মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২৮, ফিলিস্তিনপন্থি সম্ভাব্য নারী প্রার্থী কে এই ‘এওসি’

“তারা মনে করে, আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু কোনো পদ বা ক্ষমতার আসনকে ঘিরে। তারা ভাবে, আমার লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট পদ বা আসন দখল করা। কিন্তু আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার চেয়ে অনেক বড়। আমার লক্ষ্য কোনো পদ পাওয়া নয়, আমার লক্ষ্য এই দেশটাকে বদলে দেওয়া।”

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম

২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখনো অনেক দূরে। এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছেন নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। যিনি বিশ্বজুড়ে বেশি পরিচিত ‘এওসি’ নামে।

মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই মার্কিন রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে তার অবস্থান স্পষ্ট। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে তিনি ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, মানুষ মনে করে কোনো পদ, উপাধি বা ক্ষমতার চেয়ার পাওয়ার জন্য তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু তার লক্ষ্য এর চেয়েও বড়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পরিবর্তন করতে চান। 

এই বক্তব্যের পর থেকেই ২০২৮ সালের নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে বেড়েছে জল্পনা। ‘এওসি’ নিজে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। কিন্তু তার সাম্প্রতিক বক্তব্য, দেশজুড়ে রাজনৈতিক তৎপরতা, জনপ্রিয়তা সব মিলিয়ে তিনি ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছেন।

কে এই ‘এওসি’

আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্যতম পরিচিত প্রগতিশীল নেতা। ১৯৮৯ সালের ১৩ অক্টোবর নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে জন্ম। ২০১৯ সাল থেকে নিউইয়র্কের ১৪তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হিসেবে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে কাজ করছেন। বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়ার পর তিনি কমিউনিটি অর্গানাইজার হিসেবে কাজ করেন।

রাজনীতিতে তার উত্থান ঘটে ২০১৮ সালে। তখন তিনি ছিলেন মাত্র ২৮ বছরের একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের বাসিন্দা। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী জো ক্রাউলি ছিলেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। ক্রাউলি ১৯৯৯ সাল থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং ২০১৭-১৮ সময়ে তিনি হাউস ডেমোক্র্যাটিক ককাসের চেয়ারম্যানও ছিলেন।

২০১৮ সালের ২৬এ জুন নিউইয়র্কের ১৪তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে ভোট হয়। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো আসনে সাধারণ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী কে হবেন, সেটি ঠিক করতে দলটির ভোটাররা আগে প্রাইমারি নির্বাচনে ভোট দেন।

২০১৮ সালের আগে ক্রাউলি টানা ১৪ বছর নিজের দলের ভেতরেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রাইমারি পার করে আসছিলেন। তাই এওসি যখন মাত্র ২৮ বছর বয়সে তাকে চ্যালেঞ্জ করেন, সেটি ছিলো অপ্রত্যাশিত। 

নির্বাচনের আগে ক্রাউলিকে হারানো কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছিলো। তিনি ১৪ বছর ধরে কোনো প্রাইমারি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েননি। বিপরীতে এওসি-এর নির্বাচনি প্রচারণায় বড় অর্থের জোগান ছিলো না। তিনি তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ ভোটারদের ওপর নির্ভর করে প্রচার চালান। শেষ পর্যন্ত তিনি ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্রাউলিকে হারান; ক্রাউলি পান ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট।

প্রাইমারিতে জয়ী হওয়ার পর নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যান্থনি পাপ্পাসকে হারান এওসি। এর মাধ্যমে তিনি নিউইয়র্কের ১৪তম ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেসে যাওয়ার পথ নিশ্চিত করেন। তখন তার বয়স ছিলো ২৯ বছর। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শপথ নেওয়ার সময় তিনি ২৯ বছর ২ মাস ২২ দিন বয়সে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রবেশ করেন এবং ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ নারী হিসাবে কংগ্রেস সদস্য হন।

এই জয় এওসিকে রাতারাতি জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখে পরিণত করে। তাই ২০১৮ সালের ক্রাউলিকে হারানোর ঘটনাকে এওসির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ভিত্তিপ্রস্তর বলা হয়।

কেন এওসি-কে নিয়ে এত আলোচনা

এওসি-কে নিয়ে আলোচনার প্রথম কারণ তার জনপ্রিয়তা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের গ্রানাইট স্টেট পোল-এ সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের মধ্যে এওসি এগিয়ে ছিলেন বলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গ্রানাইট স্টেট পোল হলো একটি জনমত জরিপ যা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বা দলের প্রাথমিক নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনোভাব জানতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিউ হ্যাম্পশায়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য হওয়ায় সেখানে কোনো প্রার্থীর জনপ্রিয়তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে শুধু জরিপ নয়, সামাজিক মাধ্যমেও এওসি জনপ্রিয়। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ইনস্টাগ্রামেই তার প্রায় এক কোটি অনুসারী আছে। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার পাশাপাশি তিনি সরাসরি বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দিতে পারেন।

তার জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ হলো রাজনৈতিক পরিচিতি। নিজেকে ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেন। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং শ্রমজীবীদের অধিকার নিয়ে অবস্থান তাকে দলের তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করেছে।

এছাড়া ৯ই অগাস্ট ২০২৬-এ সামাজিক মাধ্যমে তিনি জানান, নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নারীদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার পরিকল্পনা ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির যে চ্যালেঞ্জ, তা নিয়ে সমাজে আরও খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। 

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এই প্রশাসন (ট্রাম্পের সরকার) দেশজুড়ে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত করছে। গর্ভপাতের অধিকার থেকে শুরু করে সুস্থভাবে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। নেতৃত্বের জায়গায় থাকা মানুষ হিসেবে আমাদের এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রক্রিয়াগত তথ্য ভাগাভাগি করে নেওয়াকে আমি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।” 

এওসির জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ তার ‘গ্রিন নিউ ডিল’। ২০১৯ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এড মার্কির সঙ্গে তিনি ‘গ্রিন নিউ ডিল’-এর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর লক্ষ্য ছিলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও অবকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা। প্রস্তাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলার বিষয়ও ছিলো।

এওসি কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে চান

এওসি এখনো বলেননি যে তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। তবে তিনি সম্ভাবনাটি নাকচও করেননি।

মে ২০২৬-এ শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রকফেলার মেমোরিয়াল চ্যাপেলে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো পদ, আসন বা উপাধি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার লক্ষ্য এই দেশকে পরিবর্তন করা।

এই বক্তব্যের পর তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা আরও বাড়ে।

এর আগে ২০২৫ সালে তিনি সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে ‘ফাইটিং অলিগার্কি’ সফরে অংশ নেন। এরপর দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রগতিশীল প্রার্থীদের সমর্থনে প্রচারণা চালিয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ড তার পরিচিতি আরও বাড়িয়েছে।

তবে এওসির সাবেক কমিউনিকেশন ডিরেক্টর করবিন ট্রেন্ট বলেন, এওসি রাজনীতিকে কখনোই শুধু পরবর্তী বড় পদে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে দেখেননি।

২০১৮ সালে এওসি জো ক্রাউলিকে হারানোর পরপরই ট্রেন্টকে বিভিন্ন রাজনীতিক ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, তার পরবর্তী লক্ষ্য কী। কিন্তু ট্রেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এওসির মাথায় প্রেসিডেন্ট, গভর্নর বা সিনেটর হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিলো না।

বামপন্থিদের সমালোচনা

তবে এওসি এখন বামপন্থিদের কাছে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন। বামপন্থি সমর্থকদের একটি অংশ মনে করছে, কংগ্রেসে দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি ধীরে ধীরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূলধারার কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন।

গত কয়েক বছরে এওসি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। সাবেক হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি সম্প্রতি তার প্রশংসা করে বলেন, এওসি এখন খুবই কার্যকরভাবে কাজ করছেন এবং তার সঙ্গে কাজ করা আনন্দের।

এতেই বামপন্থিদের একটি অংশের প্রশ্ন তুলছে, যে রাজনীতিবিদ একসময় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করতেন, তিনি কি এখন সেই ব্যবস্থারই অংশ হয়ে যাচ্ছেন?

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এওসি ইসরায়েলের গাজা অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তিনি ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দেন।

তার এই অবস্থানের কারণে ফিলিস্তিনপন্থি ও বামপন্থি ভোটারদের একটি অংশের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে। তবে একই ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যপন্থি ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কমতেও পারে। 

২০২৮ সালে কারা তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন

২০২৮ সালের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি যদি এওসিকে নিয়ে শুরু হয়, তাহলে লড়াইটি সহজ হবে না। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কয়েকজন পরিচিত ডেমোক্র্যাট নেতার নাম এসেছে।

তাদের মধ্যে রয়েছেন কমলা হ্যারিস, পিট বুটিগিগ, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম, জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান রো খান্না। 

এরা প্রত্যেকেই এওসির তুলনায় রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ। কেউ অভিজ্ঞতায় এগিয়ে, কেউ দলের মধ্যপন্থি অংশে বেশি গ্রহণযোগ্য, আবার কারও জাতীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে এওসির জন্য প্রাইমারি লড়াই সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

এওসির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর আরেকটি হতে পারে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন পাওয়া।

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনীতিতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণ ক্যারোলিনার মতো নির্বাচনি অঙ্গরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন পাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২৮ সালের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে দক্ষিণ ক্যারোলিনাই প্রথম ভোট দেবে এবং অঙ্গরাজ্যটির ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের বড় একটি অংশ কৃষ্ণাঙ্গ।

২০২০ সালে জো বাইডেন দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্রাইমারিতে বড় জয় পেয়েছিলেন, যা তার প্রচারণায় নতুন গতি এনে দেয়। একইভাবে ২০১৬ সালে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন হিলারি ক্লিনটনকে দক্ষিণ ক্যারোলিনায় বড় জয় এনে দিয়েছিলো।

তাই ২০২৮ সালে এওসি প্রার্থী হলে শুধু তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন যথেষ্ট হবে না। তাকে বৃহত্তর ডেমোক্র্যাট কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনও পেতে হবে। 

শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করলে এওসিকে রিপাবলিকানদের মুখোমুখিও হতে হবে। 

ডানপন্থি রাজনীতিক ও গণমাধ্যম বহু বছর ধরেই তাকে ‘র‌্যাডিক্যাল’ বা অতিরিক্ত বামপন্থি হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় তার পুরোনো বক্তব্য এবং সামাজিক মাধ্যমের পুরোনো পোস্টকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। 

হিলারি-কমলার পর এওসি কি মনোনয়ন পাবে

হিলারি ক্লিনটন ও কমলা হ্যারিসের পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কি আবার একজন নারীকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নিতে প্রস্তুত কি না এমন প্রশ্ন উঠছে। 

এর আগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দুবার নারী প্রার্থীকে সামনে এনে বড় নির্বাচনি ধাক্কা খেয়েছে। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হন ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপর ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিসও ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হন। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশের মধ্যে আশংকা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কি একজন নারীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করতে প্রস্তুত?

এই আশংকার পেছনে শুধু নারী হওয়ার বিষয়টি নেই। হিলারি ও কমলার পরাজয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরও বড় একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে, প্রার্থী কতটা জনপ্রিয় বা ঐতিহাসিক, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভোটারদের কাছে তিনি কতটা গ্রহণযোগ্য? 

২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন ছিলেন দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভিজ্ঞ একজন নেতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও ট্রাম্প হিলারিকে পরাজিত করেন। একই চিত্র দেখা যায় ২০২৪ সালেও। কমলা হ্যারিসকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হন ট্রাম্প।

এই জায়গাতেই এওসির সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি দুটোই রয়েছে।

হিলারি বা কমলার মতো এওসি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের প্রতিনিধি নন। বরং তার রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা, শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে অবস্থান এবং তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে। ২০১৮ সালে তিনি ১০ মেয়াদের কংগ্রেসম্যান জো ক্রাউলিকে হারিয়েই জাতীয় রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেন।

তবে একজন নারী প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিততে শুধু নারী ভোটার বা প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন পেলেই হবে না। তাকে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার, শ্রমজীবী ভোটার, মধ্যপন্থি ডেমোক্র্যাট ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। 

নারী রাজনীতিকদের শুধু তাদের রাজনৈতিক কাজ দিয়ে বিচার করা হয় না; তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সম্পর্ক, চরিত্র ও আচরণ নিয়েও অনেক বেশি প্রশ্ন তোলা হয়।

২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ব্যক্তিগত ই-মেইল সার্ভার ব্যবহার করেছিলেন। এই বিষয়টি তার প্রচারণার অন্যতম বড় বিতর্কে পরিণত হয়। একই সময়ে ডনাল্ড ট্রাম্পও নানা বিতর্ক ও যৌন অসদাচরণের অভিযোগের মুখে ছিলেন। তবু নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আচরণ ও চরিত্র নিয়ে ভোটারদের কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। 

এওসির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি কঠিন হতে পারে। সম্প্রতি তিনি ডিম্বাণু সংরক্ষণের কথা প্রকাশ্যে জানান। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলে তার বয়স, নারী হওয়া এবং পরিবার পরিকল্পনা, এসব বিষয় রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

এওসির সামনে আরেকটি পথ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে সিনেটর হওয়া।

রিপাবলিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারা সেটমেয়ার মনে করেন, নিউইয়র্কের সিনেট আসনের জন্য লড়াই করা এওসির জন্য দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে। তার মতে, সিনেটর হলে এওসি জাতীয় রাজনীতিতে আরও অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন। এরপর প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করলে তার অবস্থান আরও শক্ত হবে।

তবে এর বিপরীত যুক্তিও আছে। হিলারি ক্লিনটন ও কমলা হ্যারিসের মতো অভিজ্ঞ নেতারা সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে গিয়ে সেই সুযোগ হারিয়েছেন। আবার বারাক ওবামার মতো নেতারাও কম বয়সে নেতৃত্ব দিতে পেরেছেন।

এওসি ২০২৮-এ লড়বেন কী না এই মুহূর্তে সেই উত্তর কেউই জানে না। এওসি নিজে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। কিন্তু তার জনপ্রিয়তা, জাতীয় পর্যায়ে সক্রিয়তা, রাজনীতিতে তার অবস্থান এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ না করার কারণে তাকে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়াও কঠিন।

তার সামনে একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও বড় ঝুঁকি রয়েছে। একদিকে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারেন। অন্যদিকে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি শুধু ডেমোক্র্যাটদের অংশ নয়, কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারসহ পুরো দলের বৃহত্তর ভোটারগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য।