ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেইনির নিহত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল, তা হলো তার উত্তরসূরি কে হবেন।
জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সামনে এসেছে এক পরিচিত কিন্তু আড়ালে থাকা ব্যক্তির নাম, মোজতাবা খামেইনি। বহু বছর ধরে সুপ্রিম লিডারের কার্যালয়ের ভেতরে থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে কাজ করা আলি খামেইনির ছেলে এখন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা।
ইরানি সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বরাতে নিশ্চিত করেছেন মোজতাবাই হচ্ছেন নতুন সুপ্রিম লিডার। একাধিক পশ্চিমা গণমাধ্যমও তার সম্ভাবনার ব্যাপারেই বলেছেন।
তবে কে এই মোজতাবা খামেইনি? আলোচনায় থাকা অন্য প্রভাবশালী আলেম ও রাজনীতিকদের পেছনে ফেলে কেন তাকেই বেছে নেওয়া হলো? তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দর্শন কী, এবং তার নেতৃত্বে ইরানের ভেতরে ও বাইরে কী ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে সেই প্রশ্নগুলো এখন ইরান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
কে এই মোজতাবা খামেইনি
আয়াতোল্লাহ আলি খামেইনির দ্বিতীয় সন্তান মোজতাবা। ইরান সরকার জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় খামেইনির পাশাপাশি নিহত হয়েছেন মোজতাবার স্ত্রী জাহরা আদেল, তার মা মানসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ এবং মোজতাবার এক ছেলে।
ইসলামি বিপ্লবের এক দশক আগে, ১৯৬৯ সালে ইরানের মাশহাদে মোজতাবার জন্ম। ১৯৮৭ সালে স্কুল শেষ করে তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে (আইআরজিসি) যোগ দেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তিনি যুদ্ধেও অংশ নেন। এর পরপরই, ১৯৮৯ সালে তার বাবা আলি খামেইনি সর্বোচ্চ নেতা হন।
ইরানের কুমেতে দেশের সবচেয়ে খ্যাতিমান আলেমদের কাছে পড়াশোনা করেন মোজতাবা এবং পরে নিজেও একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছিলেন। আর সেসময়ই ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তার।

তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন না; বরং বেশিরভাগ সময় আড়ালেই থেকেছেন। পর্দার পেছন থেকেই সুপ্রিম লিডারের কার্যালয় চালিয়েছেন।
রক্ষণশীল প্রার্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সংস্কারপন্থিরা অভিযোগ করেছিলেন, মোজতাবা খামেইনি ধর্মীয় নেতাদের ও রেভল্যুশনারি গার্ডদের সঙ্গে কাজ করে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়েছেন।
সংস্কারপন্থী নেতা মেহদি কাররুবি সেসময় অভিযোগ তুলেছিলেন যে, ‘একজন আলেমের ছেলে’ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছেন। তখন সর্বোচ্চ নেতা খামেইনি নিজের ছেলেকে রক্ষা করে বলেন, তিনি ‘আলেমের ছেলে নন, তিনি নিজেই একজন আলেম।’
খামেইনির উত্তরাধিকার পরিকল্পনা নিয়ে ২০২৪ সালে ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বৈঠক করে। ওই সময় আয়াতোল্লাহ খামেইনি বলেন, উত্তরাধিকার বিবেচনায় যেন তার ছেলেকে রাখা না হয়।
তারপরও মোজতাবাই হলে সুপ্রিম লিডার। বিশ্লেষকের মতে, মোজতাবার নিয়োগ এই বার্তা দেয় যে রেভল্যুশনারি গার্ড-ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থীরাই এখনও ক্ষমতায় আছেন। অর্থাৎ খুব দ্রুত কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।
পর্দার আড়ালের শক্তি
পঞ্চান্ন বছর বয়সী মোজতাবা খামেইনিকে ইরানের রাষ্ট্রপরিচালনার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি মনে করা হয়। যদিও তিনি কখনো কোন সরকারি বা রাজনৈতিক পদে ছিলেন না, কিন্তু সরকারি নীতিমালা প্রণয়নে তার প্রভাব ছিল সবসময়ই।
বহু বছর ধরে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের ভেতর থেকেই কাজ করেছেন মোজতাবা। বাবার আশপাশে এক ধরনের ‘গেটকিপার’ ও ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তার অবস্থানকে প্রায়ই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির ছেলে আহমাদ খোমেনির ভূমিকারের সঙ্গে তুলনা করা হয়; বিপ্লবী রাষ্ট্রের শুরুর বছরগুলোতে আহমাদ ছিলেন রুহুল্লাহর এক গুরুত্বপূর্ণ সহকারী ও ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন।বিশ্লেষকদের মতে, মোজতাবা ধীরে ধীরে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোজুড়ে নিজের প্রভাব তৈরি করেছেন।
মিডল ইস্ট পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক এর পরিচালক ড. এরিক ম্যান্ডেলের মতে তেহরানের ক্ষমতার কাঠামোয় মোজতাবা খামেইনি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেকটাই আড়ালে থাকা একটি চরিত্র।
তিনি বলেন, “সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেইনির ছেলে মোজতাবা খামেইনি বহুদিন ধরেই তেহরানে পর্দার আড়ালে কাজ করে আসছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি শাসনব্যবস্থার ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে নিজের প্রভাব সংহত করেছেন। অনেকেই তাকে শাসনের দমননীতির অন্যতম নকশাকার হিসেবে দেখেন।”

তবে মোজতাবাকে অনেকেই গভীর সন্দেহের চোখে দেখেন বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও ইরান বিশ্লেষক আরাশ আজিজিও। তিনি বলেন, “এই কারণেই অন্তত ২০০৯ সাল থেকে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর কাছে এক ধরনের ঘৃণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। কারণ গুঞ্জন আছে যে বিক্ষোভ দমনে তিনিই ভূমিকা রেখেছিলেন।”
আজিজির মতে, শাসনব্যবস্থার একটি অংশের কাছেও মোজতাবা প্রভাবশালী ও পছন্দের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মোজতাবা খামেইনির। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মোজতাবা ‘হাবিব ব্যাটালিয়নে’ ছিলেন।
স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত এই ইউনিটটি ছিল বিপ্লবীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৮৮ সালে ইরাক যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন মোজতাবা। তার সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেওয়া অনেকেই পরে আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কমকর্তা হয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা এই সম্পর্কগুলোই পরবর্তীতে ইরানের শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে মোজতাবার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
ধর্মীয় যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামি আইনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞানী এবং উচ্চ পর্যায়ের ধর্মীয় কর্তৃত্ব হিসেবে স্বীকৃত হতে হয়। কিন্তু মোজতাবা খামেইনিকে ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলেমদের মধ্যে গণ্য করা হয় না। তার ‘আয়াতোল্লা’ উপাধি নেই। 'আয়াতোল্লাএকটি ফার্সি ও আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ "ঈশ্বরের নিদর্শন" বা "আল্লাহর চিহ্ন"। এটি মূলত শিয়া ইসলামের উচ্চপদস্থ ধর্মগুরু বা যাজকদের (মোজতাাহিদ) দেওয়া একটি সম্মানসূচক উপাধি, যারা ইসলামি আইন, ফিকহ ও ধর্মতত্ত্বে অত্যন্ত গভীর জ্ঞান রাখেন। ‘মোজতাাহিদ’ উপাধিও নেই মোজতাবার। প্রশাসনিক-নির্বাহী অভিজ্ঞতাও সীমিত তার।
তবে এর আগেও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো প্রার্থীকে নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হলে সংবিধানের এসব শর্ত প্রয়োগে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হয়। মোজতাবার ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে বলে জানিয়েছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল।
কেন মোজতাবা
মোজতাবার উত্থান নতুন করে এই বিতর্ক উসকে দিতে পারে যে, বিপ্লবী আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইরান পারিবারিক শাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না। সম্ভাব্য উত্তরাধিকার নিয়ে যে জল্পনা চলছিল, তা অনেক সময় বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর আড়ালে কাজ করা মোজতাবা খামেইনি এখন দেশটির আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছেন।
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদ বদল হয়েছে শুধু একবার, ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খোমেইনির মৃত্যুর পর।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় আয়াতোল্লা খামেইনি নিহত হওয়ার কে হতে পারেন নতুন নেতা, তা নিয়ে চলছিল আলোচনা। চারজনের নাম শোনা যাচ্ছিল। ছিল মোজতাবার নামও।
আরও যারা আলোচনায় ছিলেন
সর্বোচ্চ নেতার পদের জন্য সম্ভাব্য ব্যক্তি মনে করা হচ্ছিল বিশেষজ্ঞ পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সাবেক সদস্য আলিরেজা আরাফিকে। এই ধর্মযাজকের আমলাতান্ত্রিক দক্ষতায় ব্যাপক আস্থা ছিল খামেইনির।
আলোচনায় আরেকজনের নামও শোনা যাচ্ছিল। তিনি ইরানের ইসলামিক সায়েন্সেজ একাডেমির প্রধান মোহাম্মাদ মেহদি মিরবাঘেরি। বিশেষজ্ঞ পরিষদের সবচেয়ে রক্ষণশীল এবং পশ্চিম-বিরোধী সদস্যদের একজন মেহদি সর্বোচ্চ নেতাও হতে পারতেন।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খোমেইনির নাতি হাসান খোমেইনিকেও সম্ভাব্য পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা ভাবা হচ্ছিল। তবে তার রাজনৈতিক প্রভাব কম ছিল। উদারপন্থী হওয়ায় ২০১৬ সালের বিশেষজ্ঞ পরিষদ নির্বাচনে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হলো মোজতাবাকেই। ইরান ইন্টারন্যাশনাল বলছে, আইআরজিসিতে তার সমর্থনই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রেখেছে।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মোজতাবা যখন দায়িত্ব নিচ্ছেন, তখন দেশ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নেই। ফলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এই সময়ে মানা কঠিন। এখন সময় এবং নিয়ন্ত্রণই বেশি জরুরি। কারণ দেশে যুদ্ধ চলছে।
কেন রেভল্যুশনারি গার্ডদের পছন্দ মোজতাবা
এই সময় রেভল্যুশনারি গার্ডের সামনে দুটি লক্ষ্য: নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং বৈধতা নিশ্চিত করা।
নিয়ন্ত্রণ মানে কমান্ড কাঠামো অটুট রাখা, শীর্ষ পর্যায়ে বিভক্তি ঠেকানো, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে সমন্বিত রাখা এবং ক্ষমতার লড়াই শুরু হতে না দেওয়া।
বৈধতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শাসনব্যবস্থার মূল ঘাঁটির ভেতরে যে কট্টরপন্থী রাজনীতিক, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং সেই অনুগত নেটওয়ার্কগুলোর কাছে এই বৈধতা প্রমাণ জরুরি। এই সীমিত পরিসরে মোজতাবা খামেইনির একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। তিনি সরাসরি খামেইনির উত্তরাধিকার দাবি করতে পারেন, এবং শাসনব্যবস্থার মূল সমর্থকরা এটিকে এমনভাবে গ্রহণ করতে পারেন যাতে মনে না হয় যে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এই কারণেই রেভল্যুশনারি গার্ড তাকে বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হয়।
মোজতাবার সঙ্গে গার্ড কোরের সম্পর্কও বহু পুরোনো। কয়েক দশক ধরে তিনি বাহিনীটির বিভিন্ন কমান্ড পর্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
দীর্ঘদিন তিনি তার বাবা ও রেভল্যুশনারি গার্ডের নেতৃত্বের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের সেতু হিসেবেও কাজ করেছেন। এতে তিনি নিজের এমন একটি অবস্থান তৈরি করেছেন যে সবসময়ই নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রের কাছেও ছিলেন আবার সেই কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল বেসামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
গত দুই দশক ধরে মোজতাবা কার্যত সুপ্রিম লিডারের কার্যালয়, ‘বেইত’ পরিচালনা করে আসছেন এবং তাকে আলি খামেইনির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই দেখা হয়।
এই ‘বেইত’-ই রাষ্ট্রক্ষমতার মূল কেন্দ্র। বাস্তবে ইরানের নির্বাচিত সরকার ও প্রেসিডেন্ট অনেক সময়ই একটি আনুষ্ঠানিক মুখচ্ছবি মাত্র, যেখানে প্রকৃত ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীভূত ছিল এই বেইতের হাতেই।
তাই এই ক্ষমতার কাঠামো নিজেকেই রক্ষা করতে চাইছে, এবং বাইরে থেকে কোনো নতুন ব্যক্তি এসে নিয়ন্ত্রণ নিক, এমন ঝুঁকি নিতে তারা প্রস্তুত নয়।
ইরান পরিস্থিতি
মোজতাবা যখন দায়িত্ব নিচ্ছেন, ইরান স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নেই। যুদ্ধ চলমান।
এই অবস্থায় মোজতাবার সামনে দুটি পথ দেখা যাচ্ছে।
প্রথমত, তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন, এতে আরও ক্ষতি সহ্য করতে হবে তাদের। এই পথ বেছে নিলে দেশের ভেতরে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে বার্তা দেওয়া যে হামলার মুখে কোনো আলোচনা বা আপস হবে না।
অন্য পথটি হলো পিছু হটা এবং বড় ধরনের ছাড় দেওয়া। এতে যুদ্ধ থামাবে, আন্তর্জাতিক চাপ কমবে। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক কৌশলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিতে হবে।
এই দুই পথের যে কোনোটি বেছে নেওয়ার অবস্থানে মোজতাবা খামেইনি আছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
যদি শাসনব্যবস্থা কঠিন কোনো আপসের পথে যায়, তাহলে এমন একজন দরকার হবে যিনি সেই সিদ্ধান্তের দায় নিতে পারবেন এবং কট্টরপন্থী শক্তিগুলোকে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যেতে বাধা দিতে পারবেন। আর যদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজন এমন একজন নেতা, যিনি রেভল্যুশনারি গার্ডদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবেন এবং ক্রমাগত হামলার মধ্যেও নিরাপত্তা কাঠামো সচল রাখতে পারবেন।
অর্থাৎ দুইক্ষেত্রেই মোজতাবা প্রথম পছন্দই।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কি তাকে দ্রুত লক্ষ্যবস্তু বানাবে, নাকি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কিছু সময় দেবে। যদি খুব দ্রুত তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, তাহলে অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে এই অভিযান আর চাপ সৃষ্টি বা প্রতিরোধের কৌশল নয়; বরং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনই এর লক্ষ্য।
আর যদি মোজতাবাকে কিছু সময় দেওয়া হয়, তাহলে দেখতে হবে তার পরবর্তী পদক্ষেপ। তিনি কি সংঘাত আরও বাড়াবেন, নাকি আপসের পথ খুঁজবেন।
প্রতিশোধের রাজনীতি
ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো আলি খামেইনির জন্য সবসময়ই কঠিন ছিল। তেহরানের দাবি, ট্রাম্প ইরানের আত্মসমর্পণ চাইতেন। খামেইনি বারবার সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন এবং কাসেম সোলাাইমানির হত্যার প্রতিশোধের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তার উত্তরসূরির জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন। কারণ এখন ট্রাম্পের ওপর শুধু সোলাইমানির নয়, আলি খামেইনির রক্তের দায়ও আছে। ফলে যেকোনো ধরনের আপস রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন হবে তার জন্য।
ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি একটি নীতি স্থির করে গিয়েছিলেন, যা শিয়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রায় ফতোয়ার মতো গুরুত্ব বহন করে।
“ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সর্বোচ্চ দায়িত্ব।” অর্থাৎ, ইরানের টিকে থাকা প্রায় সব কিছুর ঊর্ধ্বে।
কী করবেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা
ইরানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল একসঙ্গে হামলা চালাচ্ছে। এমন অবস্থায় মোজতাবা খামেইনি যদি কঠোর অবস্থানেই থাকেন। তবে নতুন নেতৃত্ব বেশিদিন হয়তো টিকে থাকতে পারবে না।
আর যদি তিনি পিছু হটার পথ বেছে নেন, তাহলে যুদ্ধ হয়তো থামতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পর যে বাস্তবতা থাকবে, তা সামাল দেওয়াও সহজ হবে না। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপরিচালনায় তাকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে, বাবার রেখে যাওয়া অনেক নীতি ও কৌশল থেকে সরে আসতে হবে, আর একই সঙ্গে সামলাতে হবে ভাঙাচোরা এক রাষ্ট্র কাঠামো।
যে পথই বেছে নেওয়া হোক, মোজতাবা খামেইনিকে শুরু করতে হচ্ছে তার বাবার রেখে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ থেকে। ইরানের সামনে এখন যেসব বিকল্প আছে, সবই ব্যয়বহুল আর টিকে থাকা খুব কঠিন।
(নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ইরান ইন্টারন্যাশনাল অবলম্বনে)



