যাদের নেই নিজস্ব কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র, অথচ নিয়ন্ত্রণ করছে পুরো একটি দেশের সরকার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জলপথ। কারা এই হুথি? কোথা থেকে আসছে তাদের এতো শক্তি? আর কেনইবা তাদের এই সংঘাতের আঁচ এসে লাগছে বাংলাদেশেও?
রিয়াজুল বাশার
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫০ এএমআপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
হুথিদের নিয়ে সর্বশেষ সামনে আসা আলোচিত খবরটি হচ্ছে, চীনের যন্ত্রাংশ দিয়ে তারা এমন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা দিয়ে আঘাত হানা যাবে সৌদি আরব ও ইসরায়েল দুই দেশেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সামনে আসার পর নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হুথিরা এমন একটি গোষ্ঠী, যাদের নেই নিজস্ব কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র। অথচ একটি দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে কার্যত তারাই। দেশটির সরকার ও বহির্শক্তি সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে লড়াই।
একের পর এক দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চল। আর এমন একটি জায়গার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা, যেখানকার অস্থিরতা নাড়া দেয় পুরো বিশ্বকে, এমনকি বাংলাদেশকেও।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের উপকূল এবং বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোতে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে নাস্তানাবুদ করে ফেলা এবং ইসরায়েলমুখী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ।
সবমিলিয়ে গত কয়েক বছরে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে অন্যতম মাথাব্যথা হিসাবে উত্থান ঘটেছে এই হুথিদের। বৈশ্বিক সংঘাতের একেবারে কেন্দ্রে এখন সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটি।
কয়েক বছর আগেও, নতুন শতকের শুরুতে হুথিদের আন্দোলন ছিলো কেবলই ইয়েমেনের আঞ্চলিক একটি সমস্যা, ধর্মীয় অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ।
কিন্তু দেড় দশকে বদলে গেছে পুরো দৃশ্যপট। হুথিরাই এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী। তাদের কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়ছে পুরো দুনিয়াজুড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হুথিরা আসলে কারা? তারা কি লড়াই করছে শুধু মাত্র ইরানের প্রক্সি বাহিনী হিসাবে? নাকি ইয়েমেনের ইতিহাস থেকে উঠে আসা এমন এক শক্তি তারা, যাদের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা?
কেন তাদের শত্রু মনে করে সৌদি আরব? কেন হুথিদের হুমকি হিসাবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল? কারা তাদের মদত দিচ্ছে? আর কেনইবা হুথিদের কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্যও?
ইয়েমেনের ভৌগোলিক গুরুত্ব
হুথিদের আড়াই দশকের বিদ্রোহ ও সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে রোমাঞ্চকর, নাটকীয় এবং রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি? সাম্প্রতিক হুথিদের নিয়ে যে সমস্যা, তার কেন্দ্রে থাকা সেই ব্যক্তির পরিণতি হয়েছিলো অত্যন্ত মর্মান্তিক। তার কারণেই শুরু হুথিদের বিদ্রোহ। হুথি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান নেতাকে হত্যা করেছিলেন তিনি। পরে আবার হুথিদের সঙ্গেই হাত মেলান এবং সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জীবন দিতে হয় তাকে।
সেই ব্যক্তি হলেন ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ। বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এক স্বৈরশাসক। ১৯৭৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ বছর ৪ মাস ছিলেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট।
প্রথম সাড়ে ১১ বছর ছিলেন উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট। ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ এক হয়ে অখণ্ড ইয়েমেন রাষ্ট্র তৈরি হলে, আরো প্রায় ২২ বছর প্রেসিডেন্ট থাকেন আবদুল্লাহ সালেহ।
অত্যন্ত ক্ষমতাধর এই একনায়কের বৃত্তান্ত ও কর্মকাণ্ডে নিয়ে পরে আলোচনা করবো। তার আগে জানা দরকার ইয়েমেনের ভৌগোলিক গুরুত্ব। ঠিক কোন কারণে আধুনিক বিশ্বে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশটি।
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থান ইয়েমেনের। পশ্চিমে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর। আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগ পথের ঠিক প্রবেশমুখেই ইয়েমেন।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রণালি হলো বাব আল-মান্দেব। সংকীর্ণ এই জলপথটিই বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত চোকপয়েন্ট। যুক্ত করেছে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে।
জলপথটি মূলত কাজ করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের প্রধান সেতু হিসাবে। বিশ্ব বাণিজ্যের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয় বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে।
সুয়েজ খালের গুরুত্ব আপনারা নিশ্চয়ই জানেন। সুয়েজ খাল দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করতে হলে জাহাজগুলোকে পার হতে হবে বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এটি বন্ধ বা অবরুদ্ধ হওয়া মানে, এশিয়া থেকে ইউরোপে চলাচল করা জাহাজগুলোকে যেতে হবে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে, যা বিপুল পরিমাণে বাড়িয়ে দেয় যাতায়াত খরচ ও সময় দুটোই।
ভৌগোলিক এই অবস্থানের কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইয়েমেন এবং সেখানে জড়ো হচ্ছে পরাশক্তিগুলো। শুধু ইয়েমেনই নয়, বাব আল-মান্দেব প্রণালির পাশের সবগুলো দেশই এখন রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে। যে দেশগুলোকে নিয়ে হর্ন অব আফ্রিকা বলা হয়, তাদের সবগুলোর অবস্থান ইয়েমেনের পাশে।
ইয়েমেনের অন্যতম প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া। বাব আল-মান্দেবের তীর ঘেঁষে অবস্থান। গত তিন দশক ধরে কঠোর সামরিক স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র চলছে দেশটিতে।
স্বাভাবিককারণেই রাজনৈতিকভাবে প্রচণ্ড অস্থির একটি দেশ ইরিত্রিয়া। প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার সঙ্গে তিন দশক ধরে চলছে সংঘাত। ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীনতা লাভ করার পর ইথিওপিয়া পরিণত হয় একটি স্থলবেষ্টিত বা। সমুদ্রে সরাসরি প্রবেশপথ হারিয়ে ফেলে ইথিওপিয়া।
বাব আল-মান্দেবে ইরিত্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর হলো আসাব। ইরিত্রিয়ার ভয় যে, তাদের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আসাব দখল করার জন্য যুদ্ধের অজুহাত তৈরি করছে ইথিওপিয়া।
ইয়েমেনের পাশের আরেকটি দেশ হলো জিবুতি। এই দেশটিও রয়েছে কর্তৃত্ববাদী কঠোর শাসনের অধীনে। ভূরাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং সংবেদনশীল অবস্থান জিবুতির।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হওয়ায়, জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও ইতালি, এমনকি চীনও।
২০১৭ সালে জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে চীন। এটাই চীনের প্রথমবারের মতো কোনো বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি। ওই ঘটনার পর জিবুতি ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক টেনশন।
বাব আল-মান্দেবের পাশেই আরেকটি দেশ হলো সুদান। গত কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম মানবিক বিপর্যয় এবং ভয়াবহ এক গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
এবার নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন, ইয়েমেনের আশেপাশে কী চলছে। ইয়েমেনের স্থল প্রতিবেশীদের মধ্যে একদিকে জর্ডান এবং আরেকদিকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে সৌদি আরবের। হুথি সমস্যাকে আরো ব্যাপকতর করে তুলেছে এই সৌদি আরবই।
হুথিদের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু যেভাবে
হুথি মূলত ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন। তাদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। অর্থাৎ ‘আল্লাহর সমর্থক’। ‘হুথি’ নামটি এসেছে তাদের আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার নাম থেকে।
প্রতিষ্ঠাতা সেই ব্যক্তি হলেন হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথি। আসলে হুথি হলো তার বংশের নাম। বদরুদ্দিন আল-হুথির অনুসারীরাই এখন পরিচিত হুথি নামে। তারা অনুসরণ করে শিয়া ইসলামের জায়েদি মতবাদ।
জায়েদিরা এক সময় ছিলো ইয়েমেনের ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্রে। প্রায় এক হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে জায়েদি ইমামরা শাসন করেছিলো ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল। ১৯৬২ সালে প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের পর ক্ষমতা হারায় তারা।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ইয়েমেনের সব জায়েদি মুসলমান কিন্তু হুথি নয়। আবার সব হুথি সমর্থকও জায়েদি নয়। তার মানে হুথিদের সমর্থন না করলেই কেউ তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের বিরোধী হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এমনও নয়।
আবার ইরানের যে শিয়া মতবাদ রয়েছে, তার সঙ্গে ভিন্নতা রয়েছে ইয়েমেনের জায়েদি শিয়াদের মতবাদের। ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা ১২ ইমাম বা টুয়েলভার শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু জায়েদিদের বিশ্বাস অন্য কিছুতে।
তারমানে ইরানের শিয়া ও হুথি শিয়ারা এক সময়। তাই হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় ঐক্য দিয়ে ব্যাখ্যা কলে ভুল হবে। এখানে রয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামরিক সহযোগিতার হিসাব।
হাজার বছরের শাসন ক্ষমতা হারানোরে পর, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, জয়েদিরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনে ভিত্তি গড়ে ওঠে ইয়েমেনে জায়েদি ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের। সেখান থেকেই শুরু হুথিদের আন্দোলন।
প্রথমদিকে তাদের সমর্থকদের একটি অংশের ধারণা ছিলো, রাষ্ট্রীয় নীতি ও ধর্মীয় বিরূপ প্রচারের কারণেই দুর্বল হয়ে পড়েছে জায়েদিদের ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হুথিদের আন্দোলন ছাড়িয়ে যায় ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি এবং গত দেড় দশকে তা পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতার বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ে।
তার মানে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হুথিদের আন্দোলন ভূমিষ্ঠ হয়েছিলো ইরানের প্রক্সি বাহিনী হিসেবে নয়। ইয়েমেনের নিজস্ব পরিস্থিতি থেকেই উত্থান হয় তাদের। কিন্তু পরে এসে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ইরানের সঙ্গে এবং হুথি আর ইরান, এখন তারা একে অপরের সঙ্গে জড়িত ওতপ্রোতভাবে।
ধর্মীয় নেতা হিসাবে জায়েদিদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ছিলো হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনি ছিলেন ইয়েমেনের একজন সংসদ সদস্য। একাধারে রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় নেতা। তখনকার স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট সালেহর কাছ থেকে পেতেন রাজনৈতিক সুবিধা।
সালেহ- হুথি সম্পর্ক ভালোই এগোলেও টেকসই হয়নি খুব বেশিদিন। হুথির ধারণা ছিলো, প্রেসিডেন্ট সালেহ অতিরিক্ত সৌদি ঘেঁষা। আর সৌদি রাজপরিবারের নীতির সঙ্গে হুথিদের রয়েছে ঐতিহাসিক বিরোধ।
তাই হুসেইন আল-হুথি কড়া ভাষায় সমালোচনা শুরু করেন প্রেসডিন্ট সালেহর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের। বিরোধ চলে আসে প্রকাশ্যে। প্রেসিডেন্ট সালেহও বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হতে পারেন আল-হুথি।
রাজনৈতিক এই চ্যালেঞ্জে ক্ষুব্ধ হয়ে ২০০০ সালে হুসেইন আল-হুথির সব ধরনের সরকারি ফান্ড ও আর্থিক অনুদান বন্ধ করে দেন সালেহ। আর তহবিল বন্ধের সেই ক্ষোভেই ব্যাপকভাবে উগড়ে পড়ে এক বছর পরের একটি ইস্যুতে।
২০০১ সালের নাইন ইলেভেনে সন্ত্রাসী হামলা হয় ম্যানহাটনের টুইন টাওয়ারে হামলা। আমেরিকা ঘোষণা করে 'সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ'। সেই যুদ্ধে সমর্থন ও সহযোগিতা দেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট সালেহ। তিনি সিআইএ এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইয়েমেনের ভেতরের আল-কায়েদা দমনের অনুমতি দেন।
এই ঘটনাকে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসাবে আখ্যায়িত করেন হুসেইন আল-হুথি। তিনি প্রচার চালাতে শুরু করেন যে, আমেরিকার কাছে ইয়েমেনকে বিক্রি করে দিয়েছেন সালেহ।
আমেরিকার প্রতি সালেহর সমর্থনের প্রতিবাদে নিজস্ব অনুসারীদের নিয়ে উত্তর ইয়েমেনের মসজিদ ও রাজপথগুলোতে প্রকাশ্য বিক্ষোভ শুরু করেন হুসেইন আল-হুথি। খেপিয়ে তোলেন তার অনুসারী ও জায়েদি সম্প্রদায়কে।
ওই সময়ই তিনি তৈরি করেন হুথিদের নানা স্লোগান, যা পরিচিত হয় 'সারখাহ' নামে। ওইসব স্লোগানের মধ্যে ছিলো- "আল্লাহু আকবার, আমেরিকার ধ্বংস হোক, ইসরায়েলের ধ্বংস হোক, ইহুদিদের ওপর লানত, ইসলামের জয় হোক।"
হুসেইন আল-হুথির বিভিন্ন উসকানিমূলক ধর্মীয় বক্তব্য ক্যাসেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইয়েমেনে। তিনি প্রেসিডেন্ট সালেহকে আখ্যায়িত করেন আমেরিকার পাপেট বা পুতুল এবং সুন্নি মতবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে। প্রেসিডেন্ট সালেহ যে, জায়েদি শিয়াদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি, সেসব বক্তব্যও ছড়াতে থাকেন আল-হুথি।
২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনাও পুঁজি করেন আল-হুথি। সালেহর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভে ফেটে পড়ে জায়েদিরা। রাজধানী সানার বড় বড় মসজিদে প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া শুরু করে হুথি সমর্থকরা।
উত্তর ইয়েমেনের সাদা প্রদেশ হুলো জায়েদি বা হুথিদের নিজস্ব এলাকা। হুসেইন আল-হুথি যখন প্রেসিডেন্ট সালেহর বিরোধিতা করছিলেন, তখনই তলে তলে আরেকটি কাজ করেন তিনি। সাদাতে গড়ে তোলেন নিজের একটি সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থা ও সশস্ত্র বাহিনী।
হুথির অনুসারীরা যখন বেশকিছুটা গুছিয়ে নিয়েছেন, তখন তা জানতে পারেন প্রেসিডেন্ট সালেহ। ২০০৪ সালে সালেহ খবর পান, হুথির সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে এবং বিপদ কড়া নাড়ছে তার ঘাড়ের ওপর।
আল-হুথির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেন সালেহ। তার বিরুদ্ধে আনা হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ। জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। সাদা প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে আল-হুথিকে খতম করতে পাঠানো হয় সেনাবাহিনীর দক্ষ ও চৌকস সদস্যদের।
ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে এটাই ছিলো হুথিদের প্রথম আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের শুরু। ২০০৪ সালে হুসেইন আল-হুথির বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর, ওই বছরই হত্যা করা হয় তাকে।
প্রেসিডেন্ট সালেহ ভেবেছিলেন, বিপদ কাটিয়ে উঠবেন তিনি। কিন্তু ভাবনায় ভুল ছিলো। আল-হুথির মৃত্যুতে শেষ হয় না জায়েদিদের মুভমেন্ট। বরং আরো সংগঠিত হয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানতে থাকে আল-হুথির অনুসারীরা।
দৃশ্যপট বদলে দিলো আরব বসন্ত
হুসেইন আল-হুথির ছোট ভাই হলেন আব্দুল মালিক আল-হুথি। ভাইয়ের মৃত্যুর পর আন্দোলনের নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। তার নেতৃত্বেই একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহী শক্তি থেকে হুথিরা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক সক্ষমতার আঞ্চলিক প্রভাবশালী সংগঠনে।
ইয়েমেনের শাসক সালেহ শুরুতে চেয়েছিলেন হুথিদের দমন করতে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে হুথি ও সরকারের মধ্যে যুদ্ধ হয় দফায় দফায়। সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে সালেহর মিত্র সৌদি সরকার।
২০০৯ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চলাকালে সীমান্ত অতিক্রম করে সৌদি আরবে হামলা চালায় হুথিরা। পালটা সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি বাহিনীও।
ওই ঘটনা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ, তারপর হুথি আন্দোলন শুধু আর ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় হিসাবে বিবেচ্য থাকে না। প্রতিবেশী সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হয় তারা।
২০১০ সালে হুথিদের সঙ্গে সাময়িক একটি যুদ্ধবিরতি হয় ইয়েমেনের সালেহ সরকারের। কিন্তু সেখানে মীমাংসা হয় না সংঘাতের মূল কারণগুলো। তারপরও কিছুদিন সংঘাত এড়াতে পেরেছিলো দুই পক্ষই।
এরপর আসে ২০১১ সাল। শুরু হয় একাধিক মহাদেশ কাঁপানো গণআন্দোলন আরব বসন্ত। দেশে দেশে পতন ঘটতে থাকে স্বৈরশাসক ও একনায়কদের।
আরব বসন্তের ঢেউ আঁছড়ে পড়ে ইয়েমেনেও। শুরু হয় সালেহবিরোধী গণবিক্ষোভ। আগে থেকেই হুথিরা ছিলেন সরব। তাদের যুক্ত হয় আরো কয়েকটি পক্ষ। ক্ষমতার ভিত নড়ে যায় সালেহর। তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের একটি অংশ হাত মেলায় হুথিদের সঙ্গে। বিপুল উদ্যমে চাঙ্গা হয়ে ওঠে হুথিরা।
সালেহর সমর্থকদের নিয়ে গড়ে ওঠা অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক জোটই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে হুথিদের উত্থানে।
২০১১ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট সালেহ। দীর্ঘদিন ধরে তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্দ রাব্বুহ মনসুর হাদি। তার কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেন সালেহ।
কিন্তু হাদি ছিলেন ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির শাসক। তার সরকারের সামনে আরো ছিলো অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিরোধ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার সংকট।
হুথিদের সানা দখল
এই পরিস্থিতির পুরো সুযোগ নেয় হুথিরা। বাড়তে শুরু করে নিজেদের সমর্থন। তখন তারা শুধু জায়েদি জনগোষ্ঠীর দাবির কথাই বলছিলো না। রাজনৈতিক প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ এবং জ্বালানির দামসহ জনজীবনের বিভিন্ন ইস্যুকে।
এর ফলে হুথিদের সমর্থন বাড়তে থাকে। তাদের পক্ষে শক্তিশালী হতে থাকে জনমত এবং আরো দুর্বল হতে থাকে সরকার।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আকস্মিক হামলা চালিয়ে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুথিরা। কেন্দ্র দখলের পর প্রথমে তারা বলেছিলো রাজনৈতিক সমঝোতার কথা। কিন্তু পরে সুর পালটে ফেলে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকে হুথিরা।
২০১৫ সালের জানুয়ারির ঘটনা। কার্যত ভেঙে পড়ে প্রেসিডেন্ট হাদির সরকার। হাদি চলে যান দক্ষিণের বন্দর শহর এডেনে। চেষ্টা চালান আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে আবারও নিজের সরকার প্রতিষ্ঠার। এই সময়ই নতুন রূপ নেয় ইয়েমেনের সংঘাত।
একদিকে হুথিরা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হাদির সরকারের সমর্থকেরা। সৌদি আরব সমর্থন জানায় এবং একাধিক দেশ নিয়ে গঠন করে নতুন জোট।
২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে হুথিদের বিরুদ্ধে। পালটা আঘাত হানে হুথিরাও। হাদির প্রাসাদ গুড়িয়ে দেয়।
সৌদি আরবের লক্ষ্য ছিলো হুথিদের অগ্রযাত্রা থামানো। একইসঙ্গে পুনরুদ্ধার করা হাদি সরকারের অবস্থান। কিন্তু বিমান হামলা চালিয়েও সৌদি আরব ভাঙতে পারেনি হুথিদের ক্ষমতার কাঠামো। বরং দীর্ঘ যুদ্ধ, অবরোধ, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।
চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটিতে তৈরি হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ও নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ইয়েমেন নিয়ন্ত্রণ করে না হুথিরা। তারা মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ এবং রাজধানী সানা। কিন্তু এই অঞ্চলটিতেই বসবাস করে দেশটির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ। বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌ প্রণালি পড়েছে এই অংশে।
সালেহর হাত মেলানো, বেইমানি ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড
এর মধ্যেই ঘটে আরেকটি ঘটনা। আলি আবদুল্লাহ সালেহ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ছাড়লেও তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালের খেলোয়াড়। ২০১৪ সালে হুথিদের সাথে হাত মেলান।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে বিমান হামলা শুরু করলে, হুথিদের সাথে জোট গঠনের প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন সালেহ। এর কারণও ছিলো। ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট হাদির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন সালেহ।
হুথিদের সাথে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় আসেন তিনি। এরপর নিজের অনুগত নিয়মিত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সঁপে দেন হুথিদের হাতে। এই যৌথ শক্তির জোরেই ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খুব সহজে রাজধানী সানা দখল করেছিলো হুথিরা।
২০১৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সালেহর অনুসারী ও হুথিরা মিলে যৌথভাবে গঠন করেন 'সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিল' বা এসপিসি। এটি ছিলো সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিষদ। এর মাধ্যমে উত্তর ইয়েমেনে চালু হয় সমান্তরাল একটি সরকার।
কিন্তু হুথিদের সঙ্গে স্থায়ী হয়নি সালেহর জোট। কারণ, এই জোট গড়ে উঠেছিলো কেবল মাত্র স্বার্থের ভিত্তিতে। সেখানে ছিলো না কোনো আদর্শিক ঐক্য।
২০১৭ সালের ২রা ডিসেম্বর হঠাৎ করেই হুথিদের সাথে জোট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন সালেহ। এবং আবারো হাত মেলান সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সাথে। কিন্তু ওই ই ঘটনাকে হুথিরা গণ্য করে চরম "বিশ্বাসঘাতকতা" হিসাবে।
সালেহর অবস্থান বদলের পর মুহূর্তেই সানার রাজপথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় হুথি ও সালেহর অনুগত বাহিনীর মধ্যে। মাত্র দুই দিনের মধ্যে হুথিরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় সানার এবং সালেহর নিজস্ব বাসভবন উড়িয়ে দেয়।
প্রাণ বাঁচাতে অনুগত কর্মকর্তাদের সঙ্গে গাড়িবহর নিয়ে সানা থেকে পালিয়ে যান। রওনা হন জন্মভূমি সানহান অঞ্চলের দিকে। কিন্তু সালেহ অতিক্রম করতে পারেন মাত্র ৪০ কিলোমিটার পথ। জাহার সায়ান নামের একটি এলাকায় তার কনভয় ঘিরে ফেলে হুথিদের একটি বিশেষ দল।
প্রথমে রকেট চালিত গ্রেনেড (আরপিজি) মেরে থামিয়ে ফেলা হয় সালেহর বুলেটপ্রুফ গাড়ি। এরপর তাকে নামানো হয় গাড়ি থেকে। খুব কাছ থেকে সাহের মাথায় ও বুকে উপর্যুপরি গুলি চালানো হয় স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইয়েমেনের ৩৪ বছরের সাবেক শাসক।
আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মদত ও ইরান
এদিকে হুথিদের সঙ্গে সৌদি জোটের লড়াইয়ের মাত্রা যতই বাড়াতে থাকে, ততই স্পষ্ট হতে থাকে ইরানের সম্পৃক্ততার বিষয়। কারণ, পরিষ্কারভাবে একটা প্রশ্নই সামনে চলে আসে। তা হলো- এত শক্তি ও অস্ত্র কোথা থেকে পাচ্ছে হুথিরা?
ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক নিয়ে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগ নতুন নয়। সৌদির অভিযোগ, হুথিদের অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে ইরান এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের তারা ব্যবহার করতে চাচ্ছে নিজেদের উপগ্রহ হিসাবে।
একইসঙ্গে সৌদি আরো অভিযোগ করছে যে, ইয়েমেনের যুদ্ধকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিচ্ছে ইরান। অবশ্য হুথিদের অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে ইরান।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা বিভিন্ন সময়ে আটক করেছে অস্ত্রের চালান, ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান এবং সামরিক প্রযুক্তি।
সেসব বিশ্লেষণ করে তারা দাবি করে আসছে যে, ওইসব অস্ত্রের উৎস হলো ইরান এবং সেসব আলামতকে ইরানের সাথে হুথিদের সম্পর্কের প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।
যদি এই দাবি সত্য হয়, তাহলে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, হুথিরা কি পরিচালিত হয় ইরানের নির্দেশে?
অবশ্য এই উত্তর পেতে হলে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমত, হুথিরা যে ইরানের সমর্থন পাবে, সেই ধারণা বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, আবার এটাও ঠিক যে, ইরানের সমর্থন থাকার অর্থ এই নয় যে, হুথিরা ইরানের প্রতিটি নির্দেশই মেনে চলবে এবং কাজ করবে তাদের সব স্বার্থের অনুকূলে।
ইরানের আঞ্চলিক কৌশলের একটি অংশ হলো আমেরিকা, ইসরায়েল ও সৌদি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং তাদের সহায়তা করা। এটাকে বলা হচ্ছে- অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধের অক্ষ।
ইসরায়েল, আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের শত্রু দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেশে দেশে বিভিন্ন বাহিনীকে প্রক্সি দিচ্ছে ইরান। লেবাননে হেজবুল্লাহ, প্যালেস্টাইনের হামাস, ইরাক-সিরিয়াতে একাধিক বাহিনী পরিচালনা করে তারা।
ওইসব সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চ্যালেঞ্জ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের প্রভাবকে। এই কারণেই হেজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে দেখা হয় তাদের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসাবেই।
হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্ত ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ইরানের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সমুদ্রপথে আঘাত হানার অস্ত্র এবং এসব ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সহায়তার ফলে হুথিদের সামরিক শক্তি বেড়েছে।
তবে ইরানের সহায়তার পাশাপাশি হুথিদের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি। হুথি বাহিনীর বর্তমান নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা আনুমানিক সাড়ে তিন লাখ।
হুথিরা এখন প্রবেশ করেছে ইয়েমেনের ক্ষমতার কেন্দ্রে। নিয়ন্ত্রিত করে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসন এবং কাজ করে নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও।
তাই হুথিদের কেবল ইরানের হাতের পুতুল হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না।
এখানে রয়েছে আরেকটি বিষয়। ইরান ও হুথিদের ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে মিল থাকলেও তারা একই মতবাদের অনুসারী নয়। তাই ধর্মের থেকেও তাদের সবচেয়ে বড় মিলের জায়গা হলো অভিন্ন প্রতিপক্ষ, আঞ্চলিক কৌশল এবং সামরিক সহযোগিতা।
হুথিদের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারে ইরান। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির শক্তি বাড়াতে পারে হুথিরা।
তার মানে এই সম্পর্ক ‘প্রভু ও অনুগত বাহিনী’ হিসাবে নয়। তাদের সম্পর্ক দেখা যেতে পারে অসম শক্তি ও অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত অংশীদারিত্ব হিসাবে।
হুথিরা কী চায়
হুথিরা এখন আর বন্দি থাকতে চায় না শুধু মাত্র উত্তরাঞ্চলের একটি স্বায়ত্তশাসিত আন্দোলনের মধ্যে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ইয়েমেনের ক্ষমতায় নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা। পুরো ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থায় কর্তৃত্ব স্থাপন করা। কারণ, ইয়েমেন হলো খনিজ সম্পদ ভরপুর।
ইয়েমেনের প্রমাণিত খনিজ তেলের মজুত প্রায় ৩০০ কোটি ব্যারেল। এই সম্পদের বেশিরভাগই রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মাসিলা অববাহিকা এবং মারিব-জাওফ অঞ্চলে। দেশটিতে প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে ইয়েমেনে প্রায় ১৪ থেকে ১৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বালহাফ এলএনজি প্ল্যান্টের মাধ্যমে একসময় রপ্তানি করা হতো এই গ্যাস।
ইয়েমেনে আরো রয়েছে সোনা ও রুপার ভাণ্ডার। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের ৫০টিরও জায়গায় মিলেছে সোনার সন্ধান। এর মধ্যে মেদদেন হলো অন্যতম বড় সোনার খনি। সেখানে আনুমানিক ৬ লক্ষ ৭৮ হাজার টন সোনা মিশ্রিত আকরিক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু ইয়েমেনে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের মজুত সত্ত্বেও বেশিরভাগ অংশই এখনও রয়েছে মাটির নিচে। মানে অব্যবহৃত পড়ে আছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বিপুল মূল্যের খনিজ সম্পদ।
হুথিদের লক্ষ্য এখন এখানেও। ইয়েমেনের তেল-গ্যাসের রাজস্ব, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বন্দর, আমদানি-রপ্তানি এবং সরকারি রাজস্বের বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বিরোধ।
তবে হুথিদের কাছে এসব অর্থনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি রয়েছে নিজেদের প্রশাসন ও সামরিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার প্রশ্নও। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের অবসান চায় হুথিরা। নিজেদের ওপর বিভিন্ন অবরোধ ও বিধিনিষেধ শিথিল চায় এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের স্বীকৃতির দাবি তুলে আসছে তারা।
হুথিদের আরেকটি লক্ষ্য হলো- আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো। প্রয়োজনে সেটা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে হলেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতা, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের ঘোষণা এবং লোহিত সাগরে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে এই নিজেদের হাজির করছে তারা।
তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের নামে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং সামরিক সংঘাত বাড়ানোর যে দায় হুথিদের ওপর পড়ছে, তা কীভাবে এড়াবে তারা?
হুথিদের বক্তব্য, তাদের অভিযান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষ হত্যা করা হচ্ছে এবং নাবিক ও সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা তৈরি করা হচ্ছে ঝুঁকি। এর দায় কি এড়াতে পারবে হুথি বিদ্রোহীরা?
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা ঘটেছে। কৌশলগত নৌপথ বাব আল-মান্দেব ঘিরে নতুন লড়াই। লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে হুথিরা।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় হুথিরা। এরমধ্যে রয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা। মোখা ও ধুবাব বন্দর। বৈশ্বিক নৌ-পথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই উপকূলীয় শহর ও বন্দরগুলো।
কৌশলগত দুইটি স্থাপনাই দখল করে হুথিরা। পেরিম বা মায়্যুন দ্বীপের অবস্থান বাব আল-মান্দেব প্রণালির ঠিক মাঝখানে। এই সামরিক দ্বীপটিরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথিরা। এতে ওই জলপথের ওপর নজরদারি ও জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চূড়ান্ত সক্ষমতা পেয়েছে হুথিরা।
হুথিদের এই বিশাল অগ্রযাত্রার হুমকির মুখে পড়েছে বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি সরবরাহে। গত কয়েকদিনে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ছাড়িয়েছে ১০০ ডলার।
হুথিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় পালটা অভিযান শুরু করেছে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী। নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’।
অক্টোবরে শুরুতেই সৌদির নেতৃত্বে হুথিবিরোধী অভিযানের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সৌদি বিমানবাহিনীর জোরালো সহায়তায় এতে অংশ নিয়েছে সরকারি বাহিনী এবং সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেড।
গত ৫ই অক্টোবর সরকারি বাহিনী দাবি করে যে, তারা বিদ্যুৎগতির এক অভিযান চালিয়ে হুথিদের হটিয়ে পুনর্নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে কৌশলগত মোখা বন্দর, ধুবাব এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির চারপাশের মূল পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে। তবে সরকারি বাহিনীর এই দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা।
তবে বাব আল-মান্দেবের দখল নিয়ে প্রবল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে দুই পক্ষ। হুথিরা তাদের দখল করা কিছু উপকূলীয় অবস্থান থেকে কিছুটা পিছু হটে পেছনের পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে অবস্থান নিয়েছে। একের পর এক হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সৌদি আরব।
বাংলাদেশে প্রভাব
হুথিদের সংঘাতের প্রভাব কীভাবে পড়তে পারে বাংলাদেশে? বাংলাদেশ থেকে ইয়েমেনের দূরত্ব অনেক। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের পথগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের অস্থিরতা প্রভাব ফেলতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও।
বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রথম উদ্বেগ হলো পণ্য পরিবহনের খরচ। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও পণ্যের দাম। আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হলে জ্বালানি বাজারে দামের ওঠানামা বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য সময় ও ব্যয়ের অনিশ্চয়তা। পণ্য পরিবহনের রুট বদলালে শুধু জাহাজভাড়া নয়, বিমা, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর সময়ও প্রভাবিত হতে পারে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক সংঘাতের মানবিক প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কনস্যুলার সহায়তার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সুতরাং, হুথিদের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য শুধু দূরের একটি যুদ্ধের খবর নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রপ্তানি, আমদানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষার প্রশ্ন।
হুথিদের ভবিষ্যৎ কী
এখন প্রশ্ন হলো হুথিদের ভবিষ্যৎ কী? তারা কি ইয়েমেনের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে?
এখানে কয়েকটি সম্ভাবনা দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে এবং সামরিক চাপের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে রাজনৈতিক দর-কষাকষির শক্তি হিসাবে।
অতীতের দেখা গেছে, দীর্ঘ সামরিক অভিযানও তাদের দ্রুত পরাজিত করতে পারেনি।
সৌদি আরব-সমর্থিত বাহিনীর অভিযান তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড সংকুচিত করতে পারে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেবের মতো কৌশলগত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারালে তাদের আন্তর্জাতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা কমতে পারে।
আর সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আরো বাড়তে পারে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। এছাড়া রাজনৈতিক সমঝোতার পথও পুরোপুরি বন্ধ নয়।
ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সামরিক বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছু দাবি করে। ক্ষমতা ভাগাভাগি, নিরাপত্তা, রাজস্ব বণ্টন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে সমঝোতা ছাড়া স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন।
তবে এসব সম্ভাবনার কোনটি বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য, সৌদি আরবের অবস্থান, ইরানের ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
হুথিরা কি শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের ক্ষমতার স্থায়ী অংশ হয়ে থাকবে? নাকি তাদের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাদেরকে ঠেলে দেবে আরো বড় সংঘাতের দিকে? নাকি হুথিরা শেষ হয়ে বিপক্ষ বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরগুলোই নির্ধারণ করবে ইয়েমেন ও হুথিদের ভবিষ্যৎ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়।
কারা এই হুথি, তারা কী চায়, তাদের পেছনে কারা?
যাদের নেই নিজস্ব কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র, অথচ নিয়ন্ত্রণ করছে পুরো একটি দেশের সরকার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জলপথ। কারা এই হুথি? কোথা থেকে আসছে তাদের এতো শক্তি? আর কেনইবা তাদের এই সংঘাতের আঁচ এসে লাগছে বাংলাদেশেও?
হুথিদের নিয়ে সর্বশেষ সামনে আসা আলোচিত খবরটি হচ্ছে, চীনের যন্ত্রাংশ দিয়ে তারা এমন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা দিয়ে আঘাত হানা যাবে সৌদি আরব ও ইসরায়েল দুই দেশেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সামনে আসার পর নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হুথিরা এমন একটি গোষ্ঠী, যাদের নেই নিজস্ব কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র। অথচ একটি দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে কার্যত তারাই। দেশটির সরকার ও বহির্শক্তি সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে লড়াই।
একের পর এক দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চল। আর এমন একটি জায়গার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা, যেখানকার অস্থিরতা নাড়া দেয় পুরো বিশ্বকে, এমনকি বাংলাদেশকেও।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের উপকূল এবং বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোতে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে নাস্তানাবুদ করে ফেলা এবং ইসরায়েলমুখী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ।
সবমিলিয়ে গত কয়েক বছরে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে অন্যতম মাথাব্যথা হিসাবে উত্থান ঘটেছে এই হুথিদের। বৈশ্বিক সংঘাতের একেবারে কেন্দ্রে এখন সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটি।
কয়েক বছর আগেও, নতুন শতকের শুরুতে হুথিদের আন্দোলন ছিলো কেবলই ইয়েমেনের আঞ্চলিক একটি সমস্যা, ধর্মীয় অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ।
কিন্তু দেড় দশকে বদলে গেছে পুরো দৃশ্যপট। হুথিরাই এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী। তাদের কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়ছে পুরো দুনিয়াজুড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হুথিরা আসলে কারা? তারা কি লড়াই করছে শুধু মাত্র ইরানের প্রক্সি বাহিনী হিসাবে? নাকি ইয়েমেনের ইতিহাস থেকে উঠে আসা এমন এক শক্তি তারা, যাদের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা?
কেন তাদের শত্রু মনে করে সৌদি আরব? কেন হুথিদের হুমকি হিসাবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল? কারা তাদের মদত দিচ্ছে? আর কেনইবা হুথিদের কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্যও?
ইয়েমেনের ভৌগোলিক গুরুত্ব
হুথিদের আড়াই দশকের বিদ্রোহ ও সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে রোমাঞ্চকর, নাটকীয় এবং রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি? সাম্প্রতিক হুথিদের নিয়ে যে সমস্যা, তার কেন্দ্রে থাকা সেই ব্যক্তির পরিণতি হয়েছিলো অত্যন্ত মর্মান্তিক। তার কারণেই শুরু হুথিদের বিদ্রোহ। হুথি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান নেতাকে হত্যা করেছিলেন তিনি। পরে আবার হুথিদের সঙ্গেই হাত মেলান এবং সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জীবন দিতে হয় তাকে।
সেই ব্যক্তি হলেন ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ। বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এক স্বৈরশাসক। ১৯৭৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ বছর ৪ মাস ছিলেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট।
প্রথম সাড়ে ১১ বছর ছিলেন উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট। ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ এক হয়ে অখণ্ড ইয়েমেন রাষ্ট্র তৈরি হলে, আরো প্রায় ২২ বছর প্রেসিডেন্ট থাকেন আবদুল্লাহ সালেহ।
অত্যন্ত ক্ষমতাধর এই একনায়কের বৃত্তান্ত ও কর্মকাণ্ডে নিয়ে পরে আলোচনা করবো। তার আগে জানা দরকার ইয়েমেনের ভৌগোলিক গুরুত্ব। ঠিক কোন কারণে আধুনিক বিশ্বে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশটি।
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থান ইয়েমেনের। পশ্চিমে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর। আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগ পথের ঠিক প্রবেশমুখেই ইয়েমেন।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রণালি হলো বাব আল-মান্দেব। সংকীর্ণ এই জলপথটিই বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত চোকপয়েন্ট। যুক্ত করেছে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে।
জলপথটি মূলত কাজ করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের প্রধান সেতু হিসাবে। বিশ্ব বাণিজ্যের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয় বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে।
সুয়েজ খালের গুরুত্ব আপনারা নিশ্চয়ই জানেন। সুয়েজ খাল দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করতে হলে জাহাজগুলোকে পার হতে হবে বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এটি বন্ধ বা অবরুদ্ধ হওয়া মানে, এশিয়া থেকে ইউরোপে চলাচল করা জাহাজগুলোকে যেতে হবে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে, যা বিপুল পরিমাণে বাড়িয়ে দেয় যাতায়াত খরচ ও সময় দুটোই।
ভৌগোলিক এই অবস্থানের কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইয়েমেন এবং সেখানে জড়ো হচ্ছে পরাশক্তিগুলো। শুধু ইয়েমেনই নয়, বাব আল-মান্দেব প্রণালির পাশের সবগুলো দেশই এখন রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে। যে দেশগুলোকে নিয়ে হর্ন অব আফ্রিকা বলা হয়, তাদের সবগুলোর অবস্থান ইয়েমেনের পাশে।
ইয়েমেনের অন্যতম প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া। বাব আল-মান্দেবের তীর ঘেঁষে অবস্থান। গত তিন দশক ধরে কঠোর সামরিক স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র চলছে দেশটিতে।
স্বাভাবিককারণেই রাজনৈতিকভাবে প্রচণ্ড অস্থির একটি দেশ ইরিত্রিয়া। প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার সঙ্গে তিন দশক ধরে চলছে সংঘাত। ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীনতা লাভ করার পর ইথিওপিয়া পরিণত হয় একটি স্থলবেষ্টিত বা। সমুদ্রে সরাসরি প্রবেশপথ হারিয়ে ফেলে ইথিওপিয়া।
বাব আল-মান্দেবে ইরিত্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর হলো আসাব। ইরিত্রিয়ার ভয় যে, তাদের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আসাব দখল করার জন্য যুদ্ধের অজুহাত তৈরি করছে ইথিওপিয়া।
ইয়েমেনের পাশের আরেকটি দেশ হলো জিবুতি। এই দেশটিও রয়েছে কর্তৃত্ববাদী কঠোর শাসনের অধীনে। ভূরাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং সংবেদনশীল অবস্থান জিবুতির।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হওয়ায়, জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও ইতালি, এমনকি চীনও।
২০১৭ সালে জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে চীন। এটাই চীনের প্রথমবারের মতো কোনো বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি। ওই ঘটনার পর জিবুতি ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক টেনশন।
বাব আল-মান্দেবের পাশেই আরেকটি দেশ হলো সুদান। গত কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম মানবিক বিপর্যয় এবং ভয়াবহ এক গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
এবার নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন, ইয়েমেনের আশেপাশে কী চলছে। ইয়েমেনের স্থল প্রতিবেশীদের মধ্যে একদিকে জর্ডান এবং আরেকদিকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে সৌদি আরবের। হুথি সমস্যাকে আরো ব্যাপকতর করে তুলেছে এই সৌদি আরবই।
হুথিদের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু যেভাবে
হুথি মূলত ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন। তাদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। অর্থাৎ ‘আল্লাহর সমর্থক’। ‘হুথি’ নামটি এসেছে তাদের আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার নাম থেকে।
প্রতিষ্ঠাতা সেই ব্যক্তি হলেন হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথি। আসলে হুথি হলো তার বংশের নাম। বদরুদ্দিন আল-হুথির অনুসারীরাই এখন পরিচিত হুথি নামে। তারা অনুসরণ করে শিয়া ইসলামের জায়েদি মতবাদ।
জায়েদিরা এক সময় ছিলো ইয়েমেনের ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্রে। প্রায় এক হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে জায়েদি ইমামরা শাসন করেছিলো ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল। ১৯৬২ সালে প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের পর ক্ষমতা হারায় তারা।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ইয়েমেনের সব জায়েদি মুসলমান কিন্তু হুথি নয়। আবার সব হুথি সমর্থকও জায়েদি নয়। তার মানে হুথিদের সমর্থন না করলেই কেউ তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের বিরোধী হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এমনও নয়।
আবার ইরানের যে শিয়া মতবাদ রয়েছে, তার সঙ্গে ভিন্নতা রয়েছে ইয়েমেনের জায়েদি শিয়াদের মতবাদের। ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা ১২ ইমাম বা টুয়েলভার শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু জায়েদিদের বিশ্বাস অন্য কিছুতে।
তারমানে ইরানের শিয়া ও হুথি শিয়ারা এক সময়। তাই হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় ঐক্য দিয়ে ব্যাখ্যা কলে ভুল হবে। এখানে রয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামরিক সহযোগিতার হিসাব।
হাজার বছরের শাসন ক্ষমতা হারানোরে পর, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, জয়েদিরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনে ভিত্তি গড়ে ওঠে ইয়েমেনে জায়েদি ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের। সেখান থেকেই শুরু হুথিদের আন্দোলন।
প্রথমদিকে তাদের সমর্থকদের একটি অংশের ধারণা ছিলো, রাষ্ট্রীয় নীতি ও ধর্মীয় বিরূপ প্রচারের কারণেই দুর্বল হয়ে পড়েছে জায়েদিদের ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হুথিদের আন্দোলন ছাড়িয়ে যায় ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি এবং গত দেড় দশকে তা পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতার বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ে।
তার মানে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হুথিদের আন্দোলন ভূমিষ্ঠ হয়েছিলো ইরানের প্রক্সি বাহিনী হিসেবে নয়। ইয়েমেনের নিজস্ব পরিস্থিতি থেকেই উত্থান হয় তাদের। কিন্তু পরে এসে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ইরানের সঙ্গে এবং হুথি আর ইরান, এখন তারা একে অপরের সঙ্গে জড়িত ওতপ্রোতভাবে।
ধর্মীয় নেতা হিসাবে জায়েদিদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ছিলো হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনি ছিলেন ইয়েমেনের একজন সংসদ সদস্য। একাধারে রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় নেতা। তখনকার স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট সালেহর কাছ থেকে পেতেন রাজনৈতিক সুবিধা।
সালেহ- হুথি সম্পর্ক ভালোই এগোলেও টেকসই হয়নি খুব বেশিদিন। হুথির ধারণা ছিলো, প্রেসিডেন্ট সালেহ অতিরিক্ত সৌদি ঘেঁষা। আর সৌদি রাজপরিবারের নীতির সঙ্গে হুথিদের রয়েছে ঐতিহাসিক বিরোধ।
তাই হুসেইন আল-হুথি কড়া ভাষায় সমালোচনা শুরু করেন প্রেসডিন্ট সালেহর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের। বিরোধ চলে আসে প্রকাশ্যে। প্রেসিডেন্ট সালেহও বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হতে পারেন আল-হুথি।
রাজনৈতিক এই চ্যালেঞ্জে ক্ষুব্ধ হয়ে ২০০০ সালে হুসেইন আল-হুথির সব ধরনের সরকারি ফান্ড ও আর্থিক অনুদান বন্ধ করে দেন সালেহ। আর তহবিল বন্ধের সেই ক্ষোভেই ব্যাপকভাবে উগড়ে পড়ে এক বছর পরের একটি ইস্যুতে।
২০০১ সালের নাইন ইলেভেনে সন্ত্রাসী হামলা হয় ম্যানহাটনের টুইন টাওয়ারে হামলা। আমেরিকা ঘোষণা করে 'সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ'। সেই যুদ্ধে সমর্থন ও সহযোগিতা দেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট সালেহ। তিনি সিআইএ এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইয়েমেনের ভেতরের আল-কায়েদা দমনের অনুমতি দেন।
এই ঘটনাকে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসাবে আখ্যায়িত করেন হুসেইন আল-হুথি। তিনি প্রচার চালাতে শুরু করেন যে, আমেরিকার কাছে ইয়েমেনকে বিক্রি করে দিয়েছেন সালেহ।
আমেরিকার প্রতি সালেহর সমর্থনের প্রতিবাদে নিজস্ব অনুসারীদের নিয়ে উত্তর ইয়েমেনের মসজিদ ও রাজপথগুলোতে প্রকাশ্য বিক্ষোভ শুরু করেন হুসেইন আল-হুথি। খেপিয়ে তোলেন তার অনুসারী ও জায়েদি সম্প্রদায়কে।
ওই সময়ই তিনি তৈরি করেন হুথিদের নানা স্লোগান, যা পরিচিত হয় 'সারখাহ' নামে। ওইসব স্লোগানের মধ্যে ছিলো- "আল্লাহু আকবার, আমেরিকার ধ্বংস হোক, ইসরায়েলের ধ্বংস হোক, ইহুদিদের ওপর লানত, ইসলামের জয় হোক।"
হুসেইন আল-হুথির বিভিন্ন উসকানিমূলক ধর্মীয় বক্তব্য ক্যাসেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইয়েমেনে। তিনি প্রেসিডেন্ট সালেহকে আখ্যায়িত করেন আমেরিকার পাপেট বা পুতুল এবং সুন্নি মতবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে। প্রেসিডেন্ট সালেহ যে, জায়েদি শিয়াদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি, সেসব বক্তব্যও ছড়াতে থাকেন আল-হুথি।
২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনাও পুঁজি করেন আল-হুথি। সালেহর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভে ফেটে পড়ে জায়েদিরা। রাজধানী সানার বড় বড় মসজিদে প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া শুরু করে হুথি সমর্থকরা।
উত্তর ইয়েমেনের সাদা প্রদেশ হুলো জায়েদি বা হুথিদের নিজস্ব এলাকা। হুসেইন আল-হুথি যখন প্রেসিডেন্ট সালেহর বিরোধিতা করছিলেন, তখনই তলে তলে আরেকটি কাজ করেন তিনি। সাদাতে গড়ে তোলেন নিজের একটি সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থা ও সশস্ত্র বাহিনী।
হুথির অনুসারীরা যখন বেশকিছুটা গুছিয়ে নিয়েছেন, তখন তা জানতে পারেন প্রেসিডেন্ট সালেহ। ২০০৪ সালে সালেহ খবর পান, হুথির সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে এবং বিপদ কড়া নাড়ছে তার ঘাড়ের ওপর।
আল-হুথির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেন সালেহ। তার বিরুদ্ধে আনা হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ। জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। সাদা প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে আল-হুথিকে খতম করতে পাঠানো হয় সেনাবাহিনীর দক্ষ ও চৌকস সদস্যদের।
ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে এটাই ছিলো হুথিদের প্রথম আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের শুরু। ২০০৪ সালে হুসেইন আল-হুথির বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর, ওই বছরই হত্যা করা হয় তাকে।
প্রেসিডেন্ট সালেহ ভেবেছিলেন, বিপদ কাটিয়ে উঠবেন তিনি। কিন্তু ভাবনায় ভুল ছিলো। আল-হুথির মৃত্যুতে শেষ হয় না জায়েদিদের মুভমেন্ট। বরং আরো সংগঠিত হয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানতে থাকে আল-হুথির অনুসারীরা।
দৃশ্যপট বদলে দিলো আরব বসন্ত
হুসেইন আল-হুথির ছোট ভাই হলেন আব্দুল মালিক আল-হুথি। ভাইয়ের মৃত্যুর পর আন্দোলনের নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। তার নেতৃত্বেই একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহী শক্তি থেকে হুথিরা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক সক্ষমতার আঞ্চলিক প্রভাবশালী সংগঠনে।
ইয়েমেনের শাসক সালেহ শুরুতে চেয়েছিলেন হুথিদের দমন করতে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে হুথি ও সরকারের মধ্যে যুদ্ধ হয় দফায় দফায়। সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে সালেহর মিত্র সৌদি সরকার।
২০০৯ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চলাকালে সীমান্ত অতিক্রম করে সৌদি আরবে হামলা চালায় হুথিরা। পালটা সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি বাহিনীও।
ওই ঘটনা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ, তারপর হুথি আন্দোলন শুধু আর ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় হিসাবে বিবেচ্য থাকে না। প্রতিবেশী সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হয় তারা।
২০১০ সালে হুথিদের সঙ্গে সাময়িক একটি যুদ্ধবিরতি হয় ইয়েমেনের সালেহ সরকারের। কিন্তু সেখানে মীমাংসা হয় না সংঘাতের মূল কারণগুলো। তারপরও কিছুদিন সংঘাত এড়াতে পেরেছিলো দুই পক্ষই।
এরপর আসে ২০১১ সাল। শুরু হয় একাধিক মহাদেশ কাঁপানো গণআন্দোলন আরব বসন্ত। দেশে দেশে পতন ঘটতে থাকে স্বৈরশাসক ও একনায়কদের।
আরব বসন্তের ঢেউ আঁছড়ে পড়ে ইয়েমেনেও। শুরু হয় সালেহবিরোধী গণবিক্ষোভ। আগে থেকেই হুথিরা ছিলেন সরব। তাদের যুক্ত হয় আরো কয়েকটি পক্ষ। ক্ষমতার ভিত নড়ে যায় সালেহর। তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের একটি অংশ হাত মেলায় হুথিদের সঙ্গে। বিপুল উদ্যমে চাঙ্গা হয়ে ওঠে হুথিরা।
সালেহর সমর্থকদের নিয়ে গড়ে ওঠা অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক জোটই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে হুথিদের উত্থানে।
২০১১ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট সালেহ। দীর্ঘদিন ধরে তারই ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্দ রাব্বুহ মনসুর হাদি। তার কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেন সালেহ।
কিন্তু হাদি ছিলেন ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির শাসক। তার সরকারের সামনে আরো ছিলো অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিরোধ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার সংকট।
হুথিদের সানা দখল
এই পরিস্থিতির পুরো সুযোগ নেয় হুথিরা। বাড়তে শুরু করে নিজেদের সমর্থন। তখন তারা শুধু জায়েদি জনগোষ্ঠীর দাবির কথাই বলছিলো না। রাজনৈতিক প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ এবং জ্বালানির দামসহ জনজীবনের বিভিন্ন ইস্যুকে।
এর ফলে হুথিদের সমর্থন বাড়তে থাকে। তাদের পক্ষে শক্তিশালী হতে থাকে জনমত এবং আরো দুর্বল হতে থাকে সরকার।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আকস্মিক হামলা চালিয়ে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুথিরা। কেন্দ্র দখলের পর প্রথমে তারা বলেছিলো রাজনৈতিক সমঝোতার কথা। কিন্তু পরে সুর পালটে ফেলে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকে হুথিরা।
২০১৫ সালের জানুয়ারির ঘটনা। কার্যত ভেঙে পড়ে প্রেসিডেন্ট হাদির সরকার। হাদি চলে যান দক্ষিণের বন্দর শহর এডেনে। চেষ্টা চালান আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে আবারও নিজের সরকার প্রতিষ্ঠার। এই সময়ই নতুন রূপ নেয় ইয়েমেনের সংঘাত।
একদিকে হুথিরা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হাদির সরকারের সমর্থকেরা। সৌদি আরব সমর্থন জানায় এবং একাধিক দেশ নিয়ে গঠন করে নতুন জোট।
২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে হুথিদের বিরুদ্ধে। পালটা আঘাত হানে হুথিরাও। হাদির প্রাসাদ গুড়িয়ে দেয়।
সৌদি আরবের লক্ষ্য ছিলো হুথিদের অগ্রযাত্রা থামানো। একইসঙ্গে পুনরুদ্ধার করা হাদি সরকারের অবস্থান। কিন্তু বিমান হামলা চালিয়েও সৌদি আরব ভাঙতে পারেনি হুথিদের ক্ষমতার কাঠামো। বরং দীর্ঘ যুদ্ধ, অবরোধ, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।
চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটিতে তৈরি হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ও নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ইয়েমেন নিয়ন্ত্রণ করে না হুথিরা। তারা মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ এবং রাজধানী সানা। কিন্তু এই অঞ্চলটিতেই বসবাস করে দেশটির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ। বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌ প্রণালি পড়েছে এই অংশে।
সালেহর হাত মেলানো, বেইমানি ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড
এর মধ্যেই ঘটে আরেকটি ঘটনা। আলি আবদুল্লাহ সালেহ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ছাড়লেও তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালের খেলোয়াড়। ২০১৪ সালে হুথিদের সাথে হাত মেলান।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে বিমান হামলা শুরু করলে, হুথিদের সাথে জোট গঠনের প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন সালেহ। এর কারণও ছিলো। ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট হাদির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন সালেহ।
হুথিদের সাথে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় আসেন তিনি। এরপর নিজের অনুগত নিয়মিত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সঁপে দেন হুথিদের হাতে। এই যৌথ শক্তির জোরেই ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খুব সহজে রাজধানী সানা দখল করেছিলো হুথিরা।
২০১৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সালেহর অনুসারী ও হুথিরা মিলে যৌথভাবে গঠন করেন 'সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিল' বা এসপিসি। এটি ছিলো সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিষদ। এর মাধ্যমে উত্তর ইয়েমেনে চালু হয় সমান্তরাল একটি সরকার।
কিন্তু হুথিদের সঙ্গে স্থায়ী হয়নি সালেহর জোট। কারণ, এই জোট গড়ে উঠেছিলো কেবল মাত্র স্বার্থের ভিত্তিতে। সেখানে ছিলো না কোনো আদর্শিক ঐক্য।
২০১৭ সালের ২রা ডিসেম্বর হঠাৎ করেই হুথিদের সাথে জোট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন সালেহ। এবং আবারো হাত মেলান সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সাথে। কিন্তু ওই ই ঘটনাকে হুথিরা গণ্য করে চরম "বিশ্বাসঘাতকতা" হিসাবে।
সালেহর অবস্থান বদলের পর মুহূর্তেই সানার রাজপথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় হুথি ও সালেহর অনুগত বাহিনীর মধ্যে। মাত্র দুই দিনের মধ্যে হুথিরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় সানার এবং সালেহর নিজস্ব বাসভবন উড়িয়ে দেয়।
প্রাণ বাঁচাতে অনুগত কর্মকর্তাদের সঙ্গে গাড়িবহর নিয়ে সানা থেকে পালিয়ে যান। রওনা হন জন্মভূমি সানহান অঞ্চলের দিকে। কিন্তু সালেহ অতিক্রম করতে পারেন মাত্র ৪০ কিলোমিটার পথ। জাহার সায়ান নামের একটি এলাকায় তার কনভয় ঘিরে ফেলে হুথিদের একটি বিশেষ দল।
প্রথমে রকেট চালিত গ্রেনেড (আরপিজি) মেরে থামিয়ে ফেলা হয় সালেহর বুলেটপ্রুফ গাড়ি। এরপর তাকে নামানো হয় গাড়ি থেকে। খুব কাছ থেকে সাহের মাথায় ও বুকে উপর্যুপরি গুলি চালানো হয় স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইয়েমেনের ৩৪ বছরের সাবেক শাসক।
আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মদত ও ইরান
এদিকে হুথিদের সঙ্গে সৌদি জোটের লড়াইয়ের মাত্রা যতই বাড়াতে থাকে, ততই স্পষ্ট হতে থাকে ইরানের সম্পৃক্ততার বিষয়। কারণ, পরিষ্কারভাবে একটা প্রশ্নই সামনে চলে আসে। তা হলো- এত শক্তি ও অস্ত্র কোথা থেকে পাচ্ছে হুথিরা?
ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক নিয়ে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগ নতুন নয়। সৌদির অভিযোগ, হুথিদের অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে ইরান এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের তারা ব্যবহার করতে চাচ্ছে নিজেদের উপগ্রহ হিসাবে।
একইসঙ্গে সৌদি আরো অভিযোগ করছে যে, ইয়েমেনের যুদ্ধকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিচ্ছে ইরান। অবশ্য হুথিদের অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে ইরান।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা বিভিন্ন সময়ে আটক করেছে অস্ত্রের চালান, ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান এবং সামরিক প্রযুক্তি।
সেসব বিশ্লেষণ করে তারা দাবি করে আসছে যে, ওইসব অস্ত্রের উৎস হলো ইরান এবং সেসব আলামতকে ইরানের সাথে হুথিদের সম্পর্কের প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।
যদি এই দাবি সত্য হয়, তাহলে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, হুথিরা কি পরিচালিত হয় ইরানের নির্দেশে?
অবশ্য এই উত্তর পেতে হলে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমত, হুথিরা যে ইরানের সমর্থন পাবে, সেই ধারণা বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, আবার এটাও ঠিক যে, ইরানের সমর্থন থাকার অর্থ এই নয় যে, হুথিরা ইরানের প্রতিটি নির্দেশই মেনে চলবে এবং কাজ করবে তাদের সব স্বার্থের অনুকূলে।
ইরানের আঞ্চলিক কৌশলের একটি অংশ হলো আমেরিকা, ইসরায়েল ও সৌদি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং তাদের সহায়তা করা। এটাকে বলা হচ্ছে- অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধের অক্ষ।
ইসরায়েল, আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের শত্রু দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেশে দেশে বিভিন্ন বাহিনীকে প্রক্সি দিচ্ছে ইরান। লেবাননে হেজবুল্লাহ, প্যালেস্টাইনের হামাস, ইরাক-সিরিয়াতে একাধিক বাহিনী পরিচালনা করে তারা।
ওইসব সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চ্যালেঞ্জ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের প্রভাবকে। এই কারণেই হেজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে দেখা হয় তাদের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসাবেই।
হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্ত ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ইরানের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সমুদ্রপথে আঘাত হানার অস্ত্র এবং এসব ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সহায়তার ফলে হুথিদের সামরিক শক্তি বেড়েছে।
তবে ইরানের সহায়তার পাশাপাশি হুথিদের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি। হুথি বাহিনীর বর্তমান নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা আনুমানিক সাড়ে তিন লাখ।
হুথিরা এখন প্রবেশ করেছে ইয়েমেনের ক্ষমতার কেন্দ্রে। নিয়ন্ত্রিত করে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসন এবং কাজ করে নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও।
তাই হুথিদের কেবল ইরানের হাতের পুতুল হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না।
এখানে রয়েছে আরেকটি বিষয়। ইরান ও হুথিদের ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে মিল থাকলেও তারা একই মতবাদের অনুসারী নয়। তাই ধর্মের থেকেও তাদের সবচেয়ে বড় মিলের জায়গা হলো অভিন্ন প্রতিপক্ষ, আঞ্চলিক কৌশল এবং সামরিক সহযোগিতা।
হুথিদের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারে ইরান। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির শক্তি বাড়াতে পারে হুথিরা।
তার মানে এই সম্পর্ক ‘প্রভু ও অনুগত বাহিনী’ হিসাবে নয়। তাদের সম্পর্ক দেখা যেতে পারে অসম শক্তি ও অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত অংশীদারিত্ব হিসাবে।
হুথিরা কী চায়
হুথিরা এখন আর বন্দি থাকতে চায় না শুধু মাত্র উত্তরাঞ্চলের একটি স্বায়ত্তশাসিত আন্দোলনের মধ্যে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ইয়েমেনের ক্ষমতায় নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা। পুরো ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থায় কর্তৃত্ব স্থাপন করা। কারণ, ইয়েমেন হলো খনিজ সম্পদ ভরপুর।
ইয়েমেনের প্রমাণিত খনিজ তেলের মজুত প্রায় ৩০০ কোটি ব্যারেল। এই সম্পদের বেশিরভাগই রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মাসিলা অববাহিকা এবং মারিব-জাওফ অঞ্চলে। দেশটিতে প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে ইয়েমেনে প্রায় ১৪ থেকে ১৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বালহাফ এলএনজি প্ল্যান্টের মাধ্যমে একসময় রপ্তানি করা হতো এই গ্যাস।
ইয়েমেনে আরো রয়েছে সোনা ও রুপার ভাণ্ডার। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের ৫০টিরও জায়গায় মিলেছে সোনার সন্ধান। এর মধ্যে মেদদেন হলো অন্যতম বড় সোনার খনি। সেখানে আনুমানিক ৬ লক্ষ ৭৮ হাজার টন সোনা মিশ্রিত আকরিক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু ইয়েমেনে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের মজুত সত্ত্বেও বেশিরভাগ অংশই এখনও রয়েছে মাটির নিচে। মানে অব্যবহৃত পড়ে আছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বিপুল মূল্যের খনিজ সম্পদ।
হুথিদের লক্ষ্য এখন এখানেও। ইয়েমেনের তেল-গ্যাসের রাজস্ব, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বন্দর, আমদানি-রপ্তানি এবং সরকারি রাজস্বের বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বিরোধ।
তবে হুথিদের কাছে এসব অর্থনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি রয়েছে নিজেদের প্রশাসন ও সামরিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার প্রশ্নও। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের অবসান চায় হুথিরা। নিজেদের ওপর বিভিন্ন অবরোধ ও বিধিনিষেধ শিথিল চায় এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের স্বীকৃতির দাবি তুলে আসছে তারা।
হুথিদের আরেকটি লক্ষ্য হলো- আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো। প্রয়োজনে সেটা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে হলেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতা, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের ঘোষণা এবং লোহিত সাগরে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে এই নিজেদের হাজির করছে তারা।
তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের নামে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং সামরিক সংঘাত বাড়ানোর যে দায় হুথিদের ওপর পড়ছে, তা কীভাবে এড়াবে তারা?
হুথিদের বক্তব্য, তাদের অভিযান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষ হত্যা করা হচ্ছে এবং নাবিক ও সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা তৈরি করা হচ্ছে ঝুঁকি। এর দায় কি এড়াতে পারবে হুথি বিদ্রোহীরা?
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা ঘটেছে। কৌশলগত নৌপথ বাব আল-মান্দেব ঘিরে নতুন লড়াই। লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে হুথিরা।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় হুথিরা। এরমধ্যে রয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা। মোখা ও ধুবাব বন্দর। বৈশ্বিক নৌ-পথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই উপকূলীয় শহর ও বন্দরগুলো।
কৌশলগত দুইটি স্থাপনাই দখল করে হুথিরা। পেরিম বা মায়্যুন দ্বীপের অবস্থান বাব আল-মান্দেব প্রণালির ঠিক মাঝখানে। এই সামরিক দ্বীপটিরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথিরা। এতে ওই জলপথের ওপর নজরদারি ও জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চূড়ান্ত সক্ষমতা পেয়েছে হুথিরা।
হুথিদের এই বিশাল অগ্রযাত্রার হুমকির মুখে পড়েছে বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি সরবরাহে। গত কয়েকদিনে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ছাড়িয়েছে ১০০ ডলার।
হুথিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় পালটা অভিযান শুরু করেছে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী। নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’।
অক্টোবরে শুরুতেই সৌদির নেতৃত্বে হুথিবিরোধী অভিযানের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সৌদি বিমানবাহিনীর জোরালো সহায়তায় এতে অংশ নিয়েছে সরকারি বাহিনী এবং সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেড।
গত ৫ই অক্টোবর সরকারি বাহিনী দাবি করে যে, তারা বিদ্যুৎগতির এক অভিযান চালিয়ে হুথিদের হটিয়ে পুনর্নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে কৌশলগত মোখা বন্দর, ধুবাব এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির চারপাশের মূল পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে। তবে সরকারি বাহিনীর এই দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা।
তবে বাব আল-মান্দেবের দখল নিয়ে প্রবল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে দুই পক্ষ। হুথিরা তাদের দখল করা কিছু উপকূলীয় অবস্থান থেকে কিছুটা পিছু হটে পেছনের পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে অবস্থান নিয়েছে। একের পর এক হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সৌদি আরব।
বাংলাদেশে প্রভাব
হুথিদের সংঘাতের প্রভাব কীভাবে পড়তে পারে বাংলাদেশে? বাংলাদেশ থেকে ইয়েমেনের দূরত্ব অনেক। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের পথগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের অস্থিরতা প্রভাব ফেলতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও।
বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রথম উদ্বেগ হলো পণ্য পরিবহনের খরচ। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও পণ্যের দাম। আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হলে জ্বালানি বাজারে দামের ওঠানামা বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য সময় ও ব্যয়ের অনিশ্চয়তা। পণ্য পরিবহনের রুট বদলালে শুধু জাহাজভাড়া নয়, বিমা, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর সময়ও প্রভাবিত হতে পারে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক সংঘাতের মানবিক প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কনস্যুলার সহায়তার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সুতরাং, হুথিদের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য শুধু দূরের একটি যুদ্ধের খবর নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রপ্তানি, আমদানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষার প্রশ্ন।
হুথিদের ভবিষ্যৎ কী
এখন প্রশ্ন হলো হুথিদের ভবিষ্যৎ কী? তারা কি ইয়েমেনের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে?
এখানে কয়েকটি সম্ভাবনা দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে এবং সামরিক চাপের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে রাজনৈতিক দর-কষাকষির শক্তি হিসাবে।
অতীতের দেখা গেছে, দীর্ঘ সামরিক অভিযানও তাদের দ্রুত পরাজিত করতে পারেনি।
সৌদি আরব-সমর্থিত বাহিনীর অভিযান তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড সংকুচিত করতে পারে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেবের মতো কৌশলগত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারালে তাদের আন্তর্জাতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা কমতে পারে।
আর সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আরো বাড়তে পারে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। এছাড়া রাজনৈতিক সমঝোতার পথও পুরোপুরি বন্ধ নয়।
ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সামরিক বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছু দাবি করে। ক্ষমতা ভাগাভাগি, নিরাপত্তা, রাজস্ব বণ্টন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে সমঝোতা ছাড়া স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন।
তবে এসব সম্ভাবনার কোনটি বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য, সৌদি আরবের অবস্থান, ইরানের ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
হুথিরা কি শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের ক্ষমতার স্থায়ী অংশ হয়ে থাকবে? নাকি তাদের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাদেরকে ঠেলে দেবে আরো বড় সংঘাতের দিকে? নাকি হুথিরা শেষ হয়ে বিপক্ষ বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরগুলোই নির্ধারণ করবে ইয়েমেন ও হুথিদের ভবিষ্যৎ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়।
বিষয়: