আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার যে কৌশল, সেটি এখনই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ধর্মভিত্তিক জোটে ভাঙনের সুর স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপোড়েনের কারণে শরিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, আর সেই দূরত্বের কারণেই জোটের ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ জোট ছাড়ার ঘোষণা না দিলেও ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ভাঙনের শঙ্কা আর গুঞ্জন নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই টানাপোড়েন আসলে হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ভেতরে দীর্ঘদিনের আদর্শিক ও কৌশলগত বিভাজনই এখন প্রকাশ্যে আসছে।
ইসলামি দলগুলোর আদর্শগত ফারাক নির্বাচনের মতো বাস্তব রাজনীতিতে এসে সংঘাত তৈরি করছে। আবার কেউ বলছেন জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি রাজনীতির দিকে সরে এসে নতুন ভোটব্যাংক তৈরির চেষ্টা করছে।
এই রূপান্তরের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় কিছু ইসলামি দলের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
ভাঙনের ইঙ্গিত
বুধবার বিকালে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে জোটের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করে জামায়াতে ইসলামী। পরে জানা যায়, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় চাপের মুখে পড়ে জামায়াত।
প্রত্যাশিত আসন চূড়ান্ত না হওয়ায় মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফতে মজলিশও সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। তার আগ পর্যন্ত জোট করার সুযোগ থাকলেও এই সময়ের মধ্যেই সমঝোতা না হওয়া জোটের ভেতরের অস্বস্তিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
জামায়াতের সঙ্গে টানাপোড়নের মধ্যেও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দাবি করছে, জোট এখনও অটুট এবং আলোচনা চলমান। বুধবার ঢাকার পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার নীতিগত সিদ্ধান্তে তারা এখনও অনড় এবং শিগগিরই তার রূপরেখা পরিষ্কার হবে।
তবে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। ফলে তাদের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রেখে বাকি আসনগুলোতে প্রার্থী ঘোষণা করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।
১০ দলের সমঝোতা
বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দল নির্বাচনি সমঝোতার ঘোষণা দেয়।
ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ১৭৯ আসনে প্রার্থী দেবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ৩০টি আসন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ও নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি করে আসনে প্রার্থী দেবে।
এই জোটে শরিক থাকলেও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাগপা কোনো প্রার্থী দেবে না। কিছু আসন খোলা রাখা হয়েছে ভবিষ্যৎ সমঝোতার আশায়।
আলাদা হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন
বৃহস্পতিবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন মঞ্চে ইসলামী আন্দোলনের আমীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের জন্য চেয়ার রাখা হলেও তিনি বা তার দলের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। ফলে জোটের ভেতরের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জামায়াতসহ ১০ দল যখন আসন সমঝোতার ঘোষণা দিচ্ছিল, তখনই ইসলামী আন্দোলন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়,তারাও নির্বাচনি সমঝোতা নিয়ে ব্রিফিং করবে।
এর পর শুক্রবার বেলা তিনটায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের শীর্ষ নেতারা দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তারা জানান, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকছেন না তারা।
আদর্শিক ফারাকই বড় বাধা
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, এই ভাঙন অস্বাভাবিক নয়।
তিনি বলেন, “ধর্মভিত্তিক দল হলেও তাদের মধ্যে গভীর তরিকাগত ও আদর্শিক পার্থক্য রয়েছে। কেউ মওদুদিপন্থী, কেউ খেলাফতপন্থী, কেউ আবার দেওবন্দি ঘরানার, যারা মওদুদিবিরোধী। এসব আদর্শিক ফারাক রাজনীতি ও কৌশলেও প্রভাব ফেলে।”
তার মতে, ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার চিন্তা কৌশলগতভাবে যৌক্তিক হলেও বাস্তবে এটি সহজ নয়।
একই সুরে কথা বলেছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। তিনি বলেন, ইসলামকে সামনে রেখে যারা রাজনীতি করে বা ইসলামিক ফিলোসফিকে বা ইসলামিক আইডলজিকে যারা আত্মস্থকে করে রাজনীতি করে, তাদের মধ্যে একটা ডিভিশন আছে। কিছু কিছু ইসলামিক দল আছে যারা একেবারে মডার্ন যে আইডিয়াগুলোর সাথে বড় ধরনের দূরত্ব আছে।
তিনি বলেন,“একটা এই নতুন স্টাইল যেটা যেটা আপনার সবাইকে নিয়ে চলার। এইরকম মানসিকতা এখনো কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে তৈরি হয় নাই। স্পেশালি আমি মনে করি যারা আল্ট্রা রাইট বা আল্ট্রা ইসলামিক তাদের মধ্যে এখনো সেই কনসেপ্ট এই পর্যন্ত আসে নাই যে আমরা সবাই মিলেমিশে কে সবাইকে একটু ছাড় দিয়ে দিয়ে কাছাকাছি আসা।”
তবে অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের থেকে জামায়াতে ইসলামী আলাদা মন্তব্য করে সালাউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, “জামায়াতে ইসলামীকে দেখবেন তাদের পিপলস এস্পিরেশন বা এদেশের মানুষের যে চিন্তা চেতনা, একটা মধ্যপন্থা আছে। এখানেই জামাত ট্রান্সফার করে আসার চেষ্টা করছে “
“এই প্রথম, ইসলামি দলের সঙ্গে একজন হিন্দু আসছে। এর আগে আমরা কখনো দেখিনি যে তাদের হার্ডকোর পিপল ছাড়া কাউকে তারা সাপোর্ট করেছে বা নমিনেশন দিয়েছে। এবার অনেকগুলো লোক আছে যারা হার্ডকোর”, যোগ করেন মুহাম্মদ বাবর।
তিনি শেষপর্যন্ত জোটের ব্যাপারে আশাবাদী এই সাংবাদিক। বলেন, “তাদের দলের নিজস্ব কনসেপ্ট নিজের মেথডেই করছে। দলের বাইরে যখন অ্যালায়েন্স করছে তার তারা কিন্তু অনেককে অ্যাকোমোডেট করছে। তাদের একটা নতুন, একটা ডাইমেনশন আমি মনে করি। জামায়াত নিশ্চয়ই কিছু সেক্রিফাইস করেছে তাদেরকে অ্যাকোমোডেট করার জন্য।”
তবে আলতাফ পারভেজ মনে করেন, ধর্মভিত্তিক জোট শেষ পর্যন্ত সফল হওয়া কঠিন।
“এটা এক ধরনের ট্রায়াল অ্যান্ড এরর। চেষ্টা থাকবে, কিন্তু একশ ভাগ সফল হবে না। পাকিস্তান ও ভারতেও ইসলামী দলগুলো একসঙ্গে নির্বাচন করতে পারে না। তবে বাংলাদেশে যদি তারা পারত, তাহলে ভোটের অঙ্ক অনেক বাড়ত,” বলেন আলতাফ পারভেজ।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট একত্র করার যে স্বপ্ন, সেটি এখন আদর্শিক বিভাজন, আসন বণ্টনের হিসাব এবং পারস্পরিক আস্থার সংকটে আটকে গেছে।



