মন্তব্য প্রতিবেদন

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, যেখানে বোনা ছিলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীজ

বেপরোয়া বাসের চাপায় নিহত হয় শিক্ষার্থী রাজীব মিম। বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সুশাসনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। রাষ্ট্রযন্ত্র 'হেলমেট বাহিনী' দমনে প্রায় নিভে যাওয়া সেই বিদ্রোহের আগুনই দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চব্বিশের জুলাইয়ে।

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম

আট বছর আগের এইদিন, ২৯এ জুলাই রবিবার। ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বাস ধরার অপেক্ষা করছিলেন শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একদল শিক্ষার্থী। ঠিক সেই মুহূর্তে হিংস্র প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলো জাবালে ণুর পরিবহণের বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী বাস। আগে যাত্রী তোলার উন্মাদনায় ফুটপাতে অপেক্ষমান শিক্ষার্থীদের উপর বাস তুলে দেয় এক চালক। মারা যান দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব ও একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম। আহত হন আরও ১০ জন। 

রাজীব ও মিমের এই মর্মান্তিক মৃত্যু বিক্ষুব্ধ করে সহপাঠীদের। বিকেলের সূর্য ডোবার আগেই রাজপথে নেমে আসে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা।

একটি অট্টহাসি

পরদিন ৩০এ জুলাই, ঢাকা যেন এক অচেনা শহর। রাজপথে হাজার হাজার ইউনিফর্ম পরা ছাত্র-ছাত্রী। তাদের দাবি সরল ও স্পষ্ট, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।

ঢাকার রাজপথ যখন রাজীব ও মিমের মৃত্যুর বিচারের দাবিতে উত্তাল, ঠিক তখনই আন্দোলন উস্কে দেয় সেই সময়ের মন্ত্রী শাজাহান খান।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সমবেদনার পরিবর্তে এক অসংবেদনশীল অট্টহাসি দেন ওই মন্ত্রী, যিনি শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিত।

ভারতে এক বাস দুর্ঘটনায় ৩৩ জন মারা যাওয়ার উদাহরণ টেনে প্রশ্ন করেন, ‘’সেখানে কি কেউ এরকম কথা বলে, যেভাবে আমরা বলছি?’’ 

রাষ্ট্রের ‘দায়িত্বশীল’ একজন মন্ত্রীর সেই তাচ্ছিল্যের হাসির ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ। 

পরদিন পুরো ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা নিজেদের হাতে তুলে নেয় শিক্ষার্থীরা। দেখিয়ে দেয় কীভাবে সড়কে প্রতিষ্ঠা করতে হয় নিয়ম। এটি কোনো সড়ক অবরোধ ছিল না, ছিল এক নজিরবিহীন ‘বিকল্প সড়ক শাসন’।

রাস্তায় লাল দড়ি ও টেপ দিয়ে কিশোররা তৈরি করে জরুরি লেন। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস কিংবা সাংবাদিকদের গাড়ি পার করে দেওয়া হয় সেই লেন দিয়ে। পরীক্ষা করা হয় প্রতিটি যানবাহনের লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন। হাইস্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের লাইসেন্স দেখাতে বাধ্য হন বড় বড় কর্মকর্তা, পদস্থ আমলা, মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সামরিক বাহিনীর কর্তারা। 

ভঙ্গুর, অরাজক ট্রাফিক ব্যবস্থার একটি রাষ্ট্রে কিশোর-কিশোরীদের এই সুশৃঙ্খল আইন প্রয়োগের দৃশ্য অবাক চোখে চেয়ে দেখে পুরো বিশ্ব। 

আন্দোলনের একপর্যায়ে স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোরদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। সমর্থন দেন দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।  safe-roads-movement-seeds-of-july-mass-uprising

হেলমেট বাহিনী তাণ্ডব রক্তাক্ত আগস্ট

রাষ্ট্রযন্ত্র যখন বুঝতে পারলো কিশোরদের এই আইন শেখানোর আন্দোলন তাদের প্রশাসনিক নগ্নতাকে ফাঁস করে দিচ্ছে জনসম্মুখে, তখনই শুরু হলো দমনপীড়ন। 

ঢাকার ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাব, ও উত্তরা এলাকাকে পরিণত করা হয় রণক্ষেত্রে। কোমলমতি সেইসব কিশোর-কিশোরীদের লক্ষ্য করে ছোড়া হলো কাঁদানে গ্যাস, জলকামান। করা হলো লাঠিচার্জ।

শিক্ষার্থীদের দমন করতে মাথায় মোটরবাইকের হেলমেট, হাতে রামদা, রিভলভার, রড আর হাতুড়ি নিয়ে পুলিশের সাথে যোগ দিলো ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডাররা। 

ধানমন্ডি ও সায়েন্স ল্যাব এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো ‘হেলমেট বাহিনী’ নামে পরিচিত এই দলীয় বাহিনী। কিশোরদের নির্মমভাবে পেটানোর ভয়াবহ দৃশ্য ঢাকা শহরকে পরিণত করলো এক আতঙ্কপুরীতে। 

সত্য প্রকাশের মাশুল 

আন্দোলন ও শিক্ষার্থীদের উপর এই নির্মমতার খবর যেন দেশের মানুষ ও বিশ্ব দরবারে পৌঁছানো আটকাতে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নেমে আসে কঠোর প্রতিরোধ। আক্রমণ শুরু হয় দাংবাদিকদের উপর। ভেঙে ফেলা হয় ক্যামেরা, ছিনিয়ে নেওয়া হয় মেমোরি কার্ড। আন্দোলনের প্রথম তিন দিনেই অন্তত ৪০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী আহতের কথা নিশ্চিত করে বিবিসি। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশের রাজপথের প্রকৃত চিত্র ও সরকারের দমনপীড়নের কথা তুলে ধরায় গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে যায় আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে।

তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায়। আদালতে তোলার সময় শহিদুল আলম চিৎকার করে জানান, পুলিশ হেফাজতে তার উপর চালানো নির্মম শারীরিক নির্যাতনের কথা। একের পর এক জামিনের আবেদন খারিজ করে তাকে আটক রাখা হয় দীর্ঘ ১০৭ দিন।

একই আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘গুজব’ ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় অভিনেত্রী কাজী নওরশাবা আহমেদকেও।

শেখ হাসিনার হুঁশিয়ারি চালের রাজনীতি

কুর্মিটোলায় শিক্ষার্থী নিহতের সপ্তম দিন। আন্দোলন তখন চরমে। অবশেষে আন্দোলন নিয়ে মুখ খোলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ অফিস ও আওয়ামী কর্মীদের উপর জন্য হামলার জন্য তিনি দায়ী করে বসেন শিক্ষার্থীদেরই।  

দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে ‘একটি শ্রেণি’ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। গণভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আহ্বান করেন শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার। 

আন্দোলনের শেষদিকে এসে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত হওয়া আটকাতে ইন্টারনেট বন্ধ করে করা হয় ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় সকল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। অভিভাবকদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয় সন্তানদের ঘরে আটকে রাখতে।

পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ারশেল, জলকামান ও লাঠিচার্জের পাশাপাশি অস্ত্রধারী ‘হেলমেট বাহিনী’র ক্যাডারদের নামানো হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পৈশাচিক হামলা চালিয়ে কায়েম করা হয় ত্রাসের রাজত্ব। 

আন্দোলনকে সমর্থনকারীদের গ্রেফতার করে তৈরি করা হয় ভয়ের পরিবেশ। তড়িঘড়ি করে পাস করা হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন’। 

অবশেষে অগাস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রশাসনিক শক্তি, রাজনৈতিক দমনপীড়ন, ডিজিটাল সেন্সরশিপ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের এক সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়া হয় এই আন্দোলন।

আন্দোলনে অর্জিত সাফল্য

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটি রাজপথে কঠোরভাবে দমন করা হলেও, বাংলাদেশের সমাজ, আইন এবং দৈনন্দিন জীবনে এটি রেখে যায় সুদূরপ্রসারী ও দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন।

আন্দোলনের তীব্র চাপের মুখে পাস হয় দীর্ঘদিন আটকে থাকা ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’। চালকদের জবাবদিহিতা ও শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ ছিল এই আইন।

আন্দোলনের দিনগুলোতে লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করেছিলো শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের পর মানুষের মধ্যে গাড়ির বৈধ কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়। চালকদের মধ্যে লাইসেন্স গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যায় বহুগুণ।

আন্দোলনের পর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিলো বেপরোয়া গতি, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের গাড়ি চালানোর প্রবণতা। ট্রাফিক পুলিশও বাধ্য হইয়েছিলো কঠোর আইন প্রয়োগ করতে। 

তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে বাস্তবমুখী ও দৃশ্যমান পরিবর্তনটি আসে দেশের মোটরসাইকেল সংস্কৃতিতে। এর আগে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল চালকরা হেলমেট পরলেও আরোহীর হেলমেট পরা ছিলো প্রায় বিরল।

আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীরা আরোহীর হেলমেট পরাও চেক করতে শুরু করে। পরবর্তীতে এটিকে কঠোর আইনের আওতায় আনে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগও। আজ বাংলাদেশের শহরগুলোতে বাইকের চালক ও আরোহী উভয়কেই যে হেলমেট পরতে দেখা যায়, তা মূলত ২০১৮ সালের স্কুলপড়ুয়াদের আন্দোলনেরই সরাসরি সুফল।

২০১৮ এর বীজ ২০২৪ মহীরুহ 

উপনিবেশবিরোধী চিন্তাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও বিপ্লবী ফ্রানৎস ফানোঁ তার ‘সিট অব পাওয়ার’ তত্ত্বে বলেছিলেন, যে জনতা একবার বুঝে যায়, কীভাবে রাষ্ট্রকে অচল করে দেওয়া যায়। তারা নতুন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর জন্যও স্থায়ী হুমকি।

শিক্ষার্থীদের ২০১৮ সালের সেই আন্দোলন কেবল ট্রাফিক আইনের সংস্কারে শেষ হয়ে যায়নি। এটি ছিল তখনকার জেন-জি প্রজন্মের মগজে বপন করা এক রাজনৈতিক ক্ষোভের বীজ।

আন্দোলনে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস, ছাত্রলীগ, যুবলীগের ‘হেলমেট বাহিনী’র রামদার কোপ থেকে বেঁচে ফেরা সেই কিশোর কিশোরিরা ছয় বছর পর, ২০২৪ সালে এসে পদার্পণ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।

চব্বিশের জুলাইয়ে ‘বৈসম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’ তারা দেখেছিলো সেই একই  ‘হেলমেট বাহিনী’ ও পুলিশি হিংস্রতার প্রয়োগ।

কিন্তু এই তরুণ-তরুণীরা সেই ২০১৮ সালেই বুঝে গিয়েছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্তম্ভগুলো কতটা নড়বড়ে। তাই ২০২৪এ বুলেটে ভয়েও পিছিয়ে যায়নি তারা। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে এলাকা পাহারা দেওয়া, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেই তারা গড়ে ২৪এ গড়ে তুলেছিলো ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে’।

রাজীব আর মিমের মৃত্যুতে জ্বলে ওঠা আগুনের শিখা ৬ বছর পর এসে পরিণত হয় দাবানলে। পুড়িয়ে ছাই করে দেয় ফ্যাসিস্ট হাসিনার দেড় দশকের ত্রাসের রাজত্বকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জন্ম দেয় এক নতুন অধ্যায়ের।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কেবল ট্রাফিক ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় ফেরায়নি। এটি সেই কিশোর-কিশোরীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো তাদের সমষ্টিগত ঐক্য ও প্রতিবাদের শক্তির সাথে। কিশোর বয়সের সেই শক্তি ও সাহসিকতার টিমটিমে মশালই ২৪এর গণ-অভ্যুত্থানের পরিণত হয় স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যে।