মোসাদ্দেকের রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে অস্ট্রেলিয়াকে স্পোর্টিং উইকেটে উড়িয়ে দিলো বাংলাদেশ

বাংলাদেশ যখন ১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে, তখন ক্রিজে আসেন মোসাদ্দেক। একদিকে উইকেট পড়ছে, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ঠিক সেই সময় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। ধৈর্য, পরিণতিবোধ আর প্রয়োজনীয় আগ্রাসনের মিশেলে গড়া ইনিংসে দলকে পৌঁছে দেন ২৮৪ রানের লড়াকু সংগ্রহে।

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

'এভাবেও ফিরে আসা যায়'—চন্দ্রবিন্দুর জনপ্রিয় গানটি যেন ঠিক এমন এক প্রত্যাবর্তনের গল্পই বলে। মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের জাতীয় দলে ফেরার দিনটি শুরু করা যেতে পারে সেই গান দিয়েই। প্রায় চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরলেন তিনি। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন ২০২২ সালে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সুযোগ পেয়েই জানিয়ে দিলেন, এখনও তিনি ফুরিয়ে যাননি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাট হাতে ৮৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতেও নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট। ১০ ওভারে খরচ করেছেন মাত্র ৩৭ রান।

ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই মোসাদ্দেকের এই রাজসিক প্রত্যাবর্তনই হয়ে থাকবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প। বাংলাদেশ যখন ১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে, তখন ক্রিজে আসেন মোসাদ্দেক। একদিকে উইকেট পড়ছে, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ঠিক সেই সময় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। ধৈর্য, পরিণতিবোধ আর প্রয়োজনীয় আগ্রাসনের মিশেলে গড়া ইনিংসে দলকে পৌঁছে দেন ২৮৪ রানের লড়াকু সংগ্রহে। তার ৮৬ রানের ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ৩টি ছক্কা। ব্যাটিং দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে দীর্ঘদিন তিনি জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করলেও জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে বারবার আলোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের আলোচনায় ছিলেন, নির্বাচকদের আস্থার কথাও শোনা গেছে। অবশেষে সুযোগ পেয়ে সেটিকে স্মরণীয় করে রাখলেন তিনি।

তবে বাংলাদেশের এই জয়ের গল্পে নায়ক শুধু মোসাদ্দেক নন।

টস জিতে বাংলাদেশকে আগে ব্যাট করতে পাঠায় অস্ট্রেলিয়া। শুরুতেই নাথান এলিসের আঘাতে সাইফ হাসান ফিরে গেলেও দ্রুতই পাল্টা জবাব দেন তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত। তানজিদের ব্যাটে ছিল আত্মবিশ্বাসী ড্রাইভ, আর শান্ত ছিলেন আরও বেশি আক্রমণাত্মক। অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের ওপর শুরু থেকেই চাপ তৈরি করেন তারা। পাওয়ারপ্লে জুড়ে নিয়মিত বাউন্ডারি তুলে নেওয়ার পাশাপাশি দুজন মিলে গড়ে তোলেন গুরুত্বপূর্ণ জুটি। ৪৪ বলে ৫৪ রান করে তানজিদ আউট হওয়ার আগে বাংলাদেশের ইনিংসের ভিত গড়ে দেন। অন্যদিকে শান্ত খেলেন ৬৭ রানের দারুণ একটি ইনিংস। একটি জীবন পাওয়ার সুযোগও কাজে লাগিয়েছেন তিনি। তার ব্যাটিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাস, নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণের সঠিক ভারসাম্য।

তবে লিটন দাস দ্রুত ফিরলে কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। এরপর শান্তও আউট হন। তখনই ম্যাচের মোড় ঘোরানোর দায়িত্ব এসে পড়ে মোসাদ্দেকের কাঁধে। প্রথম বল থেকেই আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল তাকে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ভালো ফর্মের ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বজায় রাখেন। অ্যাডাম জাম্পাকে লং-অফের ওপর দিয়ে বাউন্ডারি মেরে শুরু করেন নিজের ইনিংস। মাঝে কয়েকবার জীবন পেয়েছেন। ২১, ৩৮ ও ৭৩ রানে তাকে সুযোগ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু সেই ভুলের পুরো মূল্য আদায় করে নিয়েছেন মোসাদ্দেক। জাম্পার বিপক্ষে রিভার্স হিট, লং-অফের ওপর দিয়ে ছক্কা কিংবা ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে নিখুঁত টাইমিং—সব মিলিয়ে তার ব্যাটিং ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।

তাওহিদ হৃদয় ৩১ রান করে আউট হওয়ার পর এবং অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ দ্রুত ফিরে গেলে আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। কিন্তু মোসাদ্দেক শেষ পর্যন্ত ইনিংস ধরে রাখেন। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের কার্যকর ক্যামিও ইনিংসও বাংলাদেশের স্কোরকে আরও এগিয়ে দেয়।

২৮৪ রান হয়তো বিশাল সংগ্রহ নয়, তবে উইকেটের চরিত্র বিবেচনায় এটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্কোর। আর সেই স্কোর গড়ার কেন্দ্রে ছিলেন একজন মানুষ—মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। চার বছর অপেক্ষার পর জাতীয় দলে ফিরে তিনি শুধু রান করেননি, নিজের সামর্থ্যেরও নতুন করে পরিচয় দিয়েছেন। অনেক সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন কঠিন হয়, আবার অনেকের ক্ষেত্রে সুযোগ এসেও হারিয়ে যায়।

কিন্তু মোসাদ্দেকের ক্ষেত্রে দিনটি ছিল ভিন্ন। কারণ, তিনি ফিরেছেন শুধু দলে নয়—ফিরেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও।

বল হাতে একদম প্রথম বলেই তাসকিন আহমেদ ম্যাথু শর্টকে বোল্ড করেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে। দুর্দান্ত আক্রমণ করেন নাহিদ রানা- তিনি জশ ইংলিশ ও অ্যালেক্স ক্যারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট সহ মোট চারটি উইকেট নিয়েছেন।  গতি দিয়ে তিনি তটস্থ রেখেছেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের- ইংলিশ আউট হওয়ার পর নাহিদের বুনো সেলিব্রেশনে কিছুক্ষণের জন্য তেতে ওঠে দুই দল। শান্ত ও মিরাজ বুঝিয়ে শুনিয়ে ফেরত পাঠান ইংলিশকে। এই ম্যাচে প্রতিটি মোড়েই বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল। হোক সেটা পাওয়ারপ্লে কিংবা মিডল ওভার।

ডাকওয়ার্থ লুইস মেথডে ৮৬ রানের জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। এটা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ফরম্যাটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচ জয়, এর আগে ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।