অবশেষে ইসরায়েলের ক্ষমতার পালাবদল হতে যাচ্ছে। ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনামলের ইতি ঘটতে যাচ্ছে বলা যায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যখন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিলেন তখন থেকেই নেতানিয়াহুর বিদায়ের সময় গণনা শুরু হয়ে গেছে।
খুব কম সময়ে রাজনীতিতে এসে এমন সুযোগ পাবেন আইজেনকট সেটা হয়ত অনেকেই চিন্তা করতে পারেননি। রাষ্ট্রপতির ঘোষণার আগ পর্যন্তও নেতানিয়াহু ভেবেই নিয়েছিলেন তিনি আবার ক্ষমতায় বসবেন। ছড়ি ঘোরাবেন মধ্যেপ্রাচ্যে। ইরান, প্যালেস্টাইনে মুহুর্মুহ বোমা বর্ষণের স্বপ্নও হয়ত দেখছিলেন। কষছিলেন নতুন যুদ্ধ পরিকল্পনা। কিন্তু তার পরিকল্পনায় বাধ সাধে সয়ং দেশটির রাষ্ট্রপতি।
ঠিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের পরে নেতানিয়াহু এমন ধাক্কা খেলেন। জোট হিসেবে আইজেনইকটের চেয়ে বেশি আসন পেয়েও সরকার গঠনের অনুমতি না পাওয়ার এটাও একটা কারণ হিসেবে অনেকে দেখছেন।
এর আগে ২৮-এ অক্টোবর পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নির্বাচনে দুজনের কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। তাই সেদিন থেকে আলোচনা ছিল কে হবেন পরবর্তী সরকার প্রধান। সরকার গঠন করতে তাদের প্রয়োজন জোট সঙ্গীদের। যাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুপূর্ণ অবস্থায় আরব জোট। তাদের সাথে যারা জোট করবে তারাই সরকার গঠন করতে পারবে- এমন আলোচনায় চলছিল।
নেতানিয়াহু নাকি আইজেনকট- কে যাবেন আরব জোটের দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে। শুধু এই দুজন গেলেই হবে না, আরব জোটের দলগুলো কার সাথে আসবেন সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। অবশেষে এক সপ্তাহের বেশি দরকষাকষি করে জোট গঠনে এগিয়ে গেছে গাদি আইজেনকট।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, নতুন পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা শেষে আইজেনকটের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য ৬৭টি সুপারিশ জমা পড়ে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশ করেন ৪৬ জন।

তবে সরকার গঠনে ব্যর্থও হতে পারেন আইজেনকট। তার হাতে সময় ২৪ দিন। যদিও অতিরিক্ত আরও ১৪ দিন সময় পাবেন তিনি। যদি সময়ের মধ্যে করতে তিনি ব্যর্থ হন তাহলে প্রেসিডেন্ট নেসেটের অন্য আরেকজন সদস্যকে নতুন করে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন।
নতুন মনোনীয়ত এ প্রার্থীও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। ওই ব্যক্তিকে সরকার গড়তে ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে। এরপরও যদি অচলাবস্থা বজায় থাকে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নেসেট ভেঙে দেওয়া হবে। ইসরায়েলে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এখন মূল যে আলাপ তা হলো কে এই গাদি আইজেনকট। তিনি যদি সরকার গঠন করেন তাহলে ইরান, প্যালেস্টাইন নিয়ে তার নীতি কেমন হতে পারে, নেতানিয়াহুর সাথে তার পার্থক্যই বা কী?
কে এই আইজেনকট?
পুরো নাম গাদি আইজেনকট। তিনি রাজনীতিতে নতুন। প্রায় চার দশক সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। সামরিক জীবনে ২০১৫-১৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন দেশটির সেনাপ্রধান।
২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন আইজেনকট। তিনি ‘ইয়াশার’ নামে দল গঠন করেন। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশলের অভাবের অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের জুনে তিনি পদত্যাগ করেন।

ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক ইতিহাসে অন্যতম একটি ঘটনা ঘটেছিল তার সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায়। ২০১৬ সালে হেবরনে আহত এক ফিলিস্তিনি হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করেন ইসরায়েলি সেনাসদস্য সার্জেন্ট এলর আজারিয়া। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ডানপন্থি রাজনীতিকদের চাপ থাকলেও আইজেনকট সামরিক তদন্ত ও বিচারের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা রক্ষার স্বার্থেই এমন অবস্থান নিয়েছেন।
গাজায় যুদ্ধে তার ছেলে গাল আইজেনকট ও দুই ভাতিজা নিহত হন। ছেলের মৃত্যুর পর দেওয়া অঙ্গীকারকে নিজের রাজনৈতিক দায়িত্বের কেন্দ্রে রেখেছেন তিনি।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথে লেখা এক নিবন্ধে আইজেনকট বলেন, “গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে এবং তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, যাদের তারা চিনতো কিংবা চিনতো না তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবো না।”
তিনি বলেছেন, এই অঙ্গীকারই তার রাজনৈতিক লক্ষ্য ও দায়িত্ব পালনের অন্যতম প্রধান প্রেরণা।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের পার্থক্য কী?
সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট একজন দক্ষ সামরিক পরিকল্পনাবিদ। তার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বের ধরন ও আচরণে নেতানিয়াহুর চেয়ে আলাদা। তার নির্বাচনি প্রচারের বিলবোর্ডে তাকে তুলে ধরা হয়েছে ‘একজন যোদ্ধা, একজন নেতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠাকারী’ হিসেবে।
আইজেনকটের দলের নাম ইয়াশার। এর অর্থ হলো সহজ বা সোজা পথ। সিএনএনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, জিম্মি হওয়া ইলি শারাবির একটি বক্তব্য থেকে নামটি অনুপ্রাণিত। তিনি বলেছিলেন, “এটা ডানপন্থি নয়, বামপন্থিও নয়, এটা সোজা পথ।”

আইজেনকটের নির্বাচনি প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
তিনি সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন । বিদায়ী নেতানিয়াহু সরকারের জোটে এমন কয়েকটি দল রয়েছে, যারা অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পক্ষে।
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও নিরাপত্তা ও সামরিক নীতির ক্ষেত্রে আইজেনকটও কঠোর অবস্থানের অনুসারী। এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার অনেক অবস্থানের মিল আছে। নেতানিয়াহুর প্রায় সব প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো তিনিও গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে মোটাদাগে সমর্থন করেছেন।
ইরানের বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের মূল লক্ষ্যগুলোর মিল রয়েছে। দুজনই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং তেহরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক দুর্বল করার পক্ষে।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল না থাকায় নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। তাঁর মতে, সামরিক অভিযানে অর্জিত সাফল্যের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও থাকতে হবে।
গাজা যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়েও নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছেন। শেষ পর্যন্ত এই অভিযোগই তাকে নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তার বক্তব্য বা অবস্থান থেকে বলা যায় তিনি নেতানিয়াহুর চেয়ে কম রূঢ়। যেমনটা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপিকে বলেছিলেন ফিলিস্তিনের এক বাসিন্দা। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে ইসরায়েলের নির্বাচনে তিনি কাকে বেছে নেবেন। তিনি বলেছিলেন, ফিলিস্তিন নিয়ে ইসরায়েলের সব নেতার নীতিই রূঢ়; তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা ‘দুই শয়তানের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম শয়তানকেই’ বেছে নিতে চান।
তার মতো অনেকেই আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রত্যাশা করার কারণ হলো, তিনি গাজা নিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত চুক্তির সমর্থক।
প্যালেস্টাইন নিয়ে আইজেনকটের নীতি
আইজেনকট সামরিক বাহিনীর বলয় থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিবিদ। তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের মধ্যে কিছু ডানপন্থি দল থাকতে পারে। যারা ইসরায়েলের কৌশল পরিবর্তন মেনে নিতে রাজি নয়। গাজার বিষয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অথবা তার ভাষায়, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ‘সৃজনশীল’ পদক্ষেপ
নেওয়ার কথা বলেছেন।
বাস্তবে নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্যও অনেকটা একই রকম। তবে আইজেনকটের যুক্তি, “নেতানিয়াহু
যত দিন ক্ষমতায় থাকবেন, হামাস তত দিন ক্ষমতায় থাকবে।”
তবে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের হামলার পর থেকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করে আসছেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, এখনো যারা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কথা বলেন, তারা ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’। তবে এর বিকল্প হিসেবে তিনি কী ধরনের সমাধান চান, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেননি।
অন্যদিকে পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করা এবং সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করেন আইজেনকট। পশ্চিম তীরের বিতর্কিত ই-১ এলাকায় ইসরায়েলি সরকারের নতুন বসতি নির্মাণ পরিকল্পনাকে তিনি ‘ভুল’
বলে অভিহিত করেছেন। তার যুক্তি, এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে।
সরকার গঠনের সমীকরণে আরব জোট
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি লিকুদ পার্টি এবং তাদের কট্টর ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় মিত্ররা পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকটের মধ্যপন্থি ইয়াশার পার্টি এবং তার জোটের আরও তিনটি ইহুদি দল পেয়েছে ৪৮টি আসন।
এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি জোট ইউনাইটেড আরব লিস্ট ও জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে মোট ১৯টি আসন। আরব ভোটারদের মধ্যে ভোটদানের হার বেড়ে যাওয়ায় এই ফল এসেছে। ফলে সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাদের সামনে।
সিএনএন, এপি, বিবিসি, আল জাজিরা অবলম্বনে



