বিবিসি’র গম্ভীর ব্রডকাস্টার থেকে টিকটক ট্রানজিশন

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা খুব সহজ। ডিজিটাল যুগে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—নিজেকে বদলাতে অস্বীকার করা। মিডিয়া যদি মনে করে ‘আমরা আগের মতোই থাকব’—তাহলে ইতিহাস তাকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেবে। একজন ইনফ্লুয়েন্সার বা প্রভাবক সকালে স্কিন কেয়ার, দুপুরে রাজনীতি আর রাতে প্রেমের পরামর্শ দিতে পারে। এরকম প্রেক্ষাপটে বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে বিবিসি কী করেছে?

আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

একসময় মিডিয়ার রাজনীতি ছিল খুব সোজা—“আমরা বলব, আপনি শুনবেন।” এখনকার মিডিয়া বলে, “আপনি না থামলে আমি শেষ!” এটাই নিউ মিডিয়ার আসল খেলা। এখানে সংবাদ শুধু তথ্য না; এটা মনোযোগের অর্থনীতি। যে চোখ আটকে রাখতে পারবে, সেই টিকে থাকবে। আর এই বাস্তবতায় শতবর্ষী বিবিসিকেও এখন শিখতে হচ্ছে—কীভাবে গম্ভীরতা হারানো ছাড়াই একটু “রিলস-ফ্রেন্ডলি” হওয়া যায়।

মিডিয়া তত্ত্বের ভাষায় এটাকে বলে “মিডিয়া কনভারজেন্স”। আগে রেডিও ছিল আলাদা, টেলিভিশন আলাদা, সংবাদপত্র আলাদা। এখন সবকিছু এক স্ক্রিনে এসে ঠাসাঠাসি করছে, শৈশবে নানুবাড়িতে গেলে কাজিনরা যেমন একখাটে ঘুমায়। আপনি একই অ্যাপে খবরও দেখছেন, বিড়ালের ভিডিওও দেখছেন, আবার পাঁচ মিনিট পরে যুদ্ধের আপডেটও পাচ্ছেন। ফলে বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে হয়েছে—“প্ল্যাটফর্ম বদলেছে, তাই ভাষাও বদলাতে হবে।” কারণ ২০২৬ সালের দর্শক আর ১৯৮৬ সালের দর্শক না। এখন কেউ খবরের জন্য অপেক্ষা করে না; খবরকে অপেক্ষা করাতে হয় যাতে মানুষ স্ক্রল থামায়।

মিডিয়া ব্যবস্থাপনা তত্ত্বের প্রেক্ষিতে দেখলে, বিবিসি আসলে “চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট”-এর এক জীবন্ত কেস স্টাডি। জন কটারের “অ্যাডাপ্ট অর ডাই” স্টাইলের বাস্তব সংস্করণ। প্রতিষ্ঠানটি বুঝেছে—“আমরা শতবর্ষ পুরনো” এই অহংকার দিয়ে টিকটকের অ্যালগরিদমকে ভয় দেখানো যাবে না। অ্যালগরিদমের কোনো আবেগ নেই। সে শুধু দেখে—কতক্ষণ মানুষ তাকিয়ে থাকল। ফলে বিবিসিকে এখন শুধু সংবাদমাধ্যম না, “অডিয়েন্স এক্সপেরিয়েন্স ব্র্যান্ড” (দর্শক-অভিজ্ঞতা নির্ভর ব্র্যান্ড) হিসেবেও ভাবতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক মিডিয়া কনফারেন্সে আলাপ হওয়ার সুযোগ হয়েছে তিন প্রজন্মের সাবেক ও বর্তমান ৪ জন বিবিসি সাংবাদিকের সাথে। এরা হলেন শাকিল আনোয়ার, আকবর হোসেন, আহরার হোসেন ও মোহনা হোসেন। এরা তিনটি প্রজন্মকে প্রতিনিধিত্ব করছে। শাকিল আনোয়ারের বিবিসির কণ্ঠ ছিল ধাতব গাম্ভীর্যের প্রতীক। এখন সেই বিবিসিই রঙিন সাবটাইটেল, দ্রুত কাট, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর “হুক” দিয়ে ভিডিও শুরু করছে মোহনা হোসেনের শর্ট ভিডিওতে। এই দুই প্রজন্মের মাঝের জন অর্থাৎ আকবর হোসেন ও আহরার হোসেনের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম তা হলো- আভিজাত্য ও নতুনত্ব দুটোই তারা ধারণ করার চেষ্টা করেন, যাকে বলে মধ্যপন্থা। আহরার হোসেন এবং আকবর হোসেন বিবিসি ছাড়লেও নিউ মিডিয়ায় যুক্ত হয়েছেন।  সম্প্রতি এই দুজনের মধ্যকার একটি পডকাস্ট নিয়ে আমি প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে লম্বা সময় আড্ডায় মজেছি। শিখেছি- নিউ মিডিয়ার গতিপ্রকৃতি। বুঝতে চেষ্টা করলাম- বিবিসির সাংবাদিকরা কেন মিডিয়ার বিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন হলো- কেন এই বিবর্তন?

জেনারেশন জেডের (নতুন প্রজন্ম) মনোযোগের সময় এখন গোল্ডফিশের সাথেও প্রতিযোগিতায় আছে। তারা “ব্রেকিং নিউজ” শুনে উত্তেজিত হয় না; বরং “এই পাঁচ সেকেন্ডে যা ঘটল…” টাইপ বাক্যে থামে। ফলে মিডিয়াকে এখন তথ্যের পাশাপাশি “প্যাকেজিং সাইকোলজি” বা উপস্থাপনার মনস্তত্ত্ব শিখতে হচ্ছে।

এখানেই আসে “ব্লু ওশান স্ট্র্যাটেজি” (প্রতিযোগিতাহীন নতুন ক্ষেত্র তৈরির কৌশল)। বিবিসি বুঝেছে—টিকটকের কনটেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে একইভাবে প্রতিযোগিতা করে লাভ নেই। কারণ একজন ইনফ্লুয়েন্সার বা প্রভাবক সকালে স্কিন কেয়ার, দুপুরে রাজনীতি আর রাতে প্রেমের পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু বিবিসির কাজ বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা। তাই তারা পুরোপুরি বিনোদনে না গিয়ে “ইনফোটেইনমেন্ট” (তথ্য+বিনোদন) বেছে নিয়েছে। মানে, খবর দেবে, তবে এমনভাবে দেবে যাতে দর্শক পালিয়ে না যায়। অর্থাৎ খবরদারি ছাড়াই খবর দেয়া!

মজার ব্যাপার হলো, বিবিসির এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়েছে পুরনো দর্শকরা। তাদের কাছে বিবিসি মানে ছিল ভারী কণ্ঠ, ধীর গতি, আর শব্দের মধ্যে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। এখন যখন তারা দেখে বিবিসি বাংলা টিকটকে ট্রানজিশন ভিডিও করছে, তখন তাদের মনে হয়—“সভ্যতা বুঝি শেষ!” কিন্তু বাস্তবতা হলো, মিডিয়া কখনো স্থির থাকে না। মার্শাল ম্যাকলুহানের বিখ্যাত তত্ত্ব মাধ্যমই বার্তা আজ আরও বেশি সত্য। মাধ্যম বদলালে ভাষা বদলাবে, ভঙ্গি বদলাবে, এমনকি সংবাদ বলার ছন্দও বদলাবে।

বিবিসির মোবাইল জার্নালিজম বা “মোজো” উদ্যোগ সাংবাদিকতার ধরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিবিসির ব্যবসা প্রতিবেদক ডুগাল শ’ এক মাসব্যাপী ‘মোজো ডায়েট’-এর অংশ হিসেবে কেবল স্মার্টফোন ব্যবহার করে প্রতিবেদন তৈরি করেন, যাতে তিনি প্রমাণ করেন যে মোবাইল ডিভাইস দিয়েও মানসম্মত ফিচার নির্মাণ সম্ভব।

আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আরটিই-র প্রযোজক এলেনর ম্যানিয়ন স্মার্টফোনে ধারণ করা পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য কালেক্টরস’ নির্মাণের মাধ্যমে ইউরোপীয় সম্প্রচার ইতিহাসে এক নজির স্থাপন করেন। তাঁরা দুজনেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন—মোবাইল সাংবাদিকতার সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা, প্রচলিত সংবাদ সংগ্রহের সঙ্গে পার্থক্য, কার্যকর অ্যাপ ও সরঞ্জামের ব্যবহার, এবং কীভাবে স্মার্টফোন সাংবাদিকতার পরিধি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে। (সূত্র- বিবিসি পডকাস্ট, মোবাইল জার্নালিজম স্পেশাল, ২০২২)

বিবিসির মোবাইল জার্নালিজম উদ্যোগ আসলে “অ্যাজাইল ম্যানেজমেন্ট” বা দ্রুত অভিযোজনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার চমৎকার উদাহরণ। আগে যেখানে বড় ক্যামেরা, বিশাল টিম আর স্যাটেলাইট ভ্যান লাগত, এখন একজন সাংবাদিক মোবাইল ফোন নিয়েই মাঠে নামছেন। ঢাকার বিবিসির সাংবাদিক শাহনেওয়াজ রকিকে তাই আমি সারা দেশে ঘুরতে দেখছি। তবে তিনি সশরীরে যেমন ঘোরেন, তার চেয়েও বেশি ঘোরেন অন্তর্জালে। যেন অন্তর্যামী নারদ মুনি। স্বর্গ- মর্ত্য- পাতাল ত্রিলোক কাঁপানো রামায়ন পুরানের মতো শাহনেওয়াজ রকিকে প্রায়ই দেখি সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্ট্রিঙ্গার খুঁজে কম্পোজিট স্টোরি করতে।

কেন বিবিসির এই বদলে যাওয়া? 

উত্তর সহজ- দ্রুত শুট, দ্রুত এডিট, দ্রুত প্রকাশ। কারণ এখন সংবাদ দেরি করলে মানুষ সেটাকে “পুরনো” মনে করে। নিউ মিডিয়ায় “ফার্স্ট” হওয়াটা অনেক সময় “রাইট” হওয়ার চেয়েও বেশি আলোচনায় থাকে। আর এই ভয়ংকর চাপের মধ্যেই বিবিসি চেষ্টা করছে—দ্রুততাকে যেন সত্যের শত্রু না বানানো হয়।

১৯২২ সালের ১৪ নভেম্বর—লন্ডনের এক শীতল সন্ধ্যায় ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল এক নতুন মাধ্যমের। সেদিন প্রথমবারের মতো আকাশপথে ভেসে আসে বিবিসির রেডিও সম্প্রচার। শতবর্ষ পরে, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি সেই একই প্রতিষ্ঠান এখন লিনিয়ার ব্রডকাস্ট থেকে ডিজিটাল জগতে পরিণত হচ্ছে এক পূর্ণাঙ্গ মাল্টিমিডিয়া ইকোসিস্টেমে। শত বছর আগে যে বিবিসি ‘ভয়েস অব ব্রিটেন’ হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, আজ তা হয়ে উঠেছে ‘গ্লোবাল ভয়েস অব নিউজ’—বিশ্বব্যাপী বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ, সংস্কৃতি ও বিশ্লেষণের এক মানদণ্ড।

ডিজিটাল যুগে মিডিয়ার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এখন “অ্যাটেনশন ইকোনমি” বা মনোযোগের অর্থনীতি। আগে সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। এখন প্রতিযোগী হচ্ছে নেটফ্লিক্স, গেমিং, মিম পেজ, ইউটিউব শর্টস, এমনকি মানুষের নিজের অলসতাও। ফলে বিবিসিকে এখন শুধু ভালো সাংবাদিকতা করলেই হচ্ছে না; তাদের “এনগেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি” বা দর্শক সম্পৃক্ততা কৌশল নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। তাই তারা ডেটা অ্যানালিটিক্স বা তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারঅ্যাকটিভ গ্রাফিক্স, এমনকি দর্শকের আচরণ বিশ্লেষণ করে কনটেন্ট বানাচ্ছে। সংবাদ এখন শুধু লেখা না; এটা ডিজাইন, সাইকোলজি, অ্যালগরিদম আর আচরণবিজ্ঞানের মিশ্রণ।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা খুব সহজ। নতুন যুগ নতুন ভাষা চায়। নতুন দর্শক নতুন ছন্দ চায়। মিডিয়া যদি মনে করে “আমরা আগের মতোই থাকব”—তাহলে ইতিহাস তাকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেবে। কারণ ডিজিটাল যুগে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—নিজেকে বদলাতে অস্বীকার করা। নতুন যুগ, নতুন মিডিয়া, নতুন ভাষা, নতুন প্রজন্ম, এসব নিয়েই নতুন স্টাইল। পুরনো ভালোবাসা আঁকড়ে বসে থাকলে কি চলে? বিবিসি বাংলার টিকটক যুগ হয়তো কারও কাছে গেজেট-গ্যাগ, কিন্তু সময়ের সাথে তাল না মেলালে মিডিয়াকে যে অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে! যেন মেয়াদ উত্তীর্ণ পাসপোর্ট, শত শত ভিসা স্টিকার থাকলেও অচল। তাই বিবিসি নিজেকে নবায়ন করেছে।

বিবিসি বাংলার টিকটক ট্রানজিশন আসলে শুধু অডিও থেকে ভিডিওতে বদল না; এটা মিডিয়া সারভাইভালের নতুন মেনিফেস্টো। যেখানে গম্ভীর সংবাদও এখন জানে—কখনো কখনো সত্য বলতেও একটু স্মার্ট এডিট, দ্রুত কাট আর স্ক্রল-স্টপিং থাম্বনেইল লাগে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা এখনো রয়ে গেছে—“জনপ্রিয় হতে গিয়ে কি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে?” এটাই বিবিসির সবচেয়ে বড় ম্যানেজমেন্ট সংকট। কারণ ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হতে শত বছর লাগে, কিন্তু নষ্ট হতে লাগে এক ভাইরাল ভুল। তাই বিবিসি এখন পুলসিরাতের উপর হাঁটছে— ‘চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম, ক্ষুরের চেয়েও ধার’। একদিকে টিকটকের গতি, অন্যদিকে সাংবাদিকতার নৈতিকতা। একদিকে ট্রেন্ড, অন্যদিকে ট্রাস্ট!

 

লেখক,সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়