বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ নেই; বাড়ছে রাষ্ট্রের খরচ, সাধারণের ভোগান্তি

দেড় দশকে লোডশেডিং ঠেকাতে লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে বিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তবু জ্বালানি সংকটে সেই কেন্দ্রই এখন অচল। আবার ফিরেছে রেকর্ড লোডশেডিং। প্রশ্ন উঠছে- এত খরচের পরও কেন বিদ্যুতের স্থায়ী নিরাপত্তা তৈরি হলো না? সরকারের নতুন পরিকল্পনায় এবার কি বদলাবে সেই পুরোনো চিত্র?

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম

বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, উৎপাদন সক্ষমতাও আছে তবু সেই কেন্দ্র চালানোর মতো জ্বালানি নেই। এরই মধ্যে গত ১০ই অগাস্ট দেশে লোডশেডিং উঠেছে রেকর্ড ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। অথচ এই লোডশেডিং ঠেকাতেই গত দেড় দশকে সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ পেতে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকিতে খরচ করেছে লক্ষ কোটি টাকা।

এখন সেই বিপুল ব্যয়ের পরও সংকট ফিরেছে নতুন চেহারায়। এখন সেই কেন্দ্রগুলো ঠিকই আছে, কিন্তু জ্বালানি সংকটে তার ব্যবহার নেই।

কারণ মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় একটি অংশ গ্যাসের অভাবে ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। সংকট সামলাতে আবার আমদানি করতে হচ্ছে ব্যয়বহুল এলএনজি, তাতে বাড়ছে ভর্তুকি। আবার বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ কিনতেও যাচ্ছে ডলার।

অর্থাৎ, লোডশেডিং কমাতে যে বিদ্যুৎ অবকাঠামো তৈরি করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ খরচ করা হয়েছিল, সেই বিনিয়োগের পরও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। বরং পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো শুধু সচল রাখতেই টাকা ঢালতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আবার সেগুলো চালাতে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনে দিতে হচ্ছে ভর্তুকি।

একসময় দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘাটতি ছিলো, তাই লোডশেডিং হতো। এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও উৎপাদন সক্ষমতা দুটোই আছে, কিন্তু জ্বালানির ঘাটতিতে কেন্দ্রগুলো পুরো ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে আবারো ফিরেছে লোডশেডিং।

কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্রের জন্য খরচ হলো, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বাড়লো, দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আদানি চুক্তি হলো- এতসব খরচের পরও কেন আজ বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ নেই?

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের এই বৈপরীত্যের গল্প শুরু করতে হলে ফিরতে হবে দেড় দশকেরও আগে। যখন ‘খাম্বা’ (বিদ্যুতের খুঁটি) ছিলো কিন্তু তাতে ছিলো না বিদ্যুৎ সংযোগ। সেটাও ছিলো বিএনপি শাসনেরই এক সময়।

এরপর সরকার বদল হলো। আওয়ামী লীগ এলো- দ্রুত বিদ্যুৎ বাড়ানোর নামে এলো কুইক রেন্টাল। সেই দ্রুত সমাধানের আড়ালো লোপাটের আইনি ভিত্তি দিতে করা হলো বিশেষ আইন, যা পরে ‘দায়মুক্তি আইন’ হিসেবে পরিচিত হয়। 

এরপর একের পর এক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র হলো, বড় উৎপাদন সক্ষমতাও তৈরি হলো; সঙ্গে বাড়লো ক্যাপাসিটি চার্জ, ভর্তুকি এবং আমদানি করা বিদ্যুতে নির্ভরতায় রাষ্ট্রীয় খরচ।

প্রশ্ন হলো সরকার আসে নতুন নতুন প্রকল্প হয়, হয় দায়মুক্তি আইনও কিন্তু লোডশেডিংয়ের স্থায়ী সমাধান আসে না কেন? কেন বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু নেই বিদ্যুৎ?

লোডশেডিং কি, হঠাৎ কেন বাড়লো

লোডশেডিং শব্দটি এখন প্রায় সবার পরিচিত। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে ঘাটতি সামলাতে পরিকল্পিতভাবে কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। এটিই লোডশেডিং।

কিন্তু এবার বিদ্যুতকেন্দ্রের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় নয়, কেন্দ্রগুলো চালানোর মতো জ্বালানির ঘাটতিতেই হঠাৎ বেড়েছে লোডশেডিং।

দেশে এমনিতেই গ্যাসের ঘাটতি ছিলো। এর মধ্যে মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে আগুনের পর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আংশিক সরবরাহ শুরু হলেও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি এখনো পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এর ওপর ১৩ই অগাস্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনাল থেকেও সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে যে ঘাটতি আগে থেকেই ছিলো, তা আরও বেড়ে যায়।

দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ অর্থাৎ জাহাজে আনা তরল গ্যাসকে আবার ব্যবহারযোগ্য গ্যাসে পরিণত করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার ভাসমান স্থাপনা মিলে দিনে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ই অগাস্ট সন্ধ্যা ৬টার হিসাবে দুই টার্মিনাল মিলে সরবরাহ হয়েছে ৮২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট।

অর্থাৎ, একটি টার্মিনাল আগুনের পর পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি, অন্যটিও আবহাওয়ার কারণে সাময়িক বন্ধ হয়েছে। এই দুই ধাক্কায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির ১৩ই অগাস্টের উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক। এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট।

রেকর্ড লোডশেডিংয়ের পরদিন, ১১ই অগাস্টের হিসাব দিয়ে সিপিডি জানায়, সেদিন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ২৯ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রয়োজনের প্রায় ৭১ শতাংশ গ্যাসই পাওয়া যায়নি।

এর ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ১০ই অগাস্ট লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠে যাওয়ার পেছনে এই জ্বালানি সংকটই বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে সমস্যাটা শুধু এলএনজি টার্মিনালের নয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও কমছে। একসময় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন তা ১৬৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, ২১এ জুলাই দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিলো ১৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। ৪ঠা অগাস্ট তা কমে দাঁড়ায় ১৬৩ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুটে।

অন্যদিকে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, অথচ স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায় গড়ে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। 

অর্থাৎ এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা হওয়ার আগেই প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি ছিল।

তার ওপর টার্মিনালের আগুন, আংশিক সরবরাহ, আবার আবহাওয়ার কারণে সাময়িক বন্ধ; সব মিলিয়ে সেই পুরোনো গ্যাস সংকটই হঠাৎ তীব্র হয়েছে। আর গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি না পেয়ে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় তার ফল দেখা যাচ্ছে লোডশেডিংয়ে।

খাম্বা ছিলো, ছিলো না বিদ্যুৎ

আজকের সংকটটা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ২০০৯ সালের দিকে। তখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ছিলো তীব্র ঘাটতির মধ্যে। 

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণের নামে বিপুলসংখ্যক বৈদ্যুতিক খুঁটি বসানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়েনি।

এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে ‘খাম্বা কেলেঙ্কারি’।

২০০৭ সালে দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে বলা হয়, ১৩টি কংক্রিট খুঁটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একটি সিন্ডিকেট দরপত্রে কারসাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কাছে ১৫ লাখ খুঁটি ১ হাজার ১০০ কোটি টাকায় বিক্রি করে। 

একই অনুসন্ধানে বলা হয়, দুর্নীতি না থাকলে একই কাজ ৪০০ কোটি টাকারও কমে করা সম্ভব ছিলো।

অর্থাৎ ওই হিসাব অনুযায়ী সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ছিলো ৭০০ কোটি টাকার বেশি।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ থেকে বেড়ে ৬০ লাখ হয়েছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। 

দ্য ডেইলি স্টারের ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র না হওয়ায় পল্লী বিদ্যুতায়ন নেটওয়ার্কে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম ছিলো।

তাই খুঁটি ছিলো, কিন্তু সেই খুঁটির লাইনে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ছিলো না। ‘খাম্বা’ তখন শুধু একটি রাজনৈতিক শব্দ নয়, বিদ্যুৎ পরিকল্পনার একটি বড় বৈপরীত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সাময়িক ভাবনায় খরচের বহর

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তখন চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং। এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত বের হতে আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘমেয়াদি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপেক্ষা না করে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর পথে যায়।

পরিকল্পনাটা ছিলো সাময়িক। দ্রুত কিছু কেন্দ্র বসিয়ে কয়েক বছরের জন্য বিদ্যুৎ ঘাটতি সামলানো হবে। এর মধ্যে বড় ও স্থায়ী কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলে এসব ব্যয়বহুল কেন্দ্রের প্রয়োজন কমবে।

শুরুতে এই কৌশল কাজও করেছিল। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেন্টাল কেন্দ্রের অংশ ছিলো প্রায় ৬ শতাংশ। ২০১২ সালে তা বেড়ে ২৭ শতাংশে ওঠে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান কমে লোডশেডিংও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

কিন্তু সাময়িক ব্যবস্থা পরে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থায় পরিণত হয়। একের পর এক কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ে, নতুন বেসরকারি কেন্দ্র আসে, আর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত রাখার জন্য রাষ্ট্রের ওপর তৈরি হয় নতুন আর্থিক দায়।

এখান থেকেই শুরু ক্যাপাসিটি চার্জের গল্প।

দ্রুত বিদ্যুতে বদলে গেলো আইন

এই পুরো প্রক্রিয়াকে দ্রুত করতে এবং নিজেদের দায়মুক্ত রাখতে ২০১০ সালে করা হয় ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’।

আইনটির উদ্দেশ্য ছিলো দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু এর মাধ্যমে প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বাইরে সীমিতসংখ্যক বা একক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হয়।

সবচেয়ে বিতর্কিত ছিলো আইনটির ৯ নাম্বার ধারা। এই ধারায় বলা হয়েছিল, এই আইনের অধীনে নেওয়া কোনো কাজ, ব্যবস্থা, আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।

এ কারণেই আইনটি পরে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি পায় ‘দায়মুক্তি আইন’ নামে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট এই আইনের ৬(২) ও ৯ ধারা অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন।

 ১০ই অগাস্ট দেশে লোডশেডিং উঠেছে রেকর্ড ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে।

কুইক রেন্টালেই প্রথম বড় খরচ

আগে কুইক রেন্টাল আর রেন্টাল কী, সেটা পরিষ্কার করা দরকার।

কুইক রেন্টাল হলো জরুরি সময়ে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে অল্প সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা। শুরুতে এগুলোকে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে আনা হয়েছিল।

কিন্তু পরে সেগুলোই হয়ে গেলো রেন্টাল কেন্দ্র। অর্থাৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিতে সরকার বিদ্যুৎ কেনে। অর্থাৎ কেন্দ্রটি সরকারের নয়; চুক্তি অনুযায়ী ওই কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার নেয়।

আওয়ামী লীগ সরকার কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের মূল বৈশিষ্ট্য ছিলো দ্রুত স্থাপন এবং দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন। কিন্তু এসব কেন্দ্রের বড় অংশ ছিলো তেলভিত্তিক। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও ছিলো বেশি।

২০১৩ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, গ্যাসে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ছিলো প্রায় ২ টাকা; কয়লায় প্রায় ৬ টাকা। বিপরীতে জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হতো প্রায় ১৪ থেকে ২০ টাকা।

অর্থাৎ, লোডশেডিং কমাতে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়া গেলো, কিন্তু সেই বিদ্যুতের জন্য রাষ্ট্রকে গুনতে হলো অনেক বেশি দাম।

এর সঙ্গে পরে যুক্ত হলো আরেক খরচ, কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখার জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ।

ক্যাপাসিটি চার্জে গেলো লাখ কোটি টাকার বেশি

ক্যাপাসিটি চার্জ সহজ করে বললে, বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখার টাকা।

ধরুন, একটি কেন্দ্র ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে পারে। কোনো মাসে সরকার সেখান থেকে বিদ্যুৎ নিলো না। তারপরও চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটি চালুর জন্য প্রস্তুত রাখার বিনিময়ে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হবে। এই অর্থই ক্যাপাসিটি চার্জ।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ কিনলে এক ধরনের বিল, আর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত রাখার জন্য আরেক ধরনের বিল।

সংসদে তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যে তথ্য দেন, সেখানে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে ৩০এ জুন ২০২৩ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে ৮২টি আইপিপি ও ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভাড়া বাবদ দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে প্রথম ১০ বছরে ৪৩ হাজার ৩৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং পরের পাঁচ বছরেই ৬৩ হাজার ৪৫২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা গেছে।

এখানে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এই পুরো অর্থকে অপচয় বা দুর্নীতি বলা যায় না। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার বিনিময়ে এই অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায় কেন এমন বিপুল সক্ষমতা তৈরি করা হলো, যার বড় অংশ নিয়মিত ব্যবহারই হয়নি?

সিপিডির হিসাবে, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। 

একই সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে দেওয়া সরকারি ভর্তুকিও ৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত ২০২৪ সালের হোয়াইট পেপারে দেখা যায়, ২০১০–১১ থেকে ২০২৩–২৪ পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি ও রেন্টাল পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। 

এর মধ্যে অন্তত ৩৬ হাজার কোটি টাকাকে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গড় প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ছিলো মাত্র ৪২–৪৬ শতাংশ। 

অর্থাৎ সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত রেখে খালি করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার।

বেসরকারি বিদ্যুতকেন্দ্রের বিল, আরেক দফা চাপ

ক্যাপাসিটি চার্জের বাইরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনতেও সরকারকে বিপুল অর্থ দিতে হয়েছে।

সহজ করে বললে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বেসরকারি কেন্দ্র থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনেছে, গ্রাহক ও বিতরণ কোম্পানির কাছে অনেক সময় সেই দামে বিক্রি করতে পারেনি। ফলে কেনা ও বিক্রির দামের মধ্যে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটি সামলাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে, আবার কোথাও ঋণও নিতে হয়েছে।

এই ঘাটতির চাপ কতটা বড় হয়েছে, তার একটি উদাহরণ ২০২৫ সালের জুনের হিসাব। ওই সময় বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৫৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণকে ভর্তুকিতে রূপান্তরের অনুরোধ করে। এর মধ্যে ৪৩ হাজার ১৬০ কোটি টাকা ছিলো মূল ঋণ এবং ১৩ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা সুদ।

এই ঋণের বড় অংশ তৈরি হয়েছিল বেসরকারি রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ও স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে।

অর্থাৎ, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের খরচ শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো বা কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার ক্যাপাসিটি চার্জেই থামেনি। কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হয়েছে, সেই বিদ্যুৎ কম দামে বিক্রি করায় ঘাটতি হয়েছে, আর সেই ঘাটতি মেটাতেও রাষ্ট্রের অর্থ গেছে।

কেন্দ্র বানাতে খরচ, কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে খরচ, বিদ্যুৎ কিনতে খরচ শেষ পর্যন্ত এই তিন দিকের চাপই এসে পড়েছে রাষ্ট্রের কোষাগারে।

জ্বালানি খরচও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়েছে

কুইক রেন্টাল ব্যবস্থায় শুধু বিদ্যুৎ কেনার দাম বেশি ছিলো না। অনেক কেন্দ্রের জ্বালানিও সরকারকে কম দামে দিতে হয়েছে।

আইএমএফের ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত রেন্টাল কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় জ্বালানি আমদানি ও ভর্তুকির চাপও বেড়ে যায়। বাজারদরের তুলনায় কম দামে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করায় বিপিসি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান বাড়ছিল, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই পড়ছিল।

এ কারণেই বিশ্বব্যাংক ২০১৪ সালে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিল। 

সংস্থাটি বলেছিল, উৎপাদন না করলে কেন্দ্রগুলোকে অর্থ না দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং কুইক রেন্টালের খরচ কমিয়ে শেষ পর্যন্ত এসব কেন্দ্র বন্ধ করতে হবে। 

কারণ বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি ২০০৯ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০১৩ সালে ১ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছিল।

তারপরও বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়তেই থাকলো

সরকার আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের কথা শোনেনি। বরং কুইক রেন্টালকে শুরুতে জরুরি ব্যবস্থা বলা হলেও পরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ধারায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।

কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা একই গতিতে বাড়েনি।

২০১৫ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি নথিতে দেখা যায়, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সময়মতো উৎপাদনে না আসায় তৎকালীন সরকার প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেছিল। এসব কেন্দ্রের বেশির ভাগই ৩ থেকে ৫ বছরের চুক্তিতে ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিতে চলতো।

বড় বেসলোড বিদ্যুৎকেন্দ্র সময়মতো না আসায় অনেক রেন্টাল কেন্দ্রের চুক্তিও নবায়ন করতে হয়েছিল। 

২০১৫ সালের বিশ্বব্যাংকের এক নথিতে দেখা যায়, তখন দেশে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ছিলো প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট কম। 

অর্থাৎ তখনও বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ছিল, কিন্তু জ্বালানি ঘাটতি ছিলো।

সেই একই সমস্যার আরও বড় সংস্করণ দেখা যাচ্ছে ২০২৬-এ এসে।

এরপরও আমদানি

দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও বাড়ানো হয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুটি ইউনিট মিলিয়ে বাংলাদেশে সরবরাহের সক্ষমতা ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট।

এখানে নতুন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়, দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর পাশাপাশি বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপরও নির্ভরতা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই অর্থবছরে আদানি পাওয়ারকে বিদ্যুতের বিল হিসেবে প্রায় ১ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে? 

আর দামের তুলনায়ও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় দাম ছিলো প্রায় ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা প্রতি ইউনিট, যেখানে ভারত থেকে অন্য তিন উৎসের বিদ্যুতের সম্মিলিত গড় দাম ছিলো প্রায় ৯ টাকা ৩৩ পয়সা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও বিদ্যুৎ সচল রাখতে আদানিকে বড় অংকের বিল দিতে হয়েছে। যার চাপ পড়েছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করার পরও ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হয়েছে বেশি দামে। আর সেটা ডলারের হিসাবে হওয়ায় রিজার্ভে বড় ধরনের ক্ষত হচ্ছে এখনো।

রেকর্ড লোডশেডিংয়ের পরদিন, ১১ই অগাস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পেয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ গ্যাস।

রাশিয়া-উক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিল দুর্বলতাটা কোথায়

তবে এটা আন্দাজ করা গিয়েছিলো ২০২২ সালের রাশিয়া-উক্রেন যুদ্ধের সময়ই।

বাংলাদেশ তখন জ্বালানি আমদানির জন্য বিপুল ডলার খরচ করে। জ্বালানি আমদানির বিল বাড়ায় ডলারের ওপর চাপ বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে যায়, টাকার মূল্য কমে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে।

রেকর্ড রিজার্ভ খালি হতে থাকে খুব দ্রুত। 

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সে সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আলাপ-কে বলেন, “রাশিয়া-উক্রেন যুদ্ধ যখন শুরু হয়েছিল তখন তার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল আমাদের অর্থনীতিতে। সংকট মোকাবিলায় বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছিলো। যার ফলে রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়েছিলো। সে সময় থেকেই বাড়তে শুরু করে মূল্যস্ফীতি। যা এখন পর্যন্ত কমানো যায়নি।”

এমনকি সংকট মোবাবিলায় সে সময় আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে। 

অর্থাৎ জ্বালানি বাজারের একটি আন্তর্জাতিক ধাক্কা এসে শেষ পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত, ডলারের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলে।

এবার হরমুজ সংকটে একই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট

রাশিয়া-উক্রেন যুদ্ধের পর বাংলাদেশ যে শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিলো, বর্তমান হরমুজ সংকট আবার সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

কারণ এখনো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশ আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

সিপিডির তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশ ছিলো আমদানি করা এলএনজি।

আর এখন সেই এলএনজি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে ভর্তুকির খরচ।

সিপিডির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে সরকারের ভর্তুকির বোঝা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অথচ এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিলো মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা। 

অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় তিন গুণ বেশি খরচ করতে হয়েছে।

ফের মহাপরিকল্পনা কিন্তু বাস্তবায়ন কবে

ফের ক্ষমতায় এসে নতুন করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সামলানোর পরিকল্পনা করছে বিএনপি সরকার।

কিন্তু সংকট যে শুধু আজকের গ্যাস ঘাটতি বা একটি এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনার কারণে নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতার ফল সেটিও এখন স্পষ্ট।

সম্প্রতি সিপিডি’র আয়োজিত সংলাপে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ তাৎক্ষণিক সংকট সামলানোর পাশাপাশি সরকার বড় ধরনের অবকাঠামো পরিকল্পনা করছে বলে জানান।

নতুন ভাসমান এলএনজি পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, “ইতিমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”

একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে সৌর ব্যাটারি ও ইনভার্টারের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশে নামানো এবং পাঁচ বছরের করছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনা শুধু নতুন গ্যাস আনা নয়; নতুন এলএনজি টার্মিনাল, গ্যাস সংরক্ষণ, বিকল্প জ্বালানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে একটি নতুন জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা।

কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রবিবার ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) অনুষ্ঠানে বলেছেন, “বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্তমান সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে কাটছে না। সমাধানে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।”

তার বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এখন যথেষ্ট থাকলেও বড় সমস্যা হচ্ছে সঞ্চালন ব্যবস্থা। 

অর্থাৎ শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করলেই হবে না; সেই বিদ্যুৎ যেখানে প্রয়োজন সেখানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

স্থায়ী সমাধানের আশা কোথায়?

সিপিডির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির অবশ্য মনে করছেন, সমস্যাটি আরও গভীর। 

তিনি বলেন, “অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।”

দেশীয় গ্যাসের মজুত কমছে। নতুন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক গ্যাসক্ষেত্রও মিলছে না। ফলে ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাস, কয়লা ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর।

ফলে একটি এলএনজি টার্মিনালে আগুন, একটি জাহাজ বন্দরে আটকে থাকা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এখন শুধু গ্যাসের সংকট তৈরি করে না। এর ধাক্কা পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও।

তবে পুরো চিত্রটা কেবল হতাশার নয়। সরকারের পরিকল্পনায় গ্যাসের উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানির বৈচিত্র্য আনার কথা রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর উদ্যোগ তার একটি অংশ।

এর বাইরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ নিরাপত্তার বড় আশা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। 

তবে রূপপুরের দুই ইউনিট মিলিয়ে পুরো ২,৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় যেতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। 

প্রথম ইউনিটের ১,২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এবং দ্বিতীয় ইউনিটও ২০২৭ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য রয়েছে। তবে ৩০০ মেগাওয়াট আসতে পারে সেপ্টেম্বরের শুরুতে।

অর্থাৎ, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে ২০২৭ সালের মধ্যেই রূপপুর থেকে পুরো ২,৪০০ মেগাওয়াট পাওয়া যাবে।

এর জ্বালানি হিসেবে গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে না। ফলে এটি চালু হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি মিশ্রণে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, নতুন এলএনজি টার্মিনাল, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা নতুন সঞ্চালন লাইন কোনোটিই রাতারাতি তৈরি হবে না। সরকারের নিজের হিসাবেই বর্তমান সংকট সামলাতে অন্তত দুই বছর লাগতে পারে।

তাই এবার আসল পরীক্ষা শুধু কত মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ যোগ হলো, সেটি নয়। পরীক্ষা হবে গত দেড় দশকের মতো আবারও কি বিপুল টাকা খরচ করে সাময়িক সক্ষমতা তৈরি করা হবে, নাকি এবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করে এমন ব্যবস্থা তৈরি হবে, যেখানে কেন্দ্র থাকবে, জ্বালানিও থাকবে এবং সেই বিদ্যুৎ মানুষের ঘর ও শিল্পকারখানায় পৌঁছাবেও।

কারণ দেড় দশকের শিক্ষা একটাই- শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বানালে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা হয় না। জ্বালানি ছাড়া হাজার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত শুধু কাগজের হিসাব।

কারণ অতীতেও বাংলাদেশ লোডশেডিং কমাতে খাম্বা বসিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েছে; এবার প্রমাণ করতে হবে, সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সচল রাখার মতো টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাও তৈরি করা হচ্ছে।