আরব্য রজনীর স্টিরিওটাইপ ভেঙে মন জয় করা সেই উদ্বোধনী
ফ্রিম্যানকে স্বাগত জানাতে ঘানিম পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হুজরাতের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেন - ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে জানতে পারো।’ সেই রাতের বার্তা থেকে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। ফুটবল তখনও শুরু হয়নি, অথচ কাতার এর আগেই নিজের গল্প বলে ফেলেছিল। ২০১০ সালে স্বাগতিকের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় এক যুগ ধরে তৈরি করা একটা স্বপ্নের বাস্তবায়নও হয়েছিল।
শিহাব আহসান খান
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ১২:৪৯ পিএমআপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
বিশ্বকাপ ২০২২, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাতারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'গুতরা'র আদলে তৈরি মাসকট 'লা'ইব' আকাশচুম্বী ভূতের মতো বাতাসে ভেসে বেড়ায় আকাশে।
বিতর্কের কমতি ছিল না আয়োজক দেশ ঘোষণার পর থেকেই। এমনকি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও গাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন শিল্পীদের কেউ কেউ। কাতার বিশ্বকাপের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে তাই বাড়ছিল অস্বস্তিও। কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক মুহূর্তে যেন সবকিছু উড়ে যায় আরবের সুর আর সংলাপে।
সময়ের হিসাবে আধঘণ্টার ছোট্ট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দাগ কেটে যায় অনেকের হৃদয়েও। আরব বিশ্বের প্রথম বিশ্বকাপের যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যান্ড বিটিএসের গায়কের গাওয়া থিম সং ‘ড্রিমারস’ ছিল, তেমনি মরগ্যান ফ্রিম্যান ও ঘানিম আল মুফতাহর সংলাপও হৃদয় ছুয়ে গেছে সবার।
কাতারের সংস্কৃতি, আতিথেয়তা ও আরব পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই করে গেছেন আয়োজকরা। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য একেকটি স্টেডিয়ামই কাতার গড়ে তুলেছিল নিজেদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে ধারণ করে। কোথাও তা ছিল মুক্তা শিকার করা নৌকার আদলে, কোথাও আবার টুপির— ছিল শুধু বিশ্বকাপের জন্য কন্টেইনার দিয়ে তৈরি স্টেডিয়ামও।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হয়েছিল আল বাইত স্টেডিয়ামে— মরুভূমির বেদুইন তাঁবুর আদলে গড়ে তোলা হয়েছিল এটি। অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ পরই সব মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন কেবল দুজন মাত্র ব্যক্তি। পুরো স্টেডিয়ামে কালো আঁধারে ঢেকে দিয়ে তারাই চলে আসেন আলোর কেন্দ্রে। দুজনের একজন আবার ছিলেন কাউডাল রিগ্রেশন সিন্ড্রোম নিয়ে পৃথিবীতে আসা।
কাতারের মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে খ্যাতি পাওয়া ঘানিম আল মুফতাহর সঙ্গে মার্কিন অভিনেতা ফ্রিম্যানের ওই কয়েক মিনিটের সংলাপে পৃথিবীর প্রতিই পৌঁছে দেওয়া হয় একটা শক্তিশালী বার্তা। ভাবনাটা ছিল এমন, ফ্রিম্যান হুট করেই এসে পড়েছেন আরবে। আর আরবের প্রতিনিধি হয়ে ঘানিম আল মুফতাহ তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
ফ্রিম্যানকে স্বাগত জানাতে ঘানিম পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হুজরাতের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেন - ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে জানতে পারো।’ এই বার্তাটিই পুরো অনুষ্ঠানে দিতে চেয়েছিলেন কাতার বিশ্বকাপের আয়োজকরা।
তার আয়াত পাঠের পরই ফ্রিম্যান সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন, ‘এখন আমি দেখছি, যা আমাদের এক করে, তা আমাদের বিভক্ত করে এমন বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বড়।’ দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে একবিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়ার বার্তাই দিয়ে গেছেন ফ্রিম্যান ও ঘানিম।
যাঁর শেষটা হয় কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম বড় উদ্দেশ্যের বার্তা দিয়ে, ‘এখানে সবাই স্বাগত।’ সংলাপ শেষে ফ্রিম্যান নিচু হয়ে বসে ঘানিমের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। ঘানিমও তার হাত বাড়িয়ে ফ্রিম্যানের আঙুল স্পর্শ করেন। শারীরিক দূরত্বের কারণে তারা প্রথাগত হ্যান্ডশেক করতে না পারলেও আঙুলের সেই স্পর্শটি ছিল ‘হিউম্যান কানেকশন’ বা মানবিক বন্ধনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।
কিন্তু শুধু তো আর আরবের সংস্কৃতি আর ভ্রমণের আহ্বানই নয়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা আসলে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বৈচিত্র্যের কারণেও।
ওরকম গুরুগম্ভীর শুরুর পরই মঞ্চে উঠেন কে-পপ তারকা জানকুক। কাতারেরই শিল্পী ফাহাদ আল-কুবায়েসিকে নিয়ে তিনি গান বিশ্বকাপের থিম সং ‘ড্রিমার্স’। তারা মঞ্চ ছাড়ার পর বাজতে থাকে আগের বিশ্বকাপগুলোর থিম সং আর ভেসে ওঠে মাসকটগুলো।
একটু পরই আকাশ থেকে নেমে আসে লা'ইব। কাতারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'গুতরা'-এর আদলে তৈরি মাসকট 'লা'ইব' আকাশচুম্বী ভূতের মতো বাতাসে ভেসে বেড়ায় আকাশে। সবকিছুই থমকে যায় ঘড়ির কাঁটায় ঘণ্টা পেরোনোর আগেই।
নিভে যায় আল বাইত স্টেডিয়ামের আলো, খালি হয়ে যায় মঞ্চও। কিন্তু সেই রাতের বার্তা থেকে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। ফুটবল তখনও শুরু হয়নি, অথচ কাতার এর আগেই নিজের গল্প বলে ফেলেছিল। ২০১০ সালে স্বাগতিকের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় এক যুগ ধরে তৈরি করা একটা স্বপ্নের বাস্তবায়নও হয়েছিল।
ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ইতি টানা হয় সেটির। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপাজয়ের আনন্দে বুঁদ হয় পুরো পৃথিবী। কিন্তু ইতালির বিখ্যাত ইভেন্ট ডিরেক্টর মার্কো বালিচের আঁকা ক্যানভাসে শুরুর ওই আধঘণ্টার অনুষ্ঠানের রেশটাও নিশ্চিতভাবেই থেকে যাবে যুগের পর যুগ। ঐক্য আর সম্প্রীতির আহ্বান ছিল যেখানে।
স্মৃতিতে কাতার বিশ্বকাপ
আরব্য রজনীর স্টিরিওটাইপ ভেঙে মন জয় করা সেই উদ্বোধনী
ফ্রিম্যানকে স্বাগত জানাতে ঘানিম পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হুজরাতের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেন - ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে জানতে পারো।’ সেই রাতের বার্তা থেকে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। ফুটবল তখনও শুরু হয়নি, অথচ কাতার এর আগেই নিজের গল্প বলে ফেলেছিল। ২০১০ সালে স্বাগতিকের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় এক যুগ ধরে তৈরি করা একটা স্বপ্নের বাস্তবায়নও হয়েছিল।
বিতর্কের কমতি ছিল না আয়োজক দেশ ঘোষণার পর থেকেই। এমনকি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও গাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন শিল্পীদের কেউ কেউ। কাতার বিশ্বকাপের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে তাই বাড়ছিল অস্বস্তিও। কিন্তু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক মুহূর্তে যেন সবকিছু উড়ে যায় আরবের সুর আর সংলাপে।
সময়ের হিসাবে আধঘণ্টার ছোট্ট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দাগ কেটে যায় অনেকের হৃদয়েও। আরব বিশ্বের প্রথম বিশ্বকাপের যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যান্ড বিটিএসের গায়কের গাওয়া থিম সং ‘ড্রিমারস’ ছিল, তেমনি মরগ্যান ফ্রিম্যান ও ঘানিম আল মুফতাহর সংলাপও হৃদয় ছুয়ে গেছে সবার।
কাতারের সংস্কৃতি, আতিথেয়তা ও আরব পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই করে গেছেন আয়োজকরা। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য একেকটি স্টেডিয়ামই কাতার গড়ে তুলেছিল নিজেদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে ধারণ করে। কোথাও তা ছিল মুক্তা শিকার করা নৌকার আদলে, কোথাও আবার টুপির— ছিল শুধু বিশ্বকাপের জন্য কন্টেইনার দিয়ে তৈরি স্টেডিয়ামও।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হয়েছিল আল বাইত স্টেডিয়ামে— মরুভূমির বেদুইন তাঁবুর আদলে গড়ে তোলা হয়েছিল এটি। অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ পরই সব মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন কেবল দুজন মাত্র ব্যক্তি। পুরো স্টেডিয়ামে কালো আঁধারে ঢেকে দিয়ে তারাই চলে আসেন আলোর কেন্দ্রে। দুজনের একজন আবার ছিলেন কাউডাল রিগ্রেশন সিন্ড্রোম নিয়ে পৃথিবীতে আসা।
কাতারের মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে খ্যাতি পাওয়া ঘানিম আল মুফতাহর সঙ্গে মার্কিন অভিনেতা ফ্রিম্যানের ওই কয়েক মিনিটের সংলাপে পৃথিবীর প্রতিই পৌঁছে দেওয়া হয় একটা শক্তিশালী বার্তা। ভাবনাটা ছিল এমন, ফ্রিম্যান হুট করেই এসে পড়েছেন আরবে। আর আরবের প্রতিনিধি হয়ে ঘানিম আল মুফতাহ তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
ফ্রিম্যানকে স্বাগত জানাতে ঘানিম পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হুজরাতের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেন - ‘হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে জানতে পারো।’ এই বার্তাটিই পুরো অনুষ্ঠানে দিতে চেয়েছিলেন কাতার বিশ্বকাপের আয়োজকরা।
তার আয়াত পাঠের পরই ফ্রিম্যান সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন, ‘এখন আমি দেখছি, যা আমাদের এক করে, তা আমাদের বিভক্ত করে এমন বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বড়।’ দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে একবিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়ার বার্তাই দিয়ে গেছেন ফ্রিম্যান ও ঘানিম।
যাঁর শেষটা হয় কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের অন্যতম বড় উদ্দেশ্যের বার্তা দিয়ে, ‘এখানে সবাই স্বাগত।’ সংলাপ শেষে ফ্রিম্যান নিচু হয়ে বসে ঘানিমের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। ঘানিমও তার হাত বাড়িয়ে ফ্রিম্যানের আঙুল স্পর্শ করেন। শারীরিক দূরত্বের কারণে তারা প্রথাগত হ্যান্ডশেক করতে না পারলেও আঙুলের সেই স্পর্শটি ছিল ‘হিউম্যান কানেকশন’ বা মানবিক বন্ধনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।
কিন্তু শুধু তো আর আরবের সংস্কৃতি আর ভ্রমণের আহ্বানই নয়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা আসলে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বৈচিত্র্যের কারণেও।
ওরকম গুরুগম্ভীর শুরুর পরই মঞ্চে উঠেন কে-পপ তারকা জানকুক। কাতারেরই শিল্পী ফাহাদ আল-কুবায়েসিকে নিয়ে তিনি গান বিশ্বকাপের থিম সং ‘ড্রিমার্স’। তারা মঞ্চ ছাড়ার পর বাজতে থাকে আগের বিশ্বকাপগুলোর থিম সং আর ভেসে ওঠে মাসকটগুলো।
একটু পরই আকাশ থেকে নেমে আসে লা'ইব। কাতারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'গুতরা'-এর আদলে তৈরি মাসকট 'লা'ইব' আকাশচুম্বী ভূতের মতো বাতাসে ভেসে বেড়ায় আকাশে। সবকিছুই থমকে যায় ঘড়ির কাঁটায় ঘণ্টা পেরোনোর আগেই।
নিভে যায় আল বাইত স্টেডিয়ামের আলো, খালি হয়ে যায় মঞ্চও। কিন্তু সেই রাতের বার্তা থেকে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। ফুটবল তখনও শুরু হয়নি, অথচ কাতার এর আগেই নিজের গল্প বলে ফেলেছিল। ২০১০ সালে স্বাগতিকের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় এক যুগ ধরে তৈরি করা একটা স্বপ্নের বাস্তবায়নও হয়েছিল।
ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ইতি টানা হয় সেটির। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপাজয়ের আনন্দে বুঁদ হয় পুরো পৃথিবী। কিন্তু ইতালির বিখ্যাত ইভেন্ট ডিরেক্টর মার্কো বালিচের আঁকা ক্যানভাসে শুরুর ওই আধঘণ্টার অনুষ্ঠানের রেশটাও নিশ্চিতভাবেই থেকে যাবে যুগের পর যুগ। ঐক্য আর সম্প্রীতির আহ্বান ছিল যেখানে।
বিষয়: