নানা পাটেকর: অভিনয়েও বিফলে মূল্য ফেরত গ্যারান্টি ছিল যার

থোড়া সা রুমানি হো যায়ে -এর নটবরলাল, ক্রান্তিবীর-এর প্রতাপ নারায়ণ তিলক, পারিন্দা-এর গ্যাংস্টার আন্না শেঠ, প্রাহার এর মেজর চৌহান, যশবন্ত-এর ইন্সপেক্টর যশবন্ত লোহার, বা ওয়েলকাম-এর ডন উদয় শেঠি। প্রতিটা নামেই তিনি তার মতো দর্শকের কাছে প্রিয়।

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

“আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টি নামবেই নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এ জন্য মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। আর হ্যাঁ পুরো টাকাটাই কিন্তু অ্যাডভান্স দিতে হবে।”

দীর্ঘদেহী, ময়লাটে বেশভূষার খটখটে যুবকের চোখে অদ্ভুত এক জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। ঘরভর্তি মানুষের অবিশ্বাসের নজরকে বারবার দ্বিধায় ফেলে দিচ্ছে সে।

একজন বলেই বসলো, সত্যিকারের বৃষ্টি?

তারপর যুবক মিনিটখানেকের টানা মনোলগে, পানি আর বৃষ্টি নিয়ে ঘরভর্তি লোকের সামনে হাঁটতে হাঁটতে তেজদীপ্ত স্বরে আপনমনে যে বয়ান দিয়ে গেলেন, এমন মন্ত্রমুগ্ধকরভাবে পানিকে সম্ভবত আর কেউ কখনো বোঝাতে পারেনি। সম্ভবত পারবেও না।

প্রখর তাপে শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাওয়া সেই অঞ্চলে বহুদিন বৃষ্টির ছিঁটেফোঁটাও নেই। এদিকে খবর ছড়িয়েছে, বড় শহর থেকে পালিয়ে গেছে এক জালিয়াত। মানুষকে কথার জাদুতে ফাঁসাতে তার নাকি জুড়ি নেই।

তারপর আটচল্লিশ ঘণ্টা যেতে না যেতেই আকাশ ঘন মেঘ করে বৃষ্টি ভিজিয়ে দিলো পুরো মুলুক। সাথে মানুষগুলোকেও। তাদের যত দ্বিধা, শংকা, ব্যথা- সব ধুয়ে মুছে গেল সাথে। সেই সাথে, যুবকও পালিয়ে যাচ্ছে। তার পেছনে পুলিশ। পাঁচ হাজারের প্রতিশ্রুতিতে সে বৃষ্টি নামিয়েছে।

যুবকের নাম নটবরলাল। এটা তার চরিত্রের নাম, সিনেমাটা ১৯৯০ সালের থোড়া সা রুমানি হো যায়ে । খানিকটা মিউজিক্যাল আঁচে গাঁথা প্রায় পৌনে তিন ঘন্টার এই সিনেমাটি বানিয়েছিলেন দুর্ধর্ষ অভিনেতা অমল পালেকর। নটবরলালের উপস্থিতি এই সিনেমায় সামান্যই, তবে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। উত্তপ্ত শুষ্ক একটি এলাকা আর তার মানুষগুলো, যাদের হৃদয় যাপিত জীবনে ক্ষয়ে ক্ষয়ে খটখটে হয়ে গিয়েছিল, তার সবটুকু তিনি ধুয়ে ভিজিয়ে তরতাজা করে দিতে পেরেছিলেন। এই যুবককে আমরা আরও অজস্র সিনেমায় দেখেছি। ভারতীয় সিনেমায় প্রতিষ্ঠিত হিরোইজমের অনেকটাই বিপরীতে দাঁড়িয়ে থেকেও এই যুবক যা করতে চেয়েছেন, হয়তো তার বেশিই পেরেছেন। তিনি বৃষ্টি নামাতে পারতেন, আগুনও জ্বালাতে জানতেন। মানুষকে হাসাতে, কাঁদাতে, তীব্র আতংকে শিউরে দিতে, প্রতিবাদের মুখর ভাষা হয়ে উঠতে, ভালোবাসার কথা বলতে–সবই জানতেন।

থোড়া সা রুমানি হো যায়ে -এর নটবরলাল, ক্রান্তিবীর-এর প্রতাপ নারায়ণ তিলক, পারিন্দা-এর গ্যাংস্টার আন্না শেঠ, প্রাহার এর মেজর চৌহান, যশবন্ত-এর ইন্সপেক্টর যশবন্ত লোহার, বা ওয়েলকাম-এর ডন উদয় শেঠি। প্রতিটা নামেই তিনি তার মতো দর্শকের কাছে প্রিয়। ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অনন্য সাধারণ অভিনেতা নানা পাটেকর আজ সত্যি সত্যি বিদায় নিলেন। পাঁচ হাজার টাকায় বৃষ্টি নামানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষার মতোই, নিজের অভিনয় ক্ষমতাও বিবিধ নিরিখে তিনি কয়েক দশক ধরে দুহাত ভরে দর্শকদের দিতে পেরেছেন। হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনার ক্যাথার্সিস আরেক পাশে রেখেও, হলভর্তি কিংবা ভিসিআরের সামনে বসে থাকে উৎসুক দর্শক নানা পাটেকরের ওপর ভরসা রাখতেন। চরিত্র যেমনই হোক, নানা পাটেকর থাকলে সেটা একদম ঠিকঠাক দেখিয়েই ছাড়বেন, এ কথা ঠিক নটবরলালের মতোই বিফলে মূল্য ফেরত গ্যারান্টি সহকারে বলতে পারতেন সবাই। সব সময়েই পারবেন।

এমন ভাগ্যও কজনেরই বা হয়?