ম্যাচের আগে ফরোয়ার্ড মেহদি তারেমি বলেন, তারা দেশের ভেতর ও বাইরে থাকা সব ইরানির জন্য খেলেন এবং রাজনীতিতে জড়াতে চান না।
আলাপ স্পোর্টস
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ১১:৪৬ এএমআপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ১১:৫০ এএম
ছবি: এআই
টিকিটে আর আনুষ্ঠানিক তালিকায় ম্যাচটির নাম ছিল ইরান বনাম নিউজিল্যান্ড। কিন্তু গ্যালারিতে বসে ম্যাচ দেখলে মনে হচ্ছিল অন্য এক লড়াই চলছে। মাঠে প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড, কিন্তু স্ট্যান্ডে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছিল ইরানিদের নিজেদের মধ্যকার বিভক্তির প্রতিধ্বনি।
বহুবার ইরানের ফুটবল কর্মকর্তারা বলেছেন, ফুটবল মানুষকে এক করে। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের এই ম্যাচে সেই ঐক্যের ছবি খুব একটা দেখা যায়নি। বরং ফুটবলকে ঘিরে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, পরিচয়ের সংকট আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান।
স্টেডিয়ামের বাইরে শুরু থেকেই ছিলো উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ। শত শত ইরানের পতাকা চোখে পড়ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগের লায়ন অ্যান্ড সান প্রতীকযুক্ত পতাকা। অনেক ইরানি আমেরিকানের কাছে এই পতাকা এখন শুধু পুরোনো রাষ্ট্রীয় প্রতীক নয়, বরং বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতীক। ফিফা এটিকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে স্টেডিয়ামের ভেতরে নিষিদ্ধ করলেও অনেকের পোশাকে, হাতে আর গ্যালারিতেও দেখা গেছে সেই পতাকা।
স্টেডিয়ামের বাইরে কয়েকশ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তাদের ক্ষোভ শুধু ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়, ইরানের জাতীয় দল নিয়েও। তাদের অভিযোগ, বর্তমান দলটি ইরানের জনগণের নয়, ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিনিধিত্ব করছে। স্লোগানে শোনা যায়, “মোল্লাদের দল আমার দল নয়।”কেউ আবার শাসন পরিবর্তনের দাবি জানায়। এক পর্যায়ে তারা ইরানের বিপ্লবপূর্ব জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করে। একজন তরুণ পরে জানান, এই গানের অর্থ তাদের কাছে স্বাধীনতা আর গর্বের প্রতীক।
কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকতেই চিত্র পাল্টে যায়। সেখানে রাজনীতির চেয়ে জোরে শোনা যাচ্ছিলো সমর্থনের আওয়াজ। ইরান পিছিয়ে পড়ার পরও দুইবার ফিরে এসে ২–২ গোলে ড্র করে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। প্রতিটি গোলের পর গ্যালারি গর্জে ওঠে।
গ্যালারিতে হাজারো ইরানি পতাকা ছিল। দূর থেকে সব একই রকম লাগলেও কাছ থেকে বোঝা যাচ্ছিলো ভিন্নতা। কারও হাতে ছিলো ইসলামিক রিপাবলিকের সরকারি পতাকা, কারও হাতে লায়ন অ্যান্ড সান প্রতীক। সবাই ইরানের রংয়ে সেজে এলেও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এক ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রে দশ বছর ধরে থাকা ইরানি আমেরিকান সামানেহ বলেন, বিষয়টি খুব জটিল। তিনি বলেন, তিনি ইরানকে সমর্থন করতে এসেছেন, সরকারকে নয়। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় তিনি কেঁদে ফেলেন। তার বাবা পাশে থাকলেও তার মা এখনও ইরানে আটকে আছেন কাগজপত্রের জটিলতা আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে। তিনি বলেন, তিনি সবসময় মাকে নিয়ে চিন্তায় থাকেন এবং নিজেও দেশে ফিরে যেতে ভয় পান।
ম্যাচ চলাকালেও এই বিভাজন স্পষ্ট ছিল। নিউজিল্যান্ড গোল করলে গ্যালারির কিছু সরকারবিরোধী দর্শক আনন্দ প্রকাশ করেন এবং লায়ন অ্যান্ড সান পতাকা উড়ান।
ম্যাচ শেষে আবারও আলোচনায় ফিরে আসে রাজনীতি। এক নারী বলেন, তারা নতুন কোনো সমঝোতা চান না। তার মতে, ইরানের মানুষ শাসন পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। আরেকজনের বক্তব্য, একটি ফুটবল ম্যাচের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাকে স্বাভাবিক করে দেখানো যায় না। তার মতে, এই দল সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না।
আরেক দর্শক প্রতীকীভাবে গলায় ফাঁসের দড়ি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার ভাষায়, এটি ইরানে নিরপরাধ মানুষদের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তার মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন, মাঠের খেলোয়াড়রা রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, জনগণকে নয়।
তবে খেলোয়াড়দের অবস্থান আলাদা। ম্যাচের আগে ফরোয়ার্ড মেহদি তারেমি বলেন, তারা দেশের ভেতর ও বাইরে থাকা সব ইরানির জন্য খেলেন এবং রাজনীতিতে জড়াতে চান না।
এই মতের সঙ্গে একমত ছিলেন কিছু সমর্থকও। কেউ বলছিলেন ফুটবল বন্ধুত্ব, সংস্কৃতির সংযোগ আর রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার জায়গা হওয়া উচিত। কেউ আবার মনে করেন, খেলোয়াড়দের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়।
আরেক সমর্থক বলেন, তিনি চেষ্টা করেন সরকার আর দলকে আলাদা করে দেখতে। তার বাবার মৃত্যুর পরও ইরানের বিশ্বকাপ দেখা তার কাছে পারিবারিক আবেগের অংশ হয়ে আছে। তিনি বলেন, তিনি এসেছেন তার বাবার স্মৃতির জন্য এবং সেইসব ইরানিদের জন্য যারা শুধু শান্তি আর একটি ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করার সুযোগ চান।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ইরানের যাত্রা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাবিত হয়েছে। ভিসা জটিলতার কারণে দলকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে ক্যাম্প সরিয়ে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় নিতে হয়েছে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে খেলছে, কিন্তু অবস্থান করছে সীমান্তের ওপারে।
ইরানের দল হয়তো ফুটবলের মাধ্যমে মানুষকে এক করার কথা বলছে। কিন্তু এই ম্যাচ অন্তত দেখিয়েছে, অনেক ইরানির ভেতরে এখনও গভীর বিভাজন রয়ে গেছে। আর সেই বিভাজনের প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গ্যালারিতেই।
লস অ্যাঞ্জেলসের স্টেডিয়ামে ইরান, কী হচ্ছিলো গ্যালারিজুড়ে
ম্যাচের আগে ফরোয়ার্ড মেহদি তারেমি বলেন, তারা দেশের ভেতর ও বাইরে থাকা সব ইরানির জন্য খেলেন এবং রাজনীতিতে জড়াতে চান না।
টিকিটে আর আনুষ্ঠানিক তালিকায় ম্যাচটির নাম ছিল ইরান বনাম নিউজিল্যান্ড। কিন্তু গ্যালারিতে বসে ম্যাচ দেখলে মনে হচ্ছিল অন্য এক লড়াই চলছে। মাঠে প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড, কিন্তু স্ট্যান্ডে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছিল ইরানিদের নিজেদের মধ্যকার বিভক্তির প্রতিধ্বনি।
বহুবার ইরানের ফুটবল কর্মকর্তারা বলেছেন, ফুটবল মানুষকে এক করে। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের এই ম্যাচে সেই ঐক্যের ছবি খুব একটা দেখা যায়নি। বরং ফুটবলকে ঘিরে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, পরিচয়ের সংকট আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান।
স্টেডিয়ামের বাইরে শুরু থেকেই ছিলো উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ। শত শত ইরানের পতাকা চোখে পড়ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগের লায়ন অ্যান্ড সান প্রতীকযুক্ত পতাকা। অনেক ইরানি আমেরিকানের কাছে এই পতাকা এখন শুধু পুরোনো রাষ্ট্রীয় প্রতীক নয়, বরং বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতীক। ফিফা এটিকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে স্টেডিয়ামের ভেতরে নিষিদ্ধ করলেও অনেকের পোশাকে, হাতে আর গ্যালারিতেও দেখা গেছে সেই পতাকা।
স্টেডিয়ামের বাইরে কয়েকশ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তাদের ক্ষোভ শুধু ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়, ইরানের জাতীয় দল নিয়েও। তাদের অভিযোগ, বর্তমান দলটি ইরানের জনগণের নয়, ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিনিধিত্ব করছে। স্লোগানে শোনা যায়, “মোল্লাদের দল আমার দল নয়।”কেউ আবার শাসন পরিবর্তনের দাবি জানায়। এক পর্যায়ে তারা ইরানের বিপ্লবপূর্ব জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করে। একজন তরুণ পরে জানান, এই গানের অর্থ তাদের কাছে স্বাধীনতা আর গর্বের প্রতীক।
কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকতেই চিত্র পাল্টে যায়। সেখানে রাজনীতির চেয়ে জোরে শোনা যাচ্ছিলো সমর্থনের আওয়াজ। ইরান পিছিয়ে পড়ার পরও দুইবার ফিরে এসে ২–২ গোলে ড্র করে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। প্রতিটি গোলের পর গ্যালারি গর্জে ওঠে।
গ্যালারিতে হাজারো ইরানি পতাকা ছিল। দূর থেকে সব একই রকম লাগলেও কাছ থেকে বোঝা যাচ্ছিলো ভিন্নতা। কারও হাতে ছিলো ইসলামিক রিপাবলিকের সরকারি পতাকা, কারও হাতে লায়ন অ্যান্ড সান প্রতীক। সবাই ইরানের রংয়ে সেজে এলেও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এক ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রে দশ বছর ধরে থাকা ইরানি আমেরিকান সামানেহ বলেন, বিষয়টি খুব জটিল। তিনি বলেন, তিনি ইরানকে সমর্থন করতে এসেছেন, সরকারকে নয়। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় তিনি কেঁদে ফেলেন। তার বাবা পাশে থাকলেও তার মা এখনও ইরানে আটকে আছেন কাগজপত্রের জটিলতা আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে। তিনি বলেন, তিনি সবসময় মাকে নিয়ে চিন্তায় থাকেন এবং নিজেও দেশে ফিরে যেতে ভয় পান।
ম্যাচ চলাকালেও এই বিভাজন স্পষ্ট ছিল। নিউজিল্যান্ড গোল করলে গ্যালারির কিছু সরকারবিরোধী দর্শক আনন্দ প্রকাশ করেন এবং লায়ন অ্যান্ড সান পতাকা উড়ান।
ম্যাচ শেষে আবারও আলোচনায় ফিরে আসে রাজনীতি। এক নারী বলেন, তারা নতুন কোনো সমঝোতা চান না। তার মতে, ইরানের মানুষ শাসন পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। আরেকজনের বক্তব্য, একটি ফুটবল ম্যাচের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাকে স্বাভাবিক করে দেখানো যায় না। তার মতে, এই দল সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না।
আরেক দর্শক প্রতীকীভাবে গলায় ফাঁসের দড়ি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার ভাষায়, এটি ইরানে নিরপরাধ মানুষদের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তার মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন, মাঠের খেলোয়াড়রা রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, জনগণকে নয়।
তবে খেলোয়াড়দের অবস্থান আলাদা। ম্যাচের আগে ফরোয়ার্ড মেহদি তারেমি বলেন, তারা দেশের ভেতর ও বাইরে থাকা সব ইরানির জন্য খেলেন এবং রাজনীতিতে জড়াতে চান না।
এই মতের সঙ্গে একমত ছিলেন কিছু সমর্থকও। কেউ বলছিলেন ফুটবল বন্ধুত্ব, সংস্কৃতির সংযোগ আর রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকার জায়গা হওয়া উচিত। কেউ আবার মনে করেন, খেলোয়াড়দের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়।
আরেক সমর্থক বলেন, তিনি চেষ্টা করেন সরকার আর দলকে আলাদা করে দেখতে। তার বাবার মৃত্যুর পরও ইরানের বিশ্বকাপ দেখা তার কাছে পারিবারিক আবেগের অংশ হয়ে আছে। তিনি বলেন, তিনি এসেছেন তার বাবার স্মৃতির জন্য এবং সেইসব ইরানিদের জন্য যারা শুধু শান্তি আর একটি ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করার সুযোগ চান।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ইরানের যাত্রা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাবিত হয়েছে। ভিসা জটিলতার কারণে দলকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে ক্যাম্প সরিয়ে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় নিতে হয়েছে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে খেলছে, কিন্তু অবস্থান করছে সীমান্তের ওপারে।
ইরানের দল হয়তো ফুটবলের মাধ্যমে মানুষকে এক করার কথা বলছে। কিন্তু এই ম্যাচ অন্তত দেখিয়েছে, অনেক ইরানির ভেতরে এখনও গভীর বিভাজন রয়ে গেছে। আর সেই বিভাজনের প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গ্যালারিতেই।