হরমুজ প্রণালি নিয়ে ফের অনিশ্চয়তা, দাভোসের বৈঠকে কি জট খুলবে
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা বাড়ছে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ০৪:১৫ পিএমআপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রভাব মিলিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথের ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
যুদ্ধবিরতির পর সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয় বলে জানিয়েছেন শিপিং কোম্পানি ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জাহাজ চলাচল আংশিকভাবে শুরু হলেও পূর্ণ স্বাভাবিকতায় ফিরতে আরও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। আর এই পুরো সময়জুড়ে বাজার অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে হরমুজে নৌ চলাচল স্থগিত বা সীমিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এখনো সম্পূর্ণভাবে খোলা রয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত আছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি করছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরান বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের জন্য হওয়া সমঝোতার স্পষ্ট লঙ্ঘন, আর সে কারণেই তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে।
এর মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
কখন ও কী নিয়ে বৈঠক
রবিবার সকালেই সুইজারল্যান্ড পৌঁছেছেন জেডি ভ্যান্স। তার আগেই সেখানে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।
ইরানের পক্ষ থেকেও একটি প্রতিনিধিদল সেখানে অবস্থান করছে। সেই দলে আছেন ইরানের পার্লামেন্টারি স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
বৈঠকে থাকছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাহ শরীফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রবিবার রাতে দুই পক্ষের আলোচনা শুরু হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে হেজবুল্লাহ ও ইসরায়েল সংঘাত থামানো এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ই আলোচনায় প্রধান গুরুত্ব পাবে।
তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে তিনি বলেন, পরমাণু অস্ত্র ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়েই ফলপ্রসূ আলোচনা হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ বলছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।
প্রথমে আলোচনা স্থগিত করে ইরান। তারা জানায়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তাদের দাবি, লেবাননে হামলা যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন, সেজন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরপর বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালি।
তবে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে নেই।
রবিবারের বৈঠকে অংশ নেবেন মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক দফা আলোচনা আয়োজন করেছিলো তারা।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন। এতে লেবানন পরিস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়।
ওই চুক্তিতে আগামী, ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
সংকটের শুরু কোথায়
যুদ্ধবিরতি ও আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত। ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলতেই থাকে। লেবাননেন ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত রাখে ইসরায়েল।
শনিবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। ২রা মার্চ সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা হেজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সংগঠনটির ডজনখানেক সদস্যকে হত্যা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তিতে হামলা বন্ধের কথা থাকলেও, ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহ পরস্পরকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে যায়।
শুক্রবার বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
চুক্তির আগে ইসরায়েল বলেছিল, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা করছে না। একইসঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছিল যে, হেজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সংঘাত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
অন্যদিকে হেজবুল্লাহ দাবি করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলাগুলো বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারও লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে।
কী অবস্থায় হরমুজ প্রণালি
আইআরজিসি বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির পর খুলে দেওয়া হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ইরানের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারাটি বাস্তবায়ন করেনি।
সেখানে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা ছিলো।
২৮এ ফেব্রুয়ারির পর ইরানে যৌথ হামলা শুরু হলে তখন থেকেই কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দেয় তেহরান। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক উদ্বেগ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। রেকর্ড পরিমাণ দাম বাড়ে তেলের।
হরমুজ প্রণালি এতটাই গভীর যে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোও এটি ব্যবহার করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও এলএনজি উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং তাদের ক্রেতারা এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়েছে, যার বার্ষিক বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির পর তেল বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। তবে বিশেষজ্ঞ ও শিপিং কোম্পানিগুলো জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক করিডরে এখনো পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফেরেনি। বরং পরিস্থিতি এখনো ‘আংশিক কার্যকর’ অবস্থায় রয়েছে, এবং স্বাভাবিক ট্রাফিকে ফিরতে আরও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
শিপ ট্র্যাকিং ও পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজ চলাচল করছে তুলনামূলকভাবে ধীর গতিতে। ইরানের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে “পূর্ণভাবে খোলা”র নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তবে দীর্ঘদিন পর আবার জিপিএস সিগন্যাল সচল হওয়ায় নৌযান চলাচল কিছুটা সহজ হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, “জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে”।
যদিও বাস্তব শিপিং ডেটা বলছে, এখনো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করছে, যেখানে সংঘাতের আগে এই সংখ্যা ১০০-এর বেশি ছিল।
শিপিং ডেটা প্রদানকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেল প্রবাহ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব স্টিফেন কটন সতর্ক করে বলেছেন, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে “সপ্তাহ নয়, মাসও লাগতে পারে”।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রাজনৈতিক চুক্তি হলেই সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক শিপিং শুরু হয় না। জাহাজের চলাচল সমন্বয়, নিরাপত্তা যাচাই এবং ইরানের নিয়ন্ত্রণ–ভূমিকা কী হবে—এসব বিষয় এখনো অনিশ্চিত।
গবেষণা সংস্থা কমোডিটি কনটেক্সট এর প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টন বলেছেন, “এটা শেষ নয়, বরং স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার শুরু মাত্র।”
ইউরেশিয়া গ্রুপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে প্রণালির ট্রাফিক প্রাক-সংকট পর্যায়ের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। শুরুর দিকে মূলত আটকে থাকা জাহাজগুলোই আগে বেরিয়ে যাবে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে।
অন্যদিকে জাহাজ দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের গায়ে শৈবাল ও বার্নাকল জমে গেছে, ফলে গতি কমে গেছে এবং রক্ষণাবেক্ষণেও সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন নাবিকরা।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এই অঞ্চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রণালি দিয়ে সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হলেও তেলের প্রকৃত বাজারে প্রভাব পড়তে আরও দেরি হবে।
(বিবিসি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল)
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ফের অনিশ্চয়তা, দাভোসের বৈঠকে কি জট খুলবে
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রভাব মিলিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথের ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
যুদ্ধবিরতির পর সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয় বলে জানিয়েছেন শিপিং কোম্পানি ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জাহাজ চলাচল আংশিকভাবে শুরু হলেও পূর্ণ স্বাভাবিকতায় ফিরতে আরও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। আর এই পুরো সময়জুড়ে বাজার অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে হরমুজে নৌ চলাচল স্থগিত বা সীমিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এখনো সম্পূর্ণভাবে খোলা রয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত আছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি করছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরান বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের জন্য হওয়া সমঝোতার স্পষ্ট লঙ্ঘন, আর সে কারণেই তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে।
এর মধ্যেই সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
কখন ও কী নিয়ে বৈঠক
রবিবার সকালেই সুইজারল্যান্ড পৌঁছেছেন জেডি ভ্যান্স। তার আগেই সেখানে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।
ইরানের পক্ষ থেকেও একটি প্রতিনিধিদল সেখানে অবস্থান করছে। সেই দলে আছেন ইরানের পার্লামেন্টারি স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
বৈঠকে থাকছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাহ শরীফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রবিবার রাতে দুই পক্ষের আলোচনা শুরু হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে হেজবুল্লাহ ও ইসরায়েল সংঘাত থামানো এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ই আলোচনায় প্রধান গুরুত্ব পাবে।
তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে তিনি বলেন, পরমাণু অস্ত্র ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়েই ফলপ্রসূ আলোচনা হবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ বলছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।
প্রথমে আলোচনা স্থগিত করে ইরান। তারা জানায়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তাদের দাবি, লেবাননে হামলা যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন, সেজন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরপর বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালি।
তবে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে নেই।
রবিবারের বৈঠকে অংশ নেবেন মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক দফা আলোচনা আয়োজন করেছিলো তারা।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন। এতে লেবানন পরিস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়।
ওই চুক্তিতে আগামী, ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আরও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
সংকটের শুরু কোথায়
যুদ্ধবিরতি ও আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত। ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলতেই থাকে। লেবাননেন ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত রাখে ইসরায়েল।
শনিবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। ২রা মার্চ সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা হেজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সংগঠনটির ডজনখানেক সদস্যকে হত্যা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তিতে হামলা বন্ধের কথা থাকলেও, ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহ পরস্পরকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে যায়।
শুক্রবার বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
চুক্তির আগে ইসরায়েল বলেছিল, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা করছে না। একইসঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছিল যে, হেজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সংঘাত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
অন্যদিকে হেজবুল্লাহ দাবি করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলাগুলো বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারও লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে।
কী অবস্থায় হরমুজ প্রণালি
আইআরজিসি বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তারা দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির পর খুলে দেওয়া হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ইরানের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারাটি বাস্তবায়ন করেনি।
সেখানে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা ছিলো।
২৮এ ফেব্রুয়ারির পর ইরানে যৌথ হামলা শুরু হলে তখন থেকেই কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দেয় তেহরান। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক উদ্বেগ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। রেকর্ড পরিমাণ দাম বাড়ে তেলের।
হরমুজ প্রণালি এতটাই গভীর যে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোও এটি ব্যবহার করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও এলএনজি উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং তাদের ক্রেতারা এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়েছে, যার বার্ষিক বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির পর তেল বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। তবে বিশেষজ্ঞ ও শিপিং কোম্পানিগুলো জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক করিডরে এখনো পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফেরেনি। বরং পরিস্থিতি এখনো ‘আংশিক কার্যকর’ অবস্থায় রয়েছে, এবং স্বাভাবিক ট্রাফিকে ফিরতে আরও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
শিপ ট্র্যাকিং ও পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজ চলাচল করছে তুলনামূলকভাবে ধীর গতিতে। ইরানের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে “পূর্ণভাবে খোলা”র নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তবে দীর্ঘদিন পর আবার জিপিএস সিগন্যাল সচল হওয়ায় নৌযান চলাচল কিছুটা সহজ হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, “জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে”।
যদিও বাস্তব শিপিং ডেটা বলছে, এখনো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করছে, যেখানে সংঘাতের আগে এই সংখ্যা ১০০-এর বেশি ছিল।
শিপিং ডেটা প্রদানকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেল প্রবাহ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব স্টিফেন কটন সতর্ক করে বলেছেন, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে “সপ্তাহ নয়, মাসও লাগতে পারে”।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রাজনৈতিক চুক্তি হলেই সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক শিপিং শুরু হয় না। জাহাজের চলাচল সমন্বয়, নিরাপত্তা যাচাই এবং ইরানের নিয়ন্ত্রণ–ভূমিকা কী হবে—এসব বিষয় এখনো অনিশ্চিত।
গবেষণা সংস্থা কমোডিটি কনটেক্সট এর প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টন বলেছেন, “এটা শেষ নয়, বরং স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার শুরু মাত্র।”
ইউরেশিয়া গ্রুপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে প্রণালির ট্রাফিক প্রাক-সংকট পর্যায়ের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। শুরুর দিকে মূলত আটকে থাকা জাহাজগুলোই আগে বেরিয়ে যাবে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে।
অন্যদিকে জাহাজ দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের গায়ে শৈবাল ও বার্নাকল জমে গেছে, ফলে গতি কমে গেছে এবং রক্ষণাবেক্ষণেও সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন নাবিকরা।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এই অঞ্চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রণালি দিয়ে সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হলেও তেলের প্রকৃত বাজারে প্রভাব পড়তে আরও দেরি হবে।
(বিবিসি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল)
বিষয়: