শতবর্ষী খেলা ফুটবল। যুগের পর যুগ এই খেলায় এসেছেন একের পর এক মহাবতার। পেলে, দিয়েগো মারাদোনা থেকে শুরু করে জর্জ বেস্ট, ডি স্টেফানো, ইয়োহান ক্রুইফ, বেকেনবাওয়ার, পুসকাস, জিনেদিন জিদান কিংবা রোনালদো নাজারিও, দ্য বিউটিফুল গেমের ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম স্বর্ণক্ষচিত করে রেখে গেছেন, লেখে গেছেন অসংখ্য বীরত্বগাথা গল্প।
ফুটবলের সর্বকালের সেরা কে? বিংশ শতাব্দীতে হয়তো এসে থেমেছিলো মারাদোনা আর পেলেতে। তবে শেষ দুই দশক ধরে যারা খেলা দেখছে, তারা নিজেদেরকে সবচেয়ে ভাগ্যবান হিসেবে দাবি করতেই পারেন। কেননা এই পুরোটা সময় জুড়ে একে অপরকে টক্কর দিয়ে ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে নিজেদের স্থান অটুট রেখেছেন লিওনেল মেসি আর ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। আর এই দেবতূল্য মহাবতারদের খুব কাছাকাছি থেকে ব্রাজিলীয়ান জোগা-বোনিতোর তালে নান্দনিক ফুটবল উপহার দিয়ে গোটা পৃথিবী মাতিয়েছেন নেইমার জুনিয়র।
গোটা একটা প্রজন্মকে ফুটবলের উন্মাদনায় মাতানো এই তিন মহাতারকাই আজ তাদের ক্যারিয়ারের ক্রান্তিকালে। সর্বশেষ ২০২২ বিশ্বকাপে যেখানে সবাই মোটামুটি কাগজে কলমে বলেই দিয়েছিলো এই বুঝি মেসি-রোনালদো-নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ, সেখানে ৪ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপে এই ত্রয়ীকে আরও একবার ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে দেখতে পারাটা পরম সৌভাগ্যই বটে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, মডার্ন ফুটবল কিংবা বিখ্যাত কোচ ইয়োর্গেন ক্লপের ভাষ্যে হেভি মেটাল ফুটবলের যুগে যেখানে কিলিয়ান এমবাপে, লামিন ইয়ামাল, আর্লিং হালান্ডরা নতুন যুগের মশাল টানছে, সেখানে ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্তিয়ানো, বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়েই নিজের ৩৯তম জন্মদিন পালন করতে যাওয়া মেসি, কিংবা ইনজুরি জর্জরিত ৩৪ বছর বয়সী নেইমার কি আদৌ তাদের সেরাটা দিতে পারবেন? নাকি দলের বোঝা হয়ে বরণ করবেন করুণ পরিণতি?
২০২২ সালে আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পর বিখ্যাত বৃটিশ ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রাউরি বলেছিলেন, “লিওনেল মেসি হ্যাজ কনকর্ড হিজ ফাইনাল পিক, লিওনেল মেসি হ্যাজ শেকেন হ্যান্ড উইথ প্যারাডাইস” যার ভাবানুবাদ “মেসি তাঁর শেষ যুদ্ধ জয় করলেন, এবং স্বর্গের সাথে হাত মেলালেন”, সেদিন বর্তমান প্রজন্মের সমর্থকরা আনুষ্ঠানিকভাবেই মেসিকে দিয়েছিলেন সর্বকালের সেরার তকমা। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা এবারের বিশ্বকাপে বেশ নির্ভারই।
তবে বরাবরের মতো মেসিকে ঘিরে দল সাজালেও, এবার নিশ্চই একমাত্র মেসি-নির্ভর হয়েই দলের ট্যাকটিক সাজাতে চাইবেন না কোচ লিওনেল স্কালোনি। তাছাড়া সম্প্রতি মেজর লিগ সকারে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ায় বিশ্বকাপের আগে কোনো ফ্রেন্ডলি ম্যাচে মেসিকে না দেখার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও মেসিকে কখনোই নির্দিষ্ট কোনো পজিশনে আবদ্ধ রাখার সু্যোগ নেই। রাইট উইং, ডিপ লাইং মিডফিল্ডার, প্লে-মেকার কিংবা ফলস নাইন, প্রতিপক্ষ যখনই মনে করবে আজ মেসিকে যব্দ করে ফেলেছি, ঠিক তখনই মেসি তার গেম-রোল পরিবর্তন করে ফেলে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করে। তাছাড়া অফ-দ্য বলে গেম-রিডিং ক্ষমতায় মেসি সবসময়ই অতুলনীয়।
তবে স্কালোনির উচিত হবে মেসির এই এট্রিবিউটগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য বাকি দলকেই সেভাবে সাজাতে। তবে আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড এবং মিডফিল্ড লাইন কখনোই দুশ্চিন্তার কারণ ছিলো না। সম্প্রতি আতলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হুলিয়ান আলভারেজ, ইন্তার মিলানের লাউতারো মার্টিনেজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নতুন মুখ হিসেবে রয়েছে হোসে লোপেজ। এছাড়া মিডফিল্ডেও অভিজ্ঞ এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাকঅ্যালিস্টার আর রদ্রিগো দি পলের সাথে রয়েছে আতলেটিকোর ৩ জন ফিজিকালি ডমিনেটিং মিডফিল্ডার সিমিওনে, আলমাদা আর নিকো গঞ্জালেজ, যারা আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড শুধু নিয়ন্ত্রণই নয়, তৈরি করতে পারে রণক্ষেত্র। তবে আর্জেন্টিনার এবারের সবচেয়ে বড় চমক হবে সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে ইতালিয়ান সেরি আ তে বেস্ট মিডফিল্ডার হওয়া নিকো পাজ। ৬ গোল এবং ৮ এসিস্ট করা পাজের ড্রিবলিং, ফিজিকাল প্রেজেন্স এবং পায়ের নিখুঁত কারুকাজ এবারের আল-বিসেলেস্তেদের জন্য হতে পারে ট্রাম্প কার্ড।
তবে এ বিষয়টাও মনে রাখা জরুরি যে, বিশ্বকাপের মাঝেই ৪০-এ পা রাখা মেসির প্রেসিং কমে যাওয়া কিংবা ট্রাঞ্জিশনে ধীরগতি স্কালোনির কিছুটা চিন্তার কারণ অবশ্যই হবে। শুরুর দিকে সহজ ম্যাচ থাকলেও নক-আউট স্টেজে যখন হেভি-প্রেসিং টিমগুলোর বিপক্ষে খেলা থাকলে মেসি একা কতোটুকু কন্ট্রিবিউট করতে পারবে, নাকি তাকে সহযোগিতার জন্য বাকিদের সাপোর্টের প্রয়োজন হবে, সেই হিসাবগুলো বিবেচনায় নিয়েই হয়তো দল সাজাবেন স্কালোনি। তাছাড়া খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে মেসি ১২০ মিনিট নিজের ফিটনেস ধরে রেখে খেলতে পারবেন কিনা, না পারলে তার বিকল্প কে হতে
তবে গত বিশ্বকাপে গোলরক্ষক এমি মার্টিনেজ যেরকম বলেছিলেন, “আমরা মেসির জন্য জীবন দিয়ে দিবো”, দলে মেসির উপস্থিতি এবং নেতৃত্ব খুব স্পষ্টতই মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখবে দলকে।
তবে মেসির চেয়ে এবার স্বাভাবিকভাবেই বেশি নজরে থাকবে তার চিরপ্রতিপক্ষ ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে এমন কোনো রেকর্ড নেই যা এই পর্তুগিজ তালিসমান নিজের করে নেন নি। তবে সর্বকালের শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়ে যে শূণ্যতা রোনালদোকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে, তা হচ্ছে বিশ্বকাপ। ইতিহাস বলে, ইউসেবিও, লুইস ফিগো কিংবা রোনালদো, পর্তুগাল যখনই একজন তারকা নির্ভর দল হয়ে খেলেছে, কিছুম্যাচে অসাধারণ একক নৈপূণ্য দেখা গেলেও, শিরোপার দেখা মেলেনি। পর্তুগালের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো এসেছে তখনই, যখন দলটি কোনো একক তারকার ব্যক্তিগত ঝলকের ওপর নির্ভর না করে সমষ্টিগত কাঠামোর মধ্যে নিজেদের শক্তিকে কাজে লাগাতে পেরেছে। ২০১৬ ইউরো এবং ২০১৯ আর ২০২৫ ইউয়েফা নেশন্স লিগ জয় তারই দৃষ্টান্ত।
৪১ বছরে পা রাখা এই পর্তুগিজ মহাতারকা এখনও গোলের ক্ষুধা হারাননি, হারাননি নিজের প্রতি অবিচল বিশ্বাসও। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের নির্মম বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র গোল করার সামর্থ্যই একজন খেলোয়াড়কে অপরিহার্য করে তোলে না। হেভি প্রেসিং, ট্রানজিশনে দ্রুত ফিরে আসা এবং প্রতিপক্ষের বিল্ড-আপ নষ্ট করার মতো বিষয়গুলো এখন ফরোয়ার্ডদের দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সেখানেই প্রশ্ন উঠছে, রোনালদোর উপস্থিতি কি পর্তুগালের জন্য এখনও আশীর্বাদ, নাকি তার চারপাশে পুরো দলকে নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করছে?
অবশ্য রোনালদোকে শুধুমাত্র তার ফিজিকালিটির মাপকাঠিতে বিচার করাও ভুল হবে। কারণ গত দুই দশক ধরে ৯৭৩ গোল করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া এই খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন আর গতি নয়, বরং অভিজ্ঞতা, পজিশনিং এবং মুহূর্তকে নিজের করে নেওয়ার বিরল ক্ষমতা। যে কোনো ম্যাচে দীর্ঘক্ষণ অনুজ্জ্বল থেকেও প্রতিপক্ষের একটিমাত্র ভুলকে গোলে পরিণত করার দক্ষতা এখনও তাকে আলাদা করে রাখে। তাই রবার্তো মার্তিনেজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রোনালদোকে দলের কেন্দ্রবিন্দু বানানো নয়, বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যেখানে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিটিনিয়া, রাফায়েল লেয়াও কিংবা গনসালো রামোসদের গতিশীলতার সঙ্গে রোনালদোর অভিজ্ঞতা মিলেমিশে পর্তুগালকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
মজার ব্যাপার হলো, ২০২২ বিশ্বকাপে ফিরে তাকালে আলোচিত দুই গোট (গ্রেটেস্ট অব অল টাইম / GOAT) এর দলের খেলায় দেখা যায়, পুরো আর্জেন্টিনা দল খেলার মাঠে নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিলো লিওনেল মেসির জন্য, রোনালদোর ক্ষেত্রে অনেকটা নাটকীয়ভাবে ঘটেছিলো এর বিপরীত, পর্তুগাল ক্রমশ রোনালদো-কেন্দ্রিকতা থেকে সরে এসে আরও গতিশীল ও সমষ্টিনির্ভর ফুটবলের দিকে ঝুঁকেছিল। তবে এবারের পর্তুগাল দলের মানসিকতা ভিন্ন। দলে তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় তো রয়েছেই, তাদের সবার কাছেই বিজয়ের রোল মডেল যেনো তাদের তালিসমান ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। তাছাড়া ব্রুনো ফার্নান্দেস তো বলেই দিয়েছেন, “আমরা ক্রিস্তিয়ানোর হাতে বিশ্বকাপ দেখতে চাই” আর রুবেন ডিয়াস বলেছেন, “আমরা সবাই রোনালদোর জন্য খেলবো”।
এদিকে পর্তুগিজদের বর্তমান কোচ রবার্তো মার্তিনেজতো রোনালদোকে ২০৩০ বিশ্বকাপেও নিজের দলে রাখতে চান বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন।
তবে মেসি কিংবা রোনালদোর তুলনায় এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশার নাম সম্ভবত নেইমার জুনিয়র। এক সময় যাকে ব্রাজিলের পরবর্তী পেলে হিসেবে যাকে দেখা হতো, সেই নেইমারের জাতীয় দল ক্যারিয়ারের শেষ কয়েক বছর কেটেছে ইনজুরি, পুনর্বাসন এবং প্রত্যাবর্তনের অনিশ্চয়তার মধ্যে। ২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ভয়াবহ হাঁটুর চোটে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকার পর তাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছিল, আদৌ কি আর কখনও জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের পুরোনো ছন্দে ফিরতে পারবেন? এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও ব্রাজিল দলে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দেখা গেছে। একদিকে সমর্থকদের একটি অংশ এখনও বিশ্বাস করে, সুস্থ নেইমারই ব্রাজিলের সবচেয়ে সৃজনশীল ফুটবলার। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কি এমন একজন খেলোয়াড়ের ওপর ভরসা করা যায়, যার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এখন আর প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার নয়, বরং নিজের শরীর?
তবে নেইমারের মূল্যায়ন শুধুমাত্র তার গোল কিংবা অ্যাসিস্ট দিয়ে করলে ভুল হবে। কারণ ব্রাজিলের বর্তমান স্কোয়াডে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, সাভিনহো, এস্তেভাও কিংবা এন্দ্রিকের মতো প্রতিভাবান আক্রমণভাগ থাকলেও, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা, চাপের মুহূর্তে বলের দায়িত্ব নেওয়া কিংবা শেষ তৃতীয়াংশে অপ্রত্যাশিত কিছু সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে নেইমারের মতো খেলোয়াড় এখনও বিরল। পরিসংখ্যানের বাইরে তার উপস্থিতি সতীর্থদের মধ্যেও এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমে নেতৃত্বের অন্যতম মুখ হিসেবে থাকা নেইমার মাঠে থাকলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের মনোযোগের বড় একটি অংশও তার দিকে সরে যায়, যা বাকিদের জন্য অতিরিক্ত জায়গা তৈরি করতে পারে। তাই ফিট থাকলে নেইমার এখনও ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রগুলোর একটি, যদিও আগের মতো পুরো দলকে তার কাঁধে তুলে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আর নেই।
সেই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপে নেইমারের সফলতা নির্ভর করবে তিনি কতটা নান্দনিক ফুটবল খেললেন তার ওপর নয়, বরং কতটা ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকতে পারলেন তার ওপর। হয়তো আর তাকে ২০১৪ কিংবা ২০১৮ সালের সেই বিস্ফোরক ড্রিবলার হিসেবে দেখা যাবে না, কিন্তু অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও তার মধ্যে বিদ্যমান। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে পুনর্গঠনের পথে থাকা ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে আদর্শ চিত্র হবে এমন একটি দল, যেখানে ভিনিসিয়ুস কিংবা রদ্রিগোরা আক্রমণের প্রধান চালিকাশক্তি হবে, আর নেইমার হবেন সেই অভিজ্ঞ পরিচালক, যিনি প্রয়োজনের মুহূর্তে খেলার ছন্দ বদলে দিতে পারেন। তাই মেসি কিংবা রোনালদোর মতোই, নেইমারকেও এবারের বিশ্বকাপে বোঝা কিংবা ত্রাণকর্তা এই দুই চরম সীমার মধ্যে বিচার করা কঠিন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, সম্পূর্ণ ফিট নেইমার এখনও এমন একজন ফুটবলার, যিনি এক মুহূর্তের জাদুতেই গোটা টুর্নামেন্টের গল্প বদলে দিতে পারেন।
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্য সম্ভবত এটাই। একসময় যে পা দুটো পুরো পৃথিবীকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল, একসময় যে দৌড় কিংবা ড্রিবল দেখে লাখো মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। কিন্তু মহাবতারদের সংজ্ঞা কখনোই শুধু তাদের গতি, গোল কিংবা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করার মধ্যেই তাদের প্রকৃত মহত্ত্ব লুকিয়ে থাকে।
২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এবং নেইমার জুনিয়রকে হয়তো আর নিজেদের সেরা সংস্করণে দেখা যাবে না। হয়তো তারা আর প্রতি ম্যাচে একাই প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে দেবেন না, হয়তো পুরো ৯০ মিনিট মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর সামর্থ্যও আর আগের মতো থাকবে না। কিন্তু ফুটবল কখনোই শুধু পায়ের খেলা ছিল না; এটি ছিল মস্তিষ্ক, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং মুহূর্তকে নিজের করে নেওয়ার শিল্প। আর সেই শিল্পের সবচেয়ে বড় শিল্পীদের মধ্যেই ছিলেন এই তিনজন।
তাই এবারের বিশ্বকাপে প্রশ্নটা হয়তো তারা বোঝা হবেন কি না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল এক প্রজন্মের শেষ প্রতিনিধিরা নিজেদের শেষ বিশ্বমঞ্চে আরেকবার ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে পারেন কি না। কারণ চার বছর পর হয়তো বিশ্বকাপ থাকবে, নতুন তারকারাও থাকবে, নতুন গল্পও লেখা হবে। কিন্তু মেসি, রোনালদো এবং নেইমারকে ঘিরে যে যুগটি কোটি মানুষের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে, সেই যুগের পর্দা নামার মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ আর কখনোই ফিরে আসবে না।



