অস্ত্র বের করতে পারেন কিনা বা কোন অবস্থায় অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন, তার অভিযানে অংশ নেওয়া এবং অস্ত্র ব্যবহার করার আইনি বৈধতা কতটুকু, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা ও বিতর্ক জন্ম নেয়।

রবিবার এক বিবৃতিতে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শরিফুল ইসলাম জানান, এই ঘটনায় কোনো আইনের ব্যত্যয় থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “ঘটনাটি মূল্যায়নের জন্য এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেবেন।”

ইশরাক হোসেনের ফেইসবুক পেইজ থেকে প্রকাশিত ভিডিও গণমাধ্যমে ছড়াছড়ি হলে রবিবার দুপুরে তিনি অভিযোগ তোলেন, তার ভিডিওর ‘খণ্ডিত অংশ’ প্রচার করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ‘নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্রে’ তার ওপর সম্ভাব্য আকস্মিক হামলার তথ্য পাওয়া যায়, এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি আত্মরক্ষার্থে পিস্তল ব্যবহার করেছিলেন।

পাশাপাশি তিনি এও বলেন, কর্মসূচি চলাকালে স্পটে পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন আইনলঙ্ঘনকারী ‘মারমুখী ভঙ্গিতে’ তার গাড়িবহরের দিকে ধেয়ে আসে। ইশরাক হোসেন দাবি করেন, ঠিক সেই মুহুর্তে তিনি জানমালের প্রত্যক্ষ হুমকি এবং সুনির্দিষ্ট হামলার হামলার আশঙ্কায় গাড়ি থেকে নেমে আত্মরক্ষা করতে স্বল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন।

রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এরপর সোমবার সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটে নিজের ফেইসবুক পেইজের পোস্টে দুপুরে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার কথা জানান তিনি। পোস্টে লেখা হয়েছে, “আজ দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হব, ইনশাআল্লাহ।”

সেখানে আরও লেখা হয়, “ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন। এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।”

২০২০ সালে ইশরাক হোসেন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে ভোটে লড়েন। তবে সেবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস মেয়র নির্বাচিত হন। বিএনপি সেই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিলো।

২০২৫ সালের ২৭এ মার্চে একটি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল সেই ফল বাতিল ঘোষণা করে ইশরাক হোসেনকে বৈধ মেয়র ঘোষণা করে রায় দেয়। মে মাসে ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে নগর ভবনের সামনে বেশ কয়েকদিন টানা আন্দোলন হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ২৮এ এপ্রিল তাকে বৈধ মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।

২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইশরাক হোসেন। পাশাপাশি তাকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ইশরাক হোসেনের পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি পরপর চারবার ঢাকা-৭ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাদেক হোসেন খোকা অখণ্ডিত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।