যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের স্টাডি ভিসার আবেদন প্রত্যাহার বেড়েছে

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম

যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্টাডি ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশিদের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই হার ছিলো ৭ দশমিক ১ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।

তবে আবেদন প্রত্যাহারের অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাজ্য সরকার এসব শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিবেদন বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করলে বা শিক্ষার্থীকে স্পনসর করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলে অনেক ক্ষেত্রে ভিসার আবেদনও প্রত্যাহার হয়ে যায়।

বাংলাদেশিদের আবেদন ঠিক কী কী কারণে প্রত্যাহার হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

কেন বাড়ছে আবেদন প্রত্যাহার?

আবেদন প্রত্যাহারের পেছনে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য নতুন করে কঠোর ভিসা-সংক্রান্ত নিয়মের ভূমিকা আছে বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।

যুক্তরাজ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্পনসর করতে হয়। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীকে ভর্তির অনুমোদন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চিঠির মাধ্যমে জানায়, ওই শিক্ষার্থী সেখানে পড়তে আসছেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যুক্ত থাকে।

কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পনসর করা শিক্ষার্থীদের ভিসা বারবার প্রত্যাখ্যান হলে প্রতিষ্ঠানটিকেও জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। এ কারণে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করা আবেদনকারীদের ভর্তি প্রস্তাব আগেই প্রত্যাহার করছে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়।

গত ১লা জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের স্পনসর করা শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখতে হচ্ছে। আগে এই সীমা ছিলো ১০ শতাংশ।

এ ছাড়া স্পনসর করা শিক্ষার্থীদের অন্তত ৯৫ শতাংশের ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর কোর্স সম্পন্ন করার হার বজায় রাখতে হবে।

নির্ধারিত শর্ত বারবার পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। এমনকি বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় স্পনসর লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। এই লাইসেন্স হারালে বিশ্ববিদ্যালয়টি আর আগের মতো বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্পনসর করতে পারবে না।

আর ভিসার সিদ্ধান্ত আসার আগেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ‘কনফারমেশন অব অ্যাকসেপট্যান্স ফর স্টাডিজ’ বা সিএএস প্রত্যাহার করলে, সেটি ওই প্রতিষ্ঠানের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হিসাবের মধ্যে পড়ে না। সিএএস হলো শিক্ষার্থীকে ভর্তির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রয়োজনীয় অনুমোদন, যা স্টাডি ভিসার আবেদনে লাগে।

ফলে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আগেভাগেই ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করছে বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।

পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীরাও চাপে

বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের আবেদনের ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ার শিক্ষার্থীদের আবেদনের ২২ দশমিক ৭ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিলো ৫ দশমিক ২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কিছু শিক্ষার্থীর স্পনসর কার্যক্রম স্থগিত করেছে অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি। একই সঙ্গে নাইজেরিয়া ও ভারত থেকে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সান্ডারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার ডেভিড বেল ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আগাম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি কমে গেলে শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন পাউন্ড টিউশন ফি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট আয়ের ২৩ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে।

অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি ও বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাওয়ায় দেশটির উচ্চশিক্ষা খাত আগে থেকেই আর্থিক চাপে রয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ইংল্যান্ডের সরকারি অর্থায়ন পাওয়া ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক ঘাটতিতে ছিলো, যা এ ধরনের মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ শতাংশ।

ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী ভেনেসা উইলসন বলেছেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি দীর্ঘদিন কম থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পুনর্গঠন করতে হতে পারে। এতে কর্মী ছাঁটাই, বিভিন্ন কোর্স বন্ধ এবং ক্যাম্পাস বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার ঠেকাতেই নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। বিশেষ করে, পড়াশোনার ভিসায় দেশটিতে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করা কিংবা অবৈধ কাজে যুক্ত হওয়ার মতো ঘটনা ঠেকাতে চায় সরকার। তবে প্রকৃত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যের দরজা খোলা থাকবে বলেও জানিয়েছে দেশটির সরকার।