ফুটবল বিশ্বকাপ জমে ক্ষীর, কিন্তু গোলবন্যার চোটে মাঠের ঘাস পুড়ে যাওয়ার উপক্রম! এক ম্যাচে ৭ গোল? ছি ছি, এ তো স্রেফ অসভ্যতা। ফুটবল কি গোল দেওয়ার খেলা, নাকি একটা ভদ্রোচিত সামাজিক মেলবন্ধন? এভাবে একের পর এক গোল দিয়ে প্রতিপক্ষের আত্মসম্মানকে গোলপোস্টের জালে পেঁচিয়ে ফেলা কোনো সুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ হতে পারে না। এটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটূ, পাড়া-মহল্লার ফুটবলেও আজকাল এমন নির্মমতা দেখা যায় না।
বিশ্বস্ত সূত্রে খবর এসেছে, ফুটবলের এই ‘হিংস্রতা’ থামাতে এবং খেলাটিকে আরও মানবিক করতে ফিফা আগামী ম্যাচ থেকেই একগুচ্ছ বৈপ্লবিক আইন চালু করতে যাচ্ছে। গোলের সীমা তো বেঁধে দেওয়া হচ্ছেই (যেমন—তিনটি গোল হয়ে গেলে বাকি ম্যাচ স্রেফ ‘লুডু’ খেলার মতো শান্তিতে কাটাতে হবে), তবে এর বাইরেও ফুটবলের সৌন্দর্য রক্ষায় যে নতুন আইনগুলো আসছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. ‘জার্সি টানার আগে লিখিত অনুমতি’ আইন
মাঠে দেখা যায়, একজন খেলোয়াড় দৌড়াচ্ছেন আর পেছন থেকে অন্যজন তার জার্সি টেনে ধরে জামাইবাবুর মতো আটকে রাখছেন। এটি অত্যন্ত অসভ্য আচরণ। নতুন আইন অনুযায়ী:
আইন: কোনো খেলোয়াড় যদি প্রতিপক্ষের জার্সি ধরে টান দিতে চান, তবে তাকে পকেট থেকে একটি ‘অনুমতি পত্র’ বের করে প্রতিপক্ষের স্বাক্ষর নিতে হবে। অথবা অন্ততপক্ষে মুখে বলতে হবে, “ভাইজান, আপনার জার্সিটি চমৎকার। একটু টানতে পারি কি?”
প্রয়োজনীয়তা: বাজারের কাপড়ের যা দাম! এভাবে জার্সি টেনে ছিঁড়ে ফেললে স্পন্সরদের বুক ফেটে যায়। তাছাড়া এতে কাপড়ের স্থায়িত্ব কমে।
উপকারিতা: খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌজন্যবোধ বাড়বে। মাঠে ‘দর্জিগিরি’ বন্ধ হবে এবং ম্যাচ শেষে জার্সি বদল করার সময় ছেঁড়া কাপড় নিয়ে কেউ লজ্জিত হবে না।
২. ‘ডি-বক্সের ভেতর নো-চিৎকার’ বা শান্ত এলাকা আইন
ডি-বক্সের ভেতর এলেই খেলোয়াড়রা যেভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি আর ডাইভ দেওয়া শুরু করেন, মনে হয় যেন মাছ বাজারে ইলিশ মাছের দামাদামি চলছে।
আইন: ডি-বক্সকে ‘সাইলেন্ট জোন’ বা শান্ত এলাকা ঘোষণা করা হলো। সেখানে ফিসফিস করে কথা বলতে হবে। গোলরক্ষককে পরাস্ত করার আগে স্ট্রাইকারকে বলতে হবে, “বাম কোণা দিয়ে বলটা জালে পাঠাচ্ছি, কিছু মনে করবেন না তো?”
প্রয়োজনীয়তা: রেফারিদের কানের পর্দা সুরক্ষার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। প্রতি ম্যাচে পেনাল্টির দাবিতে প্লেয়ারদের চিৎকারে রেফারিদের শ্রবণশক্তি হ্রাস পাচ্ছে।
উপকারিতা: মাঠে এক স্বর্গীয় শান্তি বিরাজ করবে। ধারাভাষ্যকাররা ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে পাখির কিচিরমিচির বা বাঁশির মৃদু সুর জুড়ে দিতে পারবেন। দর্শকদের মাথা ধরা কমবে।
৩. ‘হলুদ কার্ডের বদলে চকোলেট ও লাল কার্ডের বদলে চশমা’ আইন
ফুটবলাররা ফাউল করলে রেফারি পকেট থেকে কর্কশ ভঙ্গিতে কার্ড বের করেন। এই দৃশ্যটি ভীষণ রূঢ় এবং আধুনিক মনস্তত্ত্বের পরিপন্থি।
আইন: এখন থেকে হালকা ফাউল করলে রেফারি পকেট থেকে ডার্ক চকোলেট বের করে প্লেয়ারকে খাইয়ে দিয়ে বলবেন, “আর এমন করো না সোনা, লক্ষ্মীটি।“ আর যদি কেউ মারাত্মক ফাউল করে (যেমন কামড় দেওয়া বা লাথি মারা), তবে রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখাবেন না। রেফারি তাকে একটি পাওয়ারফুল চশমা উপহার দিয়ে বলবেন, “বাবা, তোমার চোখের দৃষ্টি দুর্বল। বল আর পায়ের পার্থক্য বুঝছ না। যাও, সাইডবেঞ্চে বসে চশমাটা পরে খেলা দেখ।“
প্রয়োজনীয়তা: খেলোয়াড়দের মানসিক ট্রমা থেকে রক্ষা করা। কার্ড দেখলে প্লেয়ারদের মন খারাপ হয়, যা তাদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।
উপকারিতা: মাঠের সহিংসতা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। খেলোয়াড়রা চকোলেটের লোভে ইচ্ছে করে ফাউল করবে ঠিকই, তবে তা হবে অত্যন্ত মৃদু ও মিষ্টি ফাউল।
৪. ‘অফসাইড ও মেকআপ’ বিরতি আইন
একজন লাইন্সম্যান সারাক্ষণ পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর একটু এদিক-ওদিক হলেই পতাকা নেড়ে অফসাইড ধরেন। এতে খেলার গতি নষ্ট হয়।
আইন: অফসাইড ক্যামেরা বা ভার (VAR) দেখার সময় খেলা যখন বন্ধ থাকবে, তখন খেলোয়াড়রা মাঠে অলস বসে না থেকে যার যার পকেট থেকে চিরুনি আর পাউডার বের করে চুল ও চেহারা ঠিক করে নেবেন। ক্যামেরা যখন তাদের ক্লোজ-আপ শট নেবে, তখন যেন তাদের গ্ল্যামারাস দেখায়।
প্রয়োজনীয়তা: ঘামে ভেজা, কাদা মাখা মুখ নিয়ে কোটি কোটি দর্শকের সামনে হাজির হওয়াটা একবিংশ শতাব্দীতে বড্ড বেমানান।
উপকারিতা: ফুটবলারদের ফেসিয়াল গ্লো বজায় থাকবে। এতে করে কসমেটিক্স কোম্পানিগুলো ফুটবলে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে।
মাঠে খেলোয়াড়রা ভদ্রলোক হয়ে যাবে আর গ্যালারিতে দর্শকরা বসে বসে চিৎকার করবে, পপকর্ন ছুড়বে—তা তো হতে পারে না। সাম্যবাদের ফুটবল মাঠে দর্শক সমাজকেও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
ফিফার গোপন খসড়া খাতা থেকে দর্শকদের জন্য আরও ৩টি বৈপ্লবিক আইন তুলে ধরা হলো:
৫. ‘চিৎকারের ডেসিবেল নিয়ন্ত্রণ ও ফিসফাস’ আইন
গ্যালারিতে বসে দর্শকরা যেভাবে “গোল... গোল...” বলে ষাঁড়ের মতো চিৎকার করেন, তাতে স্টেডিয়ামের আশপাশের আবাসিক এলাকার লোকজনের ঘুম ভেঙে যায়। এটি অত্যন্ত অসভ্য এবং কানের জন্য ক্ষতিকর।
আইন: স্টেডিয়ামের প্রতিটি সিটের সামনে ‘সাউন্ড মিটার’ বসানো হবে। দর্শকরা সর্বোচ্চ ৩০ ডেসিবেলে (যা সাধারণত লাইব্রেরিতে ফিসফাস করার শব্দ) চিৎকার করতে পারবেন। গোল হলে দর্শক কেবল দুই আঙুলে মৃদু তুড়ি বাজাতে পারবেন অথবা পাশের দর্শকের কানে কানে গিয়ে বলতে পারবেন, “ভাই, চমৎকার একটি গোল উপভোগ করিলাম।“
প্রয়োজনীয়তা: স্টেডিয়ামের শব্দ দূষণ কমানো এবং সভ্য সমাজ বিনির্মাণ। তাছাড়া অতিরিক্ত চিৎকারে দর্শকদের গলা ভেঙে গেলে তারা পরদিন অফিসে গিয়ে কাজ করতে পারেন না, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়।
উপকারিতা: স্টেডিয়ামে একটা আধ্যাত্মিক ও ধ্যানমগ্ন পরিবেশ তৈরি হবে। খেলা চলাকালীন দর্শকরা চাইলে হালকা ঘুমিয়েও নিতে পারবেন।
৬. ‘রেফারিকে অন্ধ বলা অপরাধ এবং বাধ্যতামূলক চক্ষুদান’ আইন
দল হারলেই গ্যালারি থেকে দর্শকরা রেফারিকে লক্ষ্য করে চশমা ছুড়ে মারেন, কেউ কেউ আবার চিৎকার করে বলেন— “রেফারি তুই কানা!” একজন সম্মানিত সরকারি চাকরিজীবীকে (ফিফার রেফারি) এভাবে প্রকাশ্যে অন্ধ বলা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
আইন: কোনো দর্শক যদি রেফারিকে ‘কানা’ বা ‘অন্ধ’ বলে গালি দেন, তবে তৎক্ষণাৎ মাঠের সিকিউরিটি তাকে ধরে নিয়ে যাবে। শাস্তি হিসেবে তাকে স্টেডিয়ামের বুথে বসিয়ে একটি ‘চক্ষু পরীক্ষা’র ফর্ম পূরণ করতে হবে এবং উইলে লিখে দিতে হবে— “মরণের পর আমি রেফারি তহবিলে চক্ষুদান করিব, যেন পরবর্তী প্রজন্মের রেফারিরা অফসাইড ঠিকঠাক দেখতে পায়।“
প্রয়োজনীয়তা: রেফারিদের আত্মসম্মান রক্ষা করা। তারা কালো পোশাক পরেন বলে তাদের কোনো অনুভূতি নেই—এমনটা ভাবা অন্যায়।
উপকারিতা: রেফারিদের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়বে। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে কর্নিয়া বা চোখের অভাব দূর হবে এবং অন্ধ রেফারি অপবাদ ঘুচবে।
৭. ‘ভার (VAR) রিভিউ ও পারিবারিক পঞ্চায়েত’ আইন
টিভি স্ক্রিনে বা স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় যখন ভার (VAR) চেকিং চলে, তখন দর্শকরা নখ কামড়াতে কামড়াতে হার্ট অ্যাটাক করার অবস্থায় চলে যান। এই অহেতুক উত্তেজনা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
আইন: রেফারি যখন মাঠের স্ক্রিনে অফসাইড বা ফাউল চেক করবেন, তখন দর্শকদের স্ক্রিনে খেলা দেখানো হবে না। সেই ৩-৪ মিনিট সময় নষ্ট না করে বড় পর্দায় দর্শকদের বাসার ড্রয়িংরুমের লাইভ সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হবে। দর্শক স্ক্রিনে দেখতে পাবেন তার ঘরের বিড়ালটি দুধ খাচ্ছে কি-না, কিংবা তার সন্তান পড়তে বসেছে নাকি গেম খেলছে।
প্রয়োজনীয়তা: ফুটবল উত্তেজনায় দর্শকরা যাতে সংসার ও পরিবারকে ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করা।
উপকারিতা: ফুটবল দেখার পাশাপাশি দর্শকদের পারিবারিক দায়িত্ববোধ বজায় থাকবে। স্ক্রিনে নিজের ঘর দেখে দর্শকরা মাঠের উত্তেজনা ভুলে শান্ত হয়ে যাবেন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
শেষ কথা
ফুটবলকে কেবল একটি গোল দেওয়ার নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতা বানিয়ে রাখলে চলবে না। ফিফার এই নতুন আইনগুলো বাস্তবায়িত হলে ফুটবল ম্যাচ আর যুদ্ধক্ষেত্র থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে একটি পারিবারিক ও বিনোদনমূলক মিলনমেলা। ৭ গোল দেওয়ার মতো পাশবিক আনন্দ ভুলে বিশ্ববাসী তখন দেখবে কীভাবে টাইট পরা ২২ জন ভদ্রলোক একে অপরের অনুমতি নিয়ে, চকোলেট খেতে খেতে, চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে পরম শান্তিতে মাঠময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আহা, ফুটবল হোক এমনই মধুময়!



