গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, দীর্ঘ মামলার পর খালাসও পেয়েছেন। এর মধ্যেই ফের নেটওয়ার্ক গড়ার অভিযোগ 'বোমারু মামুনের' বিরুদ্ধে। সাভারে সায়ানাইড উদ্ধার, আত্মঘাতী হওয়ার নির্দেশনা ও অনলাইনে যোগাযোগ সেই তৎপরতারই নতুন সূত্র হয়ে সামনে এসেছে।
দীপু সারোয়ার
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৬ পিএমআপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৭ এএম
বরিশালের রূপাতলী থানার মো. ইসমাইল মীরের ছেলে মামুনের পড়াশোনা ঢাকার দক্ষিণখান, টঙ্গী ও উত্তরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে। তবে ২০১৬ সালে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা আর এগোয়নি।
সুইসাইড ভেস্ট থেকে এখন সায়ানাইড, আত্মঘাতী হওয়ার পন্থা বদলাচ্ছেন নব্য জেমবি’র জঙ্গিরা। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জামের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া সন্দেহজনক রাসায়নিক দ্রব্য পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে সায়ানাইড শনাক্ত হওয়ার পর সামনে এসেছে এই নতুন তথ্য। আর এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন নাজমুল হাসান মামুন। পুলিশের খাতায় যার নাম ‘বোমারু মামুন’।
'মাদার অব সেইটান' নামে পরিচিত ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড (টিএটিপি) বিস্ফোরক দিয়ে বোমা তৈরিতে পারদর্শী মামুন একসময় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ বোমা-প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে, যাদের একজন ছিলেন ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী।
সেই প্রশিক্ষণ থেকে গড়ে ওঠা মামুনের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে ছিলো সিলেটের আতিয়া মহল থেকে মৌলভীবাজার, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চাপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ এবং চট্টগ্রাম থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত। যেসব জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে একের পর এক নিহত হয়েছেন নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতারা।
মামুন ২০১৭ সালে হোটেল ওলিও বিস্ফোরণ মামলায় গ্রেপ্তার হলেও, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেকসুর খালাস পান। তবে খালাসের আগেই জামিনে মুক্ত হয়ে ফের নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার তথ্য মিলছে তার বিরুদ্ধে।
জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা পুলিশের দুই বিশেষায়িত ইউনিট, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর কর্মকর্তারা বলেছেন এই বছরের অগাস্টে সাভারে চালানো অভিযানের মূল টার্গেটই ছিলেন মামুন, কিন্তু তার আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই মামুনের সন্ধানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অভিযান চালিয়ে আসছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গত ১১ই অগাস্ট সাভারের হেমায়েতপুরের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি তিন তলা ভবনে চালানো সিটিটিসির ওই অভিযানে বোমা তৈরির কেমিক্যালের সাথে সায়ানাইডও উদ্ধার হয় বলে একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে জানিয়েছেন।
যদিও ওই অভিযানের মামলার জব্দ তালিকায় সায়ানাইডের তথ্য উল্লেখ নেই। সন্দেহজনক রাসায়নিক দ্রব্য ঢাকার মহাখালীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষকের কার্যালয়ে পাঠানোর পরই সায়ানাইডের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
"সন্দেহজনক রাসায়নিক দ্রব্যটি আসলে সায়ানাইড, প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে পরীক্ষাগারের রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি," আলাপ-কে বলেছেন সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন। তিনি জানান, ঘটনার পরপরই মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় এটিইউ, এখন তদন্ত করছে তারাই।
সাভারে অভিযান চালানোর আগে সেই দিনই মামুনের ‘শিষ্য’ মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন এটিইউ-এর এক কর্মকর্তা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হেমায়েতপুরের আস্তানা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, সায়ানাইড ও মামুন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি।
আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, অজ্ঞাতস্থান থেকে অনলাইনে নির্দেশ দিচ্ছেন নব্য জেএমবির আমির মোহাম্মদ কামরুল হাসান, সংগঠনে যিনি পরিচিত মাহাদী হাসান জন এবং আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ নামে। "কামরুল হাসানের নির্দেশেই নিষিদ্ধ সংগঠনটির বোমা তৈরির নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছেন মামুন। আত্মঘাতী হতে সায়ানাইড ব্যবহারের নির্দেশও দিচ্ছেন কামরুলই," আলাপ-কেবলেন তিনি।
কামরুলের বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায়। ঢাকা, বগুড়াসহ দেশের নানা জায়গায় 'সন্ত্রাসী হামলার' তালিকাভুক্ত আসামি তিনি বলে জানিয়েছেন বগুড়ার গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সুফিয়ান।
“যতদূর জানা যায়, কামরুল বিদেশে পলাতক আছেন,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
‘বোমারু মামুন’ আসলে কে, কীভাবে বোমা বানানোতে পারদর্শী হয়ে উঠলেন, নব্য জেএমবি নেতাদের আস্থাভাজন হলেন কীভাবে, সাড়ে ৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি থাকার পর জামিনে বেরিয়ে এসে এই জঙ্গি কীভাবে আবার পুরোনো নেটওয়ার্ক সচল করলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ২০১৬ সালে।
যেভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন মামুন
বরিশালের রূপাতলী থানার মো. ইসমাইল মীরের ছেলে মামুনের পড়াশোনা ঢাকার দক্ষিণখান, টঙ্গী ও উত্তরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে। তবে ২০১৬ সালে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা আর এগোয়নি।
ওলিও হোটেলে বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মামুন জানিয়েছিলেন, কলেজে পড়ার সময় সামাজিক মাধ্যমে আবু মুসলিমা নামের একজনের সাথে তার পরিচয় হয়। ২০১৬ সালের জুন অথবা জুলাই মাসে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর পার্কে তার সাথে আবু মুসলিমার সাক্ষাৎ হয়।
আবু মুসলিমা তাকে প্রভাবিত করে বলেন, ‘প্রচলিত লেখাপড়া ভালো না। কুরআন ও হাদিস মানতে হবে, বুঝতে হবে। মৃত্যুর পর প্রচলিত লেখাপড়া কোন কাজে আসবেনা। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন কোন কাজে আসবেনা। সব মায়া ত্যাগ করে হিজরত করতে হবে।’
এরপর যোগাযোগ চলে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ 'থ্রিমা'-য়, যেখানে মামুনের সাংগঠনিক নাম হয় 'আবদুল্লাহ' আর আবু মুসলিমার নাম 'মুয়াজ'। মুয়াজের মাধ্যমেই আবদুল ওয়াহিদ নামে আরেকজনের সাথে পরিচয় হয় মামুনের, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার সাংগঠনিক পরিসর।
হোটেল ওলিও বিস্ফোরণ: মামুনের গ্রেপ্তার ও খালাসের পর নাশকতার নতুন অধ্যায়
২০১৭ সালের ১৫ই অগাস্ট, জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান ঘিরে ঢাকায় বড় নাশকতার ছক কষেছিলো নব্য জেএমবি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগের রাত থেকেই পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ঘিরে রাখে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল।
হোটেলের ৩০১ নম্বর কক্ষে থাকা এক যুবককে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় তারা। কিন্তু ভেতর থেকে বোমা বিস্ফোরণের হুমকি দিতে থাকেন ওই যুবক।
১৬ই অগাস্টে চূড়ান্ত অভিযান শুরু হতেই বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হন ওই যুবক। বিস্ফোরণের ধাক্কায় ধসে পড়ে হোটেলের দেয়াল ও রেলিং। পরে জানা যায় তার নাম সাইফুল ইসলাম।
বোমাটা অবশ্য সাইফুলের বানানো ছিলো না। ময়মনসিংহের ভালুকার একটা আস্তানায় সেটা তৈরি করে ঢাকায় নিয়ে এসে সাইফুলকে হস্তান্তর করেন মামুন নিজেই। বহুল আলোচিত এই ঘটনার মামলায় দুই নাম্বার আসামি করা হয় মামুনকে।
সেই বছরেরই ৩১এ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হন মামুন। আট বছরের বেশি সময় ধরে মামলা চলার পর, ২০২৬ সালের ৫ই জানুয়ারি ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামুনসহ ১১ জনকে বেকসুর খালাস দেন।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আবদুল হালিমের দেয়া রায়ে বলা হয়েছে, “অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন। এছাড়া মামলাটি ছিলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
অবশ্য খালাস পাওয়ার আগেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হয়ে আসেন মামুন।
জামিনে বের হয়েই অন্তবর্তী সরকারের গঠন করা গুম-সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারিতে অভিযোগ করেন মামুন। যেখানে তিনি দাবি করেন, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বরিশাল থেকে তাকে গুম করা হয়েছিলো। আর এতে পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা জড়িত।
তবে তার এই দাবি অল্প সময়ের মধ্যেই ভুল প্রমাণিত হয়। গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২৬এ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিংয়ে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণ হয়, সেখান থেকে ককটেল, দাহ্য পদার্থ ও বোমার সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
এই ঘটনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার হওয়া শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলামকে ১০ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে “বোমারু মামুনের নব্য জেমবি নেটওয়ার্ক” নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পায় পুলিশ, আলাপ-কে জানিয়েছেন তদন্তের সাথে যুক্ত একজন কর্মকর্তা। স্পষ্ট হয় যে, মামুন আবার নিজের নেটওয়ার্ক দাঁড় করানোর কাজে নেমেছেন।
এগারোই অগাস্ট সাভারের হেমায়েতপুরে দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালানোর আগে গ্রেপ্তার করা হয় নব্য জেএমবি’র আরেক নেতা মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে, যাকে ‘মামুনের শিষ্য’ বলছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ইমরানের কাছে পাওয়া তথ্যে চালানো সেই অভিযানেই অন্যান্য জিনিসের মাঝে পাওয়া গিয়েছিলো সায়ানাইড।
১৬ই অগাস্ট ঢাকার ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় জুয়েল ভূঁইয়া ও আরিফ চৌধুরীকে। তারা মামুনের সহযোগী। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেও মামুনের নেটওয়ার্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছেন এটিইউ’র এক কর্মকর্তা।
জুয়েল ভূঁইয়ার নাম অবশ্য নতুন না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নরসিংদী কারাগারে দাঙ্গার পর পালানো নয়জন জঙ্গির একজন ছিলেন তিনি। ছয়দিন পর গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে ধরা পড়ে ফের কারাগারে যান জুয়েল।
কাশিমপুর কারাগারে থাকার সময়ই মামুনের সাথে পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে জুয়েলের। মামুনের মতোই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হয়ে আসেন জুয়েল।
নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য মাহফুজের গড়ে তোলা ‘বোমারু মামুন’
২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামে চলে যান মামুন। সেখানে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে মামুনকে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দেন মো. সাখাওয়াত হোসেন। সংগঠনে যার নাম ছিলো ‘মাহফুজ’, ‘সবুজ পাখি’, ও ‘তাহুশ’।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় এক সরকারি কর্মচারীর ছেলে সাখাওয়াতের জন্ম ১৯৮৪ সালে। স্থানীয় আল হেরা একাডেমি থেকে ২০০২ সালে এসএসসি পাশ করে ফুলবাড়িয়া কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু এইচএসসি শেষ করার আগেই ২০০৪ সালে যোগ দেন নৌবাহিনীতে। সেখানে থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় ডেপুটেশনে চট্টগ্রামে র্যাব-১২ তে কর্মরত ছিলেন মাহফুজ। এর আগে ২০১৩ সালে নীলফামারী ও টাঙ্গাইলে র্যাবের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এই মাহফুজের কাছেই চট্টগ্রামে ২০১৭ সালের শুরুতে দুই মাসের প্রশিক্ষণে সালফিউরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে বোমা বানানো শিখে এক সময় 'মাদার অব সেইটান' নামে পরিচিত টিএটিপি বিস্ফোরক দিয়ে বোমা বানাতে দক্ষ হয়ে ওঠেন মামুন।
কিন্তু মাহফুজ নিজে বেশিদিন টিকতে পারেননি। সেই বছরেরই অর্থাৎ ২০১৭ সালের ২৩এ মার্চ মধ্যরাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিলেটের শিববাড়ি এলাকার 'আতিয়া মহল' ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২৫এ মার্চ থেকে ২৮এ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দলের 'অপারেশন টোয়াইলাইট'।
প্রথম দিনই ভবনের ভেতর আটকে থাকা ৭৮ জনকে উদ্ধার করেন কমান্ডোরা, কিন্তু সন্ধ্যায় পাশের মাদ্রাসার কাছে দুই দফা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন সাতজন, যাদের মধ্যে ছিলেন র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগ প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদও। আর এই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন মাহফুজ।
সিলেটের আতিয়া মহলে চালানো সেই অভিযানে নিহত চার জঙ্গির একজন ছিলেন মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসা। এর আগে ঢাকার আশকোনায় একটা অভিযানের পর মুসার নাম প্রথম সামনে আসে। ওই অভিযানের পর চট্টগ্রাম হয়ে সিলেটের আতিয়া মহলে আস্তানা গাড়েন তিনি।
আতিয়া মহলে অভিযানের সময় ওই এলাকা থেকে মাহফুজ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ২৯এ মার্চ ভোরে মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে চালানো হয় 'অপারেশন হিটব্যাক'। অভিযান শেষে পাওয়া যায় জেএমবি নেতা লোকমান হোসেন ওরফে সোহেলের মরদেহ। তার স্ত্রী শিরিনা আক্তার ও পাঁচ মেয়ের মরদেহও উদ্ধার হয় সেই সময়, যাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মেয়ের বয়স ছিলো মোটে সাত মাস।
এই আস্তানাতে যাতায়াত ছিলো মাহফুজেরও। সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তিনি বিয়েও করেছিলেন লোকমানের বড় মেয়েকে, যা ছিলো তার দ্বিতীয় বিয়ে। এর আগে পারিবারিকভাবে ২০১১ সালে প্রথমবার বিয়ে হয় মাহফুজের। প্রথম স্ত্রীর নাম শারমিন আক্তার।
শেষমেশ ৩১এ মার্চ মৌলভীবাজার শহরের বড়হাট এলাকায় 'অপারেশন ম্যাক্সিমাস'-এ মারা যান মাহফুজ। অভিযানে নিহত তিন জনের একজন ছিলেন মাহফুজ, যদিও পরিচয় নিশ্চিত হতে সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মীয়-স্বজন ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন।
মামুন তার জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, নিহত মুসা ও লোকমানকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন তিনি। তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিলো তার।
২০১৬ সালের ১লা জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ‘সন্ত্রাসী হামলার’ অন্যতম পরিকল্পনাকারী এই হাতকাটা সোহেল নব্য জেএমবির ভারতীয় শাখার আমিরও ছিলেন। দুর্ধর্ষ এই জঙ্গি ভারতের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণ মামলারও আসামি। তাকে ধরিয়ে দিতে ভারতের পুলিশ ২০১৪ সালে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো।
২০১৭ সালের ৭ই জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পুষ্কনি এলাকার আমবাগান থেকে হাতকাটা সোহেল ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৭ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হাতকাটা সোহেলের কাছে টাইম বোমা, রিমোট বোমা, প্রেসার কুকার বোমা ও সুইসাইড ভেস্ট বানানোর প্রশিক্ষণ নেন মামুন।
সেই প্রশিক্ষণে মামুনের সাথী ছিলেন বাশারুজ্জামান ওরফে ‘চকলেট বাশার’ নামের আরো একজন। যিনি সংগঠনে শাহেদ নামেও পরিচিত ছিলেন এবং ১১ দিনের জন্য নব্য জেএমবি’র আমিরও হয়েছিলেন।
সেই বছরের ২৬এ ও ২৭এ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মোবারকপুর ইউনিয়নের ত্রিমোহনী গ্রামে ‘অপারেশন ঈগল হান্ট’ পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই অভিযানে নিহত হন বাশারুজ্জামান।
সেই অভিযানে নিহত হন আরও তিনজন, যাদের একজন ছিলেন মিজানুর রহমান ওরফে ‘ছোট মিজান’। এই মিজানের সাথেও ঘনিষ্ঠতা ছিলো মামুনের, জবানবন্দি সে তথ্যই জানাচ্ছে।
জবানবন্দিতে আরও যাদের নাম; এখন সবাই নিহত
মামুনের জবানবন্দি পর্যালোচনায় এমন আরো অনেক জঙ্গির তথ্য পাওয়া যায়, যারা এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন।
২০১৬ সালের ৮ই অক্টোবর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ‘অপারেশন শরতের তুফান’ অভিযানে সাত জঙ্গি নিহত হন। পরে নিহতদের ছবি প্রকাশ করা হলে একজনকে চিনতে পারেন মামুন। তার সাংগঠনিক নাম মুয়াজ, আসল নাম আবির বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মামুন।
২০১৭ সালের ১৫ই মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌর এলাকার ৫ নম্বর প্রেমতলা ওয়ার্ডে ‘ছায়ানীড়’ নামের একটি বাড়ি ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে শুরু হওয়া ‘অ্যাসল্ট-১৬’ নামের ওই অভিযানে অংশ নেয় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ বাহিনী স্পেশাল ওয়েপনস অ্যান্ড ট্যাকটিকস (সোয়াট), র্যাব-৭ ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
পরদিন ১৬ই মার্চ বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে অভিযান। এ অভিযানের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ও গুলিতে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হন। নিহত নারী জঙ্গির পাশে এক শিশুর মরদেহও পাওয়া যায়। মামুনের জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ি নিহতদের মধ্যে দু’জনকে চিনতেন তিনি। তারা হলেন আবু উমায়ের ও আবুল খায়ের। তবে তাদের বিস্তারিত পরিচয় জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়নি।
একই বছরের ২৪এ মার্চ ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গোলচত্বর এলাকায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন এক যুবক। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত ওই যুবকের ট্রলি লাগেজের ভেতর থেকে তিনটি অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধার করা হয়। মামুনের জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, আত্মঘাতী ওই যুবকের সাংগঠনিক নাম ‘টমেটো’। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় জবানবন্দিতে উল্লেখ নেই।
বোমারু মামুনের আরো অনেক জঙ্গি সঙ্গী এখনও জীবিত
ঝিনাইদহে মামুনের সাথে পরিচয় হয় নব্য জেএমবির এক সময়ের আমির আইয়ুব বাচ্চুর। সাজিদ হাসান, সজীব, বাজিদ, খালিদ, মামুন ও হাবিবুর রহমানসহ নানা নামে পরিচিত তিনি।
সিলেটের আতিয়া মহল অভিযানে মাঈনুল ইসলাম মুসা নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবির আমিরের দায়িত্ব পান তিনি। তবে কতদিন আমিরের দায়িত্ব পালন করেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তার স্ত্রী আশরাদী জাহান ওরফে তিথি ২০১৭ সালের ১লা জুলাই কুষ্টিয়ায় গ্রেপ্তার হলেও বাচ্চু এখনো অধরাই রয়ে গেছেন।
মামুনের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তার সাথে আরো যাদের যোগাযোগ হয়েছিলো তাদের মধ্যে আছেন নওগাঁর মো. আব্দুল্লাহ আইচান কবিরাজ ওরফে রফিক।
কবিরাজ নামে সংগঠনে পরিচিত এই নব্য জেএমবি নেতা ২০১৭ সালের ১৫ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওলিও হোটেলে বিস্ফোরণ মামলায় মামুনের সাথে খালাস পাওয়া আসামিদের একজন এই কবিরাজ।
কবিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, আত্রাই থানার নওদুলী গ্রাম থেকে নব্য জেএমবির দাওয়াত বিভাগের সমন্বয়ক কবিরাজকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। এ সময় সংগঠনের সামরিক ও আত্মঘাতী দলের সদস্য মো. লুলু সরদার ওরফে শহীদ ওরফে মিস্ত্রি, মো. মাসুদ রানা ওরফে হোসেন ওরফে আতিক, মো. আব্দুর রাজ্জাক ওরফে মাসুম ওরফে বাবুল ও মো. মোয়াজ্জেম ওরফে হোসেন ওরফে বুলেটও গ্রেপ্তার হন।
প্রতিবার গ্রেপ্তারের পর তথ্য ফাঁস হওয়ার শঙ্কায় যোগাযোগের অ্যাপ বদলাচ্ছে নব্য জেএমবি। শুরুর দিকে হোয়াটসঅ্যাপেই যোগাযোগ রাখতেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা, পরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন টেলিগ্রাম আর সিগন্যালে।
কিন্তু একের পর এক কর্মী গ্রেপ্তার হওয়ার পর যখন দেখা যায় এসব অ্যাপ থেকেও তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, তখন আবার বদল। এরপর সিকিউর চ্যাট মেসেঞ্জার, থ্রিমা আর উইকারে সরে আসেন তারা। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এখন তারা ব্যবহার করছেন এলিমেন্ট ও ট্র্যাশ মিডিয়া।
সিটিটিসি ও এটিইউ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এই ট্র্যাশ মিডিয়াই এখন সংগঠনের আসল "গোপন কক্ষ"। এখান থেকেই চলে অভ্যন্তরীণ আলাপ, গোপন নির্দেশনা পাঠানো, এমনকি কোনো হামলার দায় স্বীকারও।
সায়ানাইড উদ্ধার আর সাম্প্রতিক এসব ঘটনা মিলিয়ে এটাই স্পষ্ট যে, নব্য জেএমবির নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং 'বোমারু মামুন' আর তার লোকজনকে ঘিরে যেরকম তৎপরতা দেখা যাচ্ছে তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আসছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধুই কি ‘বোমারু মামুন’ নাকি পর্দার আড়ালে অন্য কেউও নিজের মতো একটা নেটওয়ার্ক দাঁড় করাচ্ছেন? সেই উত্তরই এখন খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
সায়ানাইডে আত্মঘাতী, অনলাইনে নির্দেশনা: অধরা ‘বোমারু মামুন’-এর নেটওয়ার্ক
গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, দীর্ঘ মামলার পর খালাসও পেয়েছেন। এর মধ্যেই ফের নেটওয়ার্ক গড়ার অভিযোগ 'বোমারু মামুনের' বিরুদ্ধে। সাভারে সায়ানাইড উদ্ধার, আত্মঘাতী হওয়ার নির্দেশনা ও অনলাইনে যোগাযোগ সেই তৎপরতারই নতুন সূত্র হয়ে সামনে এসেছে।
সুইসাইড ভেস্ট থেকে এখন সায়ানাইড, আত্মঘাতী হওয়ার পন্থা বদলাচ্ছেন নব্য জেমবি’র জঙ্গিরা। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জামের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া সন্দেহজনক রাসায়নিক দ্রব্য পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে সায়ানাইড শনাক্ত হওয়ার পর সামনে এসেছে এই নতুন তথ্য। আর এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন নাজমুল হাসান মামুন। পুলিশের খাতায় যার নাম ‘বোমারু মামুন’।
'মাদার অব সেইটান' নামে পরিচিত ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারঅক্সাইড (টিএটিপি) বিস্ফোরক দিয়ে বোমা তৈরিতে পারদর্শী মামুন একসময় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ বোমা-প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে, যাদের একজন ছিলেন ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী।
সেই প্রশিক্ষণ থেকে গড়ে ওঠা মামুনের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে ছিলো সিলেটের আতিয়া মহল থেকে মৌলভীবাজার, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চাপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ এবং চট্টগ্রাম থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত। যেসব জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে একের পর এক নিহত হয়েছেন নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতারা।
মামুন ২০১৭ সালে হোটেল ওলিও বিস্ফোরণ মামলায় গ্রেপ্তার হলেও, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেকসুর খালাস পান। তবে খালাসের আগেই জামিনে মুক্ত হয়ে ফের নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার তথ্য মিলছে তার বিরুদ্ধে।
জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা পুলিশের দুই বিশেষায়িত ইউনিট, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর কর্মকর্তারা বলেছেন এই বছরের অগাস্টে সাভারে চালানো অভিযানের মূল টার্গেটই ছিলেন মামুন, কিন্তু তার আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই মামুনের সন্ধানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অভিযান চালিয়ে আসছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গত ১১ই অগাস্ট সাভারের হেমায়েতপুরের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি তিন তলা ভবনে চালানো সিটিটিসির ওই অভিযানে বোমা তৈরির কেমিক্যালের সাথে সায়ানাইডও উদ্ধার হয় বলে একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে জানিয়েছেন।
যদিও ওই অভিযানের মামলার জব্দ তালিকায় সায়ানাইডের তথ্য উল্লেখ নেই। সন্দেহজনক রাসায়নিক দ্রব্য ঢাকার মহাখালীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষকের কার্যালয়ে পাঠানোর পরই সায়ানাইডের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
"সন্দেহজনক রাসায়নিক দ্রব্যটি আসলে সায়ানাইড, প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে পরীক্ষাগারের রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি," আলাপ-কে বলেছেন সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন। তিনি জানান, ঘটনার পরপরই মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় এটিইউ, এখন তদন্ত করছে তারাই।
সাভারে অভিযান চালানোর আগে সেই দিনই মামুনের ‘শিষ্য’ মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন এটিইউ-এর এক কর্মকর্তা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হেমায়েতপুরের আস্তানা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, সায়ানাইড ও মামুন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি।
আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, অজ্ঞাতস্থান থেকে অনলাইনে নির্দেশ দিচ্ছেন নব্য জেএমবির আমির মোহাম্মদ কামরুল হাসান, সংগঠনে যিনি পরিচিত মাহাদী হাসান জন এবং আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ নামে। "কামরুল হাসানের নির্দেশেই নিষিদ্ধ সংগঠনটির বোমা তৈরির নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছেন মামুন। আত্মঘাতী হতে সায়ানাইড ব্যবহারের নির্দেশও দিচ্ছেন কামরুলই," আলাপ-কে বলেন তিনি।
কামরুলের বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায়। ঢাকা, বগুড়াসহ দেশের নানা জায়গায় 'সন্ত্রাসী হামলার' তালিকাভুক্ত আসামি তিনি বলে জানিয়েছেন বগুড়ার গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সুফিয়ান।
“যতদূর জানা যায়, কামরুল বিদেশে পলাতক আছেন,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
‘বোমারু মামুন’ আসলে কে, কীভাবে বোমা বানানোতে পারদর্শী হয়ে উঠলেন, নব্য জেএমবি নেতাদের আস্থাভাজন হলেন কীভাবে, সাড়ে ৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি থাকার পর জামিনে বেরিয়ে এসে এই জঙ্গি কীভাবে আবার পুরোনো নেটওয়ার্ক সচল করলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ২০১৬ সালে।
যেভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন মামুন
বরিশালের রূপাতলী থানার মো. ইসমাইল মীরের ছেলে মামুনের পড়াশোনা ঢাকার দক্ষিণখান, টঙ্গী ও উত্তরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে। তবে ২০১৬ সালে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা আর এগোয়নি।
ওলিও হোটেলে বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মামুন জানিয়েছিলেন, কলেজে পড়ার সময় সামাজিক মাধ্যমে আবু মুসলিমা নামের একজনের সাথে তার পরিচয় হয়। ২০১৬ সালের জুন অথবা জুলাই মাসে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টর পার্কে তার সাথে আবু মুসলিমার সাক্ষাৎ হয়।
আবু মুসলিমা তাকে প্রভাবিত করে বলেন, ‘প্রচলিত লেখাপড়া ভালো না। কুরআন ও হাদিস মানতে হবে, বুঝতে হবে। মৃত্যুর পর প্রচলিত লেখাপড়া কোন কাজে আসবেনা। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন কোন কাজে আসবেনা। সব মায়া ত্যাগ করে হিজরত করতে হবে।’
এরপর যোগাযোগ চলে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ 'থ্রিমা'-য়, যেখানে মামুনের সাংগঠনিক নাম হয় 'আবদুল্লাহ' আর আবু মুসলিমার নাম 'মুয়াজ'। মুয়াজের মাধ্যমেই আবদুল ওয়াহিদ নামে আরেকজনের সাথে পরিচয় হয় মামুনের, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার সাংগঠনিক পরিসর।
হোটেল ওলিও বিস্ফোরণ: মামুনের গ্রেপ্তার ও খালাসের পর নাশকতার নতুন অধ্যায়
২০১৭ সালের ১৫ই অগাস্ট, জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান ঘিরে ঢাকায় বড় নাশকতার ছক কষেছিলো নব্য জেএমবি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগের রাত থেকেই পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ঘিরে রাখে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল।
হোটেলের ৩০১ নম্বর কক্ষে থাকা এক যুবককে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় তারা। কিন্তু ভেতর থেকে বোমা বিস্ফোরণের হুমকি দিতে থাকেন ওই যুবক।
১৬ই অগাস্টে চূড়ান্ত অভিযান শুরু হতেই বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হন ওই যুবক। বিস্ফোরণের ধাক্কায় ধসে পড়ে হোটেলের দেয়াল ও রেলিং। পরে জানা যায় তার নাম সাইফুল ইসলাম।
বোমাটা অবশ্য সাইফুলের বানানো ছিলো না। ময়মনসিংহের ভালুকার একটা আস্তানায় সেটা তৈরি করে ঢাকায় নিয়ে এসে সাইফুলকে হস্তান্তর করেন মামুন নিজেই। বহুল আলোচিত এই ঘটনার মামলায় দুই নাম্বার আসামি করা হয় মামুনকে।
সেই বছরেরই ৩১এ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হন মামুন। আট বছরের বেশি সময় ধরে মামলা চলার পর, ২০২৬ সালের ৫ই জানুয়ারি ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামুনসহ ১১ জনকে বেকসুর খালাস দেন।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আবদুল হালিমের দেয়া রায়ে বলা হয়েছে, “অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন। এছাড়া মামলাটি ছিলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
অবশ্য খালাস পাওয়ার আগেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হয়ে আসেন মামুন।
জামিনে বের হয়েই অন্তবর্তী সরকারের গঠন করা গুম-সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারিতে অভিযোগ করেন মামুন। যেখানে তিনি দাবি করেন, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বরিশাল থেকে তাকে গুম করা হয়েছিলো। আর এতে পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা জড়িত।
তবে তার এই দাবি অল্প সময়ের মধ্যেই ভুল প্রমাণিত হয়। গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২৬এ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিংয়ে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণ হয়, সেখান থেকে ককটেল, দাহ্য পদার্থ ও বোমার সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
এই ঘটনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার হওয়া শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলামকে ১০ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে “বোমারু মামুনের নব্য জেমবি নেটওয়ার্ক” নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পায় পুলিশ, আলাপ-কে জানিয়েছেন তদন্তের সাথে যুক্ত একজন কর্মকর্তা। স্পষ্ট হয় যে, মামুন আবার নিজের নেটওয়ার্ক দাঁড় করানোর কাজে নেমেছেন।
এগারোই অগাস্ট সাভারের হেমায়েতপুরে দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালানোর আগে গ্রেপ্তার করা হয় নব্য জেএমবি’র আরেক নেতা মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে, যাকে ‘মামুনের শিষ্য’ বলছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ইমরানের কাছে পাওয়া তথ্যে চালানো সেই অভিযানেই অন্যান্য জিনিসের মাঝে পাওয়া গিয়েছিলো সায়ানাইড।
১৬ই অগাস্ট ঢাকার ডেমরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় জুয়েল ভূঁইয়া ও আরিফ চৌধুরীকে। তারা মামুনের সহযোগী। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেও মামুনের নেটওয়ার্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছেন এটিইউ’র এক কর্মকর্তা।
জুয়েল ভূঁইয়ার নাম অবশ্য নতুন না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নরসিংদী কারাগারে দাঙ্গার পর পালানো নয়জন জঙ্গির একজন ছিলেন তিনি। ছয়দিন পর গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে ধরা পড়ে ফের কারাগারে যান জুয়েল।
কাশিমপুর কারাগারে থাকার সময়ই মামুনের সাথে পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে জুয়েলের। মামুনের মতোই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হয়ে আসেন জুয়েল।
নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য মাহফুজের গড়ে তোলা ‘বোমারু মামুন’
২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামে চলে যান মামুন। সেখানে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে মামুনকে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দেন মো. সাখাওয়াত হোসেন। সংগঠনে যার নাম ছিলো ‘মাহফুজ’, ‘সবুজ পাখি’, ও ‘তাহুশ’।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় এক সরকারি কর্মচারীর ছেলে সাখাওয়াতের জন্ম ১৯৮৪ সালে। স্থানীয় আল হেরা একাডেমি থেকে ২০০২ সালে এসএসসি পাশ করে ফুলবাড়িয়া কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু এইচএসসি শেষ করার আগেই ২০০৪ সালে যোগ দেন নৌবাহিনীতে। সেখানে থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় ডেপুটেশনে চট্টগ্রামে র্যাব-১২ তে কর্মরত ছিলেন মাহফুজ। এর আগে ২০১৩ সালে নীলফামারী ও টাঙ্গাইলে র্যাবের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এই মাহফুজের কাছেই চট্টগ্রামে ২০১৭ সালের শুরুতে দুই মাসের প্রশিক্ষণে সালফিউরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে বোমা বানানো শিখে এক সময় 'মাদার অব সেইটান' নামে পরিচিত টিএটিপি বিস্ফোরক দিয়ে বোমা বানাতে দক্ষ হয়ে ওঠেন মামুন।
কিন্তু মাহফুজ নিজে বেশিদিন টিকতে পারেননি। সেই বছরেরই অর্থাৎ ২০১৭ সালের ২৩এ মার্চ মধ্যরাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিলেটের শিববাড়ি এলাকার 'আতিয়া মহল' ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২৫এ মার্চ থেকে ২৮এ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দলের 'অপারেশন টোয়াইলাইট'।
প্রথম দিনই ভবনের ভেতর আটকে থাকা ৭৮ জনকে উদ্ধার করেন কমান্ডোরা, কিন্তু সন্ধ্যায় পাশের মাদ্রাসার কাছে দুই দফা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন সাতজন, যাদের মধ্যে ছিলেন র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগ প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদও। আর এই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন মাহফুজ।
সিলেটের আতিয়া মহলে চালানো সেই অভিযানে নিহত চার জঙ্গির একজন ছিলেন মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসা। এর আগে ঢাকার আশকোনায় একটা অভিযানের পর মুসার নাম প্রথম সামনে আসে। ওই অভিযানের পর চট্টগ্রাম হয়ে সিলেটের আতিয়া মহলে আস্তানা গাড়েন তিনি।
আতিয়া মহলে অভিযানের সময় ওই এলাকা থেকে মাহফুজ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ২৯এ মার্চ ভোরে মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে চালানো হয় 'অপারেশন হিটব্যাক'। অভিযান শেষে পাওয়া যায় জেএমবি নেতা লোকমান হোসেন ওরফে সোহেলের মরদেহ। তার স্ত্রী শিরিনা আক্তার ও পাঁচ মেয়ের মরদেহও উদ্ধার হয় সেই সময়, যাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মেয়ের বয়স ছিলো মোটে সাত মাস।
এই আস্তানাতে যাতায়াত ছিলো মাহফুজেরও। সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তিনি বিয়েও করেছিলেন লোকমানের বড় মেয়েকে, যা ছিলো তার দ্বিতীয় বিয়ে। এর আগে পারিবারিকভাবে ২০১১ সালে প্রথমবার বিয়ে হয় মাহফুজের। প্রথম স্ত্রীর নাম শারমিন আক্তার।
শেষমেশ ৩১এ মার্চ মৌলভীবাজার শহরের বড়হাট এলাকায় 'অপারেশন ম্যাক্সিমাস'-এ মারা যান মাহফুজ। অভিযানে নিহত তিন জনের একজন ছিলেন মাহফুজ, যদিও পরিচয় নিশ্চিত হতে সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মীয়-স্বজন ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন।
মামুন তার জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, নিহত মুসা ও লোকমানকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন তিনি। তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিলো তার।
মামুনের বোমা বানানোর দ্বিতীয় পাঠ: ‘হাতকাটা সোহেল’
চট্টগ্রামের পর ঝিনাইদহে আরেক দফা বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ নেন মামুন। এবারের প্রশিক্ষক আব্দুস সবুর খান ওরফে হাসান ওরফে সোহেল মাহফুজ ওরফে নসরুল্লাহ ওরফে ‘হাতকাটা সোহেল’।
২০১৬ সালের ১লা জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ‘সন্ত্রাসী হামলার’ অন্যতম পরিকল্পনাকারী এই হাতকাটা সোহেল নব্য জেএমবির ভারতীয় শাখার আমিরও ছিলেন। দুর্ধর্ষ এই জঙ্গি ভারতের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণ মামলারও আসামি। তাকে ধরিয়ে দিতে ভারতের পুলিশ ২০১৪ সালে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো।
২০১৭ সালের ৭ই জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পুষ্কনি এলাকার আমবাগান থেকে হাতকাটা সোহেল ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০১৭ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হাতকাটা সোহেলের কাছে টাইম বোমা, রিমোট বোমা, প্রেসার কুকার বোমা ও সুইসাইড ভেস্ট বানানোর প্রশিক্ষণ নেন মামুন।
সেই প্রশিক্ষণে মামুনের সাথী ছিলেন বাশারুজ্জামান ওরফে ‘চকলেট বাশার’ নামের আরো একজন। যিনি সংগঠনে শাহেদ নামেও পরিচিত ছিলেন এবং ১১ দিনের জন্য নব্য জেএমবি’র আমিরও হয়েছিলেন।
সেই বছরের ২৬এ ও ২৭এ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মোবারকপুর ইউনিয়নের ত্রিমোহনী গ্রামে ‘অপারেশন ঈগল হান্ট’ পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই অভিযানে নিহত হন বাশারুজ্জামান।
সেই অভিযানে নিহত হন আরও তিনজন, যাদের একজন ছিলেন মিজানুর রহমান ওরফে ‘ছোট মিজান’। এই মিজানের সাথেও ঘনিষ্ঠতা ছিলো মামুনের, জবানবন্দি সে তথ্যই জানাচ্ছে।
জবানবন্দিতে আরও যাদের নাম; এখন সবাই নিহত
মামুনের জবানবন্দি পর্যালোচনায় এমন আরো অনেক জঙ্গির তথ্য পাওয়া যায়, যারা এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন।
২০১৬ সালের ৮ই অক্টোবর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ‘অপারেশন শরতের তুফান’ অভিযানে সাত জঙ্গি নিহত হন। পরে নিহতদের ছবি প্রকাশ করা হলে একজনকে চিনতে পারেন মামুন। তার সাংগঠনিক নাম মুয়াজ, আসল নাম আবির বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মামুন।
২০১৭ সালের ১৫ই মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌর এলাকার ৫ নম্বর প্রেমতলা ওয়ার্ডে ‘ছায়ানীড়’ নামের একটি বাড়ি ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে শুরু হওয়া ‘অ্যাসল্ট-১৬’ নামের ওই অভিযানে অংশ নেয় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ বাহিনী স্পেশাল ওয়েপনস অ্যান্ড ট্যাকটিকস (সোয়াট), র্যাব-৭ ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
পরদিন ১৬ই মার্চ বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে অভিযান। এ অভিযানের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ও গুলিতে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হন। নিহত নারী জঙ্গির পাশে এক শিশুর মরদেহও পাওয়া যায়। মামুনের জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ি নিহতদের মধ্যে দু’জনকে চিনতেন তিনি। তারা হলেন আবু উমায়ের ও আবুল খায়ের। তবে তাদের বিস্তারিত পরিচয় জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়নি।
একই বছরের ২৪এ মার্চ ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গোলচত্বর এলাকায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন এক যুবক। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত ওই যুবকের ট্রলি লাগেজের ভেতর থেকে তিনটি অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধার করা হয়। মামুনের জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, আত্মঘাতী ওই যুবকের সাংগঠনিক নাম ‘টমেটো’। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় জবানবন্দিতে উল্লেখ নেই।
বোমারু মামুনের আরো অনেক জঙ্গি সঙ্গী এখনও জীবিত
ঝিনাইদহে মামুনের সাথে পরিচয় হয় নব্য জেএমবির এক সময়ের আমির আইয়ুব বাচ্চুর। সাজিদ হাসান, সজীব, বাজিদ, খালিদ, মামুন ও হাবিবুর রহমানসহ নানা নামে পরিচিত তিনি।
সিলেটের আতিয়া মহল অভিযানে মাঈনুল ইসলাম মুসা নিহত হওয়ার পর নব্য জেএমবির আমিরের দায়িত্ব পান তিনি। তবে কতদিন আমিরের দায়িত্ব পালন করেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তার স্ত্রী আশরাদী জাহান ওরফে তিথি ২০১৭ সালের ১লা জুলাই কুষ্টিয়ায় গ্রেপ্তার হলেও বাচ্চু এখনো অধরাই রয়ে গেছেন।
মামুনের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তার সাথে আরো যাদের যোগাযোগ হয়েছিলো তাদের মধ্যে আছেন নওগাঁর মো. আব্দুল্লাহ আইচান কবিরাজ ওরফে রফিক।
কবিরাজ নামে সংগঠনে পরিচিত এই নব্য জেএমবি নেতা ২০১৭ সালের ১৫ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওলিও হোটেলে বিস্ফোরণ মামলায় মামুনের সাথে খালাস পাওয়া আসামিদের একজন এই কবিরাজ।
কবিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, আত্রাই থানার নওদুলী গ্রাম থেকে নব্য জেএমবির দাওয়াত বিভাগের সমন্বয়ক কবিরাজকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। এ সময় সংগঠনের সামরিক ও আত্মঘাতী দলের সদস্য মো. লুলু সরদার ওরফে শহীদ ওরফে মিস্ত্রি, মো. মাসুদ রানা ওরফে হোসেন ওরফে আতিক, মো. আব্দুর রাজ্জাক ওরফে মাসুম ওরফে বাবুল ও মো. মোয়াজ্জেম ওরফে হোসেন ওরফে বুলেটও গ্রেপ্তার হন।
নজরদারি এড়াতে বারবার অ্যাপ বদলাচ্ছে জঙ্গিরা
প্রতিবার গ্রেপ্তারের পর তথ্য ফাঁস হওয়ার শঙ্কায় যোগাযোগের অ্যাপ বদলাচ্ছে নব্য জেএমবি। শুরুর দিকে হোয়াটসঅ্যাপেই যোগাযোগ রাখতেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা, পরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন টেলিগ্রাম আর সিগন্যালে।
কিন্তু একের পর এক কর্মী গ্রেপ্তার হওয়ার পর যখন দেখা যায় এসব অ্যাপ থেকেও তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, তখন আবার বদল। এরপর সিকিউর চ্যাট মেসেঞ্জার, থ্রিমা আর উইকারে সরে আসেন তারা। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এখন তারা ব্যবহার করছেন এলিমেন্ট ও ট্র্যাশ মিডিয়া।
সিটিটিসি ও এটিইউ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এই ট্র্যাশ মিডিয়াই এখন সংগঠনের আসল "গোপন কক্ষ"। এখান থেকেই চলে অভ্যন্তরীণ আলাপ, গোপন নির্দেশনা পাঠানো, এমনকি কোনো হামলার দায় স্বীকারও।
সায়ানাইড উদ্ধার আর সাম্প্রতিক এসব ঘটনা মিলিয়ে এটাই স্পষ্ট যে, নব্য জেএমবির নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং 'বোমারু মামুন' আর তার লোকজনকে ঘিরে যেরকম তৎপরতা দেখা যাচ্ছে তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আসছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধুই কি ‘বোমারু মামুন’ নাকি পর্দার আড়ালে অন্য কেউও নিজের মতো একটা নেটওয়ার্ক দাঁড় করাচ্ছেন? সেই উত্তরই এখন খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
বিষয়: