সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে ট্রাম্প প্রশাসন

ইরানে হামলার মাধ্যমে দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের কথা বললেও বাস্তবে সামরিক প্রতিরোধ, বিপুল যুদ্ধব্যয় ও তেলের দামের চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। 

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

ইরানে হামলা চালিয়ে দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের কথা বলেছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ছয় দিনের মাথায় যুদ্ধের বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। একদিকে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে ইরানের পালটা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতেও হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধের বিপুল ব্যয়, তেলের দামের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফলে যে যুদ্ধকে ট্রাম্প প্রশাসন শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল, সেটিই এখন উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদিকে বলছেন, ইরানে মার্কিন অভিযান পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু তার প্রশাসনের ভেতর থেকেই শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে যে সব ইরানি হামলা প্রতিরোধ করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র বলেছে, শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির দিকে ছোড়া সব ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো সম্ভব হবে না। অর্থাৎ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও তত বেশি প্রকাশ্যে চলে আসছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র যেতে না দেওয়াই এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য। তিনি বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও শিল্প ‘পুরোপুরি ভস্ম’ করে দেওয়া হবে। কিন্তু পাঁচ দিনে ৭০০ কোটি ডলার খরচের পরও তার স্পষ্ট প্রমাণ নেই।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনা এলাকার কাছে হামলার চিহ্ন পাওয়া গেলেও পারমাণবিক উপাদান থাকা ভবনগুলোর ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি।

যুক্তরাষ্ট্রকেই যুদ্ধক্ষেত্রে কখনো কখনো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে হচ্ছে। ইরানের কম খরচে তৈরি ধীরগতির ‘শাহেদ’ ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে আঘাত হানছে। এসব হামলায় অন্তত ছয় মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, ইরানের ৩৫ হাজার ডলারের প্রতিটি ড্রোন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হচ্ছে  ৪০ লাখ ডলার। আর দিনে দুই হাজারেরও বেশি ড্রোন ছুঁড়ছে ইরান। ফলে খরচ ক্রমেই বাড়ছে ইরানের।

যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ছিল প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এখন তা কমে দৈনিক ১০০ কোটি ডলারে এলেও ব্যয় এখনো বিপুল।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির “কস্টস অব ওয়ার” প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে ২২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর বাইরে ইয়েমেন, ইরান ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-সমর্থিত বিভিন্ন অভিযানে আরও ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। বর্তমান যুদ্ধের খরচ যোগ করলে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ থেকে ৩৯ বিলিয়ন ডলারে।

এই ব্যয়ের প্রভাব ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। মুডিজ অ্যানালিটিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্দি এবিসি নিউজকে বলেছেন, সংঘাত যদি এক-দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে; আর মাসের পর মাস চললে বড় ধরনের ক্ষতি হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক অভিঘাত পড়বে তেল ও গ্যাসের দামে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ১৩ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮১ ডলারে ওঠে, যা গত জুনের পর সর্বোচ্চ।

হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলের অধ্যাপক রামানন কৃষ্ণমূর্তি এবিসি নিউজকে বলেন, “বিশ্বের পণ্য পরিবহন আর মানুষের চলাচলের জন্য তেল অপরিহার্য।”

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বাইরেও উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও। ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যগুলোয় আন্দোলন চলছে। যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন অনেক আইনপ্রণেতারও।

কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানে হামলা চালানোর সিদ্ধান্তও নতুন সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলেছে। পরে কংগ্রেস থেকে অনুমতি নিতে হয়েছে ট্রাম্পকে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির আগামী নির্বাচনের আগে ইমার্জেন্সি পাওয়ার ব্যবহার করে নাগরিকদের ভোট দেয়ার অধিকার সীমিত করার কথাও ভাবছে ট্রাম্প প্রশাসন।

বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন,  মার্কিন সংবিধান লঙ্ঘন করে ইরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা মাঝে কংগ্রেসের সম্মতি ছাড়া হঠাৎ হামলা করে বসা, এবং এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি কি যুদ্ধাবস্থার অযুহাতে জাতীয় নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের মরিয়া হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার এক প্রচেষ্টা? 

২৮ই ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও ইসরায়েলে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ইরানের পালটা চলছে। ছয়দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে  ইরানে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের জনগণও। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও হামলা চালায় হতাহত ঘটছে সেখানেও।

যদিও হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লিভিট দাবি করেছেন, “আমাদের বিশ্বের এমন সব জায়গায় অস্ত্রের মজুদ আছে যা অনেকে জানেও না। দুঃখজনকভাবে হোয়াইট হাউজে এর আগে খুব বোকা এবং অক্ষম নেতা বসেছিলেন, যিনি কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের সেরা অস্ত্রগুলো দান করে দিয়েছেন।” 

মূলত বাইডেন প্রশাসন দ্বারা ইউক্রেনকে মিসাইল দেয়ার কথা বুঝিয়েছিলেন ট্রাম্পের প্রেস সচিব।

তবে পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। নিজের দেশে ক্রমশ ফুঁসে উঠতে থাকা আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা- সব মিলিয়ে চাপে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, পাঁচ সপ্তাহে এই যুদ্ধ চললে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক ব্যয় ও সামরিক দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে       

(প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, গার্ডিয়ান, এবিসি নিউজ, কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স অবলম্বনে)