অর্থনীতি, দুর্নীতি ও জনঅসন্তোষে ভেঙে পড়ল ওরবানের ১৫ বছরের ক্ষমতা
ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হন ওরবান, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসেন পিটার মাগয়ার। দুর্নীতিবিরোধী ও অর্থনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে জনসমর্থন আদায় করেন তিনি।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৫ পিএমআপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম
১৫ বছরের শাসনের ইতি, হাঙ্গেরিতে ওরবানের বড় পরাজয়
প্রায় দেড় দশক ধরে হাঙ্গেরির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা ভিক্টর ওরবান অবশেষে বড় ধরনের নির্বাচনি পরাজয়ের মুখে পড়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউক্রেনবিরোধী অবস্থান, জাতীয়তাবাদী বক্তব্য এবং ক্ষমতার নানা কৌশল দিয়ে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা কাজে আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল অর্থনীতি, লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা ক্ষোভই তার পতনের মূল কারণ। একইসঙ্গে তারা বলছেন, এক সময়ের জনপ্রিয় এই নেতা ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসেন পিটার মাগয়ার।
২০১০ সাল থেকে মধ্য ইউরোপের ছোটে এই দেশটিতে ক্ষমতায় ছিলেন সমসাময়িক রাজনীতির বিতর্কিত চরিত্র ভিক্টর ওরবান। প্রেসিডেন্ট হয়েই যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার দেশে আগের মতো আর লিবারেল গণতন্ত্রে চলবে না। গড়ে তুলবেন ‘ইলিবারেল ডেমোক্রেসি’। চলেছেও সেভাবে।
ওরবানের মতে, ইলিবারেল গণতন্ত্র স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় না। তবে প্রধান নীতি হিসেবে উদারনৈতিক (লিবারেল) মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে। এটি এমন এক কর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমাজ, জাতীয় স্বার্থ ও সমষ্টিগত পরিচয়।
তার দাবি, পশ্চিমা গণতন্ত্রের অত্যধিক ব্যক্তিস্বাধীনতা সমাজকে দুর্বল করে ফেলেছে। তাই এমন শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন যা রক্ষা করবে সমাজ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব।
২০১০ সালে ক্ষমতায় এসে একের পর এক আইন প্রণয়ন শুরু করেন ভিক্টর ওরবান। ২০১২ সালের পয়লা জানুয়ারি কার্যকর হয় নতুন সংবিধান।
এই সংবিধানে হাঙ্গেরিকে ‘ঐতিহ্যবাহী খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, কেবল নিবন্ধিত ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর স্বীকৃতি রাখা হয় এবং ছোট ধর্মীয় সংগঠনগুলো সেই স্বীকৃতি হারায়। একই সঙ্গে বিবাহকে শুধু একজন পুরুষ ও একজন নারীর সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ফলে সমলিঙ্গ বিবাহ ও অন্য পারিবারিক কাঠামো বাদ পড়ে যায়।
বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক আদালতের ক্ষমতাও সীমিত করা হয়, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও বাজেটসংক্রান্ত বিষয়ে তাদের স্বাধীনতা কমে যায় এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৩৮৬ থেকে কমিয়ে ১৯৯ করা হয় এবং এমন এক নতুন নির্বাচনি ব্যবস্থা চালু করা হয়, যাতে ওরবানের দল ফিজেস সুবিধা পায়।
নতুন সংবিধানে সরকারনিয়ন্ত্রিত মিডিয়া কাউন্সিল গঠন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাও কিছুটা সীমিত করা হয় এবং সংবিধানে দেশের নাম ‘রিপাবলিক অব হাঙ্গেরি’ থেকে বদলে শুধু ‘হাঙ্গেরি’ করা হয়।।
এই সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছিল। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সংবিধানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত এবং ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন ভিক্টর ওরবান।
তবে সমালোচনার পরও ভিক্টর ওরবান ভোটে জিততেই থাকেন, তাও আবার নিরঙ্কুশভাবে। ২০১০ সালের পর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ এর নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। অবশেষে থামলো তার জয়যাত্রা, ২০২৬ নির্বাচনে পতন হলো ওরবানের
অনেকেই মনে করেছিলেন, নির্বাচনি মাঠ নিজের পক্ষে সাজিয়ে রাখা, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর দীর্ঘদিনের প্রভাব, আর ক্ষমতার সুবিধা–সব মিলিয়ে ওরবান আবারও টিকে যাবেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোও তাকে রক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কখনও কখনও উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই নির্বাচনে ঠিক সেটাই হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে ওরবান এবং তার দল ফিদেজকে ঘিরে ক্লান্তি ও বিরক্তি বাড়ছিল। অনেকের চোখে দলটি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ক্ষমতাবানদের সুবিধা নেওয়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেশের অর্থনীতিও চাপে পড়েছে আর তার দায় পড়েছে ওরবানের ওপরই।
তবে মানুষের মনোভাব বদলে গেলেও ধরতে পারেননি ওরবান। দিতে পারেননি নতুন কোনো বার্তা। আগের তিনটি নির্বাচনে তিনি যে কৌশল নিয়েছিলেন, এবারও প্রায় সেটাই অনুসরণ করেন।
নিজেকে ওরবান এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি নাকি একমাত্র হাঙ্গেরির স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন। পাশাপাশি তিনি বাইরের শত্রুর ভয়ও দেখানোর চেষ্টা করেন।
প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি ইইউ এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে দেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
তবে সেই ভয় দেখানোর রাজনীতি কাজ করেনি। বাইরের শত্রুর গল্পের চেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা নিয়ে চিন্তিত ছিল দেশটির জনগণ।
তারা বলছেন, এক সময়ের জনপ্রিয় নেতা ওরবান মানুষের মনের সঙ্গে তার সেই পুরোনো সংযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বুঝতে পারেননি যে, এমন কিছু সমস্যা তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা এর আগেও অনেক শক্তিশালী নেতাকে বিপদে ফেলেছে।
অন্যদিকে পিটার মাগয়ারের হয়েছেন আরও শক্তিশালী।
ওরবানের বায়োগ্রাফি লেখক পাল দানিয়েল রেনি পলিটিকোকে বলেন, “নির্বাচনি সমাবেশগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। বিরোধীদের সমাবেশে মানুষের মধ্যে বাস্তব উচ্ছ্বাস ছিল, কিন্তু সরকারের সমাবেশে তা ছিল না।”
বিদেশি নির্ভরতা ও অর্থনীতি
ওরবানের পক্ষে বিদেশি নেতাদের সমর্থন ছিল। কিন্তু তা কাজে আসেনি।
নিজেদের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব আর “নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে” রাখার কথা বললেও বিশ্বজুড়ে কট্টর ডানপন্থী নেতারা হাঙ্গেরির এই নির্বাচনে ওরবানের পক্ষে বেশ জোরেই মাঠে নামেন।
তারা একের পর এক সতর্কবার্তা দিতে থাকেন যে ওরবান হেরে গেলে হাঙ্গেরির জন্য নাকি খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।
ওরবানের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেন মার্কিন মিত্ররাও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে তার সমর্থনে নামেন।
ইউরোপে ওরবানকে তারা নিজেদের ঘনিষ্ঠ আদর্শিক মিত্র হিসেবে দেখেন। অন্য দেশের নির্বাচনে এভাবে প্রচারে নেমে তারা এক ধরনের অলিখিত রীতি ভেঙেছেন।
কিন্তু ট্রাম্পের সমর্থনই বরং নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে ওরবানে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত জুনের এক জরিপ অনুযায়ী, হাঙ্গেরিতে ট্রাম্প একটি বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব।
দেশের ৪৬ শতাংশ মানুষের তার ওপর বিশ্বনেতা হিসেবে খুব কম বা একেবারেই আস্থা নেই। অন্যদিকে ৫৩ শতাংশ মানুষের কিছুটা বা অনেক আস্থা আছে।
কিন্তু এসব বড় বড় কথা, বাইরের নেতাদের উপদেশ আর ভয়ভীতি, কোনোকিছুই সাধারণ ভোটারদের খুব একটা নাড়া দিতে পারেনি। কারণ মানুষ তখন বেশি চিন্তায় ছিল একেবারে নিজের জীবনের বাস্তব সমস্যা নিয়ে। যেমন; বিল পরিশোধ করা, কাজ পাওয়া, আর ভালো চিকিৎসা পাওয়া।
বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা মার্তোন তোমপোশ বলেন, বিদেশিদের হস্তক্ষেপ আসলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তিনি মধ্যপন্থী মোমেন্টাম দলের একজন নেতা।
এই নির্বাচনে তাদের দল পিটার মাগয়ারের তিসা পার্টির জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়, যাতে ওরবানের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে।
পলিটিকোকে তোমপোশ বলেন, “জেডি ভ্যান্সকে ধরুন। হাঙ্গেরির সাধারণ মানুষ তাকে প্রায় চিনেই না। তাই তার উপস্থিতি এসে সব বদলে দেবে, এমন ভাবনা অন্তত খুবই সরল বিশ্বাস ছিল।”
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ডানপন্থী নেতাদের এই প্রকাশ্য সমর্থন হাঙ্গেরির রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারেনি। কারণ মানুষ ফিদেজ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল দেশের ভেতরের সমস্যা নিয়ে। রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতা, দুর্নীতি আর ভেতরের পচন নিয়ে।
অনেকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আনা ছিল ওরবানের মরিয়া চেষ্টা। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাগয়ারকে ঠেকাতে ওরবানের হাতে নতুন কোনো কৌশল ছিল না।
মাগয়ার একসময় ফিদেজেরই মানুষ ছিলেন। তাই ওরবান যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, তা তিনি ভেতর থেকে ভালোই বুঝতেন।
আগের বিরোধী নেতাদের মতো তিনি দেশপ্রেম বা জাতীয় প্রতীকের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেননি। বরং তিনি নিজেই জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে নিজের ভাষায় তুলে ধরেন।
তিনি তার সমর্থকদের নির্বাচনি সমাবেশে জাতীয় পতাকা আনতে বলেন। কখনও কখনও তাকে দেখা গেছে ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা-ধাঁচের হাঙ্গেরীয় পোশাক পরে। ফুটবল ম্যাচেও তিনি গেছেন, তবে ওরবানের মতো ভিআইপি বক্সে বসেননি। তিনি সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে গ্যালারিতেই বসেছেন।
বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রশ্নেও মাগয়ার খুব পরিষ্কার অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস বা মস্কো। যেখান থেকেই হোক, বাইরের হস্তক্ষেপ হাঙ্গেরির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। হাঙ্গেরির মানুষ নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে।
সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তাটি ছিল দেশপ্রেমের শক্তিশালী বার্তা।
ওরবান নিজেকে দেশের সবচেয়ে বড় রক্ষক হিসেবে দেখাতে চাইলেও, মাগয়ার এমনভাবে কথা বলেছেন যে অনেকের কাছে বরং ওরবানকেই বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হয়েছে।
ব্রিটেনের চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক টিমোথি অ্যাশ বলেন, মাগয়ার দুর্নীতির বিষয়টি যেভাবে সামনে এনেছেন, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তার মতে, একটি দেশ যতক্ষণ অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি ভালো চলে, ততক্ষণ মানুষ অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনও সহ্য করে। কিন্তু অর্থনীতি খারাপ হতে শুরু করলে, আর মানুষ যখন দেখে ক্ষমতাবানরা নিজেদের পকেট ভরছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
কিম লেন শেপেল বলেন, হাঙ্গেরির অর্থনীতি শক্তিশালী থাকা পর্যন্ত এবং ওরবানের দুর্নীতি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকা পর্যন্ত তিনি বারবার নির্বাচিত হতে পেরেছেন।
একটা সময় অর্থনীতি থমকে যায়।
ওরবানের দুর্নীতি নিয়ে একের পর এক তথ্য সামনে আসতে থাকে। তার বাবার নামে থাকা বিলাসবহুল সম্পত্তির কথা, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অস্বাভাবিক সম্পদের কথা যখন প্রকাশ পায়, সবই মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শেপেল বলেন, মতে, সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই কষ্ট পাচ্ছিল, তখন এসব খবর তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
নিত্যদিনের সমস্যাই ‘বড় সমস্যা’
নির্বাচনি প্রচারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যা নিয়েই বেশি কথা বলেছেন পিটার মাগয়ার। তিনি বারবার ফিদেজ সরকারের দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।
তার অভিযোগ, ওরবানের পরিবার, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং আশপাশের প্রভাবশালী মহল ক্রমেই ধনী হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ হয়েছে আরও গরিব।
বুদাপেস্টের ইওতভশ লোরান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নির্বাচন বিশ্লেষক মাটিয়াস বোদি বলেন, ভোটারদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছিল মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতি।
তিনি বলেন, “ওরবানের পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এবং কাজের সংকট।”
বোদি বলেন, “মাগয়ারের একটি বড় বার্তা ছিল যে দেশটা ঠিকমতো চলছে না। স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, শিক্ষা। সব জায়গাতেই সাধারণ মানুষ ভাঙাচোরা অবস্থা আর বাড়তে থাকা অকার্যকারিতা অনুভব করেছে।”
অর্থাৎ, মানুষ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শোনেনি, তারা নিজেদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মাগয়ারের কথার মিল পেয়েছে।
‘আধুনিক, ইউরোপীয় হাঙ্গেরি’
মানুষের হতাশা ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মাগয়ার একটি ‘আধুনিক, ইউরোপীয় হাঙ্গেরি’ গড়ার প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটার থেকে শুরু করে সবার ভেতরেই সাড়া ফেলেছে।
এই শ্রেণির মানুষদের একটি বড় অংশ আগে ফিদেজের শক্ত সমর্থক হিসেবেই পরিচিত ছিল। ফলে তাদের মধ্যে মাগয়ারের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়া ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বোদির মতে, এটাই নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পুরোনো ওরবান
৪৫ বছর বয়সী পিটার মাগয়ারের প্রচারভঙ্গি ২০১০ সালের ভিক্টর ওরবানের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। তখন ওরবানও অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের জীবনমান এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচার করেছিলেন।
হাঙ্গেরির একাডেমিক ও সাবেক ফিদেজ আইনপ্রণেতা পিটার মলনারও এমনটাই মনে করেন।
১৯৯৪ সালে ফিদেজ ত্যাগ করা এই রাজনীতিবিদের অভিযোগ, ওরবান দলটিকে আরও কট্টর জাতীয়তাবাদী ও অগণতান্ত্রিক পথে নিয়ে গেছেন।
তার ভাষায়, আজকের মাগয়ার সেই পুরোনো ওরবানের মতো শোনাচ্ছেন। যিনি একসময় সাধারণ মানুষের জীবন বদলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
হাঙ্গেরির নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম লেন শেপেলের মতে, ওরবান বুঝতেই পারছিলেন না মাগয়ারকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন। কারণ, অনেক দিক থেকে মাগয়ার যেন তারই ছোট সংস্করণ।
“মাগয়ার একজন মধ্য-ডানপন্থী, দুর্নীতিবিরোধী প্রচারক। ২০১০ সালে ওরবান যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাকেও অনেকটা এমনই দেখাত”- বলেন শেপেল।
পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন যে ভাষা, ভঙ্গি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মাগয়ার সামনে এসেছেন, তা একসময় ওরবানের নিজেরই পরিচিত কৌশল ছিল। ফলে ওরবানের জন্য তাকে আক্রমণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যতিক্রমী প্রচার
নির্বাচনি প্রচারে ওরবান বারবার ইউক্রেন যুদ্ধের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনেন এবং বোঝাতে চান যে প্রতিদ্বন্দ্বী মাগয়ার জিতলে হাঙ্গেরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে এসব আক্রমণে মাগয়ার বিচলিত হননি; বরং তাকে উসকে দেওয়া বা মূল ইস্যু থেকে সরিয়ে নেওয়ার সব প্রচেষ্টাই তিনি এড়িয়ে গেছেন।
হাঙ্গেরির একাডেমিক ও সাবেক রাজনীতিক পিটার মলনার পলিটিকোকে বলেন, “মাগয়ার খুব নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। ওরবান যখনই তাকে মূল বার্তা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন, মাগয়ার সেই ফাঁদে পা দেননি।”
পুরো নির্বাচনি লড়াইয়ে মাগয়ার সক্রিয় ছিলেন। শুধু বড় শহরে নয়, ফিদেজ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছোট শহর ও গ্রামেও নিয়মিত প্রচার চালিয়েছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীরা সাধারণত এসব জায়গায় খুব একটা জোর দিতেন না। কিন্তু মাগয়ার সেখানে ব্যতিক্রম। ওরবান যদি একটি শহরে যায়, মাগয়ার গেছেন পাঁচ-ছয়টি শহরে।
হার টের পেয়েছিলেন ওরবান
যারা বহু বছর ধরে ওরবানকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচনি প্রচারের শুরুতেই ওরবান বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি হারতে পারেন।
ওরবানের বায়োগ্রাফি লেখক পাল দানিয়েল রেনির মতে, এ কারণেই হয়তো তিনি ব্রাসেলস ও জেলেনস্কিকে ঘিরে আরও বেশি উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিপক্ষকে বারবার উসকে দিতে চাইছিলেন। যেন কোনোভাবে পরিস্থিতি তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ায়।
রেনি বলেন, “তিনি যেভাবে কথা বলছিলেন, তার ভাষা, অঙ্গভঙ্গি, শরীরী ভাষা। সবই আমার কাছে আলাদা মনে হয়েছে। আমি ১৬ বছর ধরে তাকে কভার করছি। তাকে অনেকটাই মনভাঙা লাগছিল।”
“আমার মনে হয়, তিনি বুঝেছিলেন যে কোনো কিছুই চিরকাল থাকে না।”-বলেন রেনি।
হাঙ্গেরির ভবিষ্যত কী
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক ম্যাক্স বার্গম্যান টাইমকে বলেন, “এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের জন্য, ইউক্রেনের জন্য, এমনকি বিশ্বজুড়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির জন্যও এর তাৎপর্য আছে।”
তিনি বলেন, “হাঙ্গেরিকে অনেকেই এমন এক কট্টর ডানপন্থী, উদার গণতন্ত্রবিরোধী ‘মডেল’ হিসেবে দেখেছে, যেখানে নির্বাচিত হয়েও এক ধরনের স্বৈরশাসন চালানো হয়েছে।”
২০২২ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বলেছিল, হাঙ্গেরি এখন একটি “নির্বাচনি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা”-তে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, দেশে নির্বাচন হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি ও মানদণ্ডের প্রকৃত সম্মান আর নেই।
বার্গম্যান বলেন, “ওরবান হাঙ্গেরির গণতন্ত্রের চরিত্রই বদলে দিয়েছেন। এখন পুরো ব্যবস্থাটা মূলত তাকে ঘিরেই ঘোরে। তিনি দেশটাকে প্রায় নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো চালিয়েছেন।”
তবে সেই পরিস্থিতি দুর্নীতির কারণে পালটে যায় বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
ওরবানের সমালোচকদের পিটার মাগয়ার এক জায়গায় আনতে পেরেছেন মত দিয়ে বার্গম্যান বলেন, “বামপন্থী ভোটার থেকে শুরু করে ডানপন্থীদের মধ্যেও যারা ওরবানের ওপর ক্ষুব্ধ– তাদের অনেকেই মাগয়ারের পক্ষে গেছেন।”
জার্মান মার্শাল ফান্ডের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জসুজান্না ভেগ টাইমকে বলেন, এটি হাঙ্গেরির জন্য “একটি মাইলফলক নির্বাচন”।
তার মতে, মাগয়ারের দলের জয় মানে হচ্ছে হাঙ্গেরির ভোটাররা ওরবানের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভোটের আগে ভেগ বলেন, “গত দেড় দশকে যে স্বৈরতান্ত্রিক ধারা তৈরি হয়েছে, তা থামিয়ে দেশকে আবার আরও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে ফেরানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।”
তবে মাগয়ার ক্ষমতায় এলে তিনি সত্যিই প্রতিশ্রুত সংস্কার করবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ইইউ-এর ওপর প্রভাব
ওরবানের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক গত কয়েক বছরে ক্রমেই তিক্ত হয়েছে।
বার্গম্যান বলেন, ওরবান ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য “একটি বড় মাথাব্যথা” হয়ে উঠেছিলেন।
বিশেষ করে, তিনি বারবার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা সিদ্ধান্ত আটকে দিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
একই সুরে কথা বলেছেন ভেগও। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে হাঙ্গেরি কার্যত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আটকে দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে ইইউ যেভাবে কাজ করতে পারত, তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি বলেন, মাগয়ারের দল হাঙ্গেরিকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখতে চায়, যে ইইউর সদস্য থাকতে চায়, সহযোগিতা করতে চায়, এবং এই কাঠামোকে দেশের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। ইইউয়ে যৌথ উদ্যোগকে দুর্বল করতে নয়।
মাগয়ারও বলেছেন, তার দল জিতলে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির খারাপ হয়ে যাওয়া সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করবেন। তার ভাষায়, এই সাধারণ নির্বাচন হবে “বিশ্বে আমাদের দেশের অবস্থান কোথায় হবে, তার ওপর এক ধরনের গণভোট।”
বার্গম্যান অবশ্য সতর্ক করে বলেন, “পিটার মাগয়ার আসলে কোন অবস্থান নেবেন, তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা আছে।”
তবে ভেগেরও ধারণা মাগয়ার সরাসরি ভেটো দেবেন না। তিনি বলেন, “তিনি ইইউয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করবেন না। আর এটিই ওরবানের তুলনায় একটি বিশাল পরিবর্তন।”
ভেগের মতে, মাগয়ার যদি দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তা ইইউর সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করবে। কারণ দুই পক্ষের সম্পর্কে টানাপোড়েনের বড় কারণগুলোর একটি ছিল হাঙ্গেরিতে দুর্নীতির বিস্তার।
২০২২ সালে আইনের শাসন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হাঙ্গেরির জন্য বরাদ্দ কয়েক বিলিয়ন ডলারের তহবিল স্থগিত করেছিল।
যদি মাগয়ার তার প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করেন এবং ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করেন, তাহলে সেই স্থগিত অর্থ ছাড় হতে পারে।
বার্গম্যানের মতে, এতে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি আসতে পারে।
তবে ভেগ বলেন, ইইউ কতটা অর্থ ছাড় করবে, তা নির্ভর করবে সংস্কারের গভীরতা ও বাস্তবতার ওপর।
নতুন নেতৃত্ব এলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসায় পিছিয়ে পড়েছিলেন ওরবান। পশ্চিমা মিত্ররা পাশে থাকলেও ইইউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল শীতল। সব মিলে একক কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে হারাতে থাকেন ওরবান, আর তারই প্রতিফলন নির্বাচনের ফলে।
অর্থনীতি, দুর্নীতি ও জনঅসন্তোষে ভেঙে পড়ল ওরবানের ১৫ বছরের ক্ষমতা
ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হন ওরবান, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসেন পিটার মাগয়ার। দুর্নীতিবিরোধী ও অর্থনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে জনসমর্থন আদায় করেন তিনি।
প্রায় দেড় দশক ধরে হাঙ্গেরির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা ভিক্টর ওরবান অবশেষে বড় ধরনের নির্বাচনি পরাজয়ের মুখে পড়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউক্রেনবিরোধী অবস্থান, জাতীয়তাবাদী বক্তব্য এবং ক্ষমতার নানা কৌশল দিয়ে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা কাজে আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল অর্থনীতি, লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা ক্ষোভই তার পতনের মূল কারণ। একইসঙ্গে তারা বলছেন, এক সময়ের জনপ্রিয় এই নেতা ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসেন পিটার মাগয়ার।
২০১০ সাল থেকে মধ্য ইউরোপের ছোটে এই দেশটিতে ক্ষমতায় ছিলেন সমসাময়িক রাজনীতির বিতর্কিত চরিত্র ভিক্টর ওরবান। প্রেসিডেন্ট হয়েই যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার দেশে আগের মতো আর লিবারেল গণতন্ত্রে চলবে না। গড়ে তুলবেন ‘ইলিবারেল ডেমোক্রেসি’। চলেছেও সেভাবে।
ওরবানের মতে, ইলিবারেল গণতন্ত্র স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় না। তবে প্রধান নীতি হিসেবে উদারনৈতিক (লিবারেল) মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে। এটি এমন এক কর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমাজ, জাতীয় স্বার্থ ও সমষ্টিগত পরিচয়।
তার দাবি, পশ্চিমা গণতন্ত্রের অত্যধিক ব্যক্তিস্বাধীনতা সমাজকে দুর্বল করে ফেলেছে। তাই এমন শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন যা রক্ষা করবে সমাজ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব।
২০১০ সালে ক্ষমতায় এসে একের পর এক আইন প্রণয়ন শুরু করেন ভিক্টর ওরবান। ২০১২ সালের পয়লা জানুয়ারি কার্যকর হয় নতুন সংবিধান।
এই সংবিধানে হাঙ্গেরিকে ‘ঐতিহ্যবাহী খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, কেবল নিবন্ধিত ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর স্বীকৃতি রাখা হয় এবং ছোট ধর্মীয় সংগঠনগুলো সেই স্বীকৃতি হারায়। একই সঙ্গে বিবাহকে শুধু একজন পুরুষ ও একজন নারীর সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ফলে সমলিঙ্গ বিবাহ ও অন্য পারিবারিক কাঠামো বাদ পড়ে যায়।
বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক আদালতের ক্ষমতাও সীমিত করা হয়, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও বাজেটসংক্রান্ত বিষয়ে তাদের স্বাধীনতা কমে যায় এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৩৮৬ থেকে কমিয়ে ১৯৯ করা হয় এবং এমন এক নতুন নির্বাচনি ব্যবস্থা চালু করা হয়, যাতে ওরবানের দল ফিজেস সুবিধা পায়।
নতুন সংবিধানে সরকারনিয়ন্ত্রিত মিডিয়া কাউন্সিল গঠন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাও কিছুটা সীমিত করা হয় এবং সংবিধানে দেশের নাম ‘রিপাবলিক অব হাঙ্গেরি’ থেকে বদলে শুধু ‘হাঙ্গেরি’ করা হয়।।
এই সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছিল। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সংবিধানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত এবং ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন ভিক্টর ওরবান।
তবে সমালোচনার পরও ভিক্টর ওরবান ভোটে জিততেই থাকেন, তাও আবার নিরঙ্কুশভাবে। ২০১০ সালের পর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ এর নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। অবশেষে থামলো তার জয়যাত্রা, ২০২৬ নির্বাচনে পতন হলো ওরবানের
অনেকেই মনে করেছিলেন, নির্বাচনি মাঠ নিজের পক্ষে সাজিয়ে রাখা, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর দীর্ঘদিনের প্রভাব, আর ক্ষমতার সুবিধা–সব মিলিয়ে ওরবান আবারও টিকে যাবেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোও তাকে রক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কখনও কখনও উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই নির্বাচনে ঠিক সেটাই হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে ওরবান এবং তার দল ফিদেজকে ঘিরে ক্লান্তি ও বিরক্তি বাড়ছিল। অনেকের চোখে দলটি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ক্ষমতাবানদের সুবিধা নেওয়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেশের অর্থনীতিও চাপে পড়েছে আর তার দায় পড়েছে ওরবানের ওপরই।
তবে মানুষের মনোভাব বদলে গেলেও ধরতে পারেননি ওরবান। দিতে পারেননি নতুন কোনো বার্তা। আগের তিনটি নির্বাচনে তিনি যে কৌশল নিয়েছিলেন, এবারও প্রায় সেটাই অনুসরণ করেন।
নিজেকে ওরবান এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি নাকি একমাত্র হাঙ্গেরির স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন। পাশাপাশি তিনি বাইরের শত্রুর ভয়ও দেখানোর চেষ্টা করেন।
প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি ইইউ এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে দেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
তবে সেই ভয় দেখানোর রাজনীতি কাজ করেনি। বাইরের শত্রুর গল্পের চেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা নিয়ে চিন্তিত ছিল দেশটির জনগণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ওরবান ভোটারদের মন ঠিকমতো বুঝতে পারেননি।
তারা বলছেন, এক সময়ের জনপ্রিয় নেতা ওরবান মানুষের মনের সঙ্গে তার সেই পুরোনো সংযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বুঝতে পারেননি যে, এমন কিছু সমস্যা তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা এর আগেও অনেক শক্তিশালী নেতাকে বিপদে ফেলেছে।
অন্যদিকে পিটার মাগয়ারের হয়েছেন আরও শক্তিশালী।
ওরবানের বায়োগ্রাফি লেখক পাল দানিয়েল রেনি পলিটিকোকে বলেন,
“নির্বাচনি সমাবেশগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। বিরোধীদের সমাবেশে মানুষের মধ্যে বাস্তব উচ্ছ্বাস ছিল, কিন্তু সরকারের সমাবেশে তা ছিল না।”
বিদেশি নির্ভরতা ও অর্থনীতি
ওরবানের পক্ষে বিদেশি নেতাদের সমর্থন ছিল। কিন্তু তা কাজে আসেনি।
নিজেদের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব আর “নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে” রাখার কথা বললেও বিশ্বজুড়ে কট্টর ডানপন্থী নেতারা হাঙ্গেরির এই নির্বাচনে ওরবানের পক্ষে বেশ জোরেই মাঠে নামেন।
তারা একের পর এক সতর্কবার্তা দিতে থাকেন যে ওরবান হেরে গেলে হাঙ্গেরির জন্য নাকি খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।
ওরবানের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেন মার্কিন মিত্ররাও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে তার সমর্থনে নামেন।
ইউরোপে ওরবানকে তারা নিজেদের ঘনিষ্ঠ আদর্শিক মিত্র হিসেবে দেখেন। অন্য দেশের নির্বাচনে এভাবে প্রচারে নেমে তারা এক ধরনের অলিখিত রীতি ভেঙেছেন।
কিন্তু ট্রাম্পের সমর্থনই বরং নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে ওরবানে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত জুনের এক জরিপ অনুযায়ী, হাঙ্গেরিতে ট্রাম্প একটি বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব।
দেশের ৪৬ শতাংশ মানুষের তার ওপর বিশ্বনেতা হিসেবে খুব কম বা একেবারেই আস্থা নেই। অন্যদিকে ৫৩ শতাংশ মানুষের কিছুটা বা অনেক আস্থা আছে।
কিন্তু এসব বড় বড় কথা, বাইরের নেতাদের উপদেশ আর ভয়ভীতি, কোনোকিছুই সাধারণ ভোটারদের খুব একটা নাড়া দিতে পারেনি। কারণ মানুষ তখন বেশি চিন্তায় ছিল একেবারে নিজের জীবনের বাস্তব সমস্যা নিয়ে। যেমন; বিল পরিশোধ করা, কাজ পাওয়া, আর ভালো চিকিৎসা পাওয়া।
বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা মার্তোন তোমপোশ বলেন, বিদেশিদের হস্তক্ষেপ আসলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তিনি মধ্যপন্থী মোমেন্টাম দলের একজন নেতা।
এই নির্বাচনে তাদের দল পিটার মাগয়ারের তিসা পার্টির জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়, যাতে ওরবানের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে।
পলিটিকোকে তোমপোশ বলেন, “জেডি ভ্যান্সকে ধরুন। হাঙ্গেরির সাধারণ মানুষ তাকে প্রায় চিনেই না। তাই তার উপস্থিতি এসে সব বদলে দেবে, এমন ভাবনা অন্তত খুবই সরল বিশ্বাস ছিল।”
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ডানপন্থী নেতাদের এই প্রকাশ্য সমর্থন হাঙ্গেরির রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে পারেনি। কারণ মানুষ ফিদেজ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল দেশের ভেতরের সমস্যা নিয়ে। রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতা, দুর্নীতি আর ভেতরের পচন নিয়ে।
অনেকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আনা ছিল ওরবানের মরিয়া চেষ্টা। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাগয়ারকে ঠেকাতে ওরবানের হাতে নতুন কোনো কৌশল ছিল না।
মাগয়ার একসময় ফিদেজেরই মানুষ ছিলেন। তাই ওরবান যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, তা তিনি ভেতর থেকে ভালোই বুঝতেন।
আগের বিরোধী নেতাদের মতো তিনি দেশপ্রেম বা জাতীয় প্রতীকের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেননি। বরং তিনি নিজেই জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে নিজের ভাষায় তুলে ধরেন।
তিনি তার সমর্থকদের নির্বাচনি সমাবেশে জাতীয় পতাকা আনতে বলেন। কখনও কখনও তাকে দেখা গেছে ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা-ধাঁচের হাঙ্গেরীয় পোশাক পরে। ফুটবল ম্যাচেও তিনি গেছেন, তবে ওরবানের মতো ভিআইপি বক্সে বসেননি। তিনি সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে গ্যালারিতেই বসেছেন।
বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রশ্নেও মাগয়ার খুব পরিষ্কার অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস বা মস্কো। যেখান থেকেই হোক, বাইরের হস্তক্ষেপ হাঙ্গেরির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। হাঙ্গেরির মানুষ নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে।
সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তাটি ছিল দেশপ্রেমের শক্তিশালী বার্তা।
ওরবান নিজেকে দেশের সবচেয়ে বড় রক্ষক হিসেবে দেখাতে চাইলেও, মাগয়ার এমনভাবে কথা বলেছেন যে অনেকের কাছে বরং ওরবানকেই বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হয়েছে।
ব্রিটেনের চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক টিমোথি অ্যাশ বলেন, মাগয়ার দুর্নীতির বিষয়টি যেভাবে সামনে এনেছেন, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তার মতে, একটি দেশ যতক্ষণ অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি ভালো চলে, ততক্ষণ মানুষ অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনও সহ্য করে। কিন্তু অর্থনীতি খারাপ হতে শুরু করলে, আর মানুষ যখন দেখে ক্ষমতাবানরা নিজেদের পকেট ভরছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
কিম লেন শেপেল বলেন, হাঙ্গেরির অর্থনীতি শক্তিশালী থাকা পর্যন্ত এবং ওরবানের দুর্নীতি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকা পর্যন্ত তিনি বারবার নির্বাচিত হতে পেরেছেন।
একটা সময় অর্থনীতি থমকে যায়।
ওরবানের দুর্নীতি নিয়ে একের পর এক তথ্য সামনে আসতে থাকে। তার বাবার নামে থাকা বিলাসবহুল সম্পত্তির কথা, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অস্বাভাবিক সম্পদের কথা যখন প্রকাশ পায়, সবই মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শেপেল বলেন, মতে, সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই কষ্ট পাচ্ছিল, তখন এসব খবর তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
নিত্যদিনের সমস্যাই ‘বড় সমস্যা’
নির্বাচনি প্রচারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যা নিয়েই বেশি কথা বলেছেন পিটার মাগয়ার। তিনি বারবার ফিদেজ সরকারের দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।
তার অভিযোগ, ওরবানের পরিবার, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং আশপাশের প্রভাবশালী মহল ক্রমেই ধনী হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ হয়েছে আরও গরিব।
বুদাপেস্টের ইওতভশ লোরান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নির্বাচন বিশ্লেষক মাটিয়াস বোদি বলেন, ভোটারদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছিল মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতি।
তিনি বলেন, “ওরবানের পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এবং কাজের সংকট।”
বোদি বলেন, “মাগয়ারের একটি বড় বার্তা ছিল যে দেশটা ঠিকমতো চলছে না। স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, শিক্ষা। সব জায়গাতেই সাধারণ মানুষ ভাঙাচোরা অবস্থা আর বাড়তে থাকা অকার্যকারিতা অনুভব করেছে।”
অর্থাৎ, মানুষ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শোনেনি, তারা নিজেদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মাগয়ারের কথার মিল পেয়েছে।
‘আধুনিক, ইউরোপীয় হাঙ্গেরি’
মানুষের হতাশা ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মাগয়ার একটি ‘আধুনিক, ইউরোপীয় হাঙ্গেরি’ গড়ার প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটার থেকে শুরু করে সবার ভেতরেই সাড়া ফেলেছে।
এই শ্রেণির মানুষদের একটি বড় অংশ আগে ফিদেজের শক্ত সমর্থক হিসেবেই পরিচিত ছিল। ফলে তাদের মধ্যে মাগয়ারের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়া ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বোদির মতে, এটাই নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পুরোনো ওরবান
৪৫ বছর বয়সী পিটার মাগয়ারের প্রচারভঙ্গি ২০১০ সালের ভিক্টর ওরবানের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। তখন ওরবানও অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের জীবনমান এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচার করেছিলেন।
হাঙ্গেরির একাডেমিক ও সাবেক ফিদেজ আইনপ্রণেতা পিটার মলনারও এমনটাই মনে করেন।
১৯৯৪ সালে ফিদেজ ত্যাগ করা এই রাজনীতিবিদের অভিযোগ, ওরবান দলটিকে আরও কট্টর জাতীয়তাবাদী ও অগণতান্ত্রিক পথে নিয়ে গেছেন।
তার ভাষায়, আজকের মাগয়ার সেই পুরোনো ওরবানের মতো শোনাচ্ছেন। যিনি একসময় সাধারণ মানুষের জীবন বদলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
হাঙ্গেরির নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম লেন শেপেলের মতে, ওরবান বুঝতেই পারছিলেন না মাগয়ারকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন। কারণ, অনেক দিক থেকে মাগয়ার যেন তারই ছোট সংস্করণ।
“মাগয়ার একজন মধ্য-ডানপন্থী, দুর্নীতিবিরোধী প্রচারক। ২০১০ সালে ওরবান যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাকেও অনেকটা এমনই দেখাত”- বলেন শেপেল।
পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন যে ভাষা, ভঙ্গি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মাগয়ার সামনে এসেছেন, তা একসময় ওরবানের নিজেরই পরিচিত কৌশল ছিল। ফলে ওরবানের জন্য তাকে আক্রমণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যতিক্রমী প্রচার
নির্বাচনি প্রচারে ওরবান বারবার ইউক্রেন যুদ্ধের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনেন এবং বোঝাতে চান যে প্রতিদ্বন্দ্বী মাগয়ার জিতলে হাঙ্গেরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে এসব আক্রমণে মাগয়ার বিচলিত হননি; বরং তাকে উসকে দেওয়া বা মূল ইস্যু থেকে সরিয়ে নেওয়ার সব প্রচেষ্টাই তিনি এড়িয়ে গেছেন।
হাঙ্গেরির একাডেমিক ও সাবেক রাজনীতিক পিটার মলনার পলিটিকোকে বলেন, “মাগয়ার খুব নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। ওরবান যখনই তাকে মূল বার্তা থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন, মাগয়ার সেই ফাঁদে পা দেননি।”
পুরো নির্বাচনি লড়াইয়ে মাগয়ার সক্রিয় ছিলেন। শুধু বড় শহরে নয়, ফিদেজ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছোট শহর ও গ্রামেও নিয়মিত প্রচার চালিয়েছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীরা সাধারণত এসব জায়গায় খুব একটা জোর দিতেন না। কিন্তু মাগয়ার সেখানে ব্যতিক্রম। ওরবান যদি একটি শহরে যায়, মাগয়ার গেছেন পাঁচ-ছয়টি শহরে।
হার টের পেয়েছিলেন ওরবান
যারা বহু বছর ধরে ওরবানকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচনি প্রচারের শুরুতেই ওরবান বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি হারতে পারেন।
ওরবানের বায়োগ্রাফি লেখক পাল দানিয়েল রেনির মতে, এ কারণেই হয়তো তিনি ব্রাসেলস ও জেলেনস্কিকে ঘিরে আরও বেশি উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিপক্ষকে বারবার উসকে দিতে চাইছিলেন। যেন কোনোভাবে পরিস্থিতি তার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ায়।
রেনি বলেন, “তিনি যেভাবে কথা বলছিলেন, তার ভাষা, অঙ্গভঙ্গি, শরীরী ভাষা। সবই আমার কাছে আলাদা মনে হয়েছে। আমি ১৬ বছর ধরে তাকে কভার করছি। তাকে অনেকটাই মনভাঙা লাগছিল।”
“আমার মনে হয়, তিনি বুঝেছিলেন যে কোনো কিছুই চিরকাল থাকে না।”-বলেন রেনি।
হাঙ্গেরির ভবিষ্যত কী
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক ম্যাক্স বার্গম্যান টাইমকে বলেন, “এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের জন্য, ইউক্রেনের জন্য, এমনকি বিশ্বজুড়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির জন্যও এর তাৎপর্য আছে।”
তিনি বলেন, “হাঙ্গেরিকে অনেকেই এমন এক কট্টর ডানপন্থী, উদার গণতন্ত্রবিরোধী ‘মডেল’ হিসেবে দেখেছে, যেখানে নির্বাচিত হয়েও এক ধরনের স্বৈরশাসন চালানো হয়েছে।”
২০২২ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বলেছিল, হাঙ্গেরি এখন একটি “নির্বাচনি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা”-তে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, দেশে নির্বাচন হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি ও মানদণ্ডের প্রকৃত সম্মান আর নেই।
বার্গম্যান বলেন, “ওরবান হাঙ্গেরির গণতন্ত্রের চরিত্রই বদলে দিয়েছেন। এখন পুরো ব্যবস্থাটা মূলত তাকে ঘিরেই ঘোরে। তিনি দেশটাকে প্রায় নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো চালিয়েছেন।”
তবে সেই পরিস্থিতি দুর্নীতির কারণে পালটে যায় বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
ওরবানের সমালোচকদের পিটার মাগয়ার এক জায়গায় আনতে পেরেছেন মত দিয়ে বার্গম্যান বলেন, “বামপন্থী ভোটার থেকে শুরু করে ডানপন্থীদের মধ্যেও যারা ওরবানের ওপর ক্ষুব্ধ– তাদের অনেকেই মাগয়ারের পক্ষে গেছেন।”
জার্মান মার্শাল ফান্ডের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জসুজান্না ভেগ টাইমকে বলেন, এটি হাঙ্গেরির জন্য “একটি মাইলফলক নির্বাচন”।
তার মতে, মাগয়ারের দলের জয় মানে হচ্ছে হাঙ্গেরির ভোটাররা ওরবানের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভোটের আগে ভেগ বলেন, “গত দেড় দশকে যে স্বৈরতান্ত্রিক ধারা তৈরি হয়েছে, তা থামিয়ে দেশকে আবার আরও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে ফেরানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।”
তবে মাগয়ার ক্ষমতায় এলে তিনি সত্যিই প্রতিশ্রুত সংস্কার করবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ইইউ-এর ওপর প্রভাব
ওরবানের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক গত কয়েক বছরে ক্রমেই তিক্ত হয়েছে।
বার্গম্যান বলেন, ওরবান ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য “একটি বড় মাথাব্যথা” হয়ে উঠেছিলেন।
বিশেষ করে, তিনি বারবার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা সিদ্ধান্ত আটকে দিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
একই সুরে কথা বলেছেন ভেগও। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে হাঙ্গেরি কার্যত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আটকে দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে ইইউ যেভাবে কাজ করতে পারত, তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি বলেন, মাগয়ারের দল হাঙ্গেরিকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখতে চায়, যে ইইউর সদস্য থাকতে চায়, সহযোগিতা করতে চায়, এবং এই কাঠামোকে দেশের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। ইইউয়ে যৌথ উদ্যোগকে দুর্বল করতে নয়।
মাগয়ারও বলেছেন, তার দল জিতলে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির খারাপ হয়ে যাওয়া সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করবেন।
তার ভাষায়, এই সাধারণ নির্বাচন হবে “বিশ্বে আমাদের দেশের অবস্থান কোথায় হবে, তার ওপর এক ধরনের গণভোট।”
বার্গম্যান অবশ্য সতর্ক করে বলেন, “পিটার মাগয়ার আসলে কোন অবস্থান নেবেন, তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা আছে।”
তবে ভেগেরও ধারণা মাগয়ার সরাসরি ভেটো দেবেন না। তিনি বলেন, “তিনি ইইউয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করবেন না। আর এটিই ওরবানের তুলনায় একটি বিশাল পরিবর্তন।”
ভেগের মতে, মাগয়ার যদি দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তা ইইউর সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করবে। কারণ দুই পক্ষের সম্পর্কে টানাপোড়েনের বড় কারণগুলোর একটি ছিল হাঙ্গেরিতে দুর্নীতির বিস্তার।
২০২২ সালে আইনের শাসন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হাঙ্গেরির জন্য বরাদ্দ কয়েক বিলিয়ন ডলারের তহবিল স্থগিত করেছিল।
যদি মাগয়ার তার প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করেন এবং ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করেন, তাহলে সেই স্থগিত অর্থ ছাড় হতে পারে।
বার্গম্যানের মতে, এতে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি আসতে পারে।
তবে ভেগ বলেন, ইইউ কতটা অর্থ ছাড় করবে, তা নির্ভর করবে সংস্কারের গভীরতা ও বাস্তবতার ওপর।
নতুন নেতৃত্ব এলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসায় পিছিয়ে পড়েছিলেন ওরবান। পশ্চিমা মিত্ররা পাশে থাকলেও ইইউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল শীতল। সব মিলে একক কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে হারাতে থাকেন ওরবান, আর তারই প্রতিফলন নির্বাচনের ফলে।