দায়িত্ব নিয়েই বিএনপি সরকার ছয় সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। যারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলোচনায় ছিলেন বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসাবে।
এদের মধ্যে দুইজন ধানের শীষ মার্কা নিয়ে ভোটে হেরেছেন। আর বাকি চারজন মনোনয়ন চেয়েছিলেন, তবে পাননি।
গণতন্ত্র যখন আবার ফিরতে শুরু করেছে বাংলাদেশে, তখন রাজনৈতিক বিবেচনায় এমন ‘প্রাইজ’ দেওয়াকে কেউ কেউ বলছেন ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’ আবার রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের অনেকেই একে দেখছেন ‘বরাদ্দ পাওয়ার সুবিধা’ হিসাবে।
জামায়াতের কাছে হারের পর ‘প্রাইজ’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মো. শফিকুল ইসলাম খান আর খুলনাতে প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। দুইজনই এই ভোটে হেরেছেন জামায়াতের প্রার্থীদের কাছে।
ঢাকা-১৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন শফিকুল। শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল ও মিরপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে হারেন তিনি।
খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে অংশ নিয়ে মঞ্জুহারেন জামায়াতের মহানগর সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের কাছে।
নির্বাচনে হারের পর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেওয়াকে ‘প্রাইজ দেওয়ার ব্যবস্থা’ করা হয়েছে বলে মনে করেন দৈনিক নয়া দিগন্ত-এর সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।
একই সুর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ারও।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সরকার দায়িত্বে আসার সাথে সাথে যেখানে ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকার কথা, সেখানে তারা তাদের দলীয়, বিভিন্ন সময় বঞ্চিত কিংবা নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রার্থীদেরকে এক ধরনের প্রাইজ পোস্টিং করলেন।”
তবে একে প্রাইজ পোস্টিং বলতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক।
“রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় আসবে তারা চেষ্টা করবে তাদের নিজেদের মধ্যে যোগ্যদের বিভিন্ন যায়গায় বসাতে। এটা সারা বিশ্বেই হয়,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
সিলেট সিটি করপোরেশনে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জে মো. সাখাওয়াত হোসেন খান এবং গাজীপুরে মো. শওকত হোসেন সরকারকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যারা প্রত্যেকেই দলীয় টিকিট চেয়েছিলেন।
আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নিয়োগ পাওয়া মো. আবদুস সালাম ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বে।
রবিবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে এই ছয়জনের মেয়াদের কথা বলা হয়নি।
আর একেই 'অগণতান্ত্রিক' বলছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
তিনি বলেন, “প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সেখানে নির্দিষ্টভাবে মেয়াদ উল্লেখ করা নেই। প্রজ্ঞাপনটি দেখে মনে হচ্ছে, আমৃত্যু হয়ত তারা প্রশাসক থাকবেন। অথচ সরকারের যে কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কিন্তু সময়সীমাটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ।”
‘ব্যাড প্র্যাকটিস’ নাকি ‘সুবিধা’
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভ কিবরিয়া মনে করেন, বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর তারা এখন ‘ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত’ করার জন্য যা যা করা ‘উত্তম’ তাই করছে।
যার বড় উদাহরণ এই নিয়োগ প্রক্রিয়া।
“কারণ অতীতে দেখা গেছে স্থানীয় সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে বরাদ্দ পেতে সুবিধা হয়,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
এখন তাই তার প্রত্যাশা দলীয় সরকারের সুবিধা নিয়ে এরা যেন ‘ভালো পারফর্ম’ করতে পারেন।
তবে সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর একে দেখছেন গণতান্ত্রিক প্র্যাকটিসে এক ধরনের ‘কনফিউশন’ হিসাবে।
“গণতান্ত্রিক যে প্রসেস শুরু হয়েছে সেখানে এমন নিয়োগ এক ধরনের ব্যাড প্র্যাকটিস,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
এমনকি এটা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট করার শঙ্কা সৃষ্টি করেছে বলেও মন্তব্য তার।
এটা খারাপ কোনো নজির সৃষ্টি করছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মারুফ মল্লিক তুলে আনেন অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশের পরও ইশরাক হোসেনের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়ার ঘটনাটি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি স্বচ্ছ হয় তাহলে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না বলেও মনে করেন তিনি।



