ট্রাম্প-শি চিনপিং বৈঠক ও একটি টালমাটাল বিশ্বের ভবিষ্যৎ
টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতিতে আলোচনায় বসেছে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় নির্ধারিত হবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, তাইওয়ান ইস্যু এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্যের ভবিষ্যৎ। ট্রাম্প-শি’য়ের এই আলোচনা কি বিশ্বকে একটি স্থায়ী শান্তির পথ দেখাতে পারবে? নাকি নতুন সংঘাতের পথে হাঁটবে পৃথিবী?
কামরুজ্জামান পৃথু
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০৮:৪২ পিএমআপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম
ট্রাম্প-শি বৈঠক পৃথিবীকে স্থায়ী শান্তি দেবে নাকি দুই পরাশক্তির অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও সামরিক লড়াইকে আরও কৌশলী করে তুলবে, তা নির্ভর করছে এই আলোচনার উপর
বিশ্বের ভূরাজনীতি যখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, তখনই বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’এ মুখোমুখি হলেন ডনাল্ড ট্রাম্প এবং শি চিনপিং। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদের কিনারায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সাপ্লাই চেইন। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা, সেমিকন্ডাক্টর ও এআই প্রযুক্তির আধিপত্যের লড়াই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত বিশাল বাণিজ্য শুল্ক। সব মিলিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থার এই টালমাটাল সময়ে দুই পরাশক্তির এই সাক্ষাৎ সাধারণ কোনো আলোচনা নয়। এই বৈঠকের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা। তাই বিশ্লেষকরা একে বলছেন, এই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রায় এক দশক পর হওয়া কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় এই সফরের ওপর নির্ভর করছে আগামী বিশ্ব ব্যবস্থার গতিপথ।
একটি 'অনিশ্চিত' বিশ্বের সন্ধিক্ষণে
বৈশ্বিক রাজনীতি উত্তাল ছিল ২০২৬ সালের শুরু থেকেই। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ। পরবর্তীতে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। এরই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ পরিবহন হওয়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। যার ফলে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয় জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি। টালমাটাল এই সময়ে ট্রাম্পের বেইজিং সফরটি মূলত ২০২৫ এর অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত এপেক সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,, ট্রাম্পের এই সফরের মূল লক্ষ্য ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা ‘সংকট ব্যবস্থাপনা’। সংবাদমাধ্যমটির মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পেরেছে যে, চীনকে সাথে না নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সামলানো এবং মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি কমানো অসম্ভব। অন্যদিকে, চীনও তার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সংকট এবং উচ্চ বেকারত্ব দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক চাইছে।
বন্ধ হরমুজ প্রণালী: ট্রাম্পের ‘তুরুপের তাস’ কি চীন
গণমাধ্যমগুলোর খবর বলছে, ট্রাম্পের এই সফরের সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে আকাশচুম্বী হয়েছে তেলের দাম। আর এই বাড়তি দাম গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর বিশ্লেষক স্কট কেনেডির মতে, ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে তেহরানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব আছে চীনের। ট্রাম্প চাইছেন যেন শি চিনপিং ইরানকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখেন এবং হরমুজ প্রণালী খুলতে সাহায্য করেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু শুল্ক প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব খাটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ট্রাম্প।
তবে এই শুল্ক প্রত্যাহারের বিনিময়ে চীন তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার ইরানের সাথে সম্পর্ক বিসর্জন দেবে কী না সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
তাইওয়ান: শি’র 'প্রথম রেড লাইন'
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘকাল ধরে টানাপোড়েন চলে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে। চীনের গৃহযুদ্ধে পরাজিত হয়ে কুওমিনতাং সরকার ১৯৪৯ সালে তাইওয়ানে পালিয়ে যায়। সেখানেই নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে তারা। তবে বেইজিং তখন থেকেই তাইওয়ানকে বিবেচনা করে আসছে নিজেদের একটি 'বিচ্ছিন্ন প্রদেশ' হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেও ১৯৭৯ সালে 'এক চীন নীতি'কে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তাইওয়ান চীনের অংশ হিসেবে মেনে নেয়। তবে শুরু থেকেই তাইওয়ানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ও শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে একই বছর 'তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট' পাস করে তারা। এই আইন অনুযায়ী, তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করতে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র। চীনের কড়া আপত্তি সত্ত্বেও দশকের পর দশক ধরে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র তাইওয়ান। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকায় নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে তাইওয়ানকে একটি কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে চীন একে বিবেচনা করে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে।
সম্প্রতি সেই উত্তেজনা আরও বাড়ে যখন মার্কিন সামরিক সংস্থাগুলো তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল সামরিক প্যাকেজ ঘোষণা করে। যার মধ্যে আছে অত্যাধুনিক হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তিও।
ট্রাম্পের সাথে বৈঠকের শুরুতেই তাইওয়ান ইস্যুতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন শি চিনপিং।
শি চিনপিং এই পদক্ষেপকে চীনের জন্য একটি ‘অস্তিত্বের সংকট’ এবং চীন-মার্কিন সম্পর্কের ‘প্রথম রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই মিসাইলগুলো তাইওয়ানে মোতায়েন করা হলে সামরিক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বেইজিং।
তবে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আলোচনার গুটি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
পত্রিকাটির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, চীন যদি ইরানকে নিয়ন্ত্রণে এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করে, তবে এই অস্ত্র প্যাকেজ নিয়ে পুনরায় বিবেচনা করতে পারে ট্রাম্প।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে টেক জায়ান্টরা
ট্রাম্পের এই সফরের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো তার সাথে আসা বিশাল করপোরেট প্রতিনিধি দল। এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন টেসলা ও স্পেসএক্স এর সিইও ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের সিইও টিম কুক, ব্লাকরকের চেয়ারম্যান ও সিইও ল্যারি ফিঙ্ক এর মতো প্রভাবশালী বিজনেস টাইকুনরা। এই সিইওদের ‘আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন ট্রাম্প। দাবি জানিয়েছেন তাদের জন্য চীনের বাজার আরও উন্মুক্ত করার।
বেইজিং সম্মেলনে ডনাল্ড ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে মার্কিন টেক জায়ান্টদের উপস্থিতিকে একটি সুপরিকল্পিত ‘প্রযুক্তি কূটনীতি’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ইলন মাস্ক এবং এনভিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের এই সফরে যোগ দেওয়া নজর কেড়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমের।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের বিশ্ববাজারে বর্তমানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে এনভিয়া। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের ৫০ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল বাজারে নিজেদের চিপ বিক্রি করতে পারছিল না তারা।
বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর মাধ্যমে এনভিডিয়া চীনা বাজারে আবারও ঢোকার চেষ্টা করছে বলে লেখা হয়েছে দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে।
এছাড়াও চীনের সাথে সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার খবর পাওয়া গেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে। এই ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা কমাতে পারে দুই পরাশক্তির প্রযুক্তিগত সংঘাত।
ডনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরে ইলন মাস্কের উপস্থিতি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে ব্লুমবার্গ।
বিশ্লেষণে বলা হয়, মাস্কের অন্যতম মিশন হলো টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ বা এফএসডি প্রযুক্তির জন্য চীনা রাস্তার তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের অনুমতি আদায় করা। চীনের কঠোর ডেটা সিকিউরিটি আইনের কারণে যা এতদিন আটকে ছিলো।
স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা নিয়ে চীনের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। স্টারলিংক চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং জরুরি যোগাযোগে সহায়ক হতে পারে বলে বেইজিংকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করবেন মাস্ক।
অ্যাপল প্রধান টিম কুকের উপস্থিতিকে দেখা হচ্ছে নিজেদের ‘সাপ্লাই চেইন’ সুরক্ষিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে। ট্রাম্পের আরোপিত ১৪০ শতাংশ শুল্কের খড়গ থেকে আইফোনসহ অ্যাপলের অন্যান্য পণ্যকে বাঁচাতে ‘ট্যারিফ এক্সেম্পশন’ বা বিশেষ ছাড় চাইছেন টিম কুক।
ট্রাম্পের জন্য এই টেক নেতাদের সাথে রাখা ছিল একটি বড় কৌশলগত চাল। আল জাজিরা তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ট্রাম্প এই সিইওদের 'লিভারেজ' হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প বেইজিংকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, চীনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি যাদের হাতে, তারা ট্রাম্পের নীতির পূর্ণ সমর্থক।
একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের আগে সিলিকন ভ্যালির সমর্থন নিশ্চিত করা এবং মুদ্রাস্ফীতি কমাতে এই কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য: শুল্ক যুদ্ধ কি শেষ
ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নজিরবিহীন ‘শুল্ক যুদ্ধ’ চলেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। চীনের ওপর ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের মার্কিন হুমকির পরই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। দুই পরাশক্তি দেশের প্রধানদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের মাধ্যমে তা নিরসনের একটি পথ খোঁজা হচ্ছে।
বেইজিং শীর্ষ সম্মেলনের শুরুতে দুই দেশ একটি ‘ট্যারিফ ট্রুস’ বা শুল্ক বিরতিতে একমত হয়েছে। অর্থাৎ আলোচনার ফলাফল না আসা পর্যন্ত নতুন কোনো শুল্ক কার্যকর হবে না। একইসাথে পুনরায় বিবেচনা করা হবে বিদ্যমান শুল্কগুলোর বিষয়ে।
ট্রাম্পের এই সফরের একটি বড় ব্যবসায়িক সাফল্য হতে যাচ্ছে বোয়িং বিমানের বিশাল ক্রয়াদেশ। ফিন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী , চীন প্রায় ৫শ টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স জেটের একটি বিশাল অর্ডারের আশ্বাস দিয়েছে। যা চাঙা করবে মার্কিন বিমান শিল্পকে।
এছাড়াও বড় অংকের মার্কিন কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সয়াবিন ও গরুর মাংস কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক কাঠামো বা ‘ইউএস-চায়না বোর্ড অফ ট্রেড’ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশ। ভবিষ্যতে কোনো বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হলে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করবে এই বোর্ড।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুল্ক কমানোর বিষয়টি কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং এটি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমটির মতে, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চীন যদি তাইওয়ান ইস্যুতে পিছু হটে এবং মার্কিন টেক কোম্পানিগুলোকে তাদের বাজারে অবাধ সুযোগ দেয়, তবেই কেবল তিনি ১৪০ শতাংশ শুল্ক স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারের কথা ভাববেন।
ট্রাম্পের জন্য এই শুল্ক যুদ্ধ শিথিল করা রাজনৈতিকভাবে জরুরি বলছে বিবিসি। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। অন্যদিকে, চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ বেকারত্বের কারণে শি চিনপিংও চান মার্কিন বাজারে চীনা পণ্যের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে।
কার হাতে ‘ট্রাম্প কার্ড’
গবেষণা সংস্থা ‘কাউন্সিল ফর ফরেইন রিলেশন’ তাদের এক নিবন্ধে দাবি করেছে যে, এবারের সম্মেলনে চীনের পাল্লাই কিছুটা ভারী। চীন জানে যে ট্রাম্পের সামনে নির্বাচন এবং তাকে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হলে চীনের সাহায্য লাগবেই।
অন্যদিকে ‘অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট’ মনে করে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি চীনের জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, এই নীতি এশিয়ার অনেক মিত্র দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সরিয়ে চীনের বলয়ে নিয়ে আসছে।
শান্তি নাকি 'সাময়িক বিরতি'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭২ সালে যখন মাও সেতুংয়ের চীনে সফর করেন, তখন দুই দেশের মধ্যে চলছিলো দুই দশকের চরম শত্রুতা। নিক্সনের সেই সফরটি পরবর্তীকালে চীনের ‘ওপেন ডোর পলিসি’র পথ প্রশস্ত করে দেয়। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে যোগাযোগের পথ খুলে যাওয়ায় চীন সুযোগ পায় বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবেশের। তখনকার স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত ইউনিয়নকে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গড়ে ওঠে একটি অঘোষিত কৌশলগত ঐক্য। এটি চীনকে উপস্থাপন করে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে।
নিক্সন ও মাও’য়ের ওই বৈঠককে বলা হয় আধুনিক কূটনীতির অন্যতম সফল এবং বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
ট্রাম্প ও শি’র এই আলোচনার পর আবারও কি একটি 'নিক্সন-মাও মোমেন্ট’ দেখতে চলেছে বিশ্ব?
সাংবাদিক এবং বিশ্লেষক লরা বিকার মনে করেন, ২০২৬ সালের এই বৈঠকটিকে ‘নিক্সন-মাও মোমেন্ট’ বলা কঠিন।
এটিকে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি নয়, বরং একটি অত্যন্ত জটিল ‘স্ট্র্যাটেজিক স্টেবিলিটি’ বা কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বর্তমানে বিবিসির চীন করেসপনডেন্ট হিসেবে কাজ করা এই বিশ্লেষক।
এর কারণ হিসেবে লরা বলছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে আদর্শ ও প্রযুক্তিগত ফাটল আছে, তা একটি বৈঠকেই মিটে যাওয়া অসম্ভব। একইসাথে ১৯৭২ সালে তাদের উদ্দেশ্য ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে একঘরে করা। অন্যদিকে ২০২৬ সালে দুই পরাশক্তি নিজেই একে অপরের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী।
রিচার্ড নিক্সন ও মাও সেতুংয়ের সমঝোতা একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিলো। কিন্তু ট্রাম্প-শি’র এই সফর পুরনো সংঘাতগুলোকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে থামানোর প্রচেষ্টা।
দক্ষিণ চীন সাগর, এআই প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক মুদ্রার আধিপত্য নিয়ে যে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত, তা এই এক সফরে শেষ হবে না বলেই মত বিশ্লেষকদের।
নিক্সন-মাও বৈঠক যদি হয় একটি 'নতুন দিগন্তের সূচনা', তবে ট্রাম্প-শি বৈঠক হচ্ছে একটি 'অনিবার্য সংঘাত এড়ানোর মরিয়া চেষ্টা'। এই বৈঠক পৃথিবীকে স্থায়ী শান্তি দেবে নাকি দুই পরাশক্তির অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও সামরিক লড়াইকে আরও কৌশলী করে তুলবে, তা নির্ভর করছে এই আলোচনার টেবিলে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়নের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বেইজিংযে চলা এই কূটনৈতিক পদক্ষেপটি নির্ধারণ করে দেবে আগামীর পৃথিবী সংঘাতের পথে হাঁটবে, নাকি প্রবেশ করবে একটি 'কৌশলগত স্থিতিশীলতার' নতুন যুগে।
ট্রাম্প-শি চিনপিং বৈঠক ও একটি টালমাটাল বিশ্বের ভবিষ্যৎ
টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতিতে আলোচনায় বসেছে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় নির্ধারিত হবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, তাইওয়ান ইস্যু এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্যের ভবিষ্যৎ। ট্রাম্প-শি’য়ের এই আলোচনা কি বিশ্বকে একটি স্থায়ী শান্তির পথ দেখাতে পারবে? নাকি নতুন সংঘাতের পথে হাঁটবে পৃথিবী?
বিশ্বের ভূরাজনীতি যখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, তখনই বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’এ মুখোমুখি হলেন ডনাল্ড ট্রাম্প এবং শি চিনপিং। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদের কিনারায় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সাপ্লাই চেইন। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা, সেমিকন্ডাক্টর ও এআই প্রযুক্তির আধিপত্যের লড়াই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত বিশাল বাণিজ্য শুল্ক। সব মিলিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থার এই টালমাটাল সময়ে দুই পরাশক্তির এই সাক্ষাৎ সাধারণ কোনো আলোচনা নয়। এই বৈঠকের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা। তাই বিশ্লেষকরা একে বলছেন, এই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রায় এক দশক পর হওয়া কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় এই সফরের ওপর নির্ভর করছে আগামী বিশ্ব ব্যবস্থার গতিপথ।
একটি 'অনিশ্চিত' বিশ্বের সন্ধিক্ষণে
বৈশ্বিক রাজনীতি উত্তাল ছিল ২০২৬ সালের শুরু থেকেই। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ। পরবর্তীতে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। এরই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ পরিবহন হওয়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। যার ফলে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয় জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি। টালমাটাল এই সময়ে ট্রাম্পের বেইজিং সফরটি মূলত ২০২৫ এর অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত এপেক সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,, ট্রাম্পের এই সফরের মূল লক্ষ্য ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা ‘সংকট ব্যবস্থাপনা’। সংবাদমাধ্যমটির মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পেরেছে যে, চীনকে সাথে না নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সামলানো এবং মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি কমানো অসম্ভব। অন্যদিকে, চীনও তার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সংকট এবং উচ্চ বেকারত্ব দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক চাইছে।
বন্ধ হরমুজ প্রণালী: ট্রাম্পের ‘তুরুপের তাস’ কি চীন
গণমাধ্যমগুলোর খবর বলছে, ট্রাম্পের এই সফরের সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে আকাশচুম্বী হয়েছে তেলের দাম। আর এই বাড়তি দাম গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর বিশ্লেষক স্কট কেনেডির মতে, ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে তেহরানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব আছে চীনের। ট্রাম্প চাইছেন যেন শি চিনপিং ইরানকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখেন এবং হরমুজ প্রণালী খুলতে সাহায্য করেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু শুল্ক প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব খাটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ট্রাম্প।
তবে এই শুল্ক প্রত্যাহারের বিনিময়ে চীন তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার ইরানের সাথে সম্পর্ক বিসর্জন দেবে কী না সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
তাইওয়ান: শি’র 'প্রথম রেড লাইন'
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘকাল ধরে টানাপোড়েন চলে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে। চীনের গৃহযুদ্ধে পরাজিত হয়ে কুওমিনতাং সরকার ১৯৪৯ সালে তাইওয়ানে পালিয়ে যায়। সেখানেই নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে তারা। তবে বেইজিং তখন থেকেই তাইওয়ানকে বিবেচনা করে আসছে নিজেদের একটি 'বিচ্ছিন্ন প্রদেশ' হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেও ১৯৭৯ সালে 'এক চীন নীতি'কে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তাইওয়ান চীনের অংশ হিসেবে মেনে নেয়। তবে শুরু থেকেই তাইওয়ানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ও শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে একই বছর 'তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট' পাস করে তারা। এই আইন অনুযায়ী, তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করতে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র। চীনের কড়া আপত্তি সত্ত্বেও দশকের পর দশক ধরে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র তাইওয়ান। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকায় নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে তাইওয়ানকে একটি কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে চীন একে বিবেচনা করে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে।
সম্প্রতি সেই উত্তেজনা আরও বাড়ে যখন মার্কিন সামরিক সংস্থাগুলো তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল সামরিক প্যাকেজ ঘোষণা করে। যার মধ্যে আছে অত্যাধুনিক হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তিও।
ট্রাম্পের সাথে বৈঠকের শুরুতেই তাইওয়ান ইস্যুতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন শি চিনপিং।
শি চিনপিং এই পদক্ষেপকে চীনের জন্য একটি ‘অস্তিত্বের সংকট’ এবং চীন-মার্কিন সম্পর্কের ‘প্রথম রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই মিসাইলগুলো তাইওয়ানে মোতায়েন করা হলে সামরিক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বেইজিং।
তবে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আলোচনার গুটি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
পত্রিকাটির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, চীন যদি ইরানকে নিয়ন্ত্রণে এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করে, তবে এই অস্ত্র প্যাকেজ নিয়ে পুনরায় বিবেচনা করতে পারে ট্রাম্প।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে টেক জায়ান্টরা
ট্রাম্পের এই সফরের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো তার সাথে আসা বিশাল করপোরেট প্রতিনিধি দল। এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন টেসলা ও স্পেসএক্স এর সিইও ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের সিইও টিম কুক, ব্লাকরকের চেয়ারম্যান ও সিইও ল্যারি ফিঙ্ক এর মতো প্রভাবশালী বিজনেস টাইকুনরা। এই সিইওদের ‘আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন ট্রাম্প। দাবি জানিয়েছেন তাদের জন্য চীনের বাজার আরও উন্মুক্ত করার।
বেইজিং সম্মেলনে ডনাল্ড ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে মার্কিন টেক জায়ান্টদের উপস্থিতিকে একটি সুপরিকল্পিত ‘প্রযুক্তি কূটনীতি’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ইলন মাস্ক এবং এনভিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের এই সফরে যোগ দেওয়া নজর কেড়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমের।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের বিশ্ববাজারে বর্তমানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে এনভিয়া। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের ৫০ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল বাজারে নিজেদের চিপ বিক্রি করতে পারছিল না তারা।
বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর মাধ্যমে এনভিডিয়া চীনা বাজারে আবারও ঢোকার চেষ্টা করছে বলে লেখা হয়েছে দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে।
এছাড়াও চীনের সাথে সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার খবর পাওয়া গেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে। এই ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা কমাতে পারে দুই পরাশক্তির প্রযুক্তিগত সংঘাত।
ডনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরে ইলন মাস্কের উপস্থিতি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে ব্লুমবার্গ।
বিশ্লেষণে বলা হয়, মাস্কের অন্যতম মিশন হলো টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ বা এফএসডি প্রযুক্তির জন্য চীনা রাস্তার তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের অনুমতি আদায় করা। চীনের কঠোর ডেটা সিকিউরিটি আইনের কারণে যা এতদিন আটকে ছিলো।
স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা নিয়ে চীনের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। স্টারলিংক চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং জরুরি যোগাযোগে সহায়ক হতে পারে বলে বেইজিংকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করবেন মাস্ক।
অ্যাপল প্রধান টিম কুকের উপস্থিতিকে দেখা হচ্ছে নিজেদের ‘সাপ্লাই চেইন’ সুরক্ষিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে। ট্রাম্পের আরোপিত ১৪০ শতাংশ শুল্কের খড়গ থেকে আইফোনসহ অ্যাপলের অন্যান্য পণ্যকে বাঁচাতে ‘ট্যারিফ এক্সেম্পশন’ বা বিশেষ ছাড় চাইছেন টিম কুক।
ট্রাম্পের জন্য এই টেক নেতাদের সাথে রাখা ছিল একটি বড় কৌশলগত চাল। আল জাজিরা তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ট্রাম্প এই সিইওদের 'লিভারেজ' হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প বেইজিংকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, চীনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি যাদের হাতে, তারা ট্রাম্পের নীতির পূর্ণ সমর্থক।
একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের আগে সিলিকন ভ্যালির সমর্থন নিশ্চিত করা এবং মুদ্রাস্ফীতি কমাতে এই কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য: শুল্ক যুদ্ধ কি শেষ
ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নজিরবিহীন ‘শুল্ক যুদ্ধ’ চলেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। চীনের ওপর ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের মার্কিন হুমকির পরই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। দুই পরাশক্তি দেশের প্রধানদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের মাধ্যমে তা নিরসনের একটি পথ খোঁজা হচ্ছে।
বেইজিং শীর্ষ সম্মেলনের শুরুতে দুই দেশ একটি ‘ট্যারিফ ট্রুস’ বা শুল্ক বিরতিতে একমত হয়েছে। অর্থাৎ আলোচনার ফলাফল না আসা পর্যন্ত নতুন কোনো শুল্ক কার্যকর হবে না। একইসাথে পুনরায় বিবেচনা করা হবে বিদ্যমান শুল্কগুলোর বিষয়ে।
ট্রাম্পের এই সফরের একটি বড় ব্যবসায়িক সাফল্য হতে যাচ্ছে বোয়িং বিমানের বিশাল ক্রয়াদেশ। ফিন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী , চীন প্রায় ৫শ টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স জেটের একটি বিশাল অর্ডারের আশ্বাস দিয়েছে। যা চাঙা করবে মার্কিন বিমান শিল্পকে।
এছাড়াও বড় অংকের মার্কিন কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সয়াবিন ও গরুর মাংস কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক কাঠামো বা ‘ইউএস-চায়না বোর্ড অফ ট্রেড’ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশ। ভবিষ্যতে কোনো বাণিজ্যিক বিরোধ তৈরি হলে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করবে এই বোর্ড।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুল্ক কমানোর বিষয়টি কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং এটি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমটির মতে, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চীন যদি তাইওয়ান ইস্যুতে পিছু হটে এবং মার্কিন টেক কোম্পানিগুলোকে তাদের বাজারে অবাধ সুযোগ দেয়, তবেই কেবল তিনি ১৪০ শতাংশ শুল্ক স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারের কথা ভাববেন।
ট্রাম্পের জন্য এই শুল্ক যুদ্ধ শিথিল করা রাজনৈতিকভাবে জরুরি বলছে বিবিসি। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। অন্যদিকে, চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ বেকারত্বের কারণে শি চিনপিংও চান মার্কিন বাজারে চীনা পণ্যের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে।
কার হাতে ‘ট্রাম্প কার্ড’
গবেষণা সংস্থা ‘কাউন্সিল ফর ফরেইন রিলেশন’ তাদের এক নিবন্ধে দাবি করেছে যে, এবারের সম্মেলনে চীনের পাল্লাই কিছুটা ভারী। চীন জানে যে ট্রাম্পের সামনে নির্বাচন এবং তাকে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে হলে চীনের সাহায্য লাগবেই।
অন্যদিকে ‘অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট’ মনে করে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি চীনের জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, এই নীতি এশিয়ার অনেক মিত্র দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সরিয়ে চীনের বলয়ে নিয়ে আসছে।
শান্তি নাকি 'সাময়িক বিরতি'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭২ সালে যখন মাও সেতুংয়ের চীনে সফর করেন, তখন দুই দেশের মধ্যে চলছিলো দুই দশকের চরম শত্রুতা। নিক্সনের সেই সফরটি পরবর্তীকালে চীনের ‘ওপেন ডোর পলিসি’র পথ প্রশস্ত করে দেয়। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে যোগাযোগের পথ খুলে যাওয়ায় চীন সুযোগ পায় বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবেশের। তখনকার স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত ইউনিয়নকে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গড়ে ওঠে একটি অঘোষিত কৌশলগত ঐক্য। এটি চীনকে উপস্থাপন করে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে।
নিক্সন ও মাও’য়ের ওই বৈঠককে বলা হয় আধুনিক কূটনীতির অন্যতম সফল এবং বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
ট্রাম্প ও শি’র এই আলোচনার পর আবারও কি একটি 'নিক্সন-মাও মোমেন্ট’ দেখতে চলেছে বিশ্ব?
সাংবাদিক এবং বিশ্লেষক লরা বিকার মনে করেন, ২০২৬ সালের এই বৈঠকটিকে ‘নিক্সন-মাও মোমেন্ট’ বলা কঠিন।
এটিকে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি নয়, বরং একটি অত্যন্ত জটিল ‘স্ট্র্যাটেজিক স্টেবিলিটি’ বা কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বর্তমানে বিবিসির চীন করেসপনডেন্ট হিসেবে কাজ করা এই বিশ্লেষক।
এর কারণ হিসেবে লরা বলছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে আদর্শ ও প্রযুক্তিগত ফাটল আছে, তা একটি বৈঠকেই মিটে যাওয়া অসম্ভব। একইসাথে ১৯৭২ সালে তাদের উদ্দেশ্য ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে একঘরে করা। অন্যদিকে ২০২৬ সালে দুই পরাশক্তি নিজেই একে অপরের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী।
রিচার্ড নিক্সন ও মাও সেতুংয়ের সমঝোতা একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিলো। কিন্তু ট্রাম্প-শি’র এই সফর পুরনো সংঘাতগুলোকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে থামানোর প্রচেষ্টা।
দক্ষিণ চীন সাগর, এআই প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক মুদ্রার আধিপত্য নিয়ে যে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত, তা এই এক সফরে শেষ হবে না বলেই মত বিশ্লেষকদের।
নিক্সন-মাও বৈঠক যদি হয় একটি 'নতুন দিগন্তের সূচনা', তবে ট্রাম্প-শি বৈঠক হচ্ছে একটি 'অনিবার্য সংঘাত এড়ানোর মরিয়া চেষ্টা'। এই বৈঠক পৃথিবীকে স্থায়ী শান্তি দেবে নাকি দুই পরাশক্তির অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও সামরিক লড়াইকে আরও কৌশলী করে তুলবে, তা নির্ভর করছে এই আলোচনার টেবিলে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়নের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বেইজিংযে চলা এই কূটনৈতিক পদক্ষেপটি নির্ধারণ করে দেবে আগামীর পৃথিবী সংঘাতের পথে হাঁটবে, নাকি প্রবেশ করবে একটি 'কৌশলগত স্থিতিশীলতার' নতুন যুগে।