বকর-বন্দনার ব্যবচ্ছেদ 

পাকিস্তানি টিভি সিরিজ দার-এ-নিজাতের প্রধান চরিত্র আবু বকরকে নিয়ে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন দর্শক। যিনি হয়তো এই চরিত্রের নামও শোনেননি আগে, তার চোখেও ফেইসবুকে কমবেশি ‘বকর-বন্দনা’ চোখে পড়তে পারে। বিশেষ করে প্রশংসায় ভাসছেন নারীরা? সেটি কি শুধুই চরিত্রের প্রতি ভালোবাসায়, নাকি দেখার আছে আরও অনেক কিছু?

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম

ফেইসবুক একটু স্ক্রল করতেই কী ‘আবু বকর’ নামটা আপনার বারবার চোখে পড়ছে? ভাবছেন, কে এই আবু বকর? অনেকে বলছেন, আবু বকরের মতো এতো দারুণ মানুষই হয় না। বিশেষ করে নারীরা কথায় হোক আর অবস্থানের দিক থেকে হোক, রীতিমতো আবেগী হয়ে উঠেছেন আবু বকরকে নিয়ে। আবার কেউ কেউ বলছেন, এমন চরিত্র নাটক-সিনেমাতেই সম্ভব, বাস্তবে এমন লোক হওয়া একেবারে অসম্ভব। একটি টিভি সিরিজের ক্যারেক্টারকে নিয়ে এমন মাতামাতি কি শুধুই সিনেম্যাটিক ঘটনা, চরিত্র আর অভিনয়ের ফলাফল? নাকি এর সাথে আরও অনেক বিষয়ও আসলে জড়ানো?

পাকিস্তানি একটা টিভি সিরিজ, নাম হচ্ছে দার-এ-নিজাত। অনেকে হয়তো কয়েক পর্ব এরই মধ্যে ফেইসবুকে রিলস আর শর্টস দেখেই টেনে ফেলেছেন। ইউটিউবে চাইলে সব পর্বই দেখা যায়। নায়ক-নায়িকা-চরিত্র-কাহিনী সব মিলিয়ে এই ধারাবাহিকটি হয়তো অন্য অনেক টিভি সিরিজের মতোই সাফল্য পেতে পারত। তবে এর ব্যাপারটা আলাদা হয়ে গেল একটি চরিত্রের জন্য। যিনি এই সিরিজের মূল চরিত্র, বা প্রোটাগনিস্ট, তার নাম আবু বকর। তাকে নিয়ে, মানে ওই চরিত্রটি নিয়ে বিশাল এক ফ্যানবেইজ তৈরি হয়ে গেছে। আর বড় অংশই বলা যেতে পারে, নারী। এই চরিত্রে পারফর্ম করা অভিনেতা নিজেও জানিয়েছেন, তার ইনবক্স নারীদের শুভেচ্ছায় রীতিমতো ভরে উঠেছে।

আপনার মধ্যে কৌতুহলের উদ্রেক এখানে হতেই পারে, আচ্ছা ব্যাপারটা কী? মোটামুটি কাহিনী টেনে দেখলেও বুঝবেন যে, আবু বকর অত্যন্ত ইতিবাচক, নীতিবান ও সহিষ্ণু এক যুবক। একটা মানুষ যে কীভাবে এত ভালো হতে পারে, আপনি অবাক হয়ে যেতে পারেন। তার সাথে যতই খারাপ ব্যবহার করা হোক না কেন, অন্যায় করা হোক না, অবিচার-অত্যাচার ইত্যাদি করা হোক না কেন; সে ভালো ব্যবহার করে যায় প্রত্যুত্তরে। সে তার স্ত্রীর সাথে অনেক ভালো আচরণ করে, স্ত্রী যাই বলুক বা যেভাবেই তার সাথে নেতিবাচক আচরণ করুক, সে সব সময় শুধু ভালো আচরণই করে।

তো আপনার মনে হতে পারে, পার্টনারের সাথে ভালো ব্যবহার করা মানুষ বা চরিত্র আবু বকর পৃথিবীতে প্রথম না, বা আর কেউ যে ভালো ব্যবহার করে না তাও তো না। তাহলে ঘটনা কী? মানে যাই করুক না কেন, আবু বকর তার পার্টনারের জন্য একেবারে সব সময় ভালো আচরণ করেন। আর এইসব মিলিয়ে অনেক মানুষ, বিশেষ করে তার বড় একটা অংশ নারী, তারা আবু বকরের ক্যারেক্টারকে রীতিমতো প্রশংসার শীর্ষে তুলে ধরেছেন। এই চরিত্রকে প্রশংসা করছেন, প্রিয়জন বা অন্যজনদের আবু বকরের মতো হতে বলছেন, চাইছেন সবাই তার মতো আচরণ করুক, আবু বকরকে নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলছেন, ভাবছেন, চাইছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই গল্পের একটু বাইরের দিকে আসা যাক। এটা গল্প নয়, সত্যিকারের ঘটনা। ঘোরতর কঠিন ও কঠোর বাস্তব। ঘটনা বাংলাদেশের। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটা হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে স্বামীর হাতে স্ত্রীর হত্যা হয়েছে এক হাজার ৩৪। আরেকটি সংবাদে এসেছে, গত পাঁচ বছরে স্বামী, স্বামীর পরিবার ও নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫৬৫ জন নারী। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব। বাস্তবে পারিবারিক সহিংসতা ও হত্যার সংখ্যা আরও বেশি। এ রকম আরও অনেক অনেক হিসাব খুঁজে পাওয়া যাবে।

নারী অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুনের ঘটনাগুলোর বেশির ভাগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যৌতুক, পারিবারিক কলহ, পরকীয়ার সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং নারীর স্বাধীন চলাফেরায় বাধা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবারকে নিরাপদ জায়গা হিসেবে ভাবা হলেও বাস্তবে নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘটে ঘরের ভেতরেই। সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, হত্যার শিকার হওয়ার আগে নারীরা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সহ্য করেন। এক পর্যায়ে তার জীবন বিপন্ন হয়। তাদের মতে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিবেদনটির বক্তব্য, যেসব নারী পুরোপুরি পরিবার বা স্বামীর ওপর নির্ভরশীল, তারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সহজে দাঁড়াতে পারেন না।

‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ, ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার জীবনসঙ্গী বা স্বামীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন; যার মধ্যে রয়েছে শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতা, পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। তিনজনের মধ্যে দুজন ভুক্তভোগী সহিংসতার কথা কখনোই প্রকাশ করেননি। 

অনলাইনে নারীর প্রতি সহিসংতার কথা বিস্তারিত বলতে গেলে এই লেখা শেষ করা কঠিন হয়ে যাবে। ইনবক্সে, প্রকাশ্যে, পাবলিক পোস্টে কোন জায়গায় নারী সহিংসতার শিকার হয় না? আপনার পরিচিত যে কোনো নারীকে জিজ্ঞাসা করুন, বা আপনি নিজে যদি একজন নারী হয়ে থাকেন তাহলে তো আপনার সে অভিজ্ঞতা আছেই।

সেখানে, আপনি যদি এমন মানুষগুলোকে এর বিপরীত জায়গা থেকে চিন্তা করেন, যারা আসলে এই আচরণগুলো করেন না? যারা যত্নশীল, যারা সাপোর্টিভ, যারা আপনাকে দোষারোপ করছেন না, আপনার প্রতি সহিংস হচ্ছেন না, এমনকি আপনি কোনো নেতিবাচক আচরণ করলে তাতেও বিচলিত না হয়ে আপনার প্রতি সহায়তামূলক আচরণ করছেন? সেখানেই আবু বকরের চরিত্র একেবারে আদর্শ। একেবারে স্বপ্নের মতো,  আকাঙক্ষা করার মতো। আপনি যদি এমন একটা ইউটোপিয়ান পরিস্থিতি চিন্তা করেন, সেখানে আসলে মানুষজন আবু বকরের মতোই হবে।

এই জায়গায় একটা জরুরি তাত্ত্বিক আলাপ আনার রয়েছে। প্যারাসোশাল রিলেশন বলে একটা বিষয় আছে। আজকের ডিজিটাল যুগে সোশাল মিডিয়া, ইউটিউব, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটা অংশ হয়ে উঠেছে। তবে তা যতক্ষণ বিনোদনের জায়গায় থাকে ততক্ষণ বিষয়টা একরকম। আর এই সব মাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকতে থাকতে আমরা প্রায়ই সেলিব্রিটি, ইনফ্লুয়েন্সার বা কাল্পনিক চরিত্রদের খুব কাছের মানুষ মনে করতে শুরু করি। মনোবিজ্ঞানে এই একতরফা আবেগঘন সম্পর্ককেই বলা হয় প্যারাসোশাল রিলেশনশিপ।

সহজভাবে বলতে গেলে, এমন একটি সম্পর্ক যেখানে একজন ব্যক্তি অন্য একজনের ব্যাপারে প্রচন্ড আবেগী, তার প্রতি গভীর টান অনুভব করেন, কিন্তু সেই ব্যক্তিটির কাছে তার অস্তিত্বই নেই। সাধারণত, এটি সেলিব্রিটি, টিভি ব্যক্তিত্ব, ইনফ্লুয়েন্সার এমনকি কাল্পনিক চরিত্রদের সঙ্গেই তৈরি হয়। যেখানে, আবু বকর সবচেয়ে টাটকা উদাহরণ।

নব্বই দশকের একটা ঘটনা এইখানে টানা যায়। বিটিভি’র ধারাবাহিক নাটক কোথাও কেউ নেই-এর শেষ পর্ব। মূল চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবে। এদিকে, ঢাকাসহ দেশের অনেক জায়গাতেই রীতিমতো মিছিল; স্লোগান ছিল, “বাকের ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।” নাটকের রচয়িতা-পরিচালককে অনেক উচ্চ পর্যায় থেকে ফোন দেওয়া হয়েছিল যে বাকের ভাইকে যেন ফাঁসি না দেওয়া হয়, এমন গল্পও আছে। বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আসাদুজ্জামান নুর। অথচ ভাবুন, বাকের ভাই আসলে কে? স্রেফ একটি কাল্পনিক চরিত্র। বাস্তবে তো তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু তার জন্য মানুষ মিছিল করেছে। তার ফাঁসি হয়েছে দেখে অজস্র মানুষ চোখের পানি ফেলেছে।

নব্বই দশকেরই আরেকটা উদাহরণ বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ডেভিড লিঞ্চের কালজয়ী টিভি সিরিজ ‘টুইন পিকস’— আমেরিকার এক মফস্বল শহরে এক কিশোরীর মৃত্যু ও তার হত্যা রহস্য। এক সময় নাকি বিটিভিতেও দেখানো হয়েছিল। তো মূল চরিত্র লরা পামার শুরু থেকেই মৃত, তার হত্যা বা মৃত্যুর রহস্য নিয়েই কাহিনী। কিন্তু সেটা আসলে কেন, বা কীভাবে হয়েছে সেটাই প্রশ্ন।

তো সেই লরা পামারকে নিয়েও মানুষের ছিল বিশাল আগ্রহ, সহানুভূতি আর জিজ্ঞাসা। সে সময়েও এই সিরিজের নির্মাতাকে নাকি হোয়াইট হাউস থেকেও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, “লরা পামার আসলে কে?”, “এইটা কী ফোনে জানানো সম্ভব?”। এগুলো হচ্ছে কাল্পনিক চরিত্রের সাথে মানুষের সাথে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্টের ক্লাসিক উদাহরণ।

আর এই ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন ১৯৫০-এর দশকে সমাজবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হর্টন ও রিচার্ড উল। টেলিভিশন দর্শকরাও অনেক সময় টিভি উপস্থাপক বা অভিনেতাদের সঙ্গে এমন ভাবে আবেগগত সম্পর্ক তৈরি করেন যেন তারা তাদের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন।

প্যারাসোশাল সম্পর্ক ব্যাপারটার ভালো-খারাপ আসলে কেমন? অনেক সময় এটি মানুষের একাকীত্ব কমাতে বা অনুপ্রেরণা পেতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনও সফল ব্যক্তিকে দেখে কেউ জীবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও পেতে পারেন। ধরুন, আবু বকর ক্যারেক্টারটা একজন ভালো মানুষকে তুলে ধরে। কাজেই কেউ যদি তাকে দেখে তার মতো ভালো আচরণ করার চেষ্টা করেন, এটা তো সবার জন্যই ভালো। তবে সমস্যা তখনই হয় যখন এই সম্পর্ক বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে শুরু করে। যদি কেউ বাস্তবে বন্ধু বা পরিবারের থেকে দূরে সরে গিয়ে শুধুমাত্র সেলিব্রিটি বা অনলাইন ব্যক্তিত্বের ওপর আবেগগত ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কেউ যদি চিন্তা করেন, একেবারে আবু বকরের মতো আচরণ করতে না পারলে সে আর ভালো মানুষ না, তাহলে কিন্তু মুশকিল।

আবু বকর চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, শেহরিয়ার মুনাওয়ার সিদ্দিকী, তিনিও বলেছেন যে বাস্তবে তিনি সেরকম না, দোষ-গুণ  মিলিয়েই মানুষ। শেহরিয়ার বরং এই ক্যারেক্টার দিয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে আরও একটু ভাবনাচিন্তা করতে বলেছেন।

সবশেষে আরেকটি বিষয় নিয়ে বলা দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সিনেমা বা সিরিজ বা বিভিন্ন কনটেন্টে যে ধরনের আলফা মেল, সহিংস পৌরুষত্বর ছড়াছড়ি এবং সেলিব্রেশন দেখেছি, সেখানে কিন্তু তার ভিক্টিম হয় নারীরা। আমরা যদি অ্যানিমেল, বরবাদ, টক্সিক, রাক্ষস ইত্যাদি সিনেমার কথা বলি বা বেশ খানিকটা আগে কবির সিং-এর কথা বলি। ব্যবসাসফল এই সিনেমাগুলো যে ধরনের টক্সিক ম্যাসকুলিনিটির বার্তা ছড়িয়েছে, আবু বকর একেবারে তার বিপরীত। আর তা নারীদেরকে এক ধরণের স্বস্তি দিয়েছে এবং সেই সাথে টক্সিসিটির বিপরীতেও যে পুরুষ আকাঙ্ক্ষিত হতে পারে তা প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আর সাথে এটাও দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের সোসাইটিই বলুন বা পারিপার্শ্বিকতাই বলুন, সেটার শ্বাপদসংকুল এবং নেতিবাচক পরিস্থিতির জন্যই আবু বকরের মতো একটি সুপার গ্রিন ফ্ল্যাগ, সফট এবং সাপোর্টিভ মানুষই এখন তাদের কাছে ইপ্সিত।