কাফকার বিচারালয়ের আয়নায় বাংলাদেশ

যদি আইন এতই ত্রুটিপূর্ণ হয়, যদি তা ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সমাজে আইনের প্রয়োজন কেন? আইন না থাকলে কী হতো?

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

আইনের মহিমান্বিত প্রবেশদ্বারে এসে দাঁড়িয়েছে একজন সাধারণ গ্রাম্য মানুষ। ওই দরজার পাহারায় একজন প্রহরী। সে মানুষটিকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না, আবার চলে যেতেও বলে না। প্রহরীর অনুমতির অপেক্ষায় আইনের দরজার পাশে বসেই জীবনের পুরোটা সময় পার করে দেয় সেই মানুষটি। আইনালয়ের ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই এক সময় তার মৃত্যু হয়। 

চেক কথা সাহিত্যিক ফ্রান্ৎস কাফকার ছোটগল্প ‘বিফোর দ্য ল’-এর কাহিনী এটি। রূপক এই গল্পটি আধুনিক বিচার ব্যবস্থার নির্মমতার বাস্তব এক দলিল। কাফকা এই গল্পে দেখান আইনি ব্যবস্থার সেই নির্মম ফাঁদ, যার গোলকধাঁধায় পড়ে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হয় অসংখ্য মানুষ।

‘বিফোর দ্য ল’ গল্পের সাধারণ মানুষটির মতোই একজন বাংলাদেশের পরেশ চন্দ্র দাস। তিনি ছিলেন জনতা ব্যাংকের ফরিদপুর করপোরেট শাখার নিরাপত্তা প্রহরী। এই শাখা থেকে ২০১০ সালে প্রায় এক কোটি টাকা চুরি হয়।

এই ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং তদন্তকারী সংস্থা বেছে নেয় সবচেয়ে সহজ টার্গেট দরিদ্র প্রহরী পরেশকে। গ্রেপ্তার করে সাজাও দেওয়া হয় তাকে। তবে কাফকার গল্পের মানুষটির মতই হাল ছাড়েননি পরেশ। লড়াই চালিয়ে গেছেন দীর্ঘ ১৬টি বছর।

অবশেষে ২০২৫ সালের ২৮এ জানুয়ারি, টাকা চুরির ঘটনায় পরেশকে নির্দোষ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রায় প্রকাশের ঠিক ছয় মাস আগে মারা যান পরেশ চন্দ্র দাস। দীর্ঘ আইনি লড়াই চালাতে ততদিনে নিঃস্ব তার পরিবারও। দীর্ঘ ১৬ বছর লড়াই শেষে ন্যায় বিচার মিললেও, তা দেখে যেতে পারেননি পরেশ। 

কাফকার সেই গ্রাম্য লোক আর পরেশ মূলত একই মানুষ। এই দু’জনেই সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা মূলত আইনি কাঠামোকেই দাঁড় করায় কাঠগড়ায়। প্রশ্ন তোলে, আইন আসলে কী? আইন কি ন্যায়ের সন্ধান দেয়, নাকি এটি নিজেই একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁদ?

বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থা: উৎস, বাস্তবতা ও কাঠামোগত সংকট

বাংলাদেশের বর্তমান আইন ব্যবস্থার শিকড় প্রোথিত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতায়। ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যাকে বিভক্ত করেন কয়েকটি জেলায়।

প্রতিটি জেলায় নিয়োগ করা হয় একজন ইংরেজ কালেক্টর। রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি কালেক্টররা মামলাও পরিচালনা করতেন। তাদের অধীনে স্থাপিত হয় 'মফস্বল দেওয়ানি আদালত' এবং 'মফস্বল ফৌজদারি আদালত’। একই সাথে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করা হয় 'সদর দেওয়ানি আদালত' এবং 'সদর নিজামত আদালত' নামের দুটি সর্বোচ্চ আপিল আদালত।

ঐতিহাসিক এই পদক্ষেপের পর থেকে ধাপে ধাপে আধুনিক রূপ লাভ করে ব্রিটিশ ভারতের বিচার ও প্রশাসনিক কাঠামো । ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি বা সিআইপিসি, সবই তৈরি হয় ব্রিটিশ শাসকদের অধীনে। ঔপনিবেশিক এই আইনগুলো নাগরিকদের সেবা দেবার জন্য নয়, বরং ব্রিটিশ বিরোধী মত, আন্দোলন এবং প্রজাদের দমনের জন্য তৈরি হয়েছিলো।

১৯৭১ সালে স্বাধীন হলেও বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে ঔপনিবেশিক আমলের মতই দমন ও বৈষম্যমূলক। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পুলিশ আজও জনগণের সেবকের চেয়ে বেশি শাসকের লাঠিয়াল বাহিনী। ন্যায়বিচার পাওয়া আজও এই দেশে একটি ‘ব্যয়বহুল বিলাসিতা’।

পদ্ধতিগত জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো এদেশের বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ত্রুটি। যেখানে ৪০ লাখেরও বেশি বিচারাধীন মামলার বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা মাত্র দুই হাজারের কাছাকাছি। ফলে এই বিশাল মামলা জট স্থবির করে দিয়েছে বিচার ব্যবস্থাকে। বছরের পর বছর আদালতের দরজায় ঘুরতে ঘুরতে ন্যায়বিচার পরিণত হয়েছে প্রহসনে।

যে আইনি একজন মানুষের নির্দোষ প্রমাণ হতে ১৬ বছর লাগে, সেই ব্যবস্থা আর মানুষের রক্ষাকবচ থাকে না। তখন সেই ব্যবস্থা নিজেই পরিণত হয় একটি প্রহসনে। বিচারালয় নিয়ে একটি বিখ্যাত প্রবাদ হলো ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। পরেশ দাসের মতো মানুষদের কাছে এসে তা হয়ে যায় ‘জাস্টিস ডেলিভার্ড টু এ ডেড ম্যান ইজ নো জাস্টিস অ্যাট অল’। 

বিচার ব্যবস্থার অসারতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ বাদল ফরাজি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তাজমহল দেখার স্বপ্ন নিয়ে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ২০০৮ সালের ১৩ই জুলাই ভারতে প্রবেশ করেছিলেন বাদল। এর দুই মাস আগে, ৬ই মে দিল্লির অমর কলোনিতে একটি খুনের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার আসামি 'বাদল সিং' এর নামের সাথে মিল থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ। পৃথিবী দেখতে বের হওয়া এক তরুণের স্থান হলো তিহার জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।

বিচারে বাদল ফরাজিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় দিল্লির সাকেত আদালত। হাইকোর্টেও বহাল থাকে সেই রায়। কারাগারের চার দেয়ালে আটকে থেকেই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন বাদল।

মানবাধিকারকর্মী রাহুল কাপুরের প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালের ৬ই জুলাই বাদল ফরাজিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় ভারত সরকার। ততদিনে শেষ হয়ে এসেছে তার যাবজ্জীবনের মেয়াদ। দেশে এনেই তাকে মুক্তির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

কিন্তু দেশে ফেরার পর বাদলকে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক আইনি প্রহসন। দেখা যায়, ভারতের আইনে যাবজ্জীবন মানে ১৪ বছরের কারাদণ্ড, সেখানে বাংলাদেশে ৩০ বছর। প্রশ্ন ওঠে, কোন দেশের আইনে কার্যকর হবে বাদলের সাজা?

আইনি অস্পষ্টতায় ভারত থেকে নিজ দেশে ফেরার আট বছর পর আজও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চার দেয়াল বন্দী বাদল ফরাজি। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো বাদলের জীবন রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার কাছে রয়ে গেছে কেবলই একটি 'ফাইল' হয়ে।

ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি। হত্যাকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দেন তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। চৌদ্দ বছর পেরিয়ে গেলেও তা অধরাই থেকে যায়। দীর্ঘ এই সময়ে পরিবর্তন হয় তদন্তকারী সংস্থা এবং তদন্ত কর্মকর্তার। কিন্তু ১১৩ বার সময় বাড়ানোর পরেও আলোর মুখ দেখে না এই বিচার।

সাগর-রুনির বিচার যেন কাফকার সেই দুর্ভেদ্য প্রাসাদের প্রথম প্রবেশদ্বারে এসেই থমকে গেছে। কেউ জানে না কবে খুলবে ‘তদন্ত প্রতিবেদন’ নামের সেই প্রথম দরজা।

ফরাসি লেখক আনাতোল ফ্রাঁস ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘‘আইন তার মহিমান্বিত সমতার দ্বারা ধনী-দরিদ্র সবাইকে সমানভাবে নিষিদ্ধ করে সেতুর নিচে ঘুমানো, রাস্তায় ভিক্ষা করা এবং রুটি চুরি করা থেকে।’’

বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক এই বৈষম্য প্রকট। এখানে আইনি লড়াই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভালো আইনজীবী নিয়োগ, বছরের পর বছর কোর্টের বারান্দায় ঘোরা, পদে পদে অর্থ খরচ- একজন বিচারপ্রার্থীকে কখনো কখনো আর্থিকভাবে সর্বশান্ত করে ফেলে। সেখানে ধনীরা টাকার জোরে আইনকে পরিণত করেন সুরক্ষার হাতিয়ারে। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেও অধরা থেকে যান। আর মিথ্যা অভিযোগে সামান্য এক প্রহরীকে পুরো ব্যবস্থার দায় কাঁধে নিয়ে আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয় বছরের পর বছর। 

২০২১ সালে নিখোঁজ হন এক কিশোরী। সন্দেহভাজন হিসেবে তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সেই কিশোরীকে ‘গণধর্ষণ’ ও ‘হত্যার’ দায় স্বীকারও করে তারা। কিন্তু ঘটনার ৫১ দিন পর ফিরে আসে সেই কিশোরী। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন আসামির ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করেছিলো পুলিশ। 

এইসব ঘটনা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় পুলিশি দুর্বলতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ, আর্থিক লেনদেন বা স্রেফ অলসতার কারণে প্রকৃত অপরাধীকে বাদ দিয়ে নিরীহ মানুষকে আসামি বানায় পুলিশ। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের প্রাচীন ধারাগুলোর কারণে ডিজিটাল বা আধুনিক ফরেনসিক প্রমাণের চেয়ে আজও পুলিশের সাজানো কাগজের সাক্ষ্যই বেশি গুরুত্ব পায় আদালতে।

হাম্বুরাবি থেকে ব্ল্যাকস্টোন: আইনের দীর্ঘ ইতিহাস

আইন কীভাবে আজকের এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলো তা বুঝতে হলে যেতে হবে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সমাজে। মানুষ যখন যাযাবর দশা থেকে স্থায়ী হয়েছে, তখনই প্রয়োজন পড়েছে নিয়মকানুনের।

মানব ইতিহাসে প্রথম টিকে থাকা লিখিত আইনের নিদর্শন হলো কোড অব উর-নাম্মু। খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ থেকে ২০৫০ সময়ের মধ্যে সুমেরীয় ভাষায় লেখা হয়েছিল মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের এই রাজার প্রণীত আইনসংহিতা। প্রাচীন এই আইনে অপরাধের জন্য শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিলো আর্থিক জরিমানার ওপর। আইনের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজ থেকে অন্যায় দূর করে বিধবা ও এতিমদের অধিকার রক্ষা করা। 

তবে ইতিহাসের সবচেয়ে সুপরিচিত এবং সুসংগঠিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত আইন বলা হয় ব্যাবিলনের রাজা হাম্মুরাবির আইনসংহিতাকে। যা পরিচিত কোড অব হাম্বুরাবি হিসেবে। খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দের দিকে একটি বিশাল কালো পাথরের স্তম্ভে খোদাই করে লেখা হয় এসব আইন।

মোট ২৮২টি ধারায় বিভক্ত ‘হাম্বুরাবি কোড’ এর মূল ভিত্তি ছিল ‘লেক্স তালিওনিস’ বা প্রতিশোধের নীতি। ‘চোখের বদলে চোখ এবং দাঁতের বদলে দাঁত’ নীতির ওপর গড়ে ওঠা এই আইনে লিপিবদ্ধ ছিল বাণিজ্য, বিয়ে, চুরি, মজুরিসহ নাগরিক জীবনের প্রায় সব নিয়মকানুন।

রাজা হাম্বুরাবি দাবি করেছিলেন, দেবতা শামাশ তাকে এই আইন দিয়েছেন যেন সবলরা অত্যাচার করতে না পারে দুর্বলের ওপর। তবে এই আইনেও ছিল সামাজিক শ্রেণির ভিত্তিতে সাজার ভিন্নতা।

আধুনিক আইনের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে প্রণীত রোমান সাম্রাজ্যের ‘টুয়েলভ টেবিল’কে। রোমানরাই প্রথম ‘রুল অব ল’ বা আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এই ধারণার ভিত্তিতেই পরবর্তীতে জন্ম দেয় ‘ইউরোপীয় সিভিল ল’ ব্যবস্থার। ইংল্যান্ডে দ্বাদশ শতক থেকে বিচারকদের রায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ‘কমন ল’। 

স্যার উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন তার ‘কমেন্টারিস অন দ্য লজ অব ইংল্যান্ড’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রথা এবং আদালতের পূর্ববর্তী রায় মিলে একটি দেশের স্থায়ী আইন ব্যবস্থা তৈরি হয়। ব্ল্যাকস্টোনের একটি বিখ্যাত উক্তি আজও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ধরা হয়। ব্ল্যাকস্টোন বলেন, ‘‘দশজন অপরাধী পার পেয়ে যাক, তবুও একজন নিরপরাধ মানুষ যেন সাজা না পায়।’’

অ্যান্টিগনি, মোরালিটি ও আইন: এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব

আইনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রোমান আইনবিদ উলপিয়ান বলেছিলেন, ‘‘আইন হলো ন্যায় ও অন্যায়ের বিজ্ঞান।’’ কিন্তু আইন কি সবসময়ই ন্যায়সঙ্গত? 

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে সোফোক্লিসের বিখ্যাত ট্র্যাজেডি ‘অ্যান্টিগনি’-তে। গ্রীক পুরাণের গল্প অবলম্বনে খ্রিস্টপূর্ব ৪৪১ অব্দে রচিত এই নাটকটি আজও আইনি দর্শনের এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। 

নাটকের পটভূমিতে দেখা যায়, রাষ্ট্রদ্রোহী রাজপুত্র পলিনাইসের মৃতদেহ সমাহিত না করে পশু-পাখির খাওয়ার জন্য মাঠে ফেলে রাখতে আদেশ দেন থিবসের রাজা ক্রেয়ন। যে এই আদেশ অমান্য করবে, তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ‘লিগ্যাল পজিটিভিজম’ অনুযায়ী সার্বভৌম শাসক ক্রেয়নের এই আদেশই আইন। কিন্তু পলিনাইসের বোন অ্যান্টিগনি রাজার আইন অমান্য করে সমাহিত করেন ভাইয়ের লাশ।

আইন ভঙ্গের অভিযোগে রাজার সামনে আনা হলে অ্যান্টিগনি বলেন, ‘‘তোমার এই আইন অলিম্পাসের দেবতারা তৈরি করেননি। মানুষের তৈরি কোনো আইন এত শক্তিশালী হতে পারে না যা ঈশ্বরের অলিখিত এবং অপরিবর্তনীয় নিয়মকে অমান্য করতে পারে।’’ অ্যান্টিগনি রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করে অবস্থান নেন নিজের ভাইকে সমাহিত করার ন্যয্য ও নৈতিকতার পক্ষে। পরিণতিতে বরণ করে নেন মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি। আর এভাবেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বটিকে সামনে আনেন অ্যান্টিগনি। মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন ‘পজিটিভ ল’ ও ‘ন্যাচারাল ল’-কে। 

আইন ও নৈতিকতার দার্শনিক বিতর্ক

জন অস্টিন ১৮৩২ সালে লেখা তার ‘দ্য প্রোভিন্স অব জুরিসপ্রুডেন্স ডিটারমাইন্ড’ বই য়ে ধারণা দেন ‘লিগ্যাল পজিটিভিজমের’। তার মতে, আইন হলো সার্বভৌম শাসকের আদেশ, যার পেছনে থাকে শাস্তির ভয়। জন অস্টিনের এই সংজ্ঞায় আইনের সাথে নৈতিকতার কোনো বাধ্যতামূলক সম্পর্ক নেই।

এইচ. এল. এ. হার্ট বলেন, আইন হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিয়মের সমন্বয়। আইন বিষয়ে একটি বিখ্যাত রেখা টেনেছেন হার্ট। তার মতে, ‘‘আইন যা, তা-ই। আইন কেমন হওয়া উচিত, তা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।’’ হার্ট এর সংজ্ঞা অনুযায়ী নিয়ম মেনে পাস হলে কোনো বিষয় অনৈতিক হলেও তা ‘আইন’ হিসেবে বৈধ।

হার্টের মতের বিপরীতে অবস্থান প্রভাবশালী মার্কিন দার্শনিক লন ফুলারের। ‘দ্য মোরালিটি অব ল’ বইয়ে পজিটিভিজমের বিপরীতে প্রাকৃতিক আইনের পক্ষে বলেন ফুলার। তার মতে, আইনের থাকতে হবে একটি ‘ইন্টারনাল মোরালিটি’ বা অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা।

‘আইন’ হয়ে ওঠার জন্য আটটি শর্ত দেন তিনি। যা লন ফুলারের 'আইনের নৈতিকতা' নামে পরিচিত। ফুলার মনে করতেন, কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় আদেশ বা শক্তির জোরে আইন চলে না, বরং এর পেছনে থাকা প্রয়োজন একটি যৌক্তিক ও নৈতিক কাঠামো।

অস্টিনের মতে, নাৎসি জার্মানির আইনও ‘আইন’ ছিল, কারণ তা সার্বভৌম শাসকের আদেশ। কিন্তু ফুলার দেখান, আইন কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে পদ্ধতিগত দমনের একটি অস্ত্র। 

অনেক সময় আইন এবং ন্যায়কে মনে করা হয় একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে আছে বিশাল ব্যবধান। আইন হলো একটি নিয়ম বা পদ্ধতি। আর ন্যায় হলো একটি আদর্শ বা ফলাফল। অনেক সময় আইন পালন করতে গিয়ে সৃষ্টি হয় চরম অন্যায় ও অন্যায্যতার। রোমান প্রবাদে বলা হয়, 'সুমমুম ইঊস, সুমমা ইনইউরিআ’ অর্থাৎ যত আইন, তত অন্যায়। 

দার্শনিক অ্যারিস্টেটল তার ‘নিকোমাকিয়ান এথিক্স’ বই য়ে ধারণা দেন ‘ইকুইটির’। মানুষ আইন তৈরি করার সময় পৃথিবীর সব পরিস্থিতি চিন্তা করতে পারে না। তারা এমন একটি সাধারণ নিয়ম তৈরি করে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজ করে। কিন্তু অনেক পরিস্থিতিতে সেই নিয়মটি ঠিকঠাক কাজ করতে পারে না। অ্যারিস্টটলের মতে, আইন যখন বাস্তব পরিস্থিতির সামনে অচল হয়ে পড়ে, তখন বিচারকের কাজ হলো আইনের 'অক্ষর' না দেখে 'উদ্দেশ্য' দেখা।

আইন ও ন্যায়ের দ্বন্দ্বের সবচেয়ে চরম রূপ দেখা যায় মৃত্যুদণ্ড বা ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের ক্ষেত্রে। রাষ্ট্র কতৃক আইনের মাধ্যমে বিচার করে একজন মানুষের ফাঁসি দেওয়ার ঘটনাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে দেখলে সেটিকেও ‘খুন’ মনে হয়। খুনের অপরাধে রাষ্ট্রের আরেকটি ‘খুন করার’ দার্শনিক ও নৈতিক বৈধতা কী? 

এই ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন দার্শনিক ও আইনজীবীরা। 

মৃত্যুদণ্ডকে পূর্ণ সমর্থন করেছেন জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। কান্টের মতে, বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কোনো সাধারণ খুন নয়। এটিকে কান্ট বলেছেন ‘ন্যায়ের ভারসাম্য’। তার মতে, রাষ্ট্র যদি খুনিকে শাস্তি না দেয়, তবে রাষ্ট্র নিজেই সেই অপরাধের অংশীদার হয়ে যায়। খুনি নিজেই তার কাজের মাধ্যমে নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা লিখেছে, রাষ্ট্রের কাজ কেবল তা কার্যকর করা। 

কান্টের বিপরীতে গিয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন জেরেমি বেনথাম এবং সিজার বেকারিয়া। তাদের মতে, রাষ্ট্র কোনো খুনের প্রতিশোধ নিতে পারে না। সাজার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভবিষ্যতে অপরাধ রোধ করা। মৃত্যুদণ্ড যদি সমাজে অপরাধ কমাতে না পারে, তবে রাষ্ট্র কর্তৃক জীবন নেওয়া কেবলই একটি অপ্রয়োজনীয় সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তার ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’ বইয়ে লেখন, মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ন্যায়ের জন্য নয়, বরং তৈরি হয়েছে রাষ্ট্র কর্তৃক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য।

বিচারকরা মানুষ এবং আইনি প্রক্রিয়াও ত্রুটিমুক্ত নয়। একজন নিরপরাধ মানুষের ফাঁসি হয়ে গেলে রাষ্ট্র আর তা ফিরিয়ে দিতে পারে না। এই ‘অপরিবর্তনযোগ্যতা’ই মৃত্যুদণ্ডের সবচেয়ে বড় দার্শনিক ও ব্যবহারিক ত্রুটি। 

আইন কেন প্রয়োজন

যদি আইন এতই ত্রুটিপূর্ণ হয়, যদি তা ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সমাজে আইনের প্রয়োজন কেন? আইন না থাকলে কী হতো? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ‘সোস্যাল কনট্রাক্ট থিওরি’ বা সামাজিক চুক্তিবাদের দার্শনিকরা।

থমাস হবস ‘লিভাইআথান’ বইয়ে বর্ণনা করেন আইনহীন এক সমাজের কথা। যাকে তিনি বলেছেন ‘স্টেট অব নেচার’ বা প্রাকৃতিক রাজ্য। হবস লিখেছেন, আইন ও রাষ্ট্র না থাকলে কেউ তার শ্রমের ফলের নিরাপত্তা পেতো না। ফলে সমাজে থাকতো না কোনো শিল্প, সংস্কৃতি বা ব্যবসা। মানুষের জীবন হতো একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পশুতুল্য এবং স্বল্পস্থায়ী। আইনহীন সমাজে কেবল চলতো ‘মাইট ইজ রাইট’ বা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি।  

হবস বলেন, আদিম এই হিংস্রতা থেকে নিজের জীবন বাঁচাতেই মানুষ নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তি করে। একজন ‘সার্বভৌম শাসক’ বা ‘আইন’-এর কাছে সঁপে দেয় নিজেদের ক্ষমতা। হবসের মতে, আইন নিখুঁত না হলেও, আইনহীনতার চেয়ে শ্রেয়।

দার্শনিক জন লক তার ‘টু ট্রিটিস অব গভরনমেন্ট’ বইয়ে লিখেছেন, আইনের উদ্দেশ্য মানুষের স্বাধীনতা খর্ব করা নয়, বরং তা রক্ষা ও সম্প্রসারিত করা। লক বলেন, ‘যেখানে কোনো আইন নেই, সেখানে কোনো স্বাধীনতাও নেই’। তার মতে, আইন মানুষের চারপাশে একটি সীমানা প্রাচীর তৈরি করে দেয়। এই সীমানা তাকে অন্য মানুষের অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করে। 

ব্রিটিশ আইনবিদ এ ভি ডাইসি দেখিয়েছেন যে, আইন অন্তত একটি লিখিত কাঠামো দেয়, যার ওপর দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ নাগরিক লড়াই করার আইনি ভিত্তি পায় শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। পরেশ চন্দ্র দাসের পরিবার যে শেষ পর্যন্ত ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের রায় পেয়েছে, তা এই আইনের কাঠামোর কারণেই সম্ভব হয়েছে।

‘বিফোর দ্য ল’ গল্পের মানুষটি দরজার ওপারে কী আছে তা না দেখেই মারা গিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো একক মানুষের ট্র্যাজেডিতে স্তব্ধ হয়ে থাকতে পারে না। আইন কোনো স্বর্গীয় বা অপরিবর্তনীয় বস্তু নয়; এটি মানুষের তৈরি একটি হাতিয়ার।

সমাজবিজ্ঞানী ও আইনবিদ রোসকো পাউন্ড আইনকে বর্ণনা করেছেন ‘সামাজিক প্রকৌশল’ হিসেবে। তার মতে, সমাজের প্রয়োজনেই আইনকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হতে হবে। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দার্শনিক জন রলস  ‘ভেইল অব ইগনোরেন্স’ বা অজ্ঞতার পর্দার যে ধারণা দিয়েছেন, তা অনুযায়ী আইন তখনই ন্যায়সঙ্গত হয় যখন তা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্বলতম মানুষের অধিকার রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পরেশ চন্দ্র দাসের মতো মানুষদের বাঁচাতে হলে বেরিয়ে আসতে হবে ঔপনিবেশিক আইনের খোলস থেকে। আইনি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সময়পেযোগী করতে হবে। তদন্ত সংস্থাকে হতে হবে স্বাধীন, পেশাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।

আদালতের দৃষ্টিভঙ্গিকে যান্ত্রিক পজিটিভিজম থেকে বের করে এনে ধাবিত করতে হবে মানবিক ও প্রাকৃতিক ন্যায়ের দিকে। কাফকার গল্পের সেই গ্রাম্য লোকটি প্রহরীর ভয়ে ভেতরে ঢোকার সাহস দেখায়নি। কিন্তু পরেশ চন্দ্র দাস লড়াই করেছিলেন। চেষ্টা করেছিলেন আইনের সেই দুর্গের দূর্ভেদ্য দেয়াল ভাঙার।

রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো সেই দেয়ালগুলোকে ভেঙে ফেলা। যাতে আইন সাধারণ মানুষের জন্য ফাঁদ না হয়ে, হয়ে ওঠে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রকৃত আশ্রয়স্থল।