মন্তব্য প্রতিবেদন

চোরবাগানে ঝরে যাওয়া উনিশটি প্রাণ এবং মুখ্যমন্ত্রীর ‘ভাইপো’

কলকাতার দুর্গাপূজা একসময় ছিল শিল্প, সৃজনশীলতা আর জনসম্পৃক্ততার উদযাপন। ক্রমেই সেই উৎসব ঘিরে বেড়েছে রাজনৈতিক দখলদারি। মণ্ডপে পদদলিত হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু সেই বদলে যাওয়া সমীকরণকেই সামনে এনেছে। আর এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছে আরো এক ‘মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো’-কে, যার কথা বাংলার মানুষ বড় একটা জানতো না।

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম

সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে কলকাতার দুর্গাপূজা তার চিরাচরিত কাঠামোর বাইরে এক সার্বিক শিল্প-ভাবনায় পরিণত হতে থাকে। মণ্ডপ, আলো এবং প্রতিমা মিলেমিশে একটা সামাজিক বার্তাবাহী শিল্পকলা হিসাবে উঠে আসতে শুরু করে। একে হাল আমলের ‘ইস্টলেশন আর্ট’-এর বৃহদাকার ফর্ম বলা যেতে পারে। এক একটি পূজা কখনও কয়লা খনির শ্রমিক পরিবারের কথা বলে, কখনোবা বিশ্ব উষ্ণায়ন, কখনো হয়তো উত্তরাখণ্ডে হিমালয়কে প্রেক্ষাপটে রেখে হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও দুর্গমতম গিরিমন্দিরকে প্রতিটি খুঁটিনাটিসহ তুলে নিয়ে আসে নগরজীবনে।

পূজার চার দিন তো বটেই, তার তিন চার দিন আগে থেকেই শারদীয় উৎসব মুখর জনতার কলরোলে ভেসে যায় কল্লোলিনী কলকাতা। প্রবাসীরা ঘরে ফেরেন, মফস্বলের বাসিন্দাদের ঢল নামে, ভিনদেশি পর্যটকদের গন্তব্য হিসাবে তুলে ধরা হয় পূজায় কলকাতাকে। আনন্দবাজার পত্রিকা এক সময়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভিড়ের খতিয়ান প্রকাশ করত কলকাতার ডজনখানেক জনপ্রিয় বড় দুর্গোৎসবের। সুতরাং ভিড় কোনও নতুন বিষয় নয় পূজার কলকাতায়। এই ভিড়ের মধ্যেও পুলিশের কৃতিত্বে ট্রাফিক বন্দোবস্ত মাখনের মতো থেকেছে সর্বত্র। পাড়ায় পাড়ায় ভিড় নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী অনায়াসে জনস্রোতকে পরিচালনা করেছে ‘দক্ষ সাপুড়ে’র মতো।

ব্যতিক্রম এই ২০২৬। উত্তর কলকাতায় চোরবাগানের পূজা নতুন নয়। এবারেও এই পাড়ার শিল্পসুষমাময় অনন্য সৃষ্টির কথা কানে কানে এবং সোশাল সাইটে ছড়িয়ে পড়ে ঔৎসুক্য সৃষ্টি হয়েছে। ফলশ্রুতি লোকারণ্য। ১৭ তারিখ, শনিবার তদোপরি হঠাৎ বর্ষণ জনকল্লোলে যে তাৎক্ষণিক ক্ষিপ্ততার সঞ্চার ঘটায় তার ধাক্কায় প্রাণ গেল ১৯ জন দর্শনার্থীর, যারা অধিকাংশই তরুণ ও নারী। হাসপাতালে আরও অন্তত ১০ জন। আকস্মিক এই দুঃসংবাদ প্রকাশ্যে আসার পরেই নেমে আসে প্রগাঢ় বিষাদ। সঞ্চারিত হয় ক্ষোভ। তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নব্য শাসক দলের কেষ্ট-বিষ্টুদের অসহিষ্ণু মন্তব্যমালা ও কলকাতা পুলিশের নিশ্চেষ্টতার ছবি ভাইরাল ভিডিওতে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের আঁচ উসকে তুলেছে। 

উৎসবমুখর মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় যারা ব্যর্থ, তাদের কেন শাস্তি পেতে হবে না, সেই প্রশ্নও জোরেশোরে উঠেছে। আর এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছে আরো এক ‘মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো’-কে, যার কথা বাংলার মানুষ বড় একটা জানতো না।

ছবি: দ্য হিন্দু

পশ্চিমবঙ্গের ‘ভাইপো’

বলা হয়ে থাকে, আগের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ধ্বংসের প্রধান কারণ তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। 

নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই ভাইপোর নাম দেবদীপ অধিকারী, তার বড় ভাই কৃষ্ণেন্দুর পুত্র, এই চোরবাগান লেনের দুর্গাপূজার প্রধান কান্ডারি হিসাবে যার নাম উঠে আসছে।

 রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের আগে কলকাতার এক একটি পূজা ছিল আগের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের এক এক জন নেতার অধিকারে। বিজেপির জয় চূড়ান্ত হওয়ার পরে একে একে প্রায় সব পূজা কমিটির দখল নেয় এক এক জন বিজেপি নেতা। সঙ্গে অবশ্যই তাদের নব্য অনুচরেরা। যেমন চোরবাগান লেনের পূজাটির দখল নিয়েছেন এই ভাইপো বাহিনী। 

তৃণমূলের আগের বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে শাসক সিপিআই(এম) দুর্গাপূজার ‘ধর্মীয় অনুষ্ঠানে’ সেভাবে সম্পৃক্ত না হয়ে কেবল মণ্ডপের বাইরে একটি করে মার্কসীয় সাহিত্যের স্টল করে জনসংযোগ করত। এখন সেই স্টলের আকার ছোট হলেও প্রথাটি তারা ধরে রেখেছে। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে সেই স্টলগুলিই গেরুয়া বাহিনীর নিশানা হয়েছে। 

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ ও প্রশাসন মিলে এবারে বামদের বইয়ের দোকান উচ্ছেদে যতটা সচেষ্ট হয়েছে, ভিড় নিয়ন্ত্রণে ততটা নয়। এমনকি শনিবার এই দুর্ঘটনার পরেও গভীর রাতে শহরের কয়েক জায়গায় বিজেপি নেতাদের নির্দেশে বিভিন্ন বাম দলের বইয়ের স্টল উচ্ছেদ করেছে পুলিশ।

পদপিষ্ট হওয়ার দুর্ঘটনা যে মানুষকে কীভাবে ক্ষিপ্ত করেছে, তার আয়না সামাজিক মাধ্যম। সরকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, যেমন দেয়। কখনও সেই তদন্তে আসল লোকের নামগুলি উঠে আসে না, ধরা পড়ে কিছু চুনোপুঁটি। সেই নাম যদি শাসক দলের নেতাদের হয়, তা হলে তো সেটা একেবারেই সম্ভব নয়।

বর্ষীয়ান সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী তার ফেইসবুক পোস্টে বলছেন, "এবার স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক (বিজয় ওঝা) রাতারাতি সেই পূজার কর্তা, এছাড়া উত্তর কলকাতা বিজেপির মাথাও সেই কমিটি দখলে যুক্ত। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাই, হাত বদলে বর্তমানের ভাইপো, তিনিও আছেন দখল বাহিনীতে। সুতরাং, চোরবাগানে নিছক দুর্ঘটনা হয়ে থাকলেও, অন্যত্র অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়। কেননা, এই পূজা আয়োজনকে যতই আবেগ দিয়ে প্রচার করা হোক না কেন, এর আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অন্ধকার দিকটি আলোচনায় আড়ালে থাকে। মিডিয়ায় গুরুত্ব পায় থিম চর্চা। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সহবাস নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।"

জয়ন্ত লিখছেন, "এই যান্ত্রিক দখলদারির ফসল অসংখ্য চোরবাগান গজিয়ে উঠেছে গোটা রাজ্যে। যার ভিতরে রয়ে গিয়েছে আর্থিক ক্ষমতাকে কব্জায় পাওয়ার উদগ্র বাসনা।"

সমাজকর্মী প্রসূন আচার্য সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন, "শুভেন্দু সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পুলিশের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে শাসকের দলদাস হয়ে বিরোধীদের দমন করা। আজ পূজার সময়ে সারা দিন ধরে সেই কাজই তারা করেছে— বামেদের বইয়ের স্টল ভাঙা। ভিড় সামলাবে কি!!” 

“আর বিজেপির নেতাদের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কতগুলো অশিক্ষিত অবাঙালি মস্তানকে সামনে এগিয়ে দিয়ে মারব ধরব, বাম বধ, সনাতনী এই সব নিয়ে লাফালাফি। তারা তো শারদীয়া উৎসবের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন তুলছে, শারদীয়া বলা বা লেখা যাবে না! তারা পূজা কমিটি দখলের মধ্যে থাকলেও ভিড় সামলানোর মধ্যে নেই! ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। চোরবাগানের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। যত দিন যাবে এই ধরনের ঘটনা প্রকট হবে।”

আরেক বর্ষীয়ান সাংবাদিক দেবদূত ঘোষঠাকুর শনিবারের ঘটনার পরে লিখছেন, "মানুষের জীবন নিয়ে যারা খেলল, তাদের কি শনাক্ত করা হবে? নেহাত দুর্ঘটনার তত্ব খারিজ করে সাজা দিতে পারবে রাজ্য প্রশাসন? পারলে সেটাই হবে এই শহরের মানুষের পূজার সেরা উপহার।”

ছবি: আল জাজিরা

কাদের গাফিলতি?

পূজার ভিড় নিয়ে রিপোর্টিংকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন চিফ রিপোর্টার, আদতে ময়মনসিংহের ঘোষঠাকুর বাড়ির দেবদূতবাবু। 

দুই দিন আগে একটি শারদ পুরস্কার দলের বিচারক হিসাবে মধ্যরাতে রাস্তায় বেরিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে এবারের বেহাল অবস্থার বিষয়টি চোখে পড়ে তার। পুলিশের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে কারণ খুঁজতে চেয়েছিলেন দেবদূতবাবু। 

তিনি লিখছেন, "ষষ্ঠীর সকালে লালবাজারের ট্রাফিক কন্ট্রোলের এক চেনা অফিসারকে ফোন করলাম, ‘তোমরা করছ কী বলো তো? মনে হচ্ছে একমাত্র চোরবাগানেই পুজো হচ্ছে।‘ সংবাদপত্রে কাজ করার সময় আমরা সারাবছর ট্রাফিক পুলিশকে গালাগাল দিতাম। কিন্তু পূজার ভিড় সামলানোর কেরামতির জন্য পূজার ম্যান অব দ্য ম্যাচ ঘোষণা করতাম পুলিশকে।"

তিনি লিখেছেন, জমানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে পূজা দখলের সঙ্গে এই দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট। চোরবাগানে বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত পঞ্চমীর রাতে ছিল। আমরা যেমন ভুক্তভোগী, ভুক্তভোগী তেমন কলকাতা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত অফিসার আর কর্মীরাও। পূজার দিনগুলোতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে ওই পূজা কমিটি কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবে, সেটা পুলিশের সে দিনই বোঝা উচিত ছিল। সেইমতো পূজা কমিটিকে সতর্ক করে দিয়ে পারত তারা। পূজা কমিটি অপরাগ হলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারতো পুলিশ। কিন্তু সেই সবের কিছুই করা হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, "এই সরকার আগের সরকার নয়। এখন আমরা নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছি। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থায় মন দিয়েছি। কিন্তু যাদের গাফিলতিতে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের কাউকে ছাড়া হবে না।"

এই আশ্বাসের প্রতি মানুষের কিন্তু বিশ্বাস নেই। প্রথমত, কারা দায়ী, তা সবারই জানা। তারা বিজেপির নেতা। অভিযোগ, এদের মাথায় আবার খোদ মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো। তাই কী হবে তা-ও সবারই জানা।