এক সময় বাংলাদেশ থেকে ইরাক, সেখান থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া–জঙ্গিবাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ যার বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালে তুরস্কে গ্রেপ্তার, পরে জামিনে মুক্তি। তারপর থেকেই যেন হাওয়া। কিন্তু হঠাৎ আবার সামনে আসে তার নাম, নব্য জেএমবির নেতার সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
দীপু সারোয়ার
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫২ পিএমআপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৮ পিএম
নব্য জেএমবির আমির কামরুল হাসান ওরফে মাহাদী হাসান জন ওরফে আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ। দেশের নানা জায়গায় ‘সন্ত্রাসী হামলার’ তালিকাভুক্ত আসামি তিনি।
জঙ্গি কর্মকাণ্ডের নানা ঘটনায় আবারো আলোচনায় নব্য জেএমবির প্রধান নেতা। অজ্ঞাতস্থান থেকে অনলাইনে নির্দেশ দিয়ে তিনি বাংলাদেশে সংগঠন পরিচালনা করছেন, এমন খবরে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
নব্য জেএমবির ওই আমিরের নাম মোহাম্মদ কামরুল হাসান ওরফে মাহাদী হাসান জন ওরফে আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ। ঢাকা, বগুড়াসহ দেশের নানা জায়গায় ‘সন্ত্রাসী হামলার’ তালিকাভুক্ত আসামি তিনি।
২০২৩ সালে তুরস্কে গ্রেপ্তার হন জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি। এরপর সেখান থেকে জামিনে মুক্ত হন। তারপর থেকেই তিনি আসলে কোথায় অবস্থান করছেন, এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।
তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আবারো আলোচনায় এসেছেন নব্য জেএমবির আমির কামরুল হাসান।
সম্প্রতি বিভিন্নস্থানে হামলার পেছনে কামরুল হাসানের সংযোগ আছে বলে তথ্য পেয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গত নয় মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সংঘটিত ১৩টি ঘটনা, অভিযান ও মামলা পর্যালোচনা করে এসব তথ্যের সত্যতাও পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
সিটিটিসির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুন্সি শাহাবুদ্দিন আলাপ-কে বলেন, “সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় নব্য জেএমবির আমির কামরুলের নাম এসেছে। আমরা তাকে খুঁজছি। তবে তার অবস্থান এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”
শুধু সিটিটিসিই নয়, তাকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য শাখাও।
নব্য জেএমবির আমিরের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আসাদুজ্জামান।
নব্য জেএমবির আমিরের বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায়।
বগুড়ার গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সুফিয়ান বলেন, “কামরুল হাসানের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। মাসখানেক আগে তার পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করা হয়েছে।
এই কর্মকর্তা আরো জানান, ১২টি মামলার এই আসামিকে নিয়ে “এলাকার কেউ কথা বলতে চান না”।
“যতদূর জানা যায় কামরুল বিদেশে পলাতক আছেন”- দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
কিন্তু তিনি কোথায়? বাংলাদেশে, নাকি দেশের বাইরে, সেটিই এখনো নিশ্চিত নয়।
তুরস্কে জামিনে মুক্তির পর কোথায় গেলেন তিনি? কীভাবে আবার নব্য জেএমবির সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হলো? আর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কতটা প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দারা?
যেভাবে নতুন করে আলোচনায় নব্য জেএমবির আমির
গত বছরের ২৬এ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ হয়।
ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হন শাহিন ওরফে আবু বকর, আমিনুর ওরফে দর্জি আমিন, শাফিয়ান রহমান ফকির, আছিয়া বেগম, ইয়াসমিন আক্তার ও আসমানী খাতুন।
একই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নব্য জেএমবি নেতা আবদুর রহমান গত ৩০এ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যাচ্ছে।
এরপর গত ২৩এ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কদমতলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ মামলার প্রধান আসামি নব্য জেএমবি নেতা শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলামকে।
১১ই অগাস্ট সাভারে পাইপ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির আরেক নেতা মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান।
তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল হাসান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, অনলাইনে সংগঠন পরচিলনা করছেন কামরুল।
গত ৯ মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সংঘটিত বোমা বিস্ফোরণ, উদ্ধার ও গ্রেপ্তার অভিযান পর্যালোচনা করেছে সিটিটিসি। ওইসব ঘটনার মধ্যে আছে:
২৬এ ডিসেম্বর, ২০২৫: দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিংয়ে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় রাসায়নিক বিস্ফোরণ।
৫ই জানুয়ারি, ২০২৬: নব্য জেএমবি নেতা নাজমুল হাসান মামুনসহ ১৪ আসামির বেকসুর খালাস।
৩০এ জানুয়ারি: কেরাণীগঞ্জ মাদ্রাসার বিস্ফোরণে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে আবদুর রহমান গ্রেপ্তার।
২৩এ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কদমতলী এলাকা থেকে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ মামলার প্রধান আসামি নব্য জেএমবি নেতা শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলামকে গ্রেপ্তার হন।
৭ই মার্চ: কুমিল্লার একটি মন্দির ও মসজিদের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ।
২৫এ মার্চ: ঢাকার সায়েদাবাদের জনপদ মোড়ে বিস্ফোরণ।
২৪এ জুলাই: ঢাকার মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে দূর-নিয়ন্ত্রিত আইইডি উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়।
৩০এ জুলাই: আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার।
১লা অগাস্ট: ঢাকার মিরপুর ১০ ও ফার্মগেটে বোমাতঙ্ক।
১১ই অগাস্ট সাভারে পাইপ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির আরেক নেতা মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান।
কে এই কামরুল হাসান
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, নব্য জেএমবির নেতার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তবে মাহাদী হাসান জন এবং আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ নামে আরো দু’টি সাংগঠনিক পরিচয় আছে তার।
এর মধ্যে আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ নামেই বেশি পরিচিত তিনি।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার জয়পুরপাড়ার বাসিন্দা আবু সাইদের দ্বিতীয় সন্তান এই কামরুল। স্থানীয় শাপলা কিন্ডার গার্টেন স্কুল (কেজি), পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও জাহানারা-কামরুজ্জামান (জেকে) কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
তবে কলেজের পাঠ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৬ সালের ২৬এ অগাস্ট দেশ ছাড়েন। দেশে থাকতে প্রকাশ্যে ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র শাখায় কর্মী হিসাবে কাজ করতেন তিনি।
তবে গোপন একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করতেন এলাকাবাসী।
সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, দুপচাঁচিয়ায় পাঁচটি নাশকতা মামলার আসামি ছিলেন কামরুল। এ অবস্থায় বাবা কাঠ ব্যবসায়ী আবু সাইদ ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন।
সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা এবং তাকে চেনেন এমন একজন আলাপ-কে বলেন, বগুড়া ছাড়ার দুদিন পর ২৬এ অগাস্ট ইরাক পৌঁছান কামরুল। জানা গেছে, পূর্ব যোগাযোগের সূত্র ধরে সেখানে পাকিস্তানের উগ্রপন্থি একটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা আশ্রয় দেয় তাকে।
সেসময় সিরিয়ায় নানা ফ্রন্টে যুদ্ধ চলছিলো। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আক্রমণে বিধ্বস্ত হচ্ছিলো সিরিয়ার বাসার আল আসাদের সরকার।
এমন প্রেক্ষাপটেই ইরাক থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া যান কামরুল এবং সেখানে আইএস এর পক্ষে কাজ শুরু করেন।
জয়পুরপাড়ার কামরুলের এক প্রতিবেশী আলাপ-কে জানান, কামরুলের পাসপোর্ট তৈরি ও ভিসা সংগ্রহের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ যাবতীয় কাজে সিটিসেল কোম্পানির একটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিলো। কামরুলের প্রতিবেশী রবিনের নামে ছিলো ওই নম্বরটি।
বেশ কিছুদিন আগে মারা গেছেন কামরুলের বাবা আবু সাইদ ও প্রতিবেশী রবিন।
ইরাকের উদ্দেশে বগুড়া ছাড়তে ২০১৬ সালের ২৪এ অগাস্ট শাহ ফতেহ আলী পরিবহনে কামরুল ঢাকা যান বলে জানান তার ওই প্রতিবেশী।
সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা জানান, দেশে থাকতেই নব্য জেএমবিতে যোগ দেন কামরুল। নব্য জেএমবির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি।
২০১৬ সালের ২৭এ অগাস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় সিটিটিসির ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ অভিযানে নিহত হন তামিম চৌধুরী।
এন্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) এক কর্মকর্তা আলাপ-কে জানান, তুরস্কে অবস্থানকালে আইএস নেতা আবু আইয়ুব আস সামির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় কামরুলের। সিরিয়ায় এক অভিযানে আইএস নেতা ইয়াজউদ্দিন নিহত হলে তার স্ত্রী উম্মে আবদুল্লাহকে বিয়ে করেন কামরুল।
কামরুল এখন কোথায়
২০২২ সালের শেষের দিকে কামরুলের অবস্থান জানিয়ে তুরস্ক সরকারকে তথ্য দেয় সিটিটিসি।
সিটিটিসিতে ওই সময় কর্মরত ছিলেন এমন একজন জানান, ইন্টারপোলের মাধ্যমে কামরুল সম্পর্কে তুরস্ক সরকারকে তথ্য জানানো হয়েছিলো। আঙ্কারা ও ইস্তানবুলে তার বাসার ঠিকানাও জানানো হয়। তার গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়। ওইসব তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কামরুল। তবে অজ্ঞাত কারণে জামিনে মুক্ত হন তিনি।
তবে কামরুলের বর্তমান অবস্থান জানাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কামরুলের বিষয়ে যেভাবে জানতে পারে সিটিটিসি
কামরুল হাসান নব্য জেএমবির আমিরের দায়িত্ব পান ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। তারও অনেক আগেই কামরুলে বিষয়ে জানতে পারে সিটিটিসি।
২০২০ সালের ২৭এ অগাস্ট নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা শিব্বির আহমাদ গ্রেপ্তার হলে আরো বিস্তারিত জানা যায়।
সিটিটিসির অভিযানে ঢাকার সবুজবাগ থানার পূর্ব বাসাবো থেকে এলাকা গ্রেপ্তার হন তিনি।
গ্রেপ্তারের সময় তার বয়স ছিলো ২২ বছর। এ সময় তার কাছ থেকে মুঠোফোন, জিহাদি বই ও ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ বই উদ্ধার হয়।
বাগেরহাটের শরণখোলা থানার মধ্য রায়েন্দা এলাকার আব্দুল আউয়ালের ছেলে শিব্বির মাত্র ১৪ বছর বয়সে ২০১৫ সালে নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে সিটিটিসি সূত্রে জানা যায়।
প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়া শিব্বির শুরুতে সংগঠনের ‘প্রোপাগান্ডা সেলে’ কাজ করতেন। পরে সিরিয়া ফেরত বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের দায়িত্ব পালন করেন।
গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় সিসিটিসি। সেসময়েই কামরুল হাসানের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারে তারা। কামরুলের সাংগঠনিক প্রভাব, অবস্থান, অনলাইন কর্মকাণ্ড, গোপন টেলিগ্রাম চ্যানেল, বিদেশি জঙ্গিদের সাথে সম্পর্ক নিয়েও ষ্পষ্ট ধারণা পায় সিটিটিসি।
শিব্বিরের সাথেও ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, আফগানিস্তান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো বলে জানান সিটিটিসির কর্মকর্তারা।
বাসাবোর দারুল উলুম ছায়িদীয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২০১৭ সালে দাখিল পাস করেন শিব্বির। বাংলা, উর্দু, ফার্সির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দক্ষ শিব্বির মসজিদের মুয়াজ্জিন ও সহকারী ইমাম পরিচয়ের আড়ালে নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
শিব্বিরের মুঠোফোন ফরেনসিক পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় সিটিটিসি।
সেখান থেকে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, টেলিগ্রাম চ্যানেলে আলাপচারিতার সূত্র ধরে গারিবা নামে ফরাসি এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। গারিবা আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে সিরিয়া গিয়েছিলেন। পরে সিরিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে নিজ দেশে ফিরে যান।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, গারিবা ও শিব্বির সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে বিয়ে করেছিলেন।
গারিবাকে নিয়ে আফগানিস্তানের খোরাসানে এবং ইরাক-সিরিয়ায় গিয়ে আইএসের হয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন শিব্বির। কামরুল হাসানের সাথেও সাক্ষতের পরিকল্পনা ছিলো তার। কিন্তু গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
নব্য জেএমবি: সংগঠনের জন্ম যেভাবে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের অভিযানে গ্রেপ্তার জঙ্গিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ৫ই অক্টোবর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী দেশে এসে আইএসের জন্য যোদ্ধা সংগ্রহের কাজ শুরু করেন।
পরে জুনুদ আল তাওহীদ আল খিলাফাহ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠন থেকেই জন্ম হয় ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ (আইএসবি)। পরে এই আএসবিই নব্য জেএমবি নামে বাংলাদেশে পরিচিতি পায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, নব্য জেএমবি প্রতিষ্ঠায় পাঁচ জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা হলেন- তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান ওরফে মানিক ওরফে নয়ন, আব্দুস সামাদ ওরফে আরিফ ওরফে মামু ওরফে আশিক, শায়খ আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর ও মামুনুর রশিদ রিপন ওরফে রেজাউল করিম ওরফে রেজা।
এদের মধ্যে তামিম ও মানিক সিটিটিসি ও র্যাবের অভিযানে নিহত হয়েছেন।
২০১৬ সালের ২৭এ অগাস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় সিটিটিসির ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ অভিযানে নিহত হন তামিম চৌধুরী।
একই বছরের ৮ই অক্টোবর আশুলিয়ায় র্যাবের অভিযানে নিহত হন সারোয়ার জাহান।
এছাড়াও নব্য জেএমবির আরো তিনজন প্রতিষ্ঠাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো।
২০১৭ সালের ২রা মার্চ ঢাকার সেনপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির শায়খ আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর। আবুল কাশেমের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলায়। তিনি দিনাজপুরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
একই বছরের ১৩ই ডিসেম্বর ঢাকার মহাখালী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন আবদুস সামাদ ওরফে আরিফ মামু ওরফে আশিক। তার বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের বল্লভপুর জামবাড়ী এলাকায়। তার বাবার নাম আব্দুস তোয়াব।
২০১৯ সালের ১৯এ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় একটি বাস থেকে গ্রেপ্তার হন মামুনুর রশিদ রিপন ওরফে রেজাউল করিম ওরফে রেজা। রিপন বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম থানার শেখেরমাড়িয়া গ্রামের মৃত নাসির উদ্দিনের ছেলে।
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর নব্য জেএমবির এই তিন শীর্ষ নেতা কারাগারে আছেন নাকি বেরিয়ে গেছেন- তা নিশ্চিত করতে করতে পারেনি কারা অধিদফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।
নব্য জেএমবির আমির কে এই কামরুল, যাকে খুঁজছে পুলিশ
এক সময় বাংলাদেশ থেকে ইরাক, সেখান থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া–জঙ্গিবাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ যার বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালে তুরস্কে গ্রেপ্তার, পরে জামিনে মুক্তি। তারপর থেকেই যেন হাওয়া। কিন্তু হঠাৎ আবার সামনে আসে তার নাম, নব্য জেএমবির নেতার সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
জঙ্গি কর্মকাণ্ডের নানা ঘটনায় আবারো আলোচনায় নব্য জেএমবির প্রধান নেতা। অজ্ঞাতস্থান থেকে অনলাইনে নির্দেশ দিয়ে তিনি বাংলাদেশে সংগঠন পরিচালনা করছেন, এমন খবরে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
নব্য জেএমবির ওই আমিরের নাম মোহাম্মদ কামরুল হাসান ওরফে মাহাদী হাসান জন ওরফে আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ। ঢাকা, বগুড়াসহ দেশের নানা জায়গায় ‘সন্ত্রাসী হামলার’ তালিকাভুক্ত আসামি তিনি।
২০২৩ সালে তুরস্কে গ্রেপ্তার হন জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি। এরপর সেখান থেকে জামিনে মুক্ত হন। তারপর থেকেই তিনি আসলে কোথায় অবস্থান করছেন, এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।
তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আবারো আলোচনায় এসেছেন নব্য জেএমবির আমির কামরুল হাসান।
সম্প্রতি বিভিন্নস্থানে হামলার পেছনে কামরুল হাসানের সংযোগ আছে বলে তথ্য পেয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
গত নয় মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সংঘটিত ১৩টি ঘটনা, অভিযান ও মামলা পর্যালোচনা করে এসব তথ্যের সত্যতাও পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
সিটিটিসির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুন্সি শাহাবুদ্দিন আলাপ-কে বলেন, “সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় নব্য জেএমবির আমির কামরুলের নাম এসেছে। আমরা তাকে খুঁজছি। তবে তার অবস্থান এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”
শুধু সিটিটিসিই নয়, তাকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য শাখাও।
নব্য জেএমবির আমিরের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আসাদুজ্জামান।
নব্য জেএমবির আমিরের বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায়।
বগুড়ার গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সুফিয়ান বলেন, “কামরুল হাসানের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। মাসখানেক আগে তার পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করা হয়েছে।
এই কর্মকর্তা আরো জানান, ১২টি মামলার এই আসামিকে নিয়ে “এলাকার কেউ কথা বলতে চান না”।
“যতদূর জানা যায় কামরুল বিদেশে পলাতক আছেন”- দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
কিন্তু তিনি কোথায়? বাংলাদেশে, নাকি দেশের বাইরে, সেটিই এখনো নিশ্চিত নয়।
তুরস্কে জামিনে মুক্তির পর কোথায় গেলেন তিনি? কীভাবে আবার নব্য জেএমবির সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হলো? আর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কতটা প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দারা?
যেভাবে নতুন করে আলোচনায় নব্য জেএমবির আমির
গত বছরের ২৬এ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ হয়।
ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হন শাহিন ওরফে আবু বকর, আমিনুর ওরফে দর্জি আমিন, শাফিয়ান রহমান ফকির, আছিয়া বেগম, ইয়াসমিন আক্তার ও আসমানী খাতুন।
একই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নব্য জেএমবি নেতা আবদুর রহমান গত ৩০এ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যাচ্ছে।
এরপর গত ২৩এ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কদমতলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ মামলার প্রধান আসামি নব্য জেএমবি নেতা শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলামকে।
১১ই অগাস্ট সাভারে পাইপ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির আরেক নেতা মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান।
তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল হাসান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, অনলাইনে সংগঠন পরচিলনা করছেন কামরুল।
গত ৯ মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সংঘটিত বোমা বিস্ফোরণ, উদ্ধার ও গ্রেপ্তার অভিযান পর্যালোচনা করেছে সিটিটিসি। ওইসব ঘটনার মধ্যে আছে:
কে এই কামরুল হাসান
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, নব্য জেএমবির নেতার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তবে মাহাদী হাসান জন এবং আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ নামে আরো দু’টি সাংগঠনিক পরিচয় আছে তার।
এর মধ্যে আবু আব্বাস আল-বাঙ্গালী হাফিজুল্লাহ নামেই বেশি পরিচিত তিনি।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার জয়পুরপাড়ার বাসিন্দা আবু সাইদের দ্বিতীয় সন্তান এই কামরুল। স্থানীয় শাপলা কিন্ডার গার্টেন স্কুল (কেজি), পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও জাহানারা-কামরুজ্জামান (জেকে) কলেজে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
তবে কলেজের পাঠ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৬ সালের ২৬এ অগাস্ট দেশ ছাড়েন। দেশে থাকতে প্রকাশ্যে ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র শাখায় কর্মী হিসাবে কাজ করতেন তিনি।
তবে গোপন একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করতেন এলাকাবাসী।
সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, দুপচাঁচিয়ায় পাঁচটি নাশকতা মামলার আসামি ছিলেন কামরুল। এ অবস্থায় বাবা কাঠ ব্যবসায়ী আবু সাইদ ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন।
গ্রেপ্তার এড়াতে ২০১৬ সালের ২৪এ অগাস্ট ভ্রমণ ভিসায় ইরাকের উদ্দেশে বগুড়া ছাড়েন। ওইদিন আদালতে নাশকতার মামলায় হাজিরা দেওয়ার দিন ধার্য ছিলো।
সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা এবং তাকে চেনেন এমন একজন আলাপ-কে বলেন, বগুড়া ছাড়ার দুদিন পর ২৬এ অগাস্ট ইরাক পৌঁছান কামরুল। জানা গেছে, পূর্ব যোগাযোগের সূত্র ধরে সেখানে পাকিস্তানের উগ্রপন্থি একটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা আশ্রয় দেয় তাকে।
সেসময় সিরিয়ায় নানা ফ্রন্টে যুদ্ধ চলছিলো। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আক্রমণে বিধ্বস্ত হচ্ছিলো সিরিয়ার বাসার আল আসাদের সরকার।
এমন প্রেক্ষাপটেই ইরাক থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া যান কামরুল এবং সেখানে আইএস এর পক্ষে কাজ শুরু করেন।
জয়পুরপাড়ার কামরুলের এক প্রতিবেশী আলাপ-কে জানান, কামরুলের পাসপোর্ট তৈরি ও ভিসা সংগ্রহের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ যাবতীয় কাজে সিটিসেল কোম্পানির একটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিলো। কামরুলের প্রতিবেশী রবিনের নামে ছিলো ওই নম্বরটি।
বেশ কিছুদিন আগে মারা গেছেন কামরুলের বাবা আবু সাইদ ও প্রতিবেশী রবিন।
ইরাকের উদ্দেশে বগুড়া ছাড়তে ২০১৬ সালের ২৪এ অগাস্ট শাহ ফতেহ আলী পরিবহনে কামরুল ঢাকা যান বলে জানান তার ওই প্রতিবেশী।
সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা জানান, দেশে থাকতেই নব্য জেএমবিতে যোগ দেন কামরুল। নব্য জেএমবির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি।
২০১৬ সালের ২৭এ অগাস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় সিটিটিসির ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ অভিযানে নিহত হন তামিম চৌধুরী।
এন্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) এক কর্মকর্তা আলাপ-কে জানান, তুরস্কে অবস্থানকালে আইএস নেতা আবু আইয়ুব আস সামির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় কামরুলের। সিরিয়ায় এক অভিযানে আইএস নেতা ইয়াজউদ্দিন নিহত হলে তার স্ত্রী উম্মে আবদুল্লাহকে বিয়ে করেন কামরুল।
কামরুল এখন কোথায়
২০২২ সালের শেষের দিকে কামরুলের অবস্থান জানিয়ে তুরস্ক সরকারকে তথ্য দেয় সিটিটিসি।
সিটিটিসিতে ওই সময় কর্মরত ছিলেন এমন একজন জানান, ইন্টারপোলের মাধ্যমে কামরুল সম্পর্কে তুরস্ক সরকারকে তথ্য জানানো হয়েছিলো। আঙ্কারা ও ইস্তানবুলে তার বাসার ঠিকানাও জানানো হয়। তার গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়। ওইসব তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কামরুল। তবে অজ্ঞাত কারণে জামিনে মুক্ত হন তিনি।
তবে কামরুলের বর্তমান অবস্থান জানাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কামরুলের বিষয়ে যেভাবে জানতে পারে সিটিটিসি
কামরুল হাসান নব্য জেএমবির আমিরের দায়িত্ব পান ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। তারও অনেক আগেই কামরুলে বিষয়ে জানতে পারে সিটিটিসি।
২০২০ সালের ২৭এ অগাস্ট নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা শিব্বির আহমাদ গ্রেপ্তার হলে আরো বিস্তারিত জানা যায়।
সিটিটিসির অভিযানে ঢাকার সবুজবাগ থানার পূর্ব বাসাবো থেকে এলাকা গ্রেপ্তার হন তিনি।
গ্রেপ্তারের সময় তার বয়স ছিলো ২২ বছর। এ সময় তার কাছ থেকে মুঠোফোন, জিহাদি বই ও ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ বই উদ্ধার হয়।
বাগেরহাটের শরণখোলা থানার মধ্য রায়েন্দা এলাকার আব্দুল আউয়ালের ছেলে শিব্বির মাত্র ১৪ বছর বয়সে ২০১৫ সালে নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে সিটিটিসি সূত্রে জানা যায়।
প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়া শিব্বির শুরুতে সংগঠনের ‘প্রোপাগান্ডা সেলে’ কাজ করতেন। পরে সিরিয়া ফেরত বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের দায়িত্ব পালন করেন।
গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় সিসিটিসি। সেসময়েই কামরুল হাসানের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারে তারা। কামরুলের সাংগঠনিক প্রভাব, অবস্থান, অনলাইন কর্মকাণ্ড, গোপন টেলিগ্রাম চ্যানেল, বিদেশি জঙ্গিদের সাথে সম্পর্ক নিয়েও ষ্পষ্ট ধারণা পায় সিটিটিসি।
শিব্বিরের সাথেও ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, আফগানিস্তান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো বলে জানান সিটিটিসির কর্মকর্তারা।
বাসাবোর দারুল উলুম ছায়িদীয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২০১৭ সালে দাখিল পাস করেন শিব্বির। বাংলা, উর্দু, ফার্সির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দক্ষ শিব্বির মসজিদের মুয়াজ্জিন ও সহকারী ইমাম পরিচয়ের আড়ালে নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
শিব্বিরের মুঠোফোন ফরেনসিক পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় সিটিটিসি।
সেখান থেকে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, টেলিগ্রাম চ্যানেলে আলাপচারিতার সূত্র ধরে গারিবা নামে ফরাসি এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। গারিবা আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে সিরিয়া গিয়েছিলেন। পরে সিরিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে নিজ দেশে ফিরে যান।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, গারিবা ও শিব্বির সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে বিয়ে করেছিলেন।
গারিবাকে নিয়ে আফগানিস্তানের খোরাসানে এবং ইরাক-সিরিয়ায় গিয়ে আইএসের হয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন শিব্বির। কামরুল হাসানের সাথেও সাক্ষতের পরিকল্পনা ছিলো তার। কিন্তু গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
নব্য জেএমবি: সংগঠনের জন্ম যেভাবে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের অভিযানে গ্রেপ্তার জঙ্গিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ৫ই অক্টোবর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী দেশে এসে আইএসের জন্য যোদ্ধা সংগ্রহের কাজ শুরু করেন।
পরে জুনুদ আল তাওহীদ আল খিলাফাহ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠন থেকেই জন্ম হয় ইসলামিক স্টেট ইন বাংলাদেশ (আইএসবি)। পরে এই আএসবিই নব্য জেএমবি নামে বাংলাদেশে পরিচিতি পায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, নব্য জেএমবি প্রতিষ্ঠায় পাঁচ জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা হলেন- তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান ওরফে মানিক ওরফে নয়ন, আব্দুস সামাদ ওরফে আরিফ ওরফে মামু ওরফে আশিক, শায়খ আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর ও মামুনুর রশিদ রিপন ওরফে রেজাউল করিম ওরফে রেজা।
এদের মধ্যে তামিম ও মানিক সিটিটিসি ও র্যাবের অভিযানে নিহত হয়েছেন।
২০১৬ সালের ২৭এ অগাস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় সিটিটিসির ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’ অভিযানে নিহত হন তামিম চৌধুরী।
একই বছরের ৮ই অক্টোবর আশুলিয়ায় র্যাবের অভিযানে নিহত হন সারোয়ার জাহান।
এছাড়াও নব্য জেএমবির আরো তিনজন প্রতিষ্ঠাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো।
২০১৭ সালের ২রা মার্চ ঢাকার সেনপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির শায়খ আবুল কাশেম ওরফে বড় হুজুর। আবুল কাশেমের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলায়। তিনি দিনাজপুরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন।
একই বছরের ১৩ই ডিসেম্বর ঢাকার মহাখালী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন আবদুস সামাদ ওরফে আরিফ মামু ওরফে আশিক। তার বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের বল্লভপুর জামবাড়ী এলাকায়। তার বাবার নাম আব্দুস তোয়াব।
২০১৯ সালের ১৯এ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় একটি বাস থেকে গ্রেপ্তার হন মামুনুর রশিদ রিপন ওরফে রেজাউল করিম ওরফে রেজা। রিপন বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম থানার শেখেরমাড়িয়া গ্রামের মৃত নাসির উদ্দিনের ছেলে।
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর নব্য জেএমবির এই তিন শীর্ষ নেতা কারাগারে আছেন নাকি বেরিয়ে গেছেন- তা নিশ্চিত করতে করতে পারেনি কারা অধিদফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।
বিষয়: