রুশ কমান্ডের অধীনে কারা এই উক্রেইনীয় ‘স্বেচ্ছাসেবক’

উক্রেইনীয় ‘স্বেচ্ছাসেবক’দের নিয়ে একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের ঘোষণা দিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। তবে যুদ্ধবন্দি ও সাবেক সেনাসদস্যদের বক্তব্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

পাভলো অলিয়নিক, ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ ছিলেন উক্রেইন সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র লেফটেন্যান্ট। দোনবাস অঞ্চলে যুদ্ধের করতে গিয়ে ২০২৪ সালে রাশিয়ার হাতে বন্দি হন পাভলো। 

যুদ্ধবন্দি হিসাবে তাকে করা হয়েছিলো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেওয়া হয়েছিলো বৈদ্যুতিক শক। তাই তাকে যখন রাশিয়ার ‘মাকসিম ক্রিভোনিস’ ব্যাটালিয়নে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, প্রথম সুযোগেই তা লুফে নেন এই উক্রেইনীয় লেফটেন্যান্ট। 

অলিয়নিকের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার এই বাহিনীতে যোগ দিলেই তাকে সুযোগ করে দেবে উক্রেইন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পৌঁছানোর। যাতে পরবর্তীতে উক্রেইন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পালিয়ে যেতে পারেন পাভলো।

'উক্রেইনীয় স্বেচ্ছাসেবক' কারা?

উক্রেইনীয় যুদ্ধবন্দি এবং সাবেক সেনাসদস্যদের নিয়ে গঠিত এই রুশ যুদ্ধ ইউনিটের খবর প্রথম সামনে আসে ২০২২ সালে। শুরুতে কয়েকটি আলাদা দল গঠিত হলেও ২০২৬ সালের অগাস্টে সেগুলোকে একত্রিত করে ‘উক্রেইনিয়ান ভলান্টিয়ার স্পেশাল ফোর্স ব্রিগেড’ নামকরণ করা হয়। 

এর মধ্যে ‘মাকসিম ক্রিভোনিস’ ব্যাটালিয়নটি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। রুশ গণমাধ্যমের দাবি, এতে প্রায় ২০০ জন যোদ্ধা আছে। যদিও প্রাপ্ত ফুটেজে দেখা গেছে কয়েক ডজনের উপস্থিতি। উক্রেইনীয় পাবলিক ব্রডকাস্টার ‘সাসপিলনে’র একটি তদন্তকারী দল ৩০ জনেরও বেশি সদস্যকে শনাক্ত করেছে। গণমাধ্যমটি নিশ্চিত করেছে, তারা সবাই ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রুশ বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়া সাবেক উক্রেইনীয় সেনাসদস্য।

ইউক্রেনের পক্ষে লড়া রুশ লিজিয়নের ‘অনুকরণ’

সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালিসিসের রুশ বৈদেশিক নীতি ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ পাভেল লুজিনের মতে, এই ইউনিটগুলো উক্রেইনীয় সশস্ত্র বাহিনীর ‘রাশিয়ান ভলান্টিয়ার কর্পস’ এবং ‘ফ্রিডম অব রাশিয়া লিজিয়নে’র ‘অনুকরণ মাত্র’। এই ইউনিটগুলোতে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। সেখানে রুশ নাগরিকরা যুদ্ধ করছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। সংস্থাটি বলছে, মস্কোর এই উদ্যোগ মূলত এই ইউনিটগুলোর অস্তিত্ব থেকে মানুষের নজর ঘোরানোর একটি প্রচেষ্টা। উক্রেইনের গোয়েন্দা সংস্থাও একমত এই ধারণার সাথে।

অভিজ্ঞ সেনাসদস্য ও লেখক ইয়েভহেন শাইবালভ ডয়েচে ভেলেকে বলেন, ‘রাশিয়ার নাগরিকরা উক্রেইনের পক্ষে যুদ্ধ করবে আর উক্রেইনীয়রা রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করবে না। বিষয়টি তাদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল’। তিনি বলেন, উক্রেইনীয় বাহিনীতে রুশ স্বেচ্ছাসেবক ইউনিটগুলোর উপস্থিতিই ছিলো তাদের নিজস্ব বাহিনীতে উক্রেইনীয় ইউনিট গঠনের মূল কারণ।

এই নিয়োগ কি আদৌ স্বেচ্ছায়?

মুক্তিপ্রাপ্ত উক্রেইনীয় যুদ্ধবন্দিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় ২০২৫ সালে জানিয়েছিলো, উক্রেইনীয় যুদ্ধবন্দিদের ৯৫ শতাংশই শিকার হয়েছেন নির্যাতন বা দুর্ব্যবহারের।

বেসরকারি সংস্থা কমিশন ফর ইন্টারন্যাশনাল জিউইশ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটির নির্বাহী পরিচালক বিল উইলি বলেন, ফিরে আসা এই যোদ্ধাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা তাদের নিয়োগের স্বেচ্ছাধীন প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর সন্দেহের জন্ম দেয়। 

তবে কিভভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সেন্টার ফর সিভিল লিবার্টিজের মাইখাইল সাভভা ব্যাটালিয়নের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে বলেন, এগুলো ইঙ্গিত করে এই যোদ্ধারা স্বেচ্ছায় পক্ষ পরিবর্তন করেছিলেন।

তবে স্বেচ্ছায় এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিয়োগের মধ্যে রেখা টানবেন কোথায়? যুদ্ধাহত ও মানবাধিকার কর্মী ম্যাকসিম বুতকেভিচ নিজেও যুদ্ধবন্দি ছিলেন ২৮ মাস। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ম্যাকসিম বলেন, রুশ বন্দিদশার পরিবেশ এই সীমারেখা নির্ধারণ করা কঠিন করে তোলে। একদিকে ক্রমাগত চাপের পরিবেশ, অন্যদিকে কিছু বন্দির আদর্শগত নৈকট্যের কারণে দলত্যাগের সম্ভাবনাও ফেলে দেওয়া যায় না।

উক্রেইনীয় বন্দিদের কীভাবে বাধ্য করা হয়েছিল?

ম্যাকসিম বুতকেভিচ জানান, ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সব উক্রেইনীয় যুদ্ধবন্দিকে বারবার দেওয়া হয়েছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব। তার নিজের ক্ষেত্রেও এটি ঘটেছিল চরম নির্যাতনের পর।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখিয়েছিল যে তারা আমাদের সঙ্গে যেকোনো কিছু করতে পারে, আর সে কারণেই আমাদের রাজি হওয়া উচিত’।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান শাইবালভও। তিনি জানান, সব বন্দিকে প্রথমে জেরা করা হতো এবং পরবর্তীতে বলপ্রয়োগ করে নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হতো।

ম্যাকসিম বুতকেভিচও নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে দুই অভিজ্ঞ সেনাসদস্যই জানান, তারা স্বেচ্ছায় রুশ ইউনিটে যোগ দিতে ইচ্ছুক এমন কাউকে কখনো দেখেননি।

কী ঘটে নিয়োগের পর?

মাকসিম ক্রিভোনিস ব্যাটালিয়নের সেই পাভলো অলিয়নিক জানান, রুশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার একাধিক প্রস্তাব তিনি প্রথমে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পালানোর সুযোগ পাওয়ার জন্যই কেবল তিনি চতুর্থ প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেননি বলেও দাবি করেন। সামরিক পরিষেবা দেওয়া কোনো এক ব্যক্তির সাথে একটি ব্যক্তিগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ঘরে। যেখানে তাকে কিছু বক্তৃতা শোনানো হয় এবং ভিডিও ও ছবি দেখানো হয়, যা তাকে পরে আবার বলতে বলা হয়েছিল।

রাশিয়ার ‘মাকসিম ক্রিভোনিস’ ব্যাটালিয়নে যোগ দেওয়া পাভলো অলিয়নিক। পালানোর সুযোগ পেতে রাশিয়ার বাহিনীতে যোগ দেন যুদ্ধবন্দি এই লেফটেন্যান্ট।

নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতন

মাকসিম ক্রিভোনিস ব্যাটালিয়নের সহযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পক্ষ পরিবর্তন করেছিলেন বলে জানান অলিয়নিক। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়েছিলেন।

অলিয়নিক বলেন, ইউনিটে থাকা সাবেক উক্রেইনীয় যুদ্ধবন্দিদের ওপর রুশ বেসরকারি সামরিক কোম্পানির সৈন্যরা নজরদারি ও পাহারা দিতো। মারধর ও নির্যাতনও করতো।

পাভলো অলিয়নিককে মোতায়েনের কথা ছিলো উক্রেইনের দোনেৎস্ক অঞ্চলে। তার আগেই পালিয়ে যান তিনি। ড্রোন থেকে বাঁচতে দুই দিন বেজমেন্ট ও বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন এই লেফটেন্যান্ট। পরবর্তীতে সক্ষম হন উক্রেইনীয় যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

এখন উক্রেইনে আটক আছেন অলিয়নিক। তার বিরুদ্ধে চলছে রাষ্ট্রদ্রোহের সম্ভাব্য অভিযোগের তদন্ত। তবে এখনো তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। 

 

ডয়েচে ভেলে অবলম্বনে