অনলাইনে মাদক ঠেকাতে কঠোর আইন, অপব্যবহারের শংকা

ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা ঠেকাতে নতুন বিধান যুক্ত করেছে সরকার। তবে মাদক উদ্ধার ছাড়াই ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। 

 

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:১২ পিএম

"ধরুন, একজন আপনাকে জিজ্ঞেস করলো - 'জিনিস আছে?' আপনি লিখলেন- 'দেখি, জানাই'। এই একটা চ্যাট। একটা স্ক্রিনশট।  এইটুকুই যথেষ্ট হতে পারে। কোনো মাদক উদ্ধার লাগবে না। খালি ডিজিটাল প্রমাণ। আর সর্বোচ্চ শাস্তি - মৃত্যুদণ্ড," সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফেরদৌস হোসেন এক ফেসবুক পোস্টে এ কথা লিখেছেন।

প্রশ্ন উঠেছে এমন একটি ডিজিটাল বার্তা, একটি স্ক্রিনশট কিংবা অনলাইন যোগাযোগ কি মাদক অপরাধের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট হতে পারে? আর সেই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যদি হয় মৃত্যুদণ্ড তাহলে আইনের প্রয়োগ কতটা নিরাপদ?

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ ঘিরে এমন প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। নতুন আইনে সাইবার স্পেস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, বিজ্ঞাপন বা যোগাযোগকে অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। 

বিতর্কের মূল জায়গা হলো,  নতুন আইনে ডিজিটাল যোগাযোগকে অপরাধের উপাদান হিসেবে যুক্ত করা হলেও, এর প্রমাণ মূল্যায়ন কীভাবে হবে এবং কোন পর্যায়ে এটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হবে। 

কেউ বলছেন, মাদক ব্যবসার ধরন বদলে যাওয়ায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা জরুরি। 

তবে সমালোচকরা বলছেন, ডিজিটাল তথ্যের ব্যাখ্যা ও যাচাইয়ের পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া এমন কঠোর বিধান নিরীহ মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আর সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এই বিধান নিয়ে যে, ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক হবে না।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ডিজিটাল যুগে মাদক ব্যবসার নতুন কৌশল মোকাবিলায় এমন আইন প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন, ডিজিটাল প্রমাণের ব্যাখ্যা ও ব্যবহার যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত না হলে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এ ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা নিয়ে মানবাধিকার ও আইনের অপব্যবহারের প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। 

 সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাওসার আহমেদ বলেন, “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করার দিকেই রাষ্ট্রগুলোর এগিয়ে যাওয়া উচিত। আর যেসব দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ড রয়েছে, সেখানে এটি কেবল এমন অপরাধের ক্ষেত্রে রাখা যেতে পারে যেখানে সরাসরি ও ইচ্ছাকৃত প্রাণহানি ঘটে।”

মাদক না পেলেও কি হবে মামলা

নতুন আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক নিয়ে কোনো কথোপকথন কি সরাসরি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে?

এ বিষয়ে কাওসার আহমেদ বলেন, “সাইবার স্পেসে মাদক কেনাবেচার জন্য যে ধরনের কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে, সেটি শুধু সাধারণ কথোপকথন নয়। অপরাধের উদ্দেশ্য, কার্যক্রম এবং প্রমাণের বিষয়টি দেখতে হবে। শুধুমাত্র একটি কথোপকথনের ভিত্তিতে শাস্তি হবে—এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়।”

তিনি বলেন, আইনের সঠিক প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট ধারার পূর্ণাঙ্গ ভাষা ও আদালতের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী জাহিদ হাসান ফাহাদ মনে করেন নতুন এই আইনটি নিয়ে ‘মিসইন্টারপ্রেট’ করা হচ্ছে। 

আলাপকে তিনি বলেন, আইনের নির্দিষ্ট ধারাগুলো পড়লে দেখা যায়, শুধু যোগাযোগের অপরাধের জন্য সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়নি।

এই আইনজীবী জানান, নতুন আইনে মাদক সংক্রান্ত ডিজিটাল অপরাধের জন্য নতুন কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। 

একটি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট, ডার্ক ওয়েব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, পরিবহন বা বিতরণের উদ্দেশ্যে যোগাযোগ পরিচালনা করে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

তবে ওই ধারায় আলাদাভাবে কোনো শাস্তির উল্লেখ নেই বলে জানান তিনি।

 তার ভাষায়,“এই ধারায় অপরাধের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেখানে সরাসরি কোনো শাস্তির কথা বলা হয়নি। আইনের ৪২ ধারায় বলা আছে, কোনো অপরাধের জন্য আলাদা করে শাস্তির বিধান না থাকলে সেই অপরাধের জন্য নির্ধারিত সাধারণ শাস্তি প্রযোজ্য হবে।”

তার মতে, তাই শুধু ডিজিটাল যোগাযোগের অভিযোগ উঠলেই মৃত্যুদণ্ড হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।

জাহিদ হাসান ফাহাদ বলেন, মাদক আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নতুন নয়। নির্দিষ্ট ধরনের মাদক ও নির্দিষ্ট পরিমাণের ক্ষেত্রে আগেও কঠোর শাস্তির বিধান ছিল।

তবে নতুন আইনে ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তদন্ত ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন এই আইনজীবী।

তার মতে, অনলাইনে মাদক বেচাকেনা বাস্তব ঘটনা। কিন্তু সেটি আদালতে প্রমাণ করার জন্য শক্তিশালী ফরেনসিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তিনি বলেন,“মেসেঞ্জার বা অন্য কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কেউ মাদক বিক্রি করেছে কি না, সেটি প্রমাণের বিষয়। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া যাবে না। এজন্য ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।”

“কেউ ১০০ পিস ইয়াবাসহ ধরা পড়লে শুধু গুনলেই হবে না। রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হয় সেখানে প্রকৃত মাদকের পরিমাণ কত। কারণ প্যাকেট, পলিথিনসহ অন্যান্য উপাদানের ওজনও থাকে।”

তিনি বলেন,“শুধু সমালোচনা করে বলা যাবে না যে আইনটি খুব খারাপ হয়ে গেছে বা সবাইকে ধরে ধরে শাস্তি দেওয়া হবে। বিষয়টি নির্ভর করবে আইনের প্রয়োগ ও প্রমাণের মানের ওপর।”

তার মতে, মূল উদ্বেগ হওয়া উচিত অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা নিয়ে।

অপব্যবহারের আশংকা 

কাওসার আহ্‌মেদ বলেন, শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বরং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদক মামলায় অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে মাদক পাওয়া গেছে,এমন অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

“যদি যথেষ্ট সেফগার্ড ছাড়া শুধু মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়, তাহলে অ্যাবিউজ অব দ্য প্রসেস অব ল’ এবং কোর্টের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

আইনের অপব্যবহার প্রসঙ্গে জাহিদ হাসান বলেন, “নতুন ধারাটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য প্রয়োজনীয় একটি সুযোগ তৈরি করেছে, কারণ বর্তমানে মাদক ব্যবসার একটি অংশ সাইবার স্পেসে পরিচালিত হচ্ছে।” 

তবে একই সঙ্গে এই সুযোগ যেন আইনটি অপব্যবহারের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে সেদিকেও নজর দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি।