কত মানুষ খুন করেছেন এই চারজন সাংবাদিক?

ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তর বিরুদ্ধে পাঁচটি খুনের মামলা। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার অভিযোগ ধোপে না টেকায় হত্যা মামলার আসামি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি এবং মোজাম্মেল বাবু। খুনের আসামি একাত্তর টিভির সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও তার স্ত্রী সাংবাদিক ফারজানা রুপা। এই দুজনের যখনই জামিনের চেষ্টা করা হয় তখনই নতুন মামলায় ঢোকে তাদের নাম। দুজন সুপরিচিত সাংবাদিক, একজন স্যাটেলাইট টিভি বস, আরেকজন বাংলা দৈনিকের সম্পাদক দুটি ‘মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ কারাগারে পার করলেন ‘ঢালাও’ মামলায় বন্দী হয়ে, জামিনের অধিকার বঞ্চিত থেকে।

আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত গ্রেফতার হয়ে প্রায় দুই বছর আটক কারাগারে। শ্যামল দত্তের কন্যা শশী কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)-এর কাছে দাবি করেন, তার বাবার বিরুদ্ধে প্রথমে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার অভিযোগ আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সীমান্ত কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগকে ‘সমর্থন’ না করায় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় হত্যা মামলা। শশী সিপিজে’কে জানান, এখন পর্যন্ত তার বাবার নামে পাঁচটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

একইভাবে সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপার পরিবারের একজন সদস্য সিপিজে’র কাছে জানান, “আমরা যখনই কোনো পদক্ষেপ নিই, তখনই নতুন করে একটি হত্যা মামলা দেওয়া হয়”। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৩০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। যার মধ্যে ২০২৫ সালেও করা হয় ৫২টি হত্যা মামলা।

আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট-এর তথ্যমতে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার অবস্থায় কারাগারে আছেন চারজন সংবাদিক। যারা হলেন, মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ এবং শ্যামল দত্ত। অভিযোগ রয়েছে, কিছু সাংবাদিককে কোনো ধরনের হত্যা সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই হয়রানি ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

যেভাবে গ্রেফতার হন তারা

দৈনিক পত্রিকা ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক শ্যামল দত্ত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার হন। সেদিন শ্যামল দত্ত ও বেসরকারি টেলিভিশন একাত্তর টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবুও গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ, তারা ময়মনসিংহ জেলার উত্তরাঞ্চল দিয়ে অবৈধভাবে ভারত প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।

শ্যামল দত্তের কন্যা শশী সিপিজে’র কাছে দাবি করেন, “বৈধ সীমান্ত পারাপার পয়েন্টের প্রায় ২০ মাইল দূরে তাদের আটক করা হয়। সীমান্ত কর্তৃপক্ষ যখন পুলিশের ‘অবৈধ পারাপার’-এর অভিযোগ সমর্থন করেনি, তখন তাদের বিরুদ্ধে ঢাকায় ৫ই অগাস্ট নিহত ফজলুর রহমান নামে এক ব্যক্তির হত্যা মামলায় জড়ানো হয়।“

একইভাবে ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট আটক হন একাত্তর টিভির সাবেক বার্তা প্রধান শাকিল আহমেদ, তার স্ত্রী একই টেলিভিশন চ্যানেলের মুখ্য প্রতিবেদক ফারজানা রুপা। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের আটক করা হয়। ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদকেও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তাদের পরিবার সিপিজে-কে জানায়, “সর্বশেষ পাঁচটি মামলার কোনো সরকারি নথি তারা পাননি, যার ফলে তারা জামিনের আবেদনও করতে পারছেন না।“

জামিন ও হত্যা মামলা নিয়ে প্রশ্ন

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা এবং জামিন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জোর দিয়ে জানান, আইনের দৃষ্টিতে জামিন কোনো দয়া নয়।

তিনি বলেন, “জামিন হলো মৌলিক অধিকার। যার ভিত্তি হলো “দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ” থাকার ধারণা। সেই কারণে, বিচার শুরুর আগেই কাউকে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা ন্যায়বিচারের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান হত্যা মামলাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে মনে করেন এবং এ ধরনের মামলায় জামিন আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে বলে জানান।

“আদালত সাধারণত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তদন্তের অগ্রগতি, এবং আসামির বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য উপাদান আছে কিনা—এসব বিষয় বিবেচনা করে। তবে বাস্তবতায় আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক আসামিকে একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যেখানে ব্যক্তিগত দায় স্পষ্ট নয়। এই প্রেক্ষাপটে জামিন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নানান প্রশ্ন তৈরি করে,” বলেন হাবিবুর রহমান।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন আলাপকে বলেন, “এটা তো ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এভাবে ঢালাও মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে মাসের পর মাস আটকে রাখা। বাংলাদেশে এমন কখনো হয়নি। আমরা সবাই জানি তাদের জামিন পাওয়ার অধিকার আছে। আমাদের আদালতগুলোর যে ভূমিকা রাখার কথা, সেটাও তারা শক্তিশালীভাবে পালন করতে পারছে না।“

অধ্যাপক কার্জন মনে করেন মামলাগুলো প্রতিহিংসামূলক। তার মতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি টার্গেট করে সাংবাদিকসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে জেলে আটকে রেখেছে।

“শুধু তো সাংবাদিক নয়। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাবেক প্রধান বিচারপতি কেউ তো রেহাই পায়নি। এসব করা হচ্ছে ভয় দেখানোর জন্য। মুক্তিযুদ্ধ ধারার রাজনীতি বাংলাদেশে নির্মূল করে দেয়ার জন্য এমনটা শুরু করেছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার", বলেন অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মনে করেন যারা আটক আছেন, জামিন পাচ্ছেন না, তাদের বিনা বিচারে আটক করে রাখা হয়েছে।

“সাংবাদিকতা সংক্রান্ত যদি কোনো ব্যত্যয় করে থাকে, সেটা নিয়ে মামলা হতে পারে। কিন্তু বিনা বিচারে এভাবে আটকে রাখার মতো নিপীড়ন মধ্যযুগীয় সমাজেও হয়নি”, বলেন তিনি।  

হত্যা মামলা হলেও নির্দিষ্ট অনেকের বিরুদ্ধে বিগত সরকারকে তোষণ করার অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিক নাজনীন মুন্নী আলাপ-কে বলেন, “যদি সঠিক বিচার করতে হয় তাহলে নতুন আইন করতে হবে। যে আইনে বলা থাকবে কখনো কোনো ব্যক্তি কিংবা দলকে তোষামোদ করা যাবে না। তাই বলে কোনো সরকারের মেয়াদ দীর্ঘ করতে সহায়তা করার অভিযোগ এনে খুনের মামলায় প্রায় দুই বছর ধরে আটকে রাখা অন্যায় এবং অপরাধ।“  

অধ্যাপক কার্জন মনে করেন দলবাজি সাংবাদিকতা হয়েছে। অনেক শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীও দলবাজি করেছেন। সেক্ষেত্রে কেউ যদি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থেকে দুর্নীতি করে থাকেন তাহলে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হোক। কিন্তু এভাবে ঢালাও হত্যা মামলার কোনো মানে হয় না। এগুলোর একটা মামলাও টিকবে না।

এছাড়াও নাজনীন মুন্নী যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সিএনএন নিউজকে পছন্দ করেন না। তাই বলে কি তিনি সিএনএন বন্ধ করে দিয়েছেন? নাকি তাদের কোনো সাংবাদিকদের আটক করে জেলে রেখে দিয়েছেন?”

মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আলাপ-কে বলেন, “সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রায় দুই বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে রাখা হলে তা ব্যক্তিস্বাধীনতা, ন্যায় বিচারের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নকে গুরুতরভাবে সামনে নিয়ে আসে।“

যে কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে যদি গুরুতর অভিযোগ আনা যায়। তবে সেক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন বলে জানান আবু আহমেদ ফয়জুল কবির।

“অভিযোগ যদি দুর্বল বা ভিত্তিহীন হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে জামিন না দিয়ে আটক রাখা হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়", বলেন আবু আহমেদ ফয়জুল কবির।

‘অন্যায্য বা অন্যায়ভাবে’ কোনো মামলা হওয়া উচিৎ না এবং স্বাধীন দেশে এটা চলতে পারে না বলে মনে করেন জবান ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনি। 

“অলরেডি এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা নিয়ে উনি দেখবেন। আমার ধারণা দ্রুতই এটার সমাধান হবে। অন্যায্য বা অন্যায়ভাবে কোনো মামলা হবে না। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ-এটা যথাযথ প্রমাণ, তদন্ত হবে, হয়ে একটা ব্যবস্থা হবে।” 

“কিন্তু ওই যে একটা মার্ডার মামলা দেওয়া, বেল যখন হবে, কারাগার থেকে আবার আটক করা- এই ধরনের প্রহসন স্বাধীন দেশের মানুষ আর দেখতে চায় না।” 

রনি বলেন, “আমি মনে করি, সরকার এ বিষয়টায় গুরুত্ব দেবে। একটা মিস ট্রায়াল বা ভুল ট্রায়াল কিন্তু বিচার না হওয়ার চেয়ে জঘন্য, এটা সবাই আমরা জানি। সো এই দিকগুলো থেকে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের। আমি আশা করি, এ দিকগুলোতে সরকার দ্রুত নজর দিবে এবং সুরাহা হবে।”  

“তাদেরকে হরেদেরে খুনের মামলা দেওয়ার বিপক্ষে আমিও। কিন্তু তাদেরকে বিচার হতে হবে। বিচার না হলে গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতা বা স্বাধীন মত প্রকাশের যে কথা আমরা বলি, সেই প্রক্রিয়া বা ধারাবাহিকতাই শুরু হবে না। তাদের প্রপার বিচার হতে হবে।” 

রেজাউল করিম রনি আরও বলেন, “বিচারের নামে হয়রানি বা বিচারের নামে অবিচার বা পলিটিক্যাল ট্রায়াল এগুলো করা যাবে না। তাদের নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করে বিচার করতে হবে। তাহলে দেশি-বিদেশি যে প্রশ্নগুলো উঠছে, এগুলো সুযোগ পাবে না।”   

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কমবেশি সবসময় নাজুক অবস্থায় ছিল। সেক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে সরকারকে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।

“গণমাধ্যমের প্রধান কাজ সুশাসনকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং জনগণের অধিকারকে সুরক্ষিত করা। সেটা আমাদের দেশে সম্ভব হয়নি সরকারের নানা সংস্থা গণমাধ্যমের উপর চাপ প্রয়োগ করেছে", বলেন অধ্যাপক কার্জন।

একটি দেশের গণমাধ্যম কীভাবে চলবে সেটা নির্ভর করে সেই দেশের পলিটিক্যাল সিস্টেমের উপর। একই সঙ্গে পলিটিক্যাল সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে তার প্রভাব গণমাধ্যমের ওপর পড়বে, পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে যাবে। বাংলাদেশে এমনটাই হচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী।  

সাইফুল আলম চৌধুরী আলাপ-কে বলেন, শুধু ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্র আসে না। রাষ্ট্রের নিবর্তনমূলক আইন তো আছে। সেটা এখনও ব্যবহার হচ্ছে। পলিটিক্যাল সিস্টেম তো পরিবর্তন হয়নি, তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আশা করাও ঠিক নয়। রাষ্ট্র ততটুকুই স্বাধীনতা দেয় যতটুকু তার জন্য খুব বেশি ক্ষতি হবে না।

তবে নাজনীন মুন্নী মনে করেন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিগত সরকারকে তোষণ করার যে অভিযোগ তা অনেকাংশে সত্য। 

তিনি আলাপ-কে বলেন, “পৃথিবীর কোনো আইনে বা বাংলাদেশের কোনো আইনে কি আছে- কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থনের কারণে কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটকে রাখা যায়?”

জবানের সম্পদক রনি ফিরে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলের সময়। 

তিনি বলেন, “বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে বাংলাদেশে কোনো সাংবাদিকতা ছিলো না। কারণ, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও ফ্যাসিবাদ-দুইটা একসঙ্গে এক্সিস্ট করতে পারে না।” 

ওই সময়ে ‘আওয়ামী লীগ’ মনোভাবাপন্ন সাংবাদিকদের দায়ী করে তিনি বলেন, “আইনের শাসন এবং যথোপযুক্ত রিকনসিলিয়েশনের কথা বলেছিলাম। কারণ, একটা হচ্ছে ফৌজদারি অপরাধ যারা করেছে তাদেরটা। আরেকটা হচ্ছে- মব উৎপাদন করেছে ফ্যাসিবাদের পক্ষে, গণহত্যার পক্ষে, তাদের অপরাধ আরেকরকম।” 

“এগুলোকে প্রপারলি অ্যাড্রেস না করে, প্রপার আইনানুগ পথে না গিয়ে হরেদরে তারা মার্ডার মামলা দিছে, খুনের মামলা দিছে, অন্যান্য মামলা দিছে। দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুধু সাংবাদিকই না, অন্যান্য পেশাজীবী, অন্যান্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতি সেই আওয়ামী আচরণই করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ যেটা এতদিন বিএনপি-জামায়াতের প্রতি করছে। এই যে বিচারহীনতার যে, আওয়ামী সংস্কৃতি, এইটারই শিকার হয়েছে এই আওয়ামী সাংবাদিকগুলো। তারা মূলত সাংবাদিক না, তারা হলেন পার্টিজান জার্নালিস্ট। প্রফেশনালিজমকে তারা ব্যবহার করেছেন ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য।”     

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে বর্তমান সরকারের ভূমিকা

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি আলাপকে বলেছিলেন, “যারা একটা মাফিয়া সরকারকে ক্ষমতায় রাখার জন্য ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, তাদের অপরাধ খুনের চেয়েও বেশি। কিন্তু যে মামলা করা হয়েছে, সেটা প্রবলেমেটিক। এটা সঠিক নয়। মনে রাখতে হবে সরকার বিচার বিভাগ না। সুতরাং সরকারের তরফ থেকে কী কী করা যায় সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” 

“আমি বলতে পারি, সরকার যেসব মামলার বাদি আছে, সেসব মামলা কীভাবে লিগ্যাল প্রসেসের মধ্যে পারসু করা যায়, সেসব নিয়ে আলোচনায় আছে”, বলেছিলেন ডা. জাহেদ।  

তবে অন্তর্বর্তী সরকার আমলকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় মনে করেন সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার ড. ইউনূস-এর পুরো সময়টাই বাংলাদেশের সাংবাদিকরা সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে খুনের মামলা হয়েছে। অসংখ্য সাংবাদিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে ছিল মব কালচার।”

তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন নতুন রাজনৈতিক সরকার এই ধরনের মামলাগুলোকে তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করবেন। 

ইশতিয়াক রেজা বলেন, “সাংবাদিকতাকেও দখলমুক্ত করবে এই সরকার। অন্ধকার থেকে আলোর জগতে নিয়ে আসা হবে।“

সাংবাদিক নাজনীন মুন্নীও মনে করেন যেহেতু বর্তমান সরকার প্রধান প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি করবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন। তার ছাপ আমরা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দেখতে পাবো।

মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আলাপ-কে বলেন, সরকার চাইলে বিচারাধীন এসব মামলার একটি সমন্বিত পর্যালোচনা করতে পারে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ বা দীর্ঘসূত্রীতা স্পষ্ট।

তিনি মনে করেন আইনগত কাঠামোর মধ্যেই দ্রুত তদন্ত, যুক্তিসঙ্গত জামিন এবং স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এর ফলে ভিত্তিহীন মামলায় কেউ অযৌক্তিকভাবে হয়রানির শিকার হবে না। যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও বর্তমান সরকার আমলে কার্টুন ফেসবুকে শেয়ার করার অভিযোগে গ্রেফতার হন হাসান নাসিম। তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়। এছাড়াও ফেসবুকে পোস্টের কারণে জামায়াতে ইসলামীর দুইজন সমর্থক ও শ্রীনগরে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে ২৪এ এপ্রিল উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের উচিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। 

ভিন্নমত দমনে আইনের অপব্যবহারের বন্ধে সংশোধনেরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।