বড়দিনের রাতে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত এক কৃষিজমিতে। লক্ষ্য ছিল ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসী’, অথচ ধ্বংসস্তূপে মিলেছে ভুট্টাক্ষেত, খড়ের গাদা আর আতঙ্কে জমে যাওয়া মানুষের জীবন
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৩ পিএমআপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
খ্রিস্টানদের রক্ষার দাবি, সন্ত্রাস দমনের ঘোষণা–তবে বাস্তবে আতঙ্কে আছে নিরীহ মুসলিম কৃষক আর পশুপালকরা। পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিনের রাতে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত এক কৃষিজমিতে। লক্ষ্য ছিল ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসী’, অথচ ধ্বংসস্তূপে মিলেছে ভুট্টাক্ষেত, খড়ের গাদা আর আতঙ্কে জমে যাওয়া মানুষের জীবন। এই হামলার পর প্রশ্ন উঠছে যে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই সন্ত্রাসীদের নিশানা করেছে, নাকি বৈশ্বিক রাজনীতির দাবার বোর্ডে অনিচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট হয়ে গেছে নাইজেরিয়ার মুসলিম গ্রামগুলো।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নাইজেরিয়ার জাবো নামের সেই গ্রামের পরিস্থিতি যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সোকোতো রাজ্যের সেই জাবো এলাকার এক ভুট্টাক্ষেতে একটি বিরাট গর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনজন রাখাল। কৌতূহলই তাদের এখানে টেনে এনেছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তারা আলোচনা করছিলেন যে কেন অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দেবেন, তাও আবার পেঁয়াজ কাটার মৌসুমে।
ঘটনাস্থলে দেখতে তারা পাড়ি দিয়েছেন ১৬৭ কিলোমিটারের পথ। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর এখানেই আঘাত হানে অ্যামেরিকার টমাহক মিসাইল। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে মাটিতে আঘাত করে প্রায় ৩০ ফুট দূরে ছিটকে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়।
ট্রাম্পের অভিযোগ, ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসী’রা নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টানদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আর এই ঘটনাকে ‘খ্রিস্টানদের ওপর গণহত্যা’ বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
আফ্রিকার অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়া অনেকদিন ধরেই সহিংসতায় জর্জরিত। সোকোতা রাজ্যেও একই পরিস্থিতি। গরু চুরি থেকে শুরু করে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ—সব ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি এখানকার বাসিন্দারা।
এই সহিংসতার পেছনে রয়েছে ‘লাকুরাওয়া’ নামে এক সশস্ত্র গোষ্ঠী। স্থানীয়দের ও বিশ্লেষকদের ধারণা এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে জঙ্গি ইসলামিক স্টেইট (আইএস)-এর।
গত সপ্তাহে পুলিশ জানায়, নাইজেরিয়ার নাইজার রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দু’টি গ্রামে কয়েকদিন ধরে অবরুদ্ধ থাকার পর সশস্ত্র হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহতের শিকার হয়েছেন।
তবে অন্যান্য শহরের তুলনায় জাবো ছিল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ একটি এলাকা। টিনের ছাউনি দেওয়া গোছানো ঘরবাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অ্যাকাশিয়া গাছের মাঝে অবস্থিত এই শহরটি আশপাশের সহিংস এলাকা থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরআ শ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা ও ওই তিন রাখাল।
ভুক্তভোগী কৃষক ও পশুপালকরা
নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বড়দিনের রাতে চালানো হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু ধ্বংসাবশেষ দুর্ঘটনাবশত জাবো এলাকায় পড়ে। তবে এই বার্তা সবার কাছে পৌঁছায়নি। তাই স্বাভাবিকভাবে বিস্ময় ও আতঙ্ক কাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে। স্থানীয়রা জানান, সেদিন আকাশে একটি আগুনের গোলা ছুটে যেতে দেখেছিলেন তারা। একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি সিলিন্ডার অংশ অক্ষত অবস্থায় জাবোর একটি খেতে পড়ে। আরেকটি অংশ আগুন ধরিয়ে দেয় রান্নার জ্বালানি ও গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত খড়ের স্তূপে। সেখানে মাটিতে একটি পোড়া বৃত্তাকার দাগ পড়ে যায়।
তিন রাখালের একজন মোহাম্মদ আবুবকর জানান, “আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি যেন এমন কখনো আর না হয়।”
সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে তিনি বলেন, “এখানে এমন কিছুই নেই।”
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকেই এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা ক্ষতস্থানটি দেখতে আসছেন। চলছে বিভিন্ন গবেষণা, কেউ কেউ বলছেন, সন্ত্রাসীরা মনে হয় ওই হামলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। এ ছাড়া কেউ কোনো হতাহতের কথা শোনেননি বা দেখেননি
জনমনে আতঙ্ক
ট্রাম্পের দাবি, নিরপরাধ খ্রিস্টানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো আইএস সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নাইজেরিয়ার তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ইদ্রিস জানিয়েছেন, আইএসের বড় দুটি আস্তানায় আঘাত হেনেছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র। আমেরিকার সামরিক বাহিনীর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, টানগাজা বনে আঘাত হেনেছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, মূলত কৃষিজমিতে আঘাত হেনেছে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো। কিছু ধ্বংসাবশেষ আঘাত হেনেছে পরিত্যক্ত কয়েকটি ভবনে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বিস্ফোরিত হয় একটি পরিত্যক্ত অস্থায়ী শিবিরে। সেখান থেকে লাকুরাওয়া গোষ্ঠীর অনেকে পালিয়ে যায় বেশ কয়েক দিন আগেই ।
দুই বাসিন্দা জানান, স্থানীয় কৃষকেরা আকাশে বারবার সামরিক নজরদারি বিমানের মতো শব্দ শুনেছিলেন, যা তারা যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ফ্লাইট বলে ধরে নিয়েছিলেন।
এই অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যেই সোকোটোতে একটি উদ্বেগ ছড়িয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্প আসলে নাইজেরিয়ার সব মুসলিমকেই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিপুল ক্ষমতা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, সন্ত্রাসীদের পরিবর্তে কেন কৃষকদের এলাকায় বোমা বর্ষণ করা হলো?
“আমাদের অনেকেরই মনে হচ্ছে, খ্রিস্টানদের রক্ষা করার নামে এটি তার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ,” বলেন আবুবকর মোহাম্মদ জাবো নামে এক স্থানীয়।
তবে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা কোন কথা বলেননি।
এই ধারণা জোরালো হওয়ার পেছনে রয়েছে এই অঞ্চলের ইতিহাস। ঔপনিবেশ-পূর্ববর্তী আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল সোকোটো খিলাফত। আজও সুলতানের প্রাসাদ ও খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা উসমান দান ফোদিওর সমাধির কারণে সোকোটো শহর পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। উসমান দান ফোদিওর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে এখানে।
এ ছাড়া ‘খ্যালিফেট রেডিও সোকোটো’ নামের একটি বেতার স্টেশন নিয়মিত সংবাদ প্রচার করে, এমনকি স্থানীয় বাজারে ‘খ্যালিফেট’ ব্র্যান্ডের রুটিও বিক্রি হয়। অর্থাৎ খিলাফতের প্রভাব এখনো এই অঞ্চলে বেশ স্পষ্ট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, সোকোটো রাজ্যে চালানো এই হামলাগুলো ছিল ‘ওয়ান-টাইম’ অভিযান। তাদের ভাষায়, এর মাধ্যমে ট্রাম্প বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি খ্রিস্টানদের হত্যার ‘প্রতিশোধ’ নিয়েছেন। হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার জাহাজটি ইতোমধ্যে গিনি উপসাগর এলাকা ছেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়া দুই দেশের কর্মকর্তারাই জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য অভিযানের জন্য গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তবে সোকোটোর বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, দেশটি মুসলিম প্রধান হলেও এই সহিংসতা খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কেই আতঙ্কিত করে তুলছে।
তানগাজার কৃষক আবদুল্লাহি বাকো জানান, প্রায় এক বছর আগে লাকুরাওয়া গোষ্ঠী সেখানে আসার পর শুরুতে তারা স্থানীয় চোর-ছিনতাইকারীদের দমন করেছিল। ওই চক্রটি গবাদিপশু চুরি ও নানা সহিংসতায় জড়িত ছিল। তবে এর বিনিময়ে লাকুরাওয়া এলাকায় কড়াকড়ি ইসলামি শাসন কায়েম করে। তারা সিগারেট ও গান নিষিদ্ধ করে, নারী-পুরুষের সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে দেয়। এমনকি দাড়ি কামানোর অভিযোগে নাপিত ও তাদের ক্রেতাদের মারধরও করা হয়।
কৃষক ও পশুপালকদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার প্রস্তাবও দেয় লাকুরাওয়া। গবাদিপশু ফসল নষ্ট করায় অনেকদিন ধরেই এই বিরোধ চলছিল।
বাকো জানান, তার ৩৫টি গরু কৃষকের জমির ক্ষতি করায় তিনি লাকুরাওয়াকে প্রায় ২ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন, স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩০ লাখ । তবে সেই টাকা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের না দিয়ে গোষ্ঠীটি নিজেদের কাছেই রেখে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লাকুরাওয়া গোষ্ঠীর লোকজন ফেরার আশঙ্কায় বাকো এখন তার ছোট গরুর পালটি কাছের একটি শহরের পাশে সরিয়ে নিয়েছেন, যেখানে চারণভূমি খুবই কম। তিনি বলেন, “ওরা যদি আবার ফিরে আসে, এবার আরও ভয়ংকর হবে।”
জাবো গ্রামের বাসিন্দা হাসান উমর জাবো জানান, বোমা হামলার রাতে তিনি আকাশ চিরে ছুটে যাওয়া আগুনের একটি গোলা দেখেছিলেন। বিস্ফোরণের পর মানুষজন ছুটে যায় ক্ষয়ক্ষতি দেখতে। সেই সময় পায়ের নিচে পিষে যায় সদ্য লাগানো মরিচ ও পেঁয়াজের ক্ষেত। কিশোররা ছুটে গিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের ধাতব টুকরো কুড়িয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পর সেখানে নাইজেরিয়ান সেনারা পৌঁছে এলাকা পরিষ্কার করতে শুরু করে এবং সবার কাছে থাকা ধ্বংসাবশেষ জমা দিতে নির্দেশ দেয়। তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ গোপনে সেগুলো লুকিয়ে রাখে।
সোকোটোর আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র আর মাটিতে পড়ে থাকা ধাতব টুকরোর চেয়েও ভারী হয়ে উঠেছে একটাই প্রশ্ন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর চোখে কি এই জনপদ ‘টার্গেট জোন’ হয়ে উঠবে।
কেন নাইজেরিয়ার ভূট্টাখেতে হামলা চালালেন ট্রাম্প
বড়দিনের রাতে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত এক কৃষিজমিতে। লক্ষ্য ছিল ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসী’, অথচ ধ্বংসস্তূপে মিলেছে ভুট্টাক্ষেত, খড়ের গাদা আর আতঙ্কে জমে যাওয়া মানুষের জীবন
খ্রিস্টানদের রক্ষার দাবি, সন্ত্রাস দমনের ঘোষণা–তবে বাস্তবে আতঙ্কে আছে নিরীহ মুসলিম কৃষক আর পশুপালকরা। পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিনের রাতে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত এক কৃষিজমিতে।
লক্ষ্য ছিল ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসী’, অথচ ধ্বংসস্তূপে মিলেছে ভুট্টাক্ষেত, খড়ের গাদা আর আতঙ্কে জমে যাওয়া মানুষের জীবন। এই হামলার পর প্রশ্ন উঠছে যে যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই সন্ত্রাসীদের নিশানা করেছে, নাকি বৈশ্বিক রাজনীতির দাবার বোর্ডে অনিচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট হয়ে গেছে নাইজেরিয়ার মুসলিম গ্রামগুলো।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নাইজেরিয়ার জাবো নামের সেই গ্রামের পরিস্থিতি যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সোকোতো রাজ্যের সেই জাবো এলাকার এক ভুট্টাক্ষেতে একটি বিরাট গর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনজন রাখাল। কৌতূহলই তাদের এখানে টেনে এনেছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তারা আলোচনা করছিলেন যে কেন অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দেবেন, তাও আবার পেঁয়াজ কাটার মৌসুমে।
ঘটনাস্থলে দেখতে তারা পাড়ি দিয়েছেন ১৬৭ কিলোমিটারের পথ। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর এখানেই আঘাত হানে অ্যামেরিকার টমাহক মিসাইল। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে মাটিতে আঘাত করে প্রায় ৩০ ফুট দূরে ছিটকে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়।
ট্রাম্পের অভিযোগ, ‘ইসলামিস্ট সন্ত্রাসী’রা নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টানদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আর এই ঘটনাকে ‘খ্রিস্টানদের ওপর গণহত্যা’ বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
আফ্রিকার অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়া অনেকদিন ধরেই সহিংসতায় জর্জরিত। সোকোতা রাজ্যেও একই পরিস্থিতি। গরু চুরি থেকে শুরু করে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ—সব ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি এখানকার বাসিন্দারা।
এই সহিংসতার পেছনে রয়েছে ‘লাকুরাওয়া’ নামে এক সশস্ত্র গোষ্ঠী। স্থানীয়দের ও বিশ্লেষকদের ধারণা এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে জঙ্গি ইসলামিক স্টেইট (আইএস)-এর।
তবে অন্যান্য শহরের তুলনায় জাবো ছিল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ একটি এলাকা। টিনের ছাউনি দেওয়া গোছানো ঘরবাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অ্যাকাশিয়া গাছের মাঝে অবস্থিত এই শহরটি আশপাশের সহিংস এলাকা থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরআ শ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা ও ওই তিন রাখাল।
ভুক্তভোগী কৃষক ও পশুপালকরা
নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বড়দিনের রাতে চালানো হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু ধ্বংসাবশেষ দুর্ঘটনাবশত জাবো এলাকায় পড়ে। তবে এই বার্তা সবার কাছে পৌঁছায়নি। তাই স্বাভাবিকভাবে বিস্ময় ও আতঙ্ক কাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে।
স্থানীয়রা জানান, সেদিন আকাশে একটি আগুনের গোলা ছুটে যেতে দেখেছিলেন তারা। একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি সিলিন্ডার অংশ অক্ষত অবস্থায় জাবোর একটি খেতে পড়ে। আরেকটি অংশ আগুন ধরিয়ে দেয় রান্নার জ্বালানি ও গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত খড়ের স্তূপে। সেখানে মাটিতে একটি পোড়া বৃত্তাকার দাগ পড়ে যায়।
তিন রাখালের একজন মোহাম্মদ আবুবকর জানান, “আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি যেন এমন কখনো আর না হয়।”
সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে তিনি বলেন, “এখানে এমন কিছুই নেই।”
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকেই এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা ক্ষতস্থানটি দেখতে আসছেন। চলছে বিভিন্ন গবেষণা, কেউ কেউ বলছেন, সন্ত্রাসীরা মনে হয় ওই হামলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। এ ছাড়া কেউ কোনো হতাহতের কথা শোনেননি বা দেখেননি
জনমনে আতঙ্ক
ট্রাম্পের দাবি, নিরপরাধ খ্রিস্টানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো আইএস সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
নাইজেরিয়ার তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ইদ্রিস জানিয়েছেন, আইএসের বড় দুটি আস্তানায় আঘাত হেনেছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র।
আমেরিকার সামরিক বাহিনীর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, টানগাজা বনে আঘাত হেনেছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, মূলত কৃষিজমিতে আঘাত হেনেছে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো। কিছু ধ্বংসাবশেষ আঘাত হেনেছে পরিত্যক্ত কয়েকটি ভবনে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বিস্ফোরিত হয় একটি পরিত্যক্ত অস্থায়ী শিবিরে। সেখান থেকে লাকুরাওয়া গোষ্ঠীর অনেকে পালিয়ে যায় বেশ কয়েক দিন আগেই ।
দুই বাসিন্দা জানান, স্থানীয় কৃষকেরা আকাশে বারবার সামরিক নজরদারি বিমানের মতো শব্দ শুনেছিলেন, যা তারা যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ফ্লাইট বলে ধরে নিয়েছিলেন।
এই অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যেই সোকোটোতে একটি উদ্বেগ ছড়িয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্প আসলে নাইজেরিয়ার সব মুসলিমকেই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিপুল ক্ষমতা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, সন্ত্রাসীদের পরিবর্তে কেন কৃষকদের এলাকায় বোমা বর্ষণ করা হলো?
“আমাদের অনেকেরই মনে হচ্ছে, খ্রিস্টানদের রক্ষা করার নামে এটি তার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ,” বলেন আবুবকর মোহাম্মদ জাবো নামে এক স্থানীয়।
তবে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা কোন কথা বলেননি।
এ ছাড়া ‘খ্যালিফেট রেডিও সোকোটো’ নামের একটি বেতার স্টেশন নিয়মিত সংবাদ প্রচার করে, এমনকি স্থানীয় বাজারে ‘খ্যালিফেট’ ব্র্যান্ডের রুটিও বিক্রি হয়। অর্থাৎ খিলাফতের প্রভাব এখনো এই অঞ্চলে বেশ স্পষ্ট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, সোকোটো রাজ্যে চালানো এই হামলাগুলো ছিল ‘ওয়ান-টাইম’ অভিযান। তাদের ভাষায়, এর মাধ্যমে ট্রাম্প বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি খ্রিস্টানদের হত্যার ‘প্রতিশোধ’ নিয়েছেন।
হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার জাহাজটি ইতোমধ্যে গিনি উপসাগর এলাকা ছেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়া দুই দেশের কর্মকর্তারাই জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য অভিযানের জন্য গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তবে সোকোটোর বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, দেশটি মুসলিম প্রধান হলেও এই সহিংসতা খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কেই আতঙ্কিত করে তুলছে।
তানগাজার কৃষক আবদুল্লাহি বাকো জানান, প্রায় এক বছর আগে লাকুরাওয়া গোষ্ঠী সেখানে আসার পর শুরুতে তারা স্থানীয় চোর-ছিনতাইকারীদের দমন করেছিল। ওই চক্রটি গবাদিপশু চুরি ও নানা সহিংসতায় জড়িত ছিল। তবে এর বিনিময়ে লাকুরাওয়া এলাকায় কড়াকড়ি ইসলামি শাসন কায়েম করে। তারা সিগারেট ও গান নিষিদ্ধ করে, নারী-পুরুষের সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে দেয়। এমনকি দাড়ি কামানোর অভিযোগে নাপিত ও তাদের ক্রেতাদের মারধরও করা হয়।
কৃষক ও পশুপালকদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার প্রস্তাবও দেয় লাকুরাওয়া। গবাদিপশু ফসল নষ্ট করায় অনেকদিন ধরেই এই বিরোধ চলছিল।
বাকো জানান, তার ৩৫টি গরু কৃষকের জমির ক্ষতি করায় তিনি লাকুরাওয়াকে প্রায় ২ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন, স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩০ লাখ । তবে সেই টাকা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের না দিয়ে গোষ্ঠীটি নিজেদের কাছেই রেখে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লাকুরাওয়া গোষ্ঠীর লোকজন ফেরার আশঙ্কায় বাকো এখন তার ছোট গরুর পালটি কাছের একটি শহরের পাশে সরিয়ে নিয়েছেন, যেখানে চারণভূমি খুবই কম। তিনি বলেন, “ওরা যদি আবার ফিরে আসে, এবার আরও ভয়ংকর হবে।”
জাবো গ্রামের বাসিন্দা হাসান উমর জাবো জানান, বোমা হামলার রাতে তিনি আকাশ চিরে ছুটে যাওয়া আগুনের একটি গোলা দেখেছিলেন। বিস্ফোরণের পর মানুষজন ছুটে যায় ক্ষয়ক্ষতি দেখতে। সেই সময় পায়ের নিচে পিষে যায় সদ্য লাগানো মরিচ ও পেঁয়াজের ক্ষেত। কিশোররা ছুটে গিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের ধাতব টুকরো কুড়িয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পর সেখানে নাইজেরিয়ান সেনারা পৌঁছে এলাকা পরিষ্কার করতে শুরু করে এবং সবার কাছে থাকা ধ্বংসাবশেষ জমা দিতে নির্দেশ দেয়। তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ গোপনে সেগুলো লুকিয়ে রাখে।
সোকোটোর আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র আর মাটিতে পড়ে থাকা ধাতব টুকরোর চেয়েও ভারী হয়ে উঠেছে একটাই প্রশ্ন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর চোখে কি এই জনপদ ‘টার্গেট জোন’ হয়ে উঠবে।