মতামত

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যেসব প্রশ্নের জবাব মেলে না

সরকার শুরু থেকেই জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায় যে ভজঘট লাগিয়ে দিয়েছিল তার ফল তো জনসাধারণকেই ভুগতে হবে। আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সরকার তো আছেই-আমেরিকা। তাঁদের কর্মকান্ডের ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগও আমাদের ওপরই চাপবে।

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

অবশেষে সরকার সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। সরকারি পরিভাষায় এই দাম বাড়ানোর নাম ‘মূল্য সমন্বয়’। তবে এই মূল্য সমন্বয় বেশিরভাগ সময় কেবল তখনই করা হয়, যখন দাম বাড়ানোর দরকার পড়ে। এবার শুধু তেল নয়, দাম বাড়ানো হয়েছে এলপি গ্যাসেরও। তাও ১৭ দিনের মধ্যে দু’বার। তাতে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের মোট দাম বেড়েছে ৫৯৯ টাকা (৩৮৭+২১২)। ফলে সিলিন্ডারটির সরকার নির্ধারিত দাম এখন ১,৯৪০ টাকা! সাধারণ মানুষ কত টাকায় পাবেন তা ঠিকঠাক বলা সম্ভব নয়। এরপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে অন্ততঃ ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে বিদ্যুতের দাম। মূলতঃ বিদ্যুৎ উৎপাতনের জন্য ব্যবহৃত ফার্নেস তেল এবং বিমানের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম আগেই বাড়ানো হয়েছে। সরকারের এই মূল্য সমন্বয় দাম কমার পরিস্থিতিতে কেন হয় না, সে প্রশ্নের জবাব আজ পর্যন্ত মেলেনি।

সরকার অবশেষে দাম বাড়িয়েছে বলছি কারণ, গত মার্চ মাসের শুরু থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে (একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী) উল্টা-সিধা নানান কথা বলে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় (সাপ্লাই চেইন) এবং ব্যবস্থাপনায় একটা ভজঘট লাগিয়ে দিয়েছেন। দেশে জ্বালানি তেলের, বিশেষ করে পেট্রোল-অকটেনের স্বাভাবিক মজুত এবং বেসরকারি শোধনাগারগুলো থেকে নতুন সরবরাহ অব্যাহত থাকার পরও তাঁরা রেশনিং করতে শুরু করলেন। ফলে মানুষ আতংকিত হয়। পেট্রোল পাম্পগুলোতে শুরু হয়ে যায় প্রায় ২৪ ঘন্টা হাজার হাজার গ্রাহকের লাইন ধরে অপেক্ষা। তারপরও নীতি নির্ধারনী পর্যায় থেকে ‘দাম বাড়ানো হবে না’; ‘এপ্রিলে বাড়ানো হতে পারে’ প্রভৃতি কথা-বার্তা বলা অব্যাহত থাকে। তাই শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর পর প্রথম প্রশ্নটি হলো-এখন কি সরবরাহ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক হবে? পাম্পগুলোতে কী আগের অবস্থা ফিরে আসবে? হয়তো আসবে যদি অঘোষিত রেশনিং তুলে নেওয়া হয়। মানে বাইকে ৫০০ টাকার বেশি দেব না, গাড়িতে ২০০০ টাকার বেশি দেব না এগুলো যদি বন্ধ করা হয়। মানুষ যদি পেট্রোল পাম্পে গিয়ে প্রয়োজনমতো জ্বালানি পায় সেটা নিশ্চিত করা হলে পাম্পগুলোতে কেন মানুষ লাইনে দাঁড়াতে যাবে! আর নগরবাসী মানুষের এই লাইনে দাঁড়ানোর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বোরো চাষে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে কিনা। এই বিষয়টির সঙ্গে কৃষকের আর্থিক স্বার্থ এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।

দাম বাড়ানোর পর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে দাম বাড়ানো হয়েছে। সরকারের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেই পুরানো প্রশ্নই আবারো ওঠে যে সামঞ্জস্য রাখার প্রসঙ্গটি কেবল দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেই ওঠে কেন? বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানির দাম কমে তখন তো সামঞ্জস্য বিধানের প্রসঙ্গ ওঠে না! জ্বালানির বিশ্ববাজারকে সব সময়ই অস্থিতিশীল ধরে নেয়া হয়। কারণ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক প্রভৃতি হেন কোনো কারণ নেই যাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে কিংবা কমতে না পারে। তাই দেশে দেশে জ্বালানি পন্যের দাম নির্ধারণের বিশ্বব্যাপী সর্বজনস্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য পন্থা হচ্ছে জ্বালানির দামকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া যাতে দাম বাড়া-কমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশেও দাম বাড়তে-কমতে পারে।

আমাদের দেশেও কয়েক দশক ধরে এই পদ্ধতি চালু করার কথা হয়ে আসছে। কথাগুলো এসেছে মূলতঃ ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনা করে। দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নানানভাবে বিষয়টির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। সর্বশেষ খুব জোড়ালোভাবে বিষয়টি উঠেছিল কোভিডের সময়, যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ছিল ইতিহাসের সর্বন্ম্নি পর্‌যায়ে। তখন বিশেষজ্ঞ-গবেষকেরা একথাও বলেছিলেন যে কোভিডের পরপরই সারা পৃথিবীতে জ্বালানি বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হবে। তখন দামও বাড়বে। সরকারকে তখন বাধ্য হয়েই দাম বাড়াতে হবে। তাই তার আগে যদি জ্বালানির দাম বাজার-সংশ্লিষ্ট করা হয় তাহলে কোভিডকালীন মানুষ কম দামে জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে এবং পরে আর দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। কিন্তু সরকার সব সময়ই বিষয়টি নিয়ে কালক্ষেপন করার কৌশল নিয়েছে। কখনোই মানুষকে জ্বালানির কম দামের সুবিধা দেয়নি।

এই যে সরকার মানুষকে কম দামে জ্বালানি কেনার সুবিধা দেয়নি তার অন্তর্নিহিত কারণ হলো রাজস্ব উপার্জন। জ্বালানি খাত হলো সরকারের রাজস্ব আহরেণের জন্য এক সোনার খনির মতো। জ্বালানি তেল থেকে সরকার আমদানি শুল্ক নেয়, ভ্যাট নেয়, বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আয়কর নেয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ সরকারের কোষাগারে যায়। জ্বালানির দাম যত বেশি হয় সরকারের রাজস্বও ততই বাড়ে। এরপর আছে বিপিসির মুনাফা। সরকার সেখান থেকেও আয়কর এবং মুনাফার একটা অংশ নেয়। জ্বালানির দাম কম হলে সরকারের রাজস্বের পরিমানও কমে। সুতরাং রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য হাহাকারে থাকা সরকার ওই পথে হাঁটতে চায় না।

এবার আসি সরকারের ভর্তুকি এবং পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) মুনাফা প্রসঙ্গে। একথা সত্য যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল অংকের ভর্তুকি দিতে হয়। পাশাপাশি একথাও সমান সত্য যে এই ভর্তুকি দেওয়া হয় বলেই বাংলাদেশের শিল্প, কৃষি, সেবাসহ সকল উৎপাদন খাত বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি তুলে দেওয়া হলে বাংলাদেশের দেউলিয়া হতে বেশি সময় লাগবে না, তা আইএমএফ যত কথাই বলুক না কেন। আইএমএফ বিচ্ছিন্নভাবে এই খাতের ভর্তুকি তুলে দিতে বলেও না। তারা এটা বলে পূর্ণাঙ্গ একটা কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে। সেই কাজে সরকারের এবং সরকারি দলের জনপ্রিয়তা হ্রাস-বৃদ্ধির প্রশ্নটি অতীব জরুরি। কাজেই আইএমএফের দাওয়াই এই দেশে কবে কোন সরকার পূর্নাঙ্গরূপে গ্রহন ও বাস্তবায়ন করবে তা নিয়ে খুব বেশি ভাবনার দরকার নেই।

কিন্তু বিপিসির মুনাফা! সরকারের বিপুল পরিমান ভর্তুকির ঘাড়ে সওয়ার হয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসি যে বাণিজ্য করে যাচ্ছে তার জবাব কী? এই গত অর্থবছরেও (২০২৪-২৫) জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি নিট মুনাফা করেছে ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতিদিন বিপিসির নিট মুনাফা হয়েছে ১১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর বাইরে ওই অর্থবছরে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, আয়কর এবং লভ্যাংশ বাবদ বিপিসি সরকারকে দিয়েছে মোট ১৩ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অবাক করা বিষয় হলো-দেশের জনগণের সাথে সরকারের ও একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সরাসরি এবং সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে এই জ্বালানি তেল। অথচ সরকার কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিন্তু সেবার নামে জনগণের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারে না। বিপিসির এই মুনাফা এবং সরকারকে দেওয়া অর্থের হিসাব তাঁদের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটা তো এক বছরের হিসাব। বিপিসি কম-বেশি মুনাফা করে প্রতিবছর। এবছরও ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তো বিপিসি মুনাফাই করেছে। তাই দেশ ও জনগণের জন্য বিপিসি কিছুদিন যদি লোকসানও দেয় তাহলেও প্রতিষ্ঠানটির দেউলিয়া হওয়ার কোনো আশংকা নেই। শুধুমাত্র পূর্ববর্তী মুনাফার সঙ্গে এই সময়ের লোকসান সমন্বয় হতে থাকবে। অপরদিকে এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বন্ধ হবে না। তবে কম-বেশি হবে। যেমন জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে এখন সরকার আগে চেয়ে অনেক বেশি পরিমানে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট প্রভৃতি পাবে। অথচ লোকসান, প্রতিদিন শতকোটি টাকার ভর্তুকি, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান প্রভৃতি কারণ দেখিয়ে এযাবৎকালের মধ্যে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের সুযোগ ছিল অন্ততঃ আরো কিছুদিন দাম না বাড়িয়ে, সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা।

এই দাম বৃদ্ধির প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া কী হবে! সারা পৃথিবীতে জ্বালানিকে গন্য করা হয় ‘স্ট্রাটেজিক কমোডিটি’ বা কৌশলগত পন্য হিসেবে। এর প্রধান কারণ জ্বালানির উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পুরো আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর তার অনিবার্য বিরূপ প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। জ্বালানি ছাড়া গোটা অর্থনীতি পঙ্গু। শিল্প-বাণিজ্য-কর্মসংস্থান ব্যহত। যাতায়াত-পরিবহন দুর্মূল্য ও বিঘ্নিত। ইতিমধ্যে বাসভাড়া ৬৪ শতাংশ এবং লঞ্চভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মালিক পক্ষগুলো। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যহত। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। এগুলো সরকার বা নীতিনির্ধারকেরা যে জানেন না তা তো নয়। তারপরও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার কী অর্জন করতে চায়? সরকারের অগ্রাধিকারই বা কীসে? জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার কি তেমন কোনো চক্রব্যুহে ঢুকেছে যেখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন?

সবারই জানা আছে যে বর্তমান বিএনপি সরকার অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। গত তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান নেই। দেশের আর্থিক খাত সংকটে আছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি যা জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর ডাবল ডিজিটে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে মানুষের সীমিত হয়ে আসা ক্রয়ক্ষমতা আরো কমিয়ে দেবে। নিম্ন আয়ের মানুষ আরো বেশি বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়বে। রাজস্ব আয় কমে গেছে। ফলে সরকার ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা করার পথে পা বাড়াতে পারছে না। প্রবাসী আয় বেড়েছে বটে। তবে রপ্তানি খাত দুর্বলতর হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। রপ্তানি আরো দুর্বল হতে পারে। প্রবাসী আয় কমতে পারে। তাতে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার কী অর্জন করতে চাইছে? শুধু কিছু রাজস্ব এবং বিপিসির মুনাফা? জ্বালানির দাম বাড়িয়ে আর কিছু তো অর্জন করা সম্ভব নয়। অথচ সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৫ বছর ধরে চলে আসা মূল্যস্ফীতি কমানো। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ানোয় তা আরো বাড়বে।

বর্তমানে যে মূল্যস্ফীতি তা ধারাবাহিকভাবে চলে এসেছে মূলতঃ ২০২২ সাল থেকে। ওই বছরের অগাস্টে দেশে একবারে অতি উচ্চহারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরই মূল্যস্ফীতি অনেকটা বৃদ্ধি পায়। ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারের জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। তারই প্রত্রিক্রিয়ায় ২০২২ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৮০ থেকে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, অকটেন ৮৯ টাকা থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ এবং পেট্রোল ৮৬ থেকে ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করেছিল। ওই সময় ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৫, ৫১ দশমিক ৭ এবং ৫১ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছিল। এবার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দেড় মাস পর বিএনপি সরকারের নির্ধারণ করা নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শতাংশের হিসাবে ওই সময়ের তুলনায় এবার দাম বৃদ্ধি কম হলেও ওই সময়ের বর্ধিত দামের ওপর এবারের বর্ধিত দাম মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভুত হওয়ার আশংকা রয়েছে। গত শনিবার দুপুরে সরকারের একজন নীতিনির্ধারক ‘জ্বালানির দাম বাড়লে মূল‍্যস্ফীতি বাড়বে-তাই দাম বাড়াবে না সরকার ‘বলার কয়েক ঘন্টার মধ্যে জ্বালানি মন্ত্রীর ভাষায় “বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে” হলো। অনেকের ধারণা, সরকার এখনই জ্বালানির দাম বাড়ানোর কথা ভাবছিল না। কিন্তু তাতে আইএমএফের ঋণের আগামী কিস্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও আইএমএফের একই প্রেসক্রিপশন মানতে হয়েছে। তাই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের পর দাম বাড়ানোর মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা অমূলক নয়।

দেশের অন্ততঃ এক কোটি পরিবারের সঙ্গে দৈনিক সরাসরি জ্বালানি তেল ব্যবহারের সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাঁদের নির্ভরতা এলপি গ্যাসের ওপর। এছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও এলপি গ্যাস ব্যবহৃত হয়। এপ্রিলের শুরুতেই ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম তখনকার এক হাজার ৩৪১ টাকা থেকে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়। এরপর গত শনিবার, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলপি গ্যাসের দামও আরেক দফায় ২১২ টাকা বাড়ানো হলো। ফলে মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়লো ৫৯৯ টাকা। এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তাতে প্রতিমাসের এক তারিখে সৌদি অ্যারামকো ওই মাসের জন্য এলপি গ্যসের উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের যে দাম ঘোষণা করে তার ভিত্তিতে এবং তার সঙ্গে অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ওই মাসের জন্য দেশেরে বাজারের জন্য দাম নির্ধারণ করে। এটা সৌদি অ্যারামকো যেমন প্রতি মাসে একবারই ঘোষণা করে তেমনি বিইআরসিও একবারই ঘোষণা করে। এবার কেবল এর ব্যাতিক্রম হলো। ফলে এলপি গ্যাসনির্ভর পরিবারগুলো বড় ধরণের আর্থিক চাপে পড়বে। ডিজেলের দামের জন্য চাপে পড়বে কৃষক। আসলে চাপে পড়বে সমগ্র দেশের ল্থনীতি ও মানুষ।

একটা প্রাচীন নীতিকথা উল্লেখ করে শেষ করা যায়। কথাটি হলো-‘রাজকার্যে যখন বিপত্তি ঘটে তখন প্রজা সাধারণকে তার ফল ভুগতে হয়।’ এখন রাজা নেই। তার স্থলে সরকার আছে। প্রজাও নেই। তার স্থলে আছে জনসাধারণ। সরকার শুরু থেকেই জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায় যে ভজঘট লাগিয়ে দিয়েছিল তার ফল তো জনসাধারণকেই ভুগতে হবে। আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সরকার তো আছেই-আমেরিকা। তাঁদের কর্মকান্ডের ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগও আমাদের ওপরই চাপবে।

(অরুণ কর্মকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)