যে কুকুর খুঁজে দিয়েছিলো চুরি যাওয়া বিশ্বকাপ ট্রফি

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল ইংল্যান্ডের জন্য ছিলো একটি ঐতিহাসিক আয়োজন। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্রবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল।

কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা পুরো দেশকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতীক, জুলে রিমে ট্রফি, হঠাৎ করেই চুরি হয়ে যায়।

আর সেই হারিয়ে যাওয়া ট্রফি খুঁজে পেতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল একটি কুকুর। তার নাম ছিলো পিকলস।

কীভাবে চুরি হয়েছিল ট্রফি?

১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের সেন্ট্রাল হলে একটি ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে জনসাধারণের দেখার জন্য রাখা হয়েছিল জুলে রিমে ট্রফি।

২০ মার্চ, রবিবার। প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনেই ট্রফিটি তার কাঁচের বাক্স থেকে উধাও হয়ে যায়।

ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, তা আজও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, নিরাপত্তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চোরেরা জরুরি নির্গমন পথ দিয়ে ঢুকে ট্রফি নিয়ে বেরিয়ে যায়।

জুলে রিমে ট্রফি তখন প্রায় তিন হাজার পাউন্ড মূল্যের ছিল। কিন্তু এর প্রতীকী মূল্য ছিলো অনেক বেশি। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগে এমন একটি চুরি ইংল্যান্ডের ফুটবল কর্তৃপক্ষকে বড় ধরনের সংকটে ফেলে দেয়।

পরে এ বিষয়ে গবেষণা করা লেখক মার্টিন অ্যাথারটন বলেন, পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ছিল খুবই দুর্বল। প্রদর্শনীতে সব সময় ট্রফির কাছে নিরাপত্তাকর্মী থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা ছিলো না।

মুক্তিপণের দাবি

চুরির তদন্তের দায়িত্ব নেয় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড।

কিন্তু শুরুতে পুলিশের হাতে তেমন কোনো কার্যকর সূত্র ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বর্ণনাও একে অপরের সঙ্গে মিলছিল না।

এর মধ্যেই ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জো মিয়ার্সের কাছে একটি চিঠি আসে। চিঠিতে নিজেকে "জ্যাকসন" পরিচয় দেওয়া একজন ব্যক্তি ট্রফি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ১৫ হাজার পাউন্ড দাবি করেন।

পুলিশের পরামর্শে জো মিয়ার্স প্রস্তাবে রাজি হওয়ার ভান করেন।

পরে ব্যাটারসি পার্কে একটি গোপন বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে একটি স্যুটকেস ভর্তি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আসল টাকার বদলে স্যুটকেসে রাখা হয়েছিল সংবাদপত্র, যার ওপরে কয়েকটি পাঁচ পাউন্ডের নোট সাজানো ছিল।

এই অভিযানে এডওয়ার্ড বেচলি নামে এক সাবেক সেনাসদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে একটি বড় সমস্যা থেকেই যায়।

সন্দেহভাজন ব্যক্তি ধরা পড়লেও বিশ্বকাপ ট্রফির কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

মঞ্চে আসে পিকলস

চুরির এক সপ্তাহ পর, ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় দক্ষিণ লন্ডনের নরউড এলাকায় নিজের কুকুর পিকলসকে নিয়ে হাঁটতে বের হন ডেভ করবেট।

পিকলস ছিল একটি মিশ্র জাতের কুকুর, যার মধ্যে বর্ডার কোলির বৈশিষ্ট্য ছিলো।

হাঁটার সময় পিকলস পাশের একটি পার্ক করা গাড়ির কাছে গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে।

ডেভ করবেট পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি দেখলেন গাড়ির পাশে সংবাদপত্রে মোড়ানো এবং শক্ত করে সুতা দিয়ে বাঁধা একটি প্যাকেট পড়ে আছে।

কৌতূহলবশত তিনি প্যাকেটটির নিচের অংশ সামান্য ছিঁড়ে দেখেন।

সেখানে কিছু লেখা দেখতে পান।

আরও একটু খুলতেই চোখে পড়ে কয়েকটি দেশের নাম—ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি ও উরুগুয়ে।

এগুলো ছিল বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলোর নাম, যা ট্রফির গায়ে খোদাই করা ছিল।

ডেভ তখনই বুঝতে পারেন, তিনি হয়তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে পেয়েছেন।

প্যাকেটটি পুরোপুরি খোলার পর তিনি দেখতে পান, সেটিই সেই হারিয়ে যাওয়া জুলে রিমে ট্রফি।

পুলিশও প্রথমে বিশ্বাস করেনি

ট্রফিটি নিয়ে ডেভ স্থানীয় থানায় যান।

কিন্তু সেখানে প্রথমে কেউ তার কথা বিশ্বাস করতে চায়নি।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাকি মজা করে বলেছিলেন, "এটাকে তো খুব একটা বিশ্বকাপ ট্রফির মতো দেখাচ্ছে না।"

পরে একজন গোয়েন্দাকে ডাকা হয় এবং ডেভ করবেটকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়।

একপর্যায়ে তার মনে হয়েছিল, পুলিশ হয়তো তাকেই প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখছে।

তবে তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি নির্দোষ। এরপরই সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পিকলসের গল্প।

রাতারাতি তারকা

বিশ্বকাপ ট্রফি খুঁজে পাওয়ার পর পিকলস আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়ে যায়।

তাকে একটি বিশেষ পদক দেওয়া হয়। সে "ডগ অব দ্য ইয়ার" পুরস্কার জেতে।

পিকলস

বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নেয় এবং পরে "দ্য স্পাই উইথ আ কোল্ড নোজ" নামের একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করে।

ডেভ করবেটও বিভিন্ন পুরস্কার ও আর্থিক সম্মাননা পান। এসব অর্থ দিয়ে পরে তিনি সারের একটি বাড়ি কেনেন।

ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়

একই বছরের জুলাই মাসে বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ড ওয়েম্বলিতে পশ্চিম জার্মানিকে অতিরিক্ত সময়ে ৪-২ গোলে হারায়।

ট্রফিটি আবার হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফুটবল কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্কতা নিয়েছিল। এমনকি উদযাপনের সময় এক পর্যায়ে আসল ট্রফির বদলে একটি প্রতিরূপ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

ফাইনালের পর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডেভ করবেট ও পিকলসকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সেখানে ইংল্যান্ড অধিনায়ক ববি মুর একসময় পিকলসকে কোলে তুলে উপস্থিত জনতার সামনে দেখান। তখন দর্শকদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ।

দুঃখজনক সমাপ্তি

বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়ার পরও পিকলস খুব বেশি দিন বাঁচেনি।

১৯৬৭ সালে তার মৃত্যু হয়।

পিকলসকে করবেটের বাগানে সমাহিত করা হয়

ডেভ করবেটের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বিড়ালকে ধাওয়া করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় তার ঘাড় ভেঙে যায়।

পিকলসকে পরে সারের লিংফিল্ডে করবেটের বাড়ির বাগানে সমাহিত করা হয়।

তার সমাধিফলকে লেখা রয়েছে:

"পিকলস — ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের সন্ধানদাতা।"

ট্রফিটির পরিণতি

জুলে রিমে ট্রফিটি ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের পর স্থায়ীভাবে ব্রাজিলকে দেওয়া হয়।

কিন্তু ১৯৮৩ সালে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের ভবন থেকে ট্রফিটি আবার চুরি হয়ে যায়।

সেবার আর কখনো সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে ফেলেছিল।

তবে যে প্রতিরূপটি ১৯৬৬ সালে তৈরি করা হয়েছিল, সেটি পরে নিলামে বিক্রি হয় এবং বর্তমানে ম্যানচেস্টারের জাতীয় ফুটবল জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

আর ফুটবল ইতিহাসে পিকলসের নাম রয়ে গেছে এক অনন্য নায়ক হিসেবে—যে কুকুরের ঘ্রাণশক্তি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিখ্যাত রহস্যগুলোর একটির সমাধান করে দিয়েছিল।