সংবাদ বিশ্লেষণ

তেহরান কি হুথিদের থামাতে পারবে

এক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলা চলছে। এর মধ্যেই সৌদি ও হুথিদের মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। অথচ হুথিদের অস্ত্র ও সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেই। বিশ্লেষকরা এর নানা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তাদের অনেকে এটাও বলছেন তেহরান যা দিতে চাইছে তা দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে কি-না, তা স্পষ্ট না।

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম

সৌদি আরবের ওপর হুথিদের বাড়তে থাকা হামলার মাঝেই রিয়াদের কাছে মধ্যস্থতার প্রস্তাব এসেছে তেহরানের কাছ থেকে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদকে রবিবার ফোন করে এই প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম। যা সংঘাতের তীব্রতার বাড়ার পর দুই দেশের মধ্যে প্রথম প্রকাশ্য যোগাযোগ। কিন্তু হুথিরা আদৌ ইরানের কথায় থামবে কি-না তা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা নিশ্চিত নন।

জিভি ওয়্যারে প্রকাশিত একটি সিন্ডিকেটেড রিপোর্ট বলছে, মার্কিন-ইসরায়েলের সাথে ইরানের সংঘাত শুরুর পর কোন উপসাগরীয় দেশে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার একদিন পর এই ফোনকলটি এসেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, আরাঘচি বলেছেন রাজনৈতিক সমাধান এড়িয়ে সামরিক পথে গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। সৌদি আরব আর ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে তেহরান প্রস্তুত এ কথাও জানিয়েছেন।

তবে এই প্রস্তাব কাজ করবে কি-না তা নির্ভর করছে হুথিদের উপর। আর তাদের উপর তেহরানের প্রভাব ঠিক কতটা তা নিয়ে একমত নন বিশ্লেষকরা।

তার আগে যে প্রশ্নটা ওঠে তা হলো, যে ইরানের বিরুদ্ধে হুথিদের অস্ত্র ও সমর্থন জোগানোর অভিযোগ অনেক দিনের, তারা হঠাৎ কেন ‘পিস ব্রোকার’ হতে চাচ্ছে? আর এমন সময়েই বা কেন যখন ইরান নিজেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে?

সামরিক দায়কে কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত করা

সবচেয়ে বেশি যে ব্যাখ্যাটা শোনা যাচ্ছে তা হলো, ইয়েমেনের সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইরান কূটনৈতিকভাবে লাভবান হতে চাচ্ছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রেইগ আল-জাজিরাকে বলেছেন, তেহরানের লক্ষ্য ‘সামরিক বোঝাকে কূটনৈতিক সম্পদে’ পরিণত করা। তার ভাষ্য, তাইজ আর বাব আল-মান্দেবের আশেপাশের হুথিদের দখলে নেওয়া এলাকা ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদিরা। আর ইরান তা দেখছে। যে সংকট টিকিয়ে রাখতে তাদের হাত আছে, সেই সংকটে এখন দেশটি নিজেকে একটি পক্ষ হিসবে হাজির করতে চাচ্ছে।

তবে ইরান শুধু ইয়েমেনের মীমাংসা চায় না, তার চাওয়া আরো বেশি। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মর্তজাভির মতে, তেহরানের আসল লক্ষ্য হলো তার ও তার মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়া যাতে ‘মিলিটারি ক্যাম্পেইন’ বন্ধ হয়। আর তা করতে হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ছাড়াও ইয়েমেন, লেবাননসহ একাধিক ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ করতে হবে।

“আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো ব্যাপার আসলে ভাগাভাগি করে নেওয়া যায় না। ইরান ও তার মিত্ররা যতদিন চাপে থাকবে, সৌদি আরবও হামলা থেকে নিরাপদ থাকবে না,” আল-জাজিরাকে বলেছেন তিনি।

এরপর আছে অর্থনীতির বিষয়। মার্কিন অবরোধের কারণে চাপে আছে ইরান। উপসাগরীয় দেশগুলোও তাদের তেল রপ্তানি আগের পরিমাণে ফিরিয়ে নিতে পারছে।

কিংস কলেজের বিশ্লেষক ক্রেইগ বলছেন, রিয়াদকে ইয়েমেন থেকে বের হওয়ার পথ দেখাতে পারলে হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা অপসারণ আর আঞ্চলিক নিরাপত্তার কাঠামো নিয়ে দরকষাকষিতে তেহরান বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।

তার মতে, ওয়াশিংটনের উপর ভরসা করা নিয়ে রিয়াদের অস্বস্তি রয়েছে। ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ না করা নিয়ে সৌদিরা হতাশ। আরেকবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপর ভরসা করতেও তারা রাজি না। ইরান এটাকে একটা সুযোগ হিসাবে দেখছে যাতে সৌদিদের বোঝানো যায় যে তেহরান এমন কিছু দিতে পারে যা, তার পুরানো অংশীদাররা দিতে পারেনি।

সৌদিদের এই হতাশার কারণও রয়েছে। সিবিএস নিউজ মঙ্গলবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়ে সৌদিদের অনুরোধের সাড়া এখনও মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে অবগত এমন দুইটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সিবিএস বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে হুথিদের উপর হামলায় সৌদিদের সাথে যোগ দিতে ক্রাউন প্রিন্স মোহম্মদ বিন সালমানের অনুরোধ নাকচ করে দেন ডনাল্ড ট্রাম্প। সাম্প্রতিক হামলার পর রবিবার যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি-না জানতে চাইলে, ট্রাম্প বলেছেন, “হতে পারে।”

ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ শেষ না হলে এই হুমকি কমার সম্ভাবনা কম আর যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ, কারণ ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির শর্ত তেহরান মেনে নেয়নি।

আসলেই কি শান্তির প্রস্তাব

এসব ব্যাখ্যার সাথে আরো একটি ধারণার কথা আসছে, যা হলো হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা তেহরানের সাথে সমন্বয় করেই হয়েছে। প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্দ্রিউ হুদিস্তেয়ানোর মতে, এসব হামলার পেছনে ইরানের হাত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। “ইরানের আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনই এসব। তারা নিজেরা ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হতে চায় আর তাই নিজের প্রক্সি কাজে লাগাতে চাচ্ছে”, আল-জাজিরাকে বলেছেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্যও কাছাকাছি। তার ট্রুথ সোশালের পোস্টে তিনি বলেছেন ‘সম্ভবত ইরানের নির্দেশে’ হুথিরা আবার সক্রিয় হয়েছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তারা ইচ্ছা করেই তেলের দাম বাড়াতে চাইছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

ইরানের কি সাধ্য আছে

বিশ্লেষকরা এও বলছেন, হুথিরা এখন আর ইরানের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা প্রক্সি না। তাদের নেতৃত্বের নিজস্ব উচ্চাকাঙ্খা আছে। সম্প্রতি দখল নেওয়া এলাকাকে তারা দর কষাকষির জন্য কাজে লাগাতে পারবে বলে মনে করছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের আন্দ্রেয়াস ক্রেইগের মতে, বাব আল-মান্দেবের আশেপাশের এলাকার দখল ছাড়তে হুথিদেরকে আদেশ দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই তেহরান।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইয়োয়েল গুজানস্কিকে উদ্ধৃত করে সিবিএস রবিবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, হুথিরা ক্রমেই ইরানের রিজিওনাল স্ট্র্যাটেজিতে অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

“সৌদি আরব, ইসরায়েল আর জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিতে ফেলার হুমকি দিতে এটি একটি তুলনামূলক সস্তা ও টেকসই উপায়। তবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে হুথিদের যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়ে গেছে,” তিনি বলেছেন।

সিবিএস’র ওই প্রতিবেদনে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) ফ্যাবিয়ান হিনৎসের গত বছরের একটি লেখার উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, প্রযুক্তি ও উন্নত সক্ষমতার জন্য হুথিরা এখনো ইরানের ওপর নির্ভরশীল।

সংঘাতের শুরুতে এপি’কে চ্যাথাম হাউসের ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেছিলেন, হুথিরা একটা স্থানীয় গোষ্ঠী যাদের ইরান সমর্থন দেয়, ব্যবহারও করে। কিন্তু তাদের তৈরি করেনি।

চলতি সপ্তাহে জিভি ওয়্যারে প্রকাশিত সিন্ডিকেটেড রিপোর্টেও বলা হয়েছে, বিশ্লেষকরা অনেক দিন ধরেই ইরানের মিত্রদের মধ্যে হুথিদের ‘সবচেয়ে স্বাধীন’ বলে অভিহিত করে আসছেন। তাদের চাওয়া তেহরান থেকে অনেকটাই আলাদা।

তবে হুথিদের চাওয়া যেকোন ধরনের সমঝোতার উদ্যোগকে কঠিন করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রিস্ক অ্যাডভাইজরি প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের প্রতিষ্ঠাতা মোহম্মদ আল-বাশা সিবিএসকে বলেছেন, হুথিদের আসল লক্ষ্য প্রতিশোধ না, তারা ক্ষমতা ও স্বীকৃতি চায়, তথা পুরো ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ এবং সৌদি আরবের স্বীকৃতি ও অর্থায়ন।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি অবশ্য হামলাগুলোকে ‘সৌদি আগ্রাসনের’ জবাব বলছেন।

সিএনএন জানিয়েছে হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহম্মদ আল-বুখাইতি সোমবার দাবি করেছেন, রিয়াদ মধ্যস্থতা মেনে নিয়েছে, তবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে হুথিরা সাড়া দেয়নি।

তেহরানের প্রস্তাবে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের কীভাবে দেখছে

সৌদিরা এখনও প্রায় চুপ। জিভি ওয়্যারের প্রতিবেদন বলছে, ফোনকলের কথা সৌদিরা নিশ্চিত করেছে, কিন্তু মধ্যস্থতার প্রস্তাবে কিছু বলেনি।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা ধরেই নিয়েছে রিয়াদ কোনো সাড়া দিবে না। একই প্রতিবেদনে সৌদি আরবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হুথিদের পালটা আঘাত করতে থাকার ক্ষমতা থাকার কারণে সৌদি নেতৃত্ব এখন দোটানায়।

একদিকে, সেই সক্ষমতা কমাতে হবে, আবার এখান থেকে বের হওয়ার একটা পথও ভাবতে হচ্ছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ শেষ না হলে এই হুমকি কমার সম্ভাবনা কম আর যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ, কারণ ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির শর্ত তেহরান মেনে নেয়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামনের পথগুলোও মসৃণ নয়। চ্যাথাম হাউসের টমাস জুনো সিবিএসকে বলেছেন, সৌদি-হুথি সংঘাতে সরাসরি জড়ালে লোহিত সাগরে উত্তেজনা বাড়বে, তেলের দামেও চাপ পড়বে।

আবার না জড়ালে মার্কিন সমর্থন না পাওয়ার কারণে সৌদি আরবের ক্ষোভ আরও বাড়বে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের নাদওয়া আল-দাওসারি সিবিএসকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে বিমান হামলায় সবচেয়ে বেশি ফল পাওয়া যাবে। তবে শুধু তাতে ‘হুথি হুমকি’ শেষ হবে না।

সিবিএসের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিনের মতে, মার্কিন অভিযান হলেও সম্ভবত কোন চূড়ান্ত ফল আসবে না। এএফপিকে আল-বুখাইতি বলেছেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসনে’ যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিলে হুথিরা এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে ‘দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব’ দিবে।

তাহলে কেন এই প্রস্তাব

এই প্রস্তাবে ইরানের একাধিক উদ্দেশ্য পূরণ হবে। প্রথমত, ইয়েমেনকে বোঝা থেকে দর কষাকষির হাতিয়ারে বদলে নেওয়া।

দ্বিতীয়ত, সৌদি নিরাপত্তার বিষয়টি বৃহৎ আঞ্চলিক সমঝোতার সাথে জুড়ে দেওয়া।

তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালি ও অর্থনৈতিক অবরোধের মতো বিষয়ে বাড়তি সুবিধা পাওয়া এবং সব শেষে, ওয়াশিংটনের উপর হতাশ রিয়াদকে কাছে টানা।

তবে যে দুইটি বিষয়ের উপর এগুলো নির্ভর করছে, তা একেবারেই তেহরানের হাতে নেই; আলোচনায় বসতে সৌদিদের আগ্রহ এবং সেই আলোচনা মানতে হুথিদের রাজী হওয়া।

[আল-জাজিরা, সিএনএন, সিবিএস, বিবিসি, জিভি ওয়্যার এবং ওয়াশিংটন পোস্ট অবলম্বনে]