মতামত

সব ‘জিল্লু’দের কপাল এক না!

তৃতীয় মাত্রা খ্যাত জিল্লুর রহমানের কারণে ‘জিল্লু মাল দে’ বিখ্যাত হয়েছে নাকি ছবির কারণে জিল্লু নামটা আলোচিত হয়েছে আমরা সেই গবেষণায় না যাই। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকার পর্যালোচনাতেও না যাই। ফাহমিদা হককে শুভকামনা জানিয়ে একটা গল্প বলে বিদায় নেই। শোনা গল্প। এরজন্য লেখক দায়ী না।

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

বাংলাদেশের সব ‘জিল্লু’দের কাছে ক্ষমা চেয়ে এই লেখা নিবেদন করছি। শুরুতেই জানিয়ে রাখি-সব ‘জিল্লু’রা মাল দেয় না কিংবা সব ‘জিল্লু’দের কপাল একরকম হয় না

সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত জিল্লু’র নাম শ্রদ্ধেয় জিল্লুর রহমান। ভদ্রলোক ১৯২৯ সালে জন্মেছিলেন, ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে জিল্লুর রহমান সাহেব কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই তিনি আওয়ামী লীগের (১৯৭২ সালে) সাধারণ সম্পাদক হন। জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হতে পেরেছিলেন। তিনি আর বেঁচে নেই।

যদিও শ্রদ্ধেয় ‘জিল্লুর রহমান’ এর বড় গুণ ছিল সহজেই সবকিছু মেনে নেওয়া, মেনে নিয়েছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধু এবং তার কন্যা শেখ হাসিনাকে। ১৯৯৬-২০০১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিগ্রি রোগ’ হয়েছিল। বিদেশের অজানা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক ডিগ্রি পেতেন। শেখ হাসিনাকে উৎসাহ দিতে শ্রদ্ধেয় জিল্লুর রহমান বলেছিলেন-‘প্রধানমন্ত্রী দিনরাত কাজে ব্যস্ত থাকেন। এমন গুরুদায়িত্ব না ধাকলে তিনি প্রতিদিন একটি করে ডিগ্রি অর্জন করতেন!’ কোনো এক নববর্ষে এক দৈনিকের রম্য সাময়িকী তার উপাধি দিয়েছিল ‘তৈলুর রহমান’!

বহুদিন পর আবারও আমার বা আমাদের মনে হতে পারে যে ‘যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ’। এই লেখার সময় মনে হচ্ছে শ্রদ্ধেয় জিল্লুর রহমান ভালো মানুষ ছিলেন, যার বিরুদ্ধে প্রমাণিত দুর্নীতি কিংবা কোনও অনৈতিক কীর্তির বয়ান নেই। সীমাহীন এক বেদনা নিয়ে তিনি পৃথিবী ছেড়েছিলেন। ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট তার স্ত্রী আইভী রহমান বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার পর মারা গিয়েছিলেন। এই হামলায় ২৪ জন নিহত এবং অনেকেই পঙ্গু ও আহত হয়েছিলেন। ইউনূস সরকারের আমলে গ্রেনেড হত্যা মামলার বিচারের রায় বদলে দেওয়া হয়েছিল কেন, সে প্রশ্ন আজ না উঠাই। হয়তো জিল্লুর রহমান বেঁচে থাকলে বলতেন কেউ আইভীকে খুন করেনি!

এবার শ্রদ্ধেয় জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর দিকে নজর দেই। ইনি ছিলেন একাধারে লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন, এরপর যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে। এরপর দুই টার্মের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়েরও উপাচার্য ছিলেন। ১৯৯০-১৯৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। একাধিক প্রকাশনা আছে তার। পেয়েছেন আলাওল ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও স্বাধীনতা পদক। তিনিও এখন বেঁচে নেই।

যাইহোক এবারে আমরা অন্য ‘জিল্লু’রের কাছে যাই। ভদ্রলোকের নাম হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি শিক্ষাবিদ এবং অর্থনীতিবিদ। এক এগারোর কালে (২০০৭-২০০৮ ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীন এর সরকার)  ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা। ভদ্রলোক পরিমিত কথা বলেন, প্রয়োজন ছাড়া বলেন না। হোসেন সাহেব ড. মুহম্মদ ইউনূসের কালে একটি নতুন শব্দ আবিষ্কার করেছিলেন। শব্দটা হচ্ছে ‘বাংকার মেন্টালিটি’। যে জনগণের নামে দেশ বা রাজনীতি, সেই জনগণকে এড়িয়ে তাদের সহযোগী না ভেবে শুধু প্রতিষ্ঠান সর্বস্বতা দিয়ে যখন কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন নাকি এই ‘বাংকার মেন্টালিটির’ দেখা মেলে। আমরা ‘মব’ বা বাংকার এর দিকে না যাই। আমরা শুধু ‘জিল্লু’ বা তার মাল দেওয়া নিয়ে থাকি। তবে হোসেন সাহেবও আমাদের আজকের আলোচিত ‘জিল্লু’ নন।

আরো এক‘ জিল্লু’ আছেন যিনি অভিনয় করেন। জিল্লুর রহমান নামের শ্রদ্ধেয় এই অভিনেতা ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্র, অসংখ্য টেলিভিশন নাটক ও মঞ্চে অভিনয় করেছেন। কৌতুক অভিনেতা হিসেবে তিনি বিশেষ পরিচিতি পান। তার কয়েকটা কৌতুক অ্যালবাম বেরিয়েছিল যেমন-‘হ্যালো জিল্লু’, ‘চান্দের দেশে ভাতিজা’ এবং ‘ভাতিজা এখন কোথায়’? ১৯৭৩ সাল থেকে এখনও তিনি অভিনয়ের সাথে জড়িত আছেন। অভিনেতা জিল্লুর রহমানও আজকের বিষয় নন। তাহলে আমাদের আলোচিত ‘জিল্লু’ কে?

২০২৬ এর এপ্রিলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে আলোচনায় আসেন ‘তৃতীয় মাত্রা’ খ্যাত জিল্লুর রহমান। একটি বেসরকারি চ্যানেলে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। বিভিন্ন কারণে এই অনুষ্ঠান নিয়ে তিনি আলোচিত ও সমালোচিত ছিলেন। এক এগারো অর্থাৎ ফখরুদ্দীন মঈনুদ্দীনের কালে এই জিল্লুর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘাতকদের একজন কর্নেল আবদুর রশীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। ঠিক এমনই এক ক্রান্তিকাল ইউনূসের জমানায় ‘নির্বাচন হবে না, নির্বাচন হবে না’ বলে তিনি মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন। এবারে অবশ্য এসব কারণে তিনি আলোচনায় আসেননি। এই জিল্লুর রহমান আলোচনায় এসেছেন তার স্ত্রী ফাহমিদা হক এর কারণে। ফাহমিদা হক বিএনপি কর্তৃক প্রকাশিত সংরক্ষিত আসনের এমপি তালিকায় রয়েছেন। আলোচনা একারণে যে বিএনপির নারী কর্মীরা যারা বিবিধ কারণে আলোচিত ছিলেন, সংরক্ষিত মহিলা এমপি পদে যাদের নাম আলোচিত হচ্ছিল ফাহমিদা হক সেই তালিকা বা একেবারেই আলোচনায় ছিলেন না। বলা যায়, স্ত্রীর কারণে স্বামীও আলোচিত হলেন।

তৃতীয় মাত্রা খ্যাত জিল্লুর রহমান আলোচনায় আসার সাথে সাথে একটা ডায়ালগ আবারো আলোচনায় উঠে আসে। সেটা শাকিব খান অভিনীত ‘বরবাদ’ ছবির ডায়ালগ। ‘জিল্লু মাল দে’। বরবাদ ছবিতে ‘জিল্লু’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন কলকাতার শ্যাম ভট্টাচার্য। তাদের অভিনয় রসায়ন এমন ভাইরাল হয়েছে যে ‘জিল্লু’ মাল দে শিরোনামে একটা কমিক গানও হয়েছে, যেটা প্রচুর মানুষ শুনেছে বা দেখেছে।

তৃতীয় মাত্রা খ্যাত জিল্লুর রহমানের কারণে ‘জিল্লু মাল দে’ বিখ্যাত হয়েছে নাকি ছবির কারণে জিল্লু নামটা আলোচিত হয়েছে আমরা সেই গবেষণায় না যাই। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকার পর্যালোচনাতেও না যাই। ফাহমিদা হককে শুভকামনা জানিয়ে একটা গল্প বলে বিদায় নেই। শোনা গল্প। এরজন্য লেখক দায়ী না।

এক লোক দীর্ঘদিন ধরে গাজা আর দেশি মদ বিক্রি করতো। ছেলেমেয়ে বড় হবার পর একবার জেলে গিয়ে তার মনে পরিবর্তন আসে। জেল থেকে বেরিয়ে সে মেশিনওয়ালা রিকশা চালাতো। একদিন বাসায় পুলিশ আসে। লোকটা পুলিশের মুখোমুখি হয়ে বলে-স্যার আমি ‘জিল্লু’। আগে মাল বেচতাম। এখন মেশিনওয়ালা রিকশা চালাই। বিশ্বাস করেন স্যার। পুলিশ তবু তাকে ধরে নিয়ে গেলো। যাবার সময় জিল্লুর মনে হলো ‘নামে নামে যমে টানে’।

পৃথিবীর সকল জিল্লুরা সুখী হোক।