দিগন্ত, সীমান্ত, মীরবাড়ী ও মানহানি: জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এক প্রতিমন্ত্রী
‘এখানে আইনের লঙ্ঘন যদি নাও হয়, তবু এটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ তার দুই ছেলের নামের সাথে মিল আছে। এতে তার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে আজ অথবা কাল’ - নতুন নামকরণ করা দুটি ইউনিয়নের সাথে একজন প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নাম মিলে যাওয়া প্রশ্নে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান।
নাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:২২ পিএমআপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:২২ পিএম
আইনে বলা আছে, “ইউনিয়নের নামকরণ কোন ব্যক্তির নামে হইবে না।”
বগুড়ায় নবগঠিত দুইটি ইউনিয়নের নামের সাথে ওই জেলারই সরকারদলীয় এমপি এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলের নাম অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যাওয়ার ঘটনায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
যে আইন দ্বারা স্থানীয় সরকার পরিচালিত হয় সেখানেই ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে।
কিন্তু এমন একটি আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতিমন্ত্রীর ছেলের নামের সাথে নতুন ইউনিয়নের নাম মিলে গেলো তা নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন।
প্রতিমন্ত্রী স্বয়ং এটাকে কাকতাল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামকরণের প্রস্তাবনার মধ্যে ব্যক্তির নামের উল্লেখ না থাকায় এই ক্ষেত্রে এখানে আইনের লঙ্ঘন না হলেও সুস্পষ্টভাবে নৈতিকতার লঙ্ঘন হয়েছে।
একই ঘটনায় বগুড়ায় তৃতীয় আরেকটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয় ‘মীরবাড়ী’, যে নামটি প্রতিমন্ত্রীরই পৈত্রিক বাসভবনের নামের সাথে মিলে যায়।
এই নামকরণের ঘটনা যেদিন প্রকাশ্যে এসেছে, সেই একইদিন ভিন্ন একটি ঘটনায় চারজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বগুড়ার আদালতে একটি মানহানীর মামলা ঠুকে দিয়েছেন বগুড়ারই একজন সাংবাদিক। অভিযোগ ওই চারজন সাংবাদিক মিথ্যা খবর প্রকাশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর মানহানি করেছেন।
সব মিলে সোমবার থেকে শুরু করে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সকল আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন একজন ব্যক্তি, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সংসদে বিতর্ক
গত ৭ই মে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’ বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলাকে ভাগ করে ‘মোকামতলা’ নামের নতুন উপজেলা অনুমোদন দেয়।
গত বৃহস্পতিবার শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি এবং মোকামতলা উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর ১১ নাম্বার ধারার উপধারা ২ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির নামে কোনো ইউনিয়নের নামকরণ করা যায় না।
আইনে বলা আছে, “উপ-ধারা (১) এর অধীন ঘোষিত ইউনিয়ন ডেপুটি কমিশনার কর্তৃক নির্ধারিত নামে অভিহিত হইবেঃ তবে শর্ত থাকে যে, ইউনিয়নের নামকরণ কোন ব্যক্তির নামে হইবে না।”
এই আইনের অধীনেই বগুড়ায় নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার নতুন তিনটি ইউনিয়নকে ‘দিগন্ত’, ‘সীমান্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামকরণ করা হয়েছে।
কিন্তু এর মধ্যে দুটি নামই মিলে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলে দিগন্ত ও সীমান্তের সাথে। মীর শাহে আলম বগুড়া ২ আসনের সংসদ সদস্য।
তার দুই ছেলের নাম মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত।
শিবগঞ্জ উপজেলায়ও নতুন আরেকটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে যার নাম ‘মীরবাড়ী’। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাসভবনের নাম ‘মীরবাড়ী’।
রবিবার এই নামকরণ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হলে নতুন তিনটি ইউনিয়নের নাম নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
সোমবার সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেট আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
প্রতিউত্তরে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেন মীর শাহে আলম। বলেন, “আমার সন্তানদের নাম জড়িত হলো মিরাকলি। আমার সন্তানদের নামের সাথে মিলে গেছে ঠিকই কিন্তু আমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত মীর দিগন্ত”।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমার যদি ইনটেনশন থাকতো সন্তানের নামে করার তাহলে তো আমি ইউনিয়নের নাম, প্রশাসনকে বলতাম যে রাখেন মীর সীমান্ত না হলে মীর দিগন্ত। কিন্তু নামের আগে তো মীর নাই মাননীয় স্পিকার।”
শফিকুল ইসলাম মাসুদকে উদ্দেশ্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আল্লাহ বাঁচাইছে যে মাননীয় সংসদ সদস্য বলেনি বিজিবির নির্মিত যে ব্যাংক সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড ওটা আমার ব্যাংক। মাননীয় স্পিকার উনি দয়া করে যে বলেননি যে খুলনা থেকে পার্বতীপুরে যে ট্রেন যায় সীমান্ত এক্সপ্রেস সেটিও আমার ট্রেন। মাননীয় স্পিকার উনি যে দয়া করে বলেননি যে গুলশান একে যে দিগন্ত টাওয়ার রয়েছে সেটিও আমার।”
এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছে দাবি করে শফিকুল ইসলাম মাসুদের বক্তব্য এক্সপাঞ্জের অনুরোধ করেন স্পিকারের কাছে।
নৈতিকতার প্রশ্ন
নতুন ইউনিয়নের নামকরণের জন্য প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক মোঃ তৌফিকুর রহমান।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমার কাছে উপজেলা কমিটি থেকে প্রস্তাব এসেছে। আমি আইন অনুযায়ী কাগজপত্র দেখে গণশুনানি করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছি।”
জানা গেছে, গত ৩রা জুন শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সভায় স্থানীয় একজন বিএনপি নেতা ইউনিয়নগুলোর নামকরণের বিষয়ে প্রস্তাব করেন। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলে উপজেলা প্রশাসন থেকে নামগুলো লিখিত প্রস্তাব আকারে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।
পরে যাচাই বাছাই শেষে গণশুনানি করে নতুন ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন দেন জেলা প্রশাসক।
আইনে থাকার পরও কারো নামে ইউনিয়ন নামকরণ নিয়মের ব্যত্যয় কি-না? এমন প্রশ্নে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, “কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণের প্রস্তাবনা গেলে তা আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু প্রস্তাবনায় কোন ব্যক্তির নাম উল্লেখ না থাকলেতো আইনের লঙ্ঘন হয়নি।”
তবে এখানে নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা যেতে পারে বলে মনে করেন প্রফেসর আমিনুজ্জামান।
তিনি বলেন, “এখানে আইনের লঙ্ঘন যদি না-ও হয়, তবু এটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ তার দুই ছেলের নামের সাথে মিল আছে। এতে তার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে আজ অথবা কাল।”
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে প্রস্তাবনায় ‘দিগন্ত’ ও ‘সীমান্ত’ নাম দুটি থাকলেও তা কোনো ব্যক্তির নামে বলে উল্লেখ করা হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব এলে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নতুন নামের বিষয়ে প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।
দুই উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহে আলম উপজেলা প্রশাসনে ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র্রও দিয়েছেন।
মানহানি
ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সারা দেশে আলোচনায় আরো রসদ জুগিয়েছে শাহে আলমের মানহানির অভিযোগে মামলা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
শুনানির পর বিচারক অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট থানাকে আদেশ দেন।
মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, বিবাদীরা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করে বাদী এবং বগুড়ার সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করেছেন।
বাদী তানভীর আলম দৈনিক মহাস্থানের সম্পাদক ও প্রকাশক।
তিনি আলাপকে বলেন, “২০ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত জেলা আমাদের বগুড়া। ৩২ বছর পর আমরা প্রতিমন্ত্রী পেলাম। যে ঘটনা নিয়ে আলোচনা, প্রতিমন্ত্রী প্রেসক্লাবে এসেও তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারপরও দেখা যায় তার বিরুদ্ধে নেগেটিভ নিউজ, প্রত্যেকদিনই হচ্ছে। এটাতো হতে পারে না।”
প্রেস কাউন্সিলে না গিয়ে আদালতে মামলা কেন, এই প্রশ্নের উত্তরে বাদী তানভীর আলম বলেন, “তাদের পত্রিকার ডিক্লারেশন আছে কি-না তা নিয়েই আমার প্রশ্ন আছে। সাংবাদিক হলে প্রেস কাউন্সিলে যেতাম।”
তবে অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের বার্তা সম্পাদক আশরাফ আলী ফারুকী আলাপ-কে নিশ্চিত করেছেন পত্রিকাটির ডিক্লারেশন আছে।
তিনি বলেন, “তিনিতো প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের উপদেশ দিয়েছেন, আমরা সেই নিয়েই নিউজ করেছি। সুস্পষ্ট অভিযোগসহই আমরা সংবাদ করেছি।”
প্রতিমন্ত্রীর মানহানি হলে কেন অন্য কেউ মামলা করবে সেই প্রশ্ন তুলে আশরাফ আলী ফারুকী বলেন, “আমরা জানি মামলা তিনিই করিয়েছেন দালাল দিয়ে।”
দিগন্ত, সীমান্ত, মীরবাড়ী ও মানহানি: জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এক প্রতিমন্ত্রী
‘এখানে আইনের লঙ্ঘন যদি নাও হয়, তবু এটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ তার দুই ছেলের নামের সাথে মিল আছে। এতে তার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে আজ অথবা কাল’ - নতুন নামকরণ করা দুটি ইউনিয়নের সাথে একজন প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নাম মিলে যাওয়া প্রশ্নে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান।
বগুড়ায় নবগঠিত দুইটি ইউনিয়নের নামের সাথে ওই জেলারই সরকারদলীয় এমপি এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলের নাম অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যাওয়ার ঘটনায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
যে আইন দ্বারা স্থানীয় সরকার পরিচালিত হয় সেখানেই ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে।
কিন্তু এমন একটি আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রতিমন্ত্রীর ছেলের নামের সাথে নতুন ইউনিয়নের নাম মিলে গেলো তা নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন।
প্রতিমন্ত্রী স্বয়ং এটাকে কাকতাল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামকরণের প্রস্তাবনার মধ্যে ব্যক্তির নামের উল্লেখ না থাকায় এই ক্ষেত্রে এখানে আইনের লঙ্ঘন না হলেও সুস্পষ্টভাবে নৈতিকতার লঙ্ঘন হয়েছে।
একই ঘটনায় বগুড়ায় তৃতীয় আরেকটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয় ‘মীরবাড়ী’, যে নামটি প্রতিমন্ত্রীরই পৈত্রিক বাসভবনের নামের সাথে মিলে যায়।
এই নামকরণের ঘটনা যেদিন প্রকাশ্যে এসেছে, সেই একইদিন ভিন্ন একটি ঘটনায় চারজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বগুড়ার আদালতে একটি মানহানীর মামলা ঠুকে দিয়েছেন বগুড়ারই একজন সাংবাদিক। অভিযোগ ওই চারজন সাংবাদিক মিথ্যা খবর প্রকাশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর মানহানি করেছেন।
সব মিলে সোমবার থেকে শুরু করে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সকল আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন একজন ব্যক্তি, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সংসদে বিতর্ক
গত ৭ই মে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’ বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলাকে ভাগ করে ‘মোকামতলা’ নামের নতুন উপজেলা অনুমোদন দেয়।
গত বৃহস্পতিবার শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি এবং মোকামতলা উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর ১১ নাম্বার ধারার উপধারা ২ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির নামে কোনো ইউনিয়নের নামকরণ করা যায় না।
আইনে বলা আছে, “উপ-ধারা (১) এর অধীন ঘোষিত ইউনিয়ন ডেপুটি কমিশনার কর্তৃক নির্ধারিত নামে অভিহিত হইবেঃ তবে শর্ত থাকে যে, ইউনিয়নের নামকরণ কোন ব্যক্তির নামে হইবে না।”
এই আইনের অধীনেই বগুড়ায় নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার নতুন তিনটি ইউনিয়নকে ‘দিগন্ত’, ‘সীমান্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামকরণ করা হয়েছে।
কিন্তু এর মধ্যে দুটি নামই মিলে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলে দিগন্ত ও সীমান্তের সাথে। মীর শাহে আলম বগুড়া ২ আসনের সংসদ সদস্য।
তার দুই ছেলের নাম মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত।
শিবগঞ্জ উপজেলায়ও নতুন আরেকটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে যার নাম ‘মীরবাড়ী’। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাসভবনের নাম ‘মীরবাড়ী’।
রবিবার এই নামকরণ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হলে নতুন তিনটি ইউনিয়নের নাম নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
সোমবার সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেট আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
প্রতিউত্তরে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেন মীর শাহে আলম। বলেন, “আমার সন্তানদের নাম জড়িত হলো মিরাকলি। আমার সন্তানদের নামের সাথে মিলে গেছে ঠিকই কিন্তু আমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত মীর দিগন্ত”।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমার যদি ইনটেনশন থাকতো সন্তানের নামে করার তাহলে তো আমি ইউনিয়নের নাম, প্রশাসনকে বলতাম যে রাখেন মীর সীমান্ত না হলে মীর দিগন্ত। কিন্তু নামের আগে তো মীর নাই মাননীয় স্পিকার।”
শফিকুল ইসলাম মাসুদকে উদ্দেশ্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আল্লাহ বাঁচাইছে যে মাননীয় সংসদ সদস্য বলেনি বিজিবির নির্মিত যে ব্যাংক সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড ওটা আমার ব্যাংক। মাননীয় স্পিকার উনি দয়া করে যে বলেননি যে খুলনা থেকে পার্বতীপুরে যে ট্রেন যায় সীমান্ত এক্সপ্রেস সেটিও আমার ট্রেন। মাননীয় স্পিকার উনি যে দয়া করে বলেননি যে গুলশান একে যে দিগন্ত টাওয়ার রয়েছে সেটিও আমার।”
এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছে দাবি করে শফিকুল ইসলাম মাসুদের বক্তব্য এক্সপাঞ্জের অনুরোধ করেন স্পিকারের কাছে।
নৈতিকতার প্রশ্ন
নতুন ইউনিয়নের নামকরণের জন্য প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক মোঃ তৌফিকুর রহমান।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমার কাছে উপজেলা কমিটি থেকে প্রস্তাব এসেছে। আমি আইন অনুযায়ী কাগজপত্র দেখে গণশুনানি করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছি।”
জানা গেছে, গত ৩রা জুন শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সভায় স্থানীয় একজন বিএনপি নেতা ইউনিয়নগুলোর নামকরণের বিষয়ে প্রস্তাব করেন। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলে উপজেলা প্রশাসন থেকে নামগুলো লিখিত প্রস্তাব আকারে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।
পরে যাচাই বাছাই শেষে গণশুনানি করে নতুন ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন দেন জেলা প্রশাসক।
আইনে থাকার পরও কারো নামে ইউনিয়ন নামকরণ নিয়মের ব্যত্যয় কি-না? এমন প্রশ্নে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, “কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণের প্রস্তাবনা গেলে তা আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু প্রস্তাবনায় কোন ব্যক্তির নাম উল্লেখ না থাকলেতো আইনের লঙ্ঘন হয়নি।”
তবে এখানে নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা যেতে পারে বলে মনে করেন প্রফেসর আমিনুজ্জামান।
তিনি বলেন, “এখানে আইনের লঙ্ঘন যদি না-ও হয়, তবু এটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ তার দুই ছেলের নামের সাথে মিল আছে। এতে তার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে আজ অথবা কাল।”
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে প্রস্তাবনায় ‘দিগন্ত’ ও ‘সীমান্ত’ নাম দুটি থাকলেও তা কোনো ব্যক্তির নামে বলে উল্লেখ করা হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব এলে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নতুন নামের বিষয়ে প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।
দুই উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহে আলম উপজেলা প্রশাসনে ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র্রও দিয়েছেন।
মানহানি
ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সারা দেশে আলোচনায় আরো রসদ জুগিয়েছে শাহে আলমের মানহানির অভিযোগে মামলা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বগুড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ তানভীর আলম বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
শুনানির পর বিচারক অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট থানাকে আদেশ দেন।
মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, বিবাদীরা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করে বাদী এবং বগুড়ার সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করেছেন।
বাদী তানভীর আলম দৈনিক মহাস্থানের সম্পাদক ও প্রকাশক।
তিনি আলাপকে বলেন, “২০ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত জেলা আমাদের বগুড়া। ৩২ বছর পর আমরা প্রতিমন্ত্রী পেলাম। যে ঘটনা নিয়ে আলোচনা, প্রতিমন্ত্রী প্রেসক্লাবে এসেও তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারপরও দেখা যায় তার বিরুদ্ধে নেগেটিভ নিউজ, প্রত্যেকদিনই হচ্ছে। এটাতো হতে পারে না।”
প্রেস কাউন্সিলে না গিয়ে আদালতে মামলা কেন, এই প্রশ্নের উত্তরে বাদী তানভীর আলম বলেন, “তাদের পত্রিকার ডিক্লারেশন আছে কি-না তা নিয়েই আমার প্রশ্ন আছে। সাংবাদিক হলে প্রেস কাউন্সিলে যেতাম।”
তবে অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের বার্তা সম্পাদক আশরাফ আলী ফারুকী আলাপ-কে নিশ্চিত করেছেন পত্রিকাটির ডিক্লারেশন আছে।
তিনি বলেন, “তিনিতো প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের উপদেশ দিয়েছেন, আমরা সেই নিয়েই নিউজ করেছি। সুস্পষ্ট অভিযোগসহই আমরা সংবাদ করেছি।”
প্রতিমন্ত্রীর মানহানি হলে কেন অন্য কেউ মামলা করবে সেই প্রশ্ন তুলে আশরাফ আলী ফারুকী বলেন, “আমরা জানি মামলা তিনিই করিয়েছেন দালাল দিয়ে।”
“একজন সাংবাদিক হয়ে কীভাবে আরেকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন” -প্রশ্ন তোলেন অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের সম্পাদক।
তিনি বলেন, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালতের বিচারে যদি অপরাধী হই তাহলে মেনে নেবো। আইনি পথেই এর মোকাবেলা করবো।”