বিশ্বকাপ মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি আর ভৌগোলিক সীমারেখা পেছনে পড়ে যায় ফুটবলের উন্মাদনার কাছে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা ফুটবলের চেয়ে বড় এক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিশ্বকাপের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে? ফিফার, নাকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে আছেন সোমালিয়ার রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতান। আফ্রিকার অন্যতম সেরা এই রেফারি বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তার দাবি, প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ঘটনাটি শুধু একজন রেফারির ব্যক্তিগত হতাশার গল্প নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। কারণ আরতান কোনো সাধারণ ভ্রমণকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন ফিফা কর্তৃক নির্বাচিত একজন বিশ্বকাপ রেফারি, যার দায়িত্ব ছিল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল আসরের ম্যাচ পরিচালনা করা।
গত কয়েক বছরে আরতানের ক্যারিয়ার ছিল ঈর্ষণীয়। ২০২৫ সালে তিনি প্রথম সোমালি হিসেবে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল পরিচালনা করেন। একই বছর অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপের একাধিক ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেন এবং আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ রেফারিদের একজন। মার্চে যখন তার নাম বিশ্বকাপের অফিসিয়াল রেফারিদের তালিকায় আসে, তখন সেটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ অর্জন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রাই শেষ হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ফিফার নিজস্ব একজন কর্মকর্তা যদি বিশ্বকাপে অংশ নিতে গিয়ে প্রবেশাধিকার না পান, তাহলে সাধারণ সমর্থকদের অবস্থা কী হতে পারে?
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ওপর নতুন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। সেই তালিকায় সোমালিয়াও রয়েছে। ফলে আরতানের ঘটনা অনেকের কাছে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর নীতিরই অংশ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সাধারণত আয়োজক দেশগুলো ফিফার জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করেছে। ২০১৮ সালে রাশিয়া সমর্থকদের জন্য ভিসা ছাড়াই প্রবেশের ব্যবস্থা করেছিল। ২০২২ সালে কাতার হাইয়া কার্ডের মাধ্যমে ভ্রমণ ও ম্যাচ প্রবেশকে সহজ করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। এখানে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভিবাসন নীতি ফুটবলের চেয়েও বড় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফলে শুধু রেফারিই নন, বিভিন্ন দেশের সমর্থক, সাংবাদিক এবং কর্মকর্তারাও ভিসা ও প্রবেশ জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে ইরান, কঙ্গো ও হাইতির মতো দেশগুলোকে ঘিরে আশঙ্কা আরও বেশি। ইতোমধ্যে ইরানের কিছু কর্মকর্তা ভিসা না পাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে ফিফার অবস্থান অনেকটা দর্শকের মতো। সংস্থাটি জানিয়েছে, কোনো দেশের ভিসা বা অভিবাসন নীতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। আইনগতভাবে কথাটি সঠিক হলেও বাস্তবে এটি ফিফার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব তাদের হলেও অংশগ্রহণকারীদের প্রবেশ নিশ্চিত করার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই।
আরতানের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত একজন রেফারি যদি সীমান্ত পার হতে না পারেন, তাহলে বোঝা যায় মাঠের বাইরের ক্ষমতার লড়াই কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপকে সবসময় বলা হয় ফুটবলের সর্বজনীন উৎসব। কিন্তু ২০২৬ আসরের শুরুতেই দেখা যাচ্ছে, সেই উৎসবের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে রাজনীতি, অভিবাসন নীতি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। ফুটবল মাঠে ফিফা হয়তো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু বিমানবন্দর, সীমান্ত এবং ভিসা কাউন্টারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে রাষ্ট্র।
ওমর আরতানের অপূর্ণ স্বপ্ন তাই কেবল একজন রেফারির ব্যক্তিগত বেদনার গল্প নয়। এটি এমন এক বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ফুটবল এবং রাজনীতির সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আর সেই কারণেই আজ প্রশ্ন উঠছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ আসলে কার হাতে? ফিফার, নাকি হোয়াইট হাউসের?
বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। বিশ্বকাপ আয়োজনের মঞ্চ ফিফা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই মঞ্চে কে প্রবেশ করবে আর কে করবে না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও রাষ্ট্রের হাতেই। আর সেই বাস্তবতায় ওমর আরতানের গল্প হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে থাকবে।



