জিদানের ঢুঁস এবং ফুটবল বিশ্বকাপের আলোচিত পাঁচ লাল কার্ড

বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে ফরাসি তারকা ফুটবলার জিনেদিন জিদানের সেই ঢুঁসের কথা মনে আছে? কুড়ি বছর আগের যে ঢুঁস জিদানকে লাল কার্ড এনে দিয়েছিল, তা আজো ফুটবল ইতিহাসের আলোচিত সব ফাউলের টপচার্টে থাকে। এরকম আর কী কী ফাউল আছে, যা ফুটবল ভক্তরা কখনো ভোলেন না?

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

২০০৬ বিশ্বকাপের আগে যদি কেউ আপনাকে বলতো- এই বিশ্বকাপের ফাইনালে জিনেদিন জিদান কাউকে ঢুঁস মেরে লাল কার্ড দেখতে পারেন, নিশ্চিতভাবেই আপনি তা বিশ্বাস করতেন না। অথচ বাস্তবে সেটিই ঘটেছিল। পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে জিদান যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তাঁর পাশেই রাখা ছিল চকচকে বিশ্বকাপ ট্রফিটি। ফরাসি জাদুকরের ক্যারিয়ারের অন্যতম 'ট্রেডমার্ক' ছবি হয়ে আছে সেটি। এক লাল কার্ডে যেন সব শেষ!

শুধু কি জিনেদিন জিদান! ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন অনেক রথী-মহারথী লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন। তালিকাটা বেশ লম্বা। তবে সেখান থেকে সবচেয়ে আলোচিত

পাঁচটি লাল কার্ড বেছে নেওয়া বেশ কঠিন কাজ। বিভিন্ন জরিপ ও ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যে পাঁচটি লাল কার্ড সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়, পাঠকদের জন্য তা নিয়েই আজকের এই আয়োজন।

৫. ওয়েইন রুনি

ইংল্যান্ড বনাম পর্তুগাল (২০০৬ বিশ্বকাপ, কোয়ার্টার ফাইনাল)

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দুই তৎকালীন সতীর্থ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও ওয়েইন রুনির মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছিল এই একটি লাল কার্ড। ২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল। ম্যাচের এক পর্যায়ে পর্তুগিজ ডিফেন্ডার রিকার্ডো কারভালহো মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় তার পা দিয়ে মাড়িয়ে দেন রুনি।

সঙ্গত কারণেই পর্তুগালের ফুটবলাররা ফাউলের আবেদন জানান, তবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ছিলেন সবচেয়ে সরব। ধারণা করা হয়, রোনালদোর তীব্র প্রতিবাদের মুখেই রেফারি রুনিকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।

রুনি মাঠ ছাড়ার পর রোনালদোকে তার দলের ডাগআউটের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপতে দেখা যায়, যা রুনি-রোনালদো সম্পর্ক শীতল করে দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। রুনি সেবারই নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলছিলেন। ম্যাচ ফিটনেসের অভাবে নিজের নামের প্রতি সুবিচার তো করতে পারছিলেনই না, তার ওপর এই লাল কার্ড ছিল মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়।

৪. ডিয়েগো ম্যারাডোনা

আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল (১৯৮২ বিশ্বকাপ, দ্বিতীয় রাউন্ড)

১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথমবারের মতো শিরোপার স্বাদ পেয়েছিল। ১৯৮২ বিশ্বকাপ ছিল তাদের সেই মুকুট ধরে রাখার মিশন। আর আলবিসেলেস্তেদের সেই স্বপ্নের পালে হাওয়া দিচ্ছিলেন তরুণ ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তবে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে কোনো গৌরবের স্মৃতি উপহার দিতে পারেননি এই ফুটবল ঈশ্বর। ইটালি ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে হেরে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।

ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ম্যারাডোনা। সেলেসাওরা তখন ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে। মাঠের পারফরম্যান্সে এমনিতেই ব্যাকফুটে থাকা আর্জেন্টিনার জন্য পরিস্থিতি আরও শোচনীয় করে তোলেন ম্যারাডোনা। ব্রাজিলের জোয়াও বাতিস্তার কুঁচকিতে লাথি মেরে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন তিনি, যা ছিল তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের অন্যতম এক অন্ধকার অধ্যায়।

৩. লুইস সুয়ারেজ

উরুগুয়ে বনাম ঘানা (২০১০ বিশ্বকাপ, কোয়ার্টার ফাইনাল)

বিশ্বকাপের ইতিহাসে লুইস সুয়ারেজ এবং বিতর্কের যেন এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ২০১৪ বিশ্বকাপে জর্জো কিয়েল্লিনিকে কামড়ে দেওয়ার ঘটনা তো আছেই, তবে ২০১০ বিশ্বকাপে ঘানার বিরুদ্ধে তিনি যা করেছিলেন, তার জন্য ফুটবল বিশ্ব তাঁকে কোনোদিন ভুলবে না।

অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ সেকেন্ডে ম্যাচ যখন ১-১ সমতায়, তখন লুইস সুয়ারেজ যেন উরুগুয়ের গোলরক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জালের দিকে ছুটে যাওয়া নিশ্চিত গোলের বলটি গোললাইন থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে হাত দিয়ে ঘুষি মেরে আটকে দেন তিনি। ঘটনাটি ছিল একেবারেই প্রকাশ্য এবং খেলার স্পিরিটের পরিপন্থী। রেফারি সুয়ারেজকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান এবং ঘানাকে একটি পেনাল্টি উপহার দেন, যা তাদের সেমিফাইনালে পৌঁছে দিতে পারত।

আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে ঘানা তখন নিজেদের মহাদেশের মাটিতে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার ঠিক ইঞ্চিখানেক দূরত্বে দাঁড়িয়ে। কিন্তু ফুটবল বিধাতা হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন।

ঘানার আসামোয়া গিয়ানের পেনাল্টি শটটি ক্রসবারে লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বলটি বারে লেগে ফিরে আসার সাথে সাথেই টানেলে দাঁড়িয়ে থাকা সুয়ারেজ এমনভাবে উল্লাসে মেতে ওঠেন, যেন তিনিই জয়সূচক গোলটি করেছেন! ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে এবং উরুগুয়ে জয়লাভ করে সেমিফাইনালে পৌঁছায়। সুয়ারেজ রাতারাতি আফ্রিকার চোখে খলনায়ক আর উরুগুয়ের কাছে মহানায়ক বনে যান। তবে এটি যে বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম 'পাগলাটে' লাল কার্ডের ঘটনা, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

২. ডেভিড বেকহাম

ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা (১৯৯৮ বিশ্বকাপ, রাউন্ড অব সিক্সটিন)

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ইংলিশ ফুটবলের 'গোল্ডেন বয়' থেকে পুরো জাতির এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন ডেভিড বেকহাম। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচে শুরুতে গোল হজম করেও প্রথমার্ধে ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। তবে বিরতিতে যাওয়ার ঠিক আগে আর্জেন্টিনা গোল শোধ করলে খেলাটি ২-২ সমতায় ফেরে।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায়, বর্তমান অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের প্রধান কোচ ডিয়েগো সিমিওনে বেকহামকে পেছন থেকে একটি ফাউল করেন। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় মেজাজ হারিয়ে বেকহাম অপ্রয়োজনীয়ভাবে সিমিওনেকে একটি লাথি মেরে বসেন, যা রেফারির চোখ এড়ায়নি। রেফারি বেকহামকে লাল কার্ড দেখালে ইংল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হয়।

১০ জন নিয়ে ইংল্যান্ড দারুণভাবে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। থ্রি-লায়ন্সদের এই বিদায়ের সম্পূর্ণ দায় গিয়ে পড়ে বেকহামের ওপর। এই লাল কার্ডের প্রভাব বেকহামের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবনে এতটাই ছিল যে, দীর্ঘদিন পুরো ব্রিটিশ জাতি তার দিকে ঘৃণার চোখে তাকিয়েছে। এটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী লাল কার্ডের ঘটনা।

১. জিনেদিন জিদান

ফ্রান্স বনাম ইটালি (২০০৬ বিশ্বকাপ, ফাইনাল)

২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের জিনেদিন জিদানের লাল কার্ডটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় এবং বিখ্যাত ঘটনা। অতিরিক্ত সময়ে যখন ম্যাচের স্কোর ১-১ সমতায়, তখন জিদান হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে সজোরে মাথা দিয়ে ঢুঁস মেরে বসেন।

তখন ঠিক কী ঘটেছিল, সেই মুহূর্তে কেউ বুঝতে পারেনি। স্টেডিয়ামে থাকা হাজারো দর্শক আর টিভির সামনে থাকা কোটি কোটি মানুষ শুধু দেখেছিল ফ্রান্সের অধিনায়ককে রেফারি লাল কার্ড দেখাচ্ছেন। পরবর্তীতে রিপ্লেতে যখন পুরো ঘটনা পরিষ্কার হয়, তখন গোটা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে যায়।

পেশাদার ফুটবল থেকে ইতিমধ্যেই অবসরের ঘোষণা দিয়ে দেওয়া জিদান চেয়েছিলেন ফুটবলের সর্বোচ্চ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন। কিন্তু তার বদলে, তিনি ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে টানেলের অন্ধকারে মিলিয়ে যান; যা ছিল সবুজ গালিচায় ফুটবলার জিদানের শেষ পদক্ষেপ। অধিনায়ক ড্রেসিংরুমে থাকা অবস্থায় ফ্রান্স পরবর্তীতে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যায়। ক্ষণিকের সেই তীব্র ক্ষোভ জিদানের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি ট্র্যাজিক বানিয়ে দেয়। পরবর্তীতে কোচ হিসেবে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতলেও, জিদানের নাম মুখে এলেই আজও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে সেই অবিশ্বাস্য 'হেডবাট'-এর ছবি।

মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এই লাল কার্ডগুলোর মতো নাটকীয় ও বিতর্কিত মুহূর্তগুলোই ফুটবল বিশ্বকাপকে করে তুলেছে এতটা রোমাঞ্চকর। বছরের পর বছর কেটে গেলেও এই ঘটনাগুলো ফুটবলপ্রেমীদের আড্ডায় চিরকাল বেঁচে থাকবে অমলিন হয়ে।