নিউ ইয়র্ক রাঙিয়ে রেখেছে বাঙালিরাই

কুইন্সের জ্যামাইকা হিল সাইডের ওপরের অংশে ঢুকতেই পুরো হাওয়া বদলে গেলো। এটা আমেরিকার পরিচিত বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল। রাস্তার চারপাশে যারা হেঁটে যাচ্ছেন তাদের মুখের গড়নই বলে দিচ্ছে, এরা বাঙালি। পরনে হয় ব্রাজিল, না হয় আর্জেন্টিনার জার্সি।

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ১০:৫৫ এএম

আমেরিকায় ইমিগ্রেশন পার হওয়া বেশ ঝক্কি-ঝামেলার। কাজটা যতটা না কঠিন, তার থেকেও বেশি দুশ্চিন্তার। টানা ২২ ঘণ্টা জার্নি শেষে ঢাকা থেকে জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে পা দিয়ে নামতে না নামতেই ইমিগ্রেশন সেন্টার। কোথাও যে দাঁড়িয়ে একটু এদিক ওদিক তাকাবো, সেই সময়টুকুও নেই। বিশাল ইমিগ্রেশন সেন্টারের প্রায় পুরোটা ফাঁকা। আমি লাইনে দাঁড়াতে হাঁটা দিলাম।

‘দিজ ইজ আমেরিকা মাই ব্রাদার। হেয়ার টাইম ইজ মানি,’- নিজের ইংলিশটা এই সুযোগে একটু বাজিয়ে নিলাম। ভদ্রলোক আমার আগেই লাইনে দাঁড়ালেন। গোটা চল্লিশেক লোকের পেছনে আমরা দু’জন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমাদের পেছনে শ’তিনেক লোক দাঁড়িয়ে গেলো। বোঝাই যাচ্ছে একের অধিক ফ্লাইটের অবতরণ হয়েছে।

সফরসঙ্গী বেশ এক্সসাইটেড। প্রথমবার আমেরিকা আসার অনুভূতি তাকে উত্তেজিত করে চলেছে। সে তুলনায় আমি বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এর আগে দু’বার ইউএস ইমিগ্রেশন পার হওয়ার স্মৃতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আমার আগেই ভদ্রলোকের ডাক পড়লো। আমি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করছি কী কথোপকথন চলছে। সাংবাদিক মহাশয় সব কিছুর ঠিকঠাক জবাব দিচ্ছেন। শুধু একটি প্রশ্নে আটকে গেলেন। ‘এই সফরে আপনার বাজেট কত, মহাশয়?’ ধেয়ে আসা এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি ডলারের অঙ্ক জানিয়ে যোগ করলেন, ‘পুরোটাই ক্যাশ এনেছি!’

সাথে ক্রেডিট কার্ড নেই জানার পর ইমিগ্রেশন অফিসারের যেন চোখ কপালে উঠে গেলো। আর আমার চোখ তখন কপাল ছাড়িয়ে ইমিগ্রেশন সেন্টারের ছাদে বাড়ি খাচ্ছে। মহাশয় এ কী জবাব দিলেন! ভদ্রলোককে সাথে সাথে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। ক্রেডিট কার্ড ছাড়া আমেরিকা প্রবেশের কারণে তার কপালে এখন কী আছে কে জানে!

এবার আমার পালা! হৃদপিণ্ড যেন ঢোল বাজাচ্ছে। অন্য লাইনে ডাক পড়েছে আমার। বিশালদেহী এক আমেরিকান অফিসার বসা। পাসপোর্ট প্লিজ বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি সে সব উত্তর দেবো, তা মনে মনে আরেকবার জপে নিলাম।

‘ওহ! তুমি বিশ্বকাপ ফুটবলের খবর সংগ্রহের জন্য এসেছো?’ ভারী কণ্ঠে কাঁচের ওপাশ থেকে প্রথম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হলো।

আমি মিনমিনে কণ্ঠে বললাম, ‘জি, ঠিক ধরেছেন। সাংবাদিক হিসেবে সেটাই আমার কাজ।’

ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন, আমি দেখছি এর আগে তুমি ক্রিকেট বিশ্বকাপও কাভার করেছো। নিউ ইয়র্ক তাহলে তো তোমার পরিচিত শহর।’

বিগলিত হাসি দিয়ে আমি আবারও বললাম, ‘জি, ঠিক ধরেছেন।’

‘তুমি কি আবারও একই ঠিকানায় উঠবে? জ্যামাইকা হিল সাইডে তোমার বাবার বাসায়?’

আমি আবারও মৃদু স্বরে বললাম, জি, ঠিক ধরেছেন।

‘গুড লাক’ বলে ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিলেন। ‘জি, ঠিক ধরেছেন’ - এই তিন শব্দের ওপর দিয়েই আমার জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শেষ হলো। কার মুখ দেখে বিমানে উঠেছি কে জানে! যার মুখচ্ছবি-ই দেখে থাকি না কেন, সেটা আমার জন্য পয়মন্তই বটে!

আমার সাংবাদিক বন্ধুকে আশপাশে কোথাও পেলাম না। হোয়াটঅ্যাপে কল দিয়ে বুঝলাম অনলাইনেও নেই। লাগেজ সংগ্রহ করে গেট থেকে বের হতে সব মিলিয়ে মিনিট বিশেক সময় লাগলো।

গেটের বাইরে বাবার আলিঙ্গন শেষে গাড়িতে চেপে বসলাম। অবাক হয়ে ভাবছি, এই যে জন এফ কেনেডিতে আমার বিশ মিনিটের গল্প, কোথাও বিশ্বকাপের একটা পোস্টার বা জার্সি পরা কাউকে চোখে পড়লো না কেন? আসলেই নিউ ইয়র্ক এবারের অন্যতম আয়োজক শহরই তো, নাকি?

বাবা ১২ বছর ধরে নিউ ইয়র্কে থাকেন। ডাইহার্ড ব্রাজিল ফ্যান। পাঁচ তারকা সম্বলিত হলুদ জার্সি আনা হয়েছে শুনে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বিশ্বাস করুন, বিমানবন্দর থেকে জ্যামাইকা হিল সাইডে পঁচিশ মিনিটের রাইডে বিশ্বকাপ নিয়ে চর্চা করার মতো তেমন কিছু চোখে পড়লো না। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ - এর সম্ভবত প্রচার প্রসার লাগে না এই শহরে!

কুইন্সের জ্যামাইকা হিল সাইডের ওপরের অংশে ঢুকতেই পুরো হাওয়া বদলে গেলো। এটা আমেরিকার পরিচিত বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল। রাস্তার চারপাশে যারা হেঁটে যাচ্ছেন তাদের মুখের গড়নই বলে দিচ্ছে, এরা বাঙালি। পরনে হয় ব্রাজিল, না হয় আর্জেন্টিনার জার্সি।

প্রিমিয়াম সুইটসে লাঞ্চ করতে ঢুকেছি। ইয়া বড়ো রুই মাছের পেটি, শাক আর আলু ভর্তা অর্ডার দিলাম। বিশ-বাইশ বছরের একটা ওয়েটার খাবার সার্ভ করতে এলো। ছেলেটা হ্যান্ডসাম। চশমার কারণে বাচ্চা-বাচ্চা একটু ভাব আছে। খুব অমায়িক। পরনে তার প্রিয় দলের পোশাক। আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল-সাদা জার্সিটি যেন চোখ রাঙ্গাচ্ছে। বাবা ছেলেটাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে আমার দিকে ফিরে নিচু স্বরে বললেন, ‘লাগেজ খুলে ব্রাজিলের জার্সিটা নিয়ে আয়। জ্যামাইকা হিল সাইডে আর্জেন্টিনার ফ্যান বেশি। আমি ব্রাজিলের জার্সি পরে খাবো, আর্জেন্টিনার ফ্যান আমাকে সার্ভ করবে। কী বলিস?’

নিউ ইয়র্কবাসী ফুটবল বিশ্বকাপের শহর হয়েও চুপ করে থাকতে পারে। তবে বাঙালিরা চুপ করার পাত্র নয়। বিশ্বের যেই শহরেই থাকুক না কেন, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ইস্যুতে তারাই বিশ্বকাপ মাতিয়ে রাখবে!

 দোকান থেকে বেরিয়ে লাগেজ খুলে জার্সিটা আনতে আনতেই ফোন পেলাম, সাংবাদিক বন্ধুকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে আরও বলা হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড ছাড়া এরপর আমেরিকায় এলে তার প্রবেশ নিষেধ। এবারের মতো ভুল-চুক মাফ।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল ভক্ত হলেও আমরা দিনশেষে বাঙালি। ঝামেলা ছাড়া আমাদের আবার চলে নাকি?