“খুনি আমাদের চিনেছিলেন। সম্ভাব্য পরিণতিও তিনি বুঝেছিলেন। তবে আমরা তাকে চেহারায় চিনতাম না। এই সুযোগটিই কাজে লাগান তিনি। আমরা তাকেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম মোজাফফর হোসেনের বাসা কোনটি। ধীরস্থিরভাবে বাসা দেখিয়ে দিলেন। আমরা সেখানে গেলাম। বাড়ির ভেতরে-বাইরে ভাঙচুর হলো। কিন্তু তাকে পেলাম না। এরই মধ্যে পুলিশ এলো। বেপরোয়া মারধরের শিকার হলাম আমরা।”
১৯৯৭ সালের নভেম্বরে হাতের কাছে পেয়েও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি মোজাফফর হোসেনকে ধরতে না পারার ঘটনা আলাপ-কে বলছিলেন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক খোরশেদ আলম মিন্টু।
মিন্টু বলেন, “ওই নভেম্বরের দিন-তারিখ এখন আর মনে নেই। জেলা বিএনপির কার্যালয়ে বসেছিলাম। হঠাৎ খবর এলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খুনি মোজাফফর হোসেন হোসেনপুরের আল মাহমুদ সড়কে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। হালকা শীতের সন্ধ্যা। আমরা সেখানে সঠিক সময়েই পৌঁছেছিলাম। তবে চেহারা অচেনা থাকায় মোজাফফর হাতের নাগালে এসেও পালিয়ে যেতে পারলেন।”
মিন্টু আরও বলেন, “পরে সিনিয়র অনেকের কাছে চেহারা বর্ণনা করে জানতে পারি মোজাফফরের কাছেই আমরা তার বাসার ঠিকানা জানতে চেয়েছিলাম।”
সিরাজগঞ্জে প্রকাশ্যেই ছিলেন মোজাফফর
২০১৯ সালের ৩১এ মার্চ। সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে শহরের শহীদ এম মনসুর আলী মিলনায়তনে গুণিজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে যারা সংবর্ধনা পান, তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আবদুর রউফ মুক্তা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই পলাতক তিনি। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে 'স্যুভেনির' প্রকাশ করেছিলো সিরাজগঞ্জ পৌরসভা। তাতে প্রকাশিত ছবিতে মোজাফফরকে মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসাবে উল্লেখ করা হয়। ছবিতে তার নাকের ঠিক নিচে একটি তিল বা আঁচিলসদৃশ কালো দাগ দেখা যায়।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর মোজাফফরের এই জন্মচিহ্ন আলোচিত হয়। নাকের নিচে থাকা এই জন্মচিহ্ন তাকে গ্রেপ্তারে ভূমিকা রেখেছে বলে এরই মধ্যে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে মোজাফফর তার ছোটোভাই পরাগকে সাথে নিয়ে স্থানীয় প্রেস ক্লাবে যান। সাংবাদিকদের সাথে কিছুটা সময়ও কাটান বলে আলাপ-কে জানান এক প্রবীণ সাংবাদিক।
তিনি বলেন, “আমরা জানতাম তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় অভিযুক্ত। সিরাজগঞ্জে তার অবাধ যাতায়াত ছিলো। সামাজিক অনুষ্ঠানেও তিনি যেতেন। এটা ওপেন সিক্রেট’ ছিলো।”
তবে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি এই সাংবাদিক। আরেকজন প্রবীণ সাংবাদিকও বিভিন্ন সময়ে মোজাফফরের সিরাজগঞ্জে অবস্থানের খবর নিশ্চিত করেছেন।
কে এই মোজাফফর
সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ও তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত মুখ মোজাফফর। বন্ধুদের কাছে পরিচিতি ‘মোজাম’ নামে। বাবার নাম লুৎফার রহমান; দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড়। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিয়ে সিরাজগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলে (ভাটপিয়ারী, কাজিপুর অঞ্চল) বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ জনের একটি গেরিলা দল ‘কমান্ড’ করতেন তিনি।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ৫৫১ নম্বরে আছে মোজাফফর হোসেনের নাম। সেখানে তাকে অবসরপ্রাপ্ত হিসাবে উল্লেখ করা হলেও, কোন বাহিনী, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন তা উল্লেখ নেই।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিরাজগঞ্জ জেলা কমান্ডের সাবেক এক কমান্ডার আলাপ-কে জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে ভাটপিয়ারী এলাকায় একজন মুক্তিযোদ্ধা খুন হন। ওই খুনের সাথে নাম জড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সিরাজগঞ্জের রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারেননি মোজাফফর। এ অবস্থায় ১৯৭২ সালে রক্ষীবাহিনী গঠন হলে প্রথম ব্যাচেই যোগ দেন। তার পদবি ছিলো ‘লিডার’।
জাতীয় রক্ষীবাহিনী নিয়ে লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে অন্যতম আনোয়ার উল আলমের ‘রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা’। ওই বইয়ে আনোয়ার উল আলম ২১২ জন লিডারের নাম উল্লেখ করে তালিকা দিয়েছেন। তালিকায় শুরুর নামটিই মোজাফফর হোসেন-এর। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণের সিদ্ধান্ত হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় এই বাহিনী বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেনাবাহিনীতে মেজর পদবি পান মোজাফফর।

মাসুদ-মোজাফফর সম্পর্ক
রক্ষীবাহিনীতে মোজাফফর ছিলেন প্রথম ব্যাচের লিডার। আর ষষ্ঠ ব্যাচের লিডার ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। আনোয়ার উল আলমের বইয়ে দেওয়া তালিকার ১১৩ নম্বরে আছে মাসুদ চৌধুরীর নাম। একই বাহিনীর কর্মকর্তা হিসাবে মোজাফফর ও মাসুদ ছিলেন পরস্পরের পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠ।
গত ২৩এ মার্চ রাতে ঢাকার বারিধারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন মাসুদ। ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ চৌধুরীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত ৭ই মে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে এই মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদেরও অনুমতি দেওয়া হয়।
বর্তমানে কারাগারে থাকা সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ থেকেই মিলেছে মোজাফফরের সন্ধান।
মাসুদ চৌধুরীর ফোনের কল লিস্টে ‘জন ডো’ নামে এক ব্যক্তির নিয়মিত যোগাযোগ বিশ্লেষণ করেন গোয়েন্দারা। একপর্যায়ে ছদ্মনামের এই রহস্যজনক ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে পারে পুলিশ। কিন্তু কথা বলার সময় ভিপিএন ব্যবহার করায় অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য মিলছিল না। ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের আগে ভিপিএন ছাড়াই সরাসরি ফোন কলে তাদের মধ্যে কথোপকথন হয়। সেই সূত্র ধরেই মোজাফফরকে খুঁজে পান গোয়েন্দারা।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি ৪৫ বছর ধরে পলাতক মোজাফফর হোসেনকে গত বুধবার রাতে ঢাকার বনানী ডিওএইচএসের ৫ নম্বর রোডের ৭১ নম্বর বাড়ির চার তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, মোজাফফরকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শুক্রবার মোজাফফরকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের সামরিক আদালতের হেফাজতে নেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার এজাহার থেকে জানা যায় এ ঘটনায় মামলা হয় ১৯৮১ সালের ১লা জুন। চট্টগ্রামের কোতয়ালী থানায় দায়ের হওয়া মামলার বাদী ছিলেন তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) মোকাররম হোসেন। মামলায় ৬ নম্বর আসামি মোজাফফর।
১৯৮১ সালের ৩০এ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ঘটনার আগের দিন ২৯এ মে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তিনি।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০এ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মোজাফফর। ঘটনার পর মোজাফফর পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস’র ‘বাংলাদেশ: অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে জিয়া হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা পাওয়া যায়।
ওই বর্ণনা অনুযায়ী, মোজাফফরের ভূমিকা হত্যার মুহূর্তে উপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে আবার সার্কিট হাউজে যান। জিয়ার শোয়ার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরা হয়। এরপর জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার লাশ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন। পরে বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর মঞ্জুর ও সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা পরদিন ভোরে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালান। সামনের জিপে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব, মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেফতার হন। মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তার স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে মোজাফফর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকাকালে জিয়া হত্যাকাণ্ডের পলাতক অভিযুক্ত মেজর এসএম খালেদ ব্যাংককে অবস্থান করছিলেন। একই ঘটনায় পলাতক মোজাফফর তখন ভারতে ছিলেন।
বইয়ে মইনুলের উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে খালেদকে সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। জিয়াউর রহমান কীভাবে নিহত হয়েছিলেন, তা জানার জন্য তিনি তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
জেনারেল মইনুল বাংলাদেশে ফিরে মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর সম্পর্কে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবহিত করেন।
মইনুল লিখেছেন, “যেসব অফিসারের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জেনারেল জিয়াকে হত্যা করা হয় তাঁদের মধ্যে একমাত্র মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফরই তখন জীবিত ছিলেন।”


প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার কে এই মেজর মোজাফফর, ৪৫ বছর কোথায় ছিলেন?
