কেন আত্মহুতি দিলেন তিব্বতের মানবাধিকার কর্মী

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বত’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অন্তত ১৫৯ জন আত্মাহুতি দেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০১২ সালেই নিজেদের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেন ৮৫ জন তিব্বতি। যার মধ্যে ছিলেন বহু ভিক্ষু, সাধারণ মানুষ ও নারী।

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০২:০৮ পিএম

নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন এক তিব্বতি ব্যক্তি। নিউইউর্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ওই ব্যক্তিকে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে বেলভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নির্বাসিত তিব্বতিদের গণমাধ্যম ‘ভয়েস অব তিব্বত’ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তির নাম লোবগা রংজেন। তিনি একজন তিব্বতি অ্যাক্টিভিস্ট। প্রায় ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন তিনি। লোবগা ‘তিব্বতের স্বাধীনতা ও ঐক্যের জন্য’ আত্মাহুতি দিয়েছেন বলে জানায় ‘ভয়েস অব তিব্বত’। 

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘অ্যামনিউইয়র্ক’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিব্বতের পতাকা নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন লোবগা। আত্মহুতির আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রচার করেন তিনি। 

ভিডিও বার্তায় ‘আমার তিব্বতিদের লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য’ বজায় রাখার আহ্ববান জানান লোবগা। লবসাং পালজোর নামের এক সহকর্মীর বরাতে ‘অ্যামনিউইয়র্ক’ জানায়, চীনের নতুন ‘এথনিক ইউনিটি ল’ নিয়ে খুব ক্ষুব্ধ ছিলেন রংজেন।

চীনের অভ্যন্তরে জাতিগত নীতি এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে ‘ল অন প্রোমোটিং ইউনিটি এন্ড প্রোগ্রেস’ নামক নতুন একটি আইন প্রণয়ন করছে বেইজিং।

চীনা সরকারের ভাষ্যমতে, এই আইনের লক্ষ্য দেশটির ৫৫টি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একটি 'অভিন্ন' ও 'শক্তিশালী' জাতীয় পরিচয় তৈরি করা। আইনে প্রাক-কিন্ডারগার্টেন থেকে উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইনটিতে এমন কিছু ধারা আছে, যা চীনকে তার ভূখণ্ডের বাইরে থাকা ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ভিত্তি দেয়। 

এই আইন নিয়ে ইতোমধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নির্বাসিত তিব্বতি ও উইঘুর গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই আইনটিকে দেখছে ‘বলপূর্বক সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ’ এবং সংখ্যালঘু পরিচয় মুছে ফেলার একটি কৌশল হিসেবে। লোবগা রংজেনের আত্মহুতির মাত্র এক দিন আগে কার্যকর হয় এই আইন।

বেইজিংয়ের নীতির প্রতিবাদে এর আগেও আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছে তিব্বতিরা। চীনের ‘কঠোর’ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রথম আত্মাহুতির ঘটনা ঘটেছিল ২০০৯ সালের ২৭এ ফেব্রুয়ারি। সেবার তিব্বতের আমদো অঞ্চলের কীর্তি মঠের এক তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষু নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে চীনা নীতির প্রতিবাদ করেন।

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বত’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অন্তত ১৫৯ জন আত্মাহুতি দেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০১২ সালেই নিজেদের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেন ৮৫ জন তিব্বতি। যার মধ্যে ছিলেন বহু ভিক্ষু, সাধারণ মানুষ ও নারী।

তিব্বত ঐতিহাসিকভাবে হিমালয় অঞ্চলের একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ছিল। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ১৯৫০ সালে এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। চীন একে বলে ‘শান্তিপূর্ণ মুক্তি’ বললেও তিব্বতিদের কাছে এটি ছিল তাদের সার্বভৌমত্ব হরণ।

চীনা শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৫৯ সালে তিব্বতে একটি গণঅভ্যুত্থান হয়। চীনা সামরিক বাহিনী অত্যন্ত নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে বলে অভিযোগ ওঠে। 

তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা চতুর্দশ দালাই লামা ছদ্মবেশে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে গঠন করেন নির্বাসিত সরকার। মাও সেতুংয়ের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’য়ের সময় তিব্বতের হাজার হাজার বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ধর্মীয় গ্রন্থ। সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হয় তিব্বতিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা। 

চীনে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর তিব্বতে ‘চীনায়ন’ প্রক্রিয়া আরও তীব্র হয়েছে বলে দাবী নির্বাসিত তিব্বতিদের। তিব্বতি ভাষা শিক্ষার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে ম্যান্ডারিন ভাষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, তিব্বতিদের ডিএনএ সংগ্রহ এবং উন্নত ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো তিব্বতকে একটি উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।

 

দ্য গার্ডিয়ান আবলম্বনে