আয়নাবাজি: দণ্ডিত ‘আলমাছ’ কানাডায়, বাংলাদেশে জেল খাটলেন ‘আলমাস’

একজনের নামে সাজা, অন্যজনের কাঁধে তার বোঝা। নামের সামান্য পার্থক্য আর ঠিকানার ভুলের কারণে প্রায় এক বছর কারাগারে থাকতে হলো একজন নির্দোষ মানুষকে।

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম

২০২৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর ঢাকার দোহার উপজেলায় সুন্দরীপাড়া গ্রামে যায় চর মোহম্মদপুর পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল। সঙ্গে একটা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ২২ বছর আগের এক অস্ত্র মামলায় সাজা পেয়ে পলাতক থাকা আলমাছকে ধরার জন্য। 

কিন্তু পুলিশ যাকে গ্রেপ্তার করে তার নাম আলমাস। বয়স ৪১ বছর, চাষবাস করেন, মাঝে মধ্যে ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজও করেন।

গ্রেপ্তারের সময়ই গ্রামের লোকজন পুলিশকে বলেছিল, এই ব্যক্তি সেই আলমাছ না। পরিবারের লোকজন এনআইডিও দেখান। তাতেও কাজ হয়নি। আলমাস জেলে গেলেন।

প্রায় এক বছর পর, হাইকোর্ট তাকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। রবিবার বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার বেঞ্চ কারা কর্তৃপক্ষকে এই আদেশ দেন। 

এ বিষয়ে রিট হওয়ার পর হাইকোর্ট একটি বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের করা সেই অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে যে দুইজন আলাদা মানুষ, বলে জানিয়েছেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব‍্যারিস্টার মহিউদ্দীন মো. হানিফ।

“আসল আসামি আলমাছ এখন কানাডায়। কারাগার থেকে আলমাস নিজেই হাইকোর্টে রিট করেছিলেন,” আলাপকে  বলেছেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।

দুইজনের নামের বানানে সামান্য পার্থক্য। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম ‘আলমাছ’, আর যাকে কারাগারে যেতে হয়েছে তার নাম ‘আলমাস’। 

দুই দশক পুরোনো মামলা

ঘটনার শুরু ২০০২ সালের ১০ই এপ্রিলে। সেদিন মিরপুরের হাজী রোড থেকে ২৪ বছর বয়সী আলমাছ এবং ২২ বছর বয়সী নাজমুল আলম মামুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার এজাহার অনুযায়ী, আলমাছের কোমরে গোঁজা ছিল একটি পয়েন্ট থ্রি টু বোরের রিভলবার। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা হয়।

এজাহারে আলমাছের বাবার নাম লেখা হয় খলিল আহম্মেদ। স্থায়ী ঠিকানা দোহারের পূর্ব ধোয়াইর আর বর্তমান ঠিকানা মিরপুরের পাইকপাড়া বলে উল্লেখ করা হয়।

গোলমালটা বাধে যখন আসামিকে আদালতে পাঠানোর সময় তদন্ত কর্মকর্তা নথিতে স্থায়ী ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইরের বদলে লেখেন দক্ষিণ বাহ্রা। পরে পুলিশের প্রতিবেদন, আদালতের রায় এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও সেই ঠিকানাই রয়ে যায়।

২০০৪ সালের জুনে ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ আসামি আলমাছকে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। রায়ের সময় তিনি পলাতক ছিলেন। আরেক আসামি নাজমুল আলম মামুন খালাস পান।

দক্ষিণ বাহ্রা নিয়ে বিভ্রান্তি   

হাইকোর্টের নির্দেশে করা বিচারিক অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, দক্ষিন বাহ্রা আসলে ডাকঘরের নাম। সেখানকার পোস্টমাস্টার লিখিতভাবে জানিয়েছেন, এর আওতায় ১১টি গ্রাম রয়েছে। যার মধ্যে বাহ্রা ও পূর্ব ধোয়াইরও রয়েছে। 

এলাকার মানুষ অনেক সময় গ্রামের নামের বদলে ডাকঘরের নাম ব্যবহার করেন। ফলে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ ঠিকানাটি দুই গ্রামের বাসিন্দার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে।

কারাগারে থাকা আলমাসের বাবা শেখ খলিলের পরিবার একসময় বাহ্রা গ্রামে থাকতেন। ২০০৭ সালে নদী ভাঙনে ঘর-বাড়ি হারিয়ে তারা সুন্দরীপাড়া গ্রামে চলে আসেন। শেখ খলিলের তিন ছেলের একজন আলমাস।

অন্যদিকে, অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আলমাছের বাবার নাম নথিতে খলিল আহম্মেদ। নামের এই মিল আর ঠিকানা বিভ্রান্তির কারণেই শেষ পর্যন্ত আলমাসের কাছে পৌঁছে যায় পুলিশ।

গ্রেপ্তারের দিন যা হয়েছিল

চর মোহম্মদপুর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই জুবাইদুল হক, যিনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি তামিল করেছিলেন, তার জবানবন্দিতে বলেছেন, আলমাসকে গ্রেপ্তারের পরপরই পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছিলেন তার বাবার নাম শেখ খলিল, খলিল আহম্মেদ নয়। তারা আলমাস ও তার বাবার এনআইডিও দেখিয়েছিলেন।

এসআই জুবাইদুল দাবি করেছেন, তিনি বিষয়টি থানার ওসি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। সরকারি মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে আলমাসের ছবি ও এনআইডি পাঠিয়েছিলেন। এরপর আলমাসকে আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। আলমাসকে প্রথমে দোহার থানায় রাখা হয়, পরদিন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মোহম্মদপুর গ্রামের ইউপি মেম্বার উজ্জ্বল হোসেনও তার জবানবন্দিতে বলেছেন, গ্রেপ্তারের দিন তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন এই আলমাসের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই বা তিনি সাজাপ্রাপ্ত নন। জবাবে পুলিশ তাকে বলেছিল, ‘উপরের নির্দেশ আছে’ বলে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

একই প্রতিবেদনে আলমাসের স্ত্রী বন্যা আক্তারের জবানবন্দি রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগেও একবার পুলিশ আলমাসকে গ্রেপ্তার করতে এসেছিল। তখন স্থানীয় লোকজন পুলিশকে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে এই আলমাস সেই সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন।

হাইকোর্টে আলমাসের করা রিট আবেদনে আরও বলা হয়েছে, নামে মিলের কারণে ২০১৮ সালে একই মামলায় তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে নাম ও ঠিকানায় আংশিক ভুল থাকার কথা উল্লেখ করে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের উপস্থিতিতে তাকে বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়।

আলমাসের বাবা শেখ খলিলের বয়স ৭০ বছর। অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তিনি বলেছেন, তার তিন ছেলে, সেলিম, আলমাস ও আল-আমিন এবং দুই মেয়ে, আসমা ও নাজমা। তার দাবি, তার ছেলে কখনও ঢাকা যাননি। নিজের ও সন্তানদের এনআইডি ও পাসপোর্টের কপি এবং বিদ্যুৎ বিলের কপিও জমা দিয়েছেন তিনি।

হাইকোর্টের নির্দেশে জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি

কারাগারে যাওয়ার পর আলমাস হাইকোর্টে রিট করেন। এই বছরের ৬ই সেপ্টেম্বর বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার বেঞ্চ রুল জারি করেন। 

একই সঙ্গে সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ এবং কারাগারে থাকা আলমাস একই ব্যক্তি কি-না তা যাচাই করতে ঢাকার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তার তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অনুসন্ধান পরিচালনা করতে আদেশ দেন।

অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান। তিনি দোহারে গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য নেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে মহানগর দায়রা জজের আদালতের রেকর্ডরুম থেকে ২০০২ সালের মামলার নথিও পরীক্ষা করেন।

সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন তাকে জানিয়েছেন, তাদের দাদার নাম শেখ শহর আলী। আলমাছের বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান। তিন বোনের একমাত্র ভাই আলমাছ। বোনদের নাম, রেখা, লিপি ও শিল্পী। তাদের পরিবার মিরপুরে থাকতো, পূর্ব ধোয়াইরে না। আরও এক সাক্ষী কাউসার মাহমুদ, যিনি আলমাছের দূরসম্পর্কের ভাগ্নে, একই তথ্য দিয়েছেন।

দু’জনেই জানিয়েছেন, সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ এখন কানাডায় তার বোন রেখার সাথে থাকেন। অনুসন্ধান প্রতিবেদন বলা হয়েছে, আলমাছের নিজের আত্মীয়রাই তার পরিচয় সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তারা আসামিকে আড়াল করার চেষ্টা করেনি, সেকারণে তাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নথিপত্রেও দুইজনের পরিচয়ের পার্থক্য স্পষ্ট। সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের নাগরিক সনদে তার বাবার নাম খলিল আহাম্মদ। তবে তার বাবার প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সে নাম মো. আবুল খায়ের (খলিল), সেখানে আলমাছের দাদার নাম শেখ শহর আলী।

অন্যদিকে, আলমাসের বাবা শেখ খলিলের এনআইডিতে তার পিতার নাম শেখ নওয়াব আলী।

সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের ২০০২ সালের মামলার ওকালতনামা এবং ২০০৩ সালে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশে তার ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইর দেওয়া রয়েছে, দক্ষিন বাহ্রা নয়। বিচারিক অনুসন্ধানের প্রতিবেদনে হাইকোর্টের জামিন আদেশকে পরিচয় নির্ধারণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসাবে দেখা হয়েছে।

বয়সের হিসাবও মিলে না। দণ্ডিত আলমাছের বয়স ২০০২ সালের ছিল ২৪ বছর। এখন তার বয়স প্রায় ৪৮ বছর। অন্যদিকে, কারাগারে থাকা আলমাসের জন্ম ১৯৮৫ সালে। অস্ত্র মামলার সময় তার বয়স ছিল ১৭-এর কাছাকাছি। 

এছাড়া, দুইজনের মায়ের নাম, ভাই-বোনের নাম এবং পারিবারিক তথ্যেও কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

যেসব তথ্য মেলানো যায়নি

বিচারিক অনুসন্ধানের প্রতিবেদন কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছে। ২০০২ সালের মামলার গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তা ও তদন্ত কর্মকর্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কারা কর্তৃপক্ষের কাছেও আসল আসামির ছবি বা আঙুলের ছাপ সংরক্ষিত নেই।

মামলায় খালাস পাওয়া নাজমুলের ঠিকানায় কয়েকবার গিয়েও সন্ধান মেলেনি। মিরপুরের পাইকপাড়ায় আলমাছের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও কেউ তাকে চেনে না।

তাই ছবি বা আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সাক্ষীদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন নথিপত্রের ভিত্তিতেই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বিচারক।

প্রতিবেদনে আলমাসের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়টি উঠে এলেও এই ঘটনার জন্য কারও দায় নির্ধারণ বা তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি।

তবে আলমাসের করা রিটে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে বলে আলাপকে জানিয়েছেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মারিয়া তানজিমাৎ, যিনি রবিবারের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন।

“আদালত যে রুল জারি করেছিলেন তার নিষ্পত্তি হয়নি এখনও। বিচারিক অনুসন্ধানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত রবিবার আলমাসকে অবিলম্বে কারাগার থেকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তী শুনানিতে এই ব্যাপার নিয়ে যুক্তি-তর্ক হবে।”