অভিজ্ঞতা

১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর হলে কী করবেন

কিছুক্ষণের মধ্যে তার গায়ের তাপ চড়চড় করে বেড়ে আগুন হয়ে গেলো। গায়ের ওপরে ডিম ছেড়ে দিলে পোচ হয়ে যাবে যেন। থার্মোমিটারের পারদ ১০৭-এর ঘর ছাড়িয়ে গেছে। এত জ্বর উঠলে সেই মানুষতো বাঁচে না বলেই জানতাম এতদিন। কী করব এখন? থার্মোমিটার নষ্ট না তো? ভুল রিডিং দিচ্ছে না তো?

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

“বাবুর জ্বরতো ১০৬-এর ওপরে! সাতের কাছাকাছি। কোনকিছুতেই জ্বর নামছে না। সাপোজিটরিতেও কাজ হচ্ছে না। কী করব এখন?”

এগারো বছর শেষ করে বারোতে পা দেয়া আমার একমাত্র কন্যার মা টেলিফোনে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো। হার্টবিট মিস হয়ে যায় আমার।

সাথে সাথে মাথার মধ্যে অনেকগুলো দুশ্চিন্তা খেলে যায়। ১০৬-৭ জ্বর উঠলে সেই মানুষতো বাঁচে না বলেই জানি!  

কী করব এখন? আমিতো ওদের থেকে দূরে আছি। আবার বিশ্বাসও হতে চায় না। অপত্যস্নেহে কাতর মা আমাকে বাড়িয়ে বলেছ না তো! নাকি থার্মোমিটার নষ্ট? ভুল রিডিং দিচ্ছে না তো? 

বৃহস্পতিবার। সপ্তাহের শেষদিন। এত রাতে হাসপাতালে নিয়েই বা কী করব? ঢাকার বড় ডাক্তাররা শুক্রবার কাজ করেন না। রাতের বেলা হাসপাতালগুলো চলে মোস্টলি সদ্য এমবিবিএস পাশ করা কিংবা ইন্টার্নশিপে থাকা তরুণ চিকিৎসকদের তত্বাবধানে।

সকালেই স্কুল থেকেই ওর মাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে বাচ্চার জ্বর এসেছে। সিকরুমে আছে। গার্জিয়ান গিয়ে যেন তাকে গিয়ে নিয়ে আসে। স্কুল থেকে ফেরার সময়েই মায়ের মোবাইল থেকে ভিডিও কল দিয়েছিল আমাকে।  

“পাপা জানো, আমাদের ক্লাসের অর্ধেক বাচ্চাই আজকে সিকরুমে”, বাবু বলিছলো আমাকে।

বৃহস্পতিবার রাত দশটা নাগাদ আমি আমার মেয়ের কাছে পৌঁছাই। তার মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। মেয়ে ঠান্ডায় কাঁপছে। তার গায়ে দুটো কম্বল। তার মা ভেজা টাওয়েল দিয়ে মেয়ের গা মুছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। মেয়ে মোটেও রাজি হচ্ছে না। আমাকে দেখে একটা কাষ্ঠ হাসি দিল। আমি কাঁপা হাতে থার্মোমিটার দিলাম তার বগলে। ১০৬ দশমিক ৫ তার গায়ের তাপমাত্রা। নিজের তাপ মেপে দেখলাম একই থার্মোমিটারে। আটানব্বই। কই, আমারটাতো বেশি দেখাচ্ছে না?”

এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন দিলাম। সে বললো, “আজকালকার জ্বর এমনই হচ্ছে সবার”। 

তার পরামর্শে নাপার ডোজ বাড়িয়ে দিলাম। বড় মানুষের যে ডোজ সেই ডোজ এখন দেয়া হচ্ছে তাকে।

ঘন্টাদুয়েক আগে তাকে সাপোজিটরি দেয়া হয়েছে। পরবর্তী দু ঘন্টায় তাকে আর এই চিকিৎসা দেয়া যাবে না। একটাই উপায় পানি ঢেলে তার তাপ কমিয়ে রাখা। কোন এক অদ্ভুত কারণে আমি পাশে থাকলে তাকে দুতিনটা ইঞ্জেকশানও দিয়ে ফেলা যায়। এমনিতে সুঁই ফোটাতে গেলে সে চিৎকার করে পাড়া মাথায় তোলে। আমি থাকলে চুপচাপ সহ্য করে। 

আমি আসার পর তাকে গা মুছিয়ে দেয়া গেল। মেয়েটা বারোতে পা দিয়েছে। তার শরীরে পরিবর্তন ঘটছে। আত্মসম্মনবোধ তীব্র হয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে পিতার উপস্থিতে কন্যার শরীর ভেজা টাওয়েল দিয়ে মুছিয়ে দেয়া সহজ নয়। এই কাজটাই তার মাকে করতে হচ্ছিল নানা কসরৎ  করে।  এই মোছামুছির পর তার তাপ কিছু কমল। তাও ১০৫ এর কাছাকাছি। কিন্তু সর্বক্ষণ গা মুছতে দিচ্ছে না সে। শুধু মাথায় পানি ঢালা যাচ্ছে। 

কিছুক্ষণ পর আবার তাপ বাড়তে শুরু করেছে। মেয়েকে বললাম, “চল বাবু বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে বসে থাকি। নাহলেতো তোমাকে বাঁচাতে পারবো না আমি”। 

এতটুকু মেয়ে আমার। মুখটা শুকিয়ে গেল। তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে করুণ মুখে বললো, “আচ্ছা চল।” 

বত্রিশ কেজির শুকনাপটকা মেয়েকে নিয়ে বাথরুমে নিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। ঠকঠক করে কাঁপছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে ঝর্ণার জলে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু টুঁ শব্দটি করছে না আমার ‘ব্রেভ গার্ল’। 

মিনিট চারেক তাকে ঝর্ণার জলে চুবালাম। এই অসুস্থ শরীরে একটা বাচ্চা কাহাতক আর গোসল করতে পারে? তারপর তাকে মুছিয়ে কোলে নিয়ে বসলাম। পারদ এবার একশ চারের নীচে। মেয়ের মুখে সামান্য হাসি। একটু পর পর সে বলছে, “পাপা একটু জ্বর মাপো না!” আমার মেয়ে এই বয়সেই অত্যন্ত দায়িত্বশীল।

আধঘণ্টা পর আবার জ্বর বাড়তে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে তার গায়ের তাপ চড়চড় করে বেড়ে আগুণ হয়ে গেলো। গায়ের মধ্যে ডিম ছেড়ে দিলে পোচ হয়ে যাওয়ার মত তাপ। পারদ ১০৭-এর ঘর ছাড়িয়ে গেছে। কিছু চিন্তা করে না পেয়ে ওর মাকে বললাম, গুছিয়ে নাও তাড়াতাড়ি। হাসপাতালে নিতে হবে বাবুকে। রাত তখন পৌনে বারোটা। এতক্ষণ যে বিবরণ আপনি পড়েছেন, তার সময়সীমা মোটে পৌনে দু ঘন্টা।

ড. মুহাম্মদ তৌফিক, বিএসএইচ হসপিটালের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট।

হসপিটালে সিট নেই

যে কোনো স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আমরা সাধারণত কল্যানপুরের বাংলাদেশ স্পেশিয়ালাইজড হসপিটালে (বিএসএইচ) যাই। ওই রাতে সেখানে গিয়ে দেখি ইমারজেন্সিতে একটা সিটও ফাঁকা নেই। 

কিছুক্ষণ পর একটা সিট ফাঁকা হলো। ইমারজেন্সির ডাক্তার বললেন। হসপিটালে ভর্তি করা লাগলে কিন্তু পারবেন না, সিট ফাঁকা নেই। 

আরো দুটো হসপিটালে ফোন করলাম। স্কয়ার এবং বিআরবি। সেখানেও বিছানা ফাঁকা নেই। বাসা থেকে আসার সময় রাস্তায় যতগুলো অ্যাম্বুলেন্স দেখেছি, তাতে মনে হচ্ছে আজ রাতে ঢাকা শহরে কোন হসপিটালেই সিট পাওয়া যাবে না। আগে ইমারজেন্সিতে ওর জ্বরটা ম্যানেজ করি। পরেরটা পরে দেখা যাবে। 

বিএসএইচের ইমারজেন্সিতে যতগুলো রোগী আছে তার বেশিরভাগই শিশু। এর মধ্য একটি বিছানার সামনে দুটি কিশোরী মেয়ে চিৎকার করে মাটিতে পড়ে হাহাকার করতে শুরু করলো। ওই বিছানায় ছিল ১৪ বছরের একটি ফুটফুটে কিশোরী। আমার বাবুর চাইতে মোটে দু বছরের বড়। সে ডেঙ্গু আক্রান্ত। কিশোরীটিকে এইমাত্র লাইফ সাপোর্টে নেয়া হলো। ইমারজেন্সির ডাক্তাররা তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হাহাকার করতে থাকা কিশোরীদুটি তার কাজিন।

বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের সুযোগ এলো। ডাক্তারকে জানালাম সব। ঝর্ণার জলে গোসল দেয়ার কথাও। তরুণ ডাক্তার মাথা নাড়লেন। বললেন গোসল করিয়ে ঠিক করেননি। যেহেতু নাপা দেয়া হয়েছে দু ঘন্টা আগে, তাই আপাতত নার্স এসে বাবুকে স্পঞ্জ করিয়ে দিল। 

নার্স যে দক্ষতায় স্পঞ্জ করলেন সেটা আমাদের জানা ছিল না। বাবুর মা কুইক লার্নার। সে স্পঞ্জ করার কৌশলটা শিখে নিল। ঘন্টা দুয়েক পর বাবুর জ্বর ১০১ এ চলে এলো। একবার ঘামলোও সে। 

যদিও ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ লিখেছে, কিন্তু আমরা তাকে বাসায় নিয়ে এলাম। 

ততক্ষণে আমরা জেনে গেছি, আজ রাতে ঢাকার কোন হাসপাতালে বিছানা ফাঁকা পাওয়া দুষ্কর হবে। আর বাবুর যেহেতু জ্বরের প্রথম দিন, তাই তার গায়ের তাপমাত্রা ম্যানেজ করা ছাড়া ডাক্তারদেরও আপাতত তেমন কিছু করার নেই।

ইমারজেন্সিতেই তার ডেঙ্গু এবং সিবিসি পরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গু নেগেটিভ এসেছে। কিন্তু আমরা জানি, ডেঙ্গু পরীক্ষায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক ফল আসে না। এটা একটা আইওয়াশ ছাড়া কিছু না। এই মৌসুমে জ্বর হলে ডাক্তররা ডেঙ্গু প্রটোকল মেনে চলারই পরামর্শ দেবেন।

বাসায় আনার পর সকাল নাগাদ আরো একবার ১০৭ ডিগ্রি তাপ উঠে যায়। ততক্ষণে তার মা অবশ্য জানে স্পঞ্জ করার কৌশল। পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা নির্ঘুম জেগে বসেছিল মেয়ের পাশে। টানা স্পঞ্জ করে করে গেছে। কিন্তু আমাদের সেই কৌশলও সঠিক ছিল না, সেটা জেনেছি আরো দুদিন পর। সেই ঘটনা বলছি একটু পর।

শনিবার রাতে বাবুর আরেকটা সিবিসি টেস্ট করি আমরা। এই দিনটি সে একটু ভাল ছিল। ভাল মানে, জ্বর ১০৪ এর বেশি হয়নি কোনোবার। বাবু প্লেফুল ছিল। তার স্কুলের একটা প্রোজেক্টের কাজ চলছে। তার বন্ধুরা এসে তাকে নিয়ে প্রোজেক্টের কাজ করেছে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। শরীরে তাপ থাকলেও হাসিআনন্দে দিন কেটেছে তার।  

রবিবার সকালে টেস্টের রেজাল্ট পাই আমরা। আগের সিবিসিতে বাবুর যে প্লেটলেট কাউন্ট ছিল, দ্বিতীয় সিবিসিতে তার প্লেটলেট কাউন্ট তার চেয়ে ষাট হাজার কম। আজকে তার শরীরটাও আগেরদিনের চাইতে খারাপ।

শনিবার বাংলাদেশে ৬ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ডেঙ্গু পজিটিভ হয়েছে শতশত মানুষ। 

প্রথম আলোতে এক চিকিৎসক দম্পতির ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর বিবরণ ছাপা হয়েছে। এই চিকিৎসক দম্পতি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতে পারেননি তাদের শিশুটির এত খারাপ অবস্থা। চেনাজানা কোনো উপসর্গই তার শরীরে ছিল না। বাসাতেই চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। যখন শিশুটির অবস্থা খারাপ হয় তখন তারা হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই হসপিটাল ঘুরে সিট না পেয়ে আরো বহু সময় ধরে যানজট ঠেলে শিশুটিকে যখন অনেক দূরের স্কয়ার হসপিটালের পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে নিয়ে ভর্তি করানো হয়, ততক্ষণে তার অন্তিম সময় এসে গেছে। তারপর শিশুটি বেঁচেছিল সামান্য সময়। 

এসব খবর পড়ার পর একজন জ্বরতপ্ত শিশুর পিতার মনের অবস্থা কি দাঁড়ায় বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই।

স্পঞ্জ করার সঠিক উপায়

বাবুকে ছোটবেলা থেকেই যে কোন অসুখ বিসুখে আমরা ডক্টর তৌফিকের কাছে নিয়ে যাই। 

ডক্টর তৌফিক একজন জনপ্রিয় পেডিয়াট্রিক কনসালট্যান্ট।  তিনি শিশুদের সাথে তাদের ভাষায় কথা বলেন। তাদেরকে সময় দেন। এমনকি তার টেবিলে থাকে বাটিভর্তি ক্যান্ডি। শিশুরা সেখান থেকে ইচ্ছেমতো মুঠোভর্তি ক্যান্ডি নিয়ে যেতে পারে। 

বাবুরও খুব পছন্দের তিনি। তার চেম্বারে ঢুকে বাবু সাধারণত বাসার মতই চঞ্চলতা থাকে। বাসায় থাকলে সে সারাক্ষণ যেভাবে নাচতে থাকে ওখানেও সে একই কাজ করে। এটাওটা নাড়েচাড়ে। ড. তৌফিক তার স্বভাবসুলভ শিশুতোষ ভঙ্গিতে বাবুকে আশকারা দেন। তিনি সম্ভবত তার সকল রোগীকেই এই আশকারাটা দেন বলেই এত জনপ্রিয়।

ড. মুহাম্মদ তৌফিক বিএসএইচ হসপিটালের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট। রবিবার সন্ধ্যায় বিএসএইচ হসপিটালে সম্ভবত তার রোগীর সংখ্যাই ছিল সবচাইতে বেশি। 

অধিকাংশ শিশু জ্বর আক্রান্ত। এখানে এসে বুঝতে পারি ডেঙ্গুভীতি আবিষ্ট করে রেখেছে শহরের সকল কমবয়েসী শিশুর পিতামাতাকে।

তিনি রিপোর্ট-টিপোর্ট দেখে খুব চিন্তিত হলেন বলে মনে হলো না। বরং আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “বাচ্চাকে একটা ফুল হাতা গেঞ্জি পরিয়েছেন। তার ওপর একটা হাফ হাতা। তার ওপরে একটা কম্বল। এত ঢেকেঢুকে রাখলে জ্বর পালাবে কীভাবে? টেম্পারেচরতো সব শরীরের ভেতরেই রয়ে যাবে। এইসময় ওকে যত কম কাপড়ে রাখা যায় তত মঙ্গল।  এসি চালিয়ে রাখবেন।” 

-কিন্তু বাবুতো ঠান্ডায় কষ্ট পায়!

-কষ্ট পাক। তারপরও এটা করতে হবে। তাকে ঠান্ডা করতে হবে। মনে রাখবেন, তাকে এখন এই কষ্টটা দিচ্ছেন যাতে সে ভবিষ্যতে আরাম পায়। ভাল থাকে।

বললেন ডক্টর তৌফিক। তারপর ফের জিজ্ঞেস করলেন:

-জ্বর নামানোর জন্য কী কী করেছেন আপনারা?

-মাথায় পানি ঢেলেছি। আর স্পঞ্জ করেছি।

-কতক্ষণ করেছেন? কতবার করেছেন?

-ননস্টপ করেছি।

-আর কী করেছেন?

-গোসল করিয়েছি।

-কতক্ষণ করিয়েছেন? 

-চার মিনিট। কিন্তু ইমারজেন্সির ডাক্তার বললো গোসল করিয়ে নাকি ঠিক করিনি।

- এখানেই তো আমরা ভুলটা করি। আমার নার্সদের পর্যন্ত বোঝাতে পারিনা ব্যাপারটা। সবাই আপত্তি করে, বলে বেশি ভেজালে তো ঠান্ডা লেগে যাবে!

বললেন ডক্টর। তারপর ফের জিজ্ঞেস করলেন। 

-আচ্ছা চার মিনিট গোসল করানোর সময় তার টেম্পারেচর কম ছিল। কিন্তু গোসলের পর?

-কিছুক্ষণ পর আবার স্পঞ্জ এবং মাথায় পানি।

-স্পঞ্জ কীভাবে করেছেন?

-তোয়ালে ভিজিয়েছি। তারপর নিঙড়ে নিয়েছি। তারপর গা মুছিয়েছি।

একটু হতাশভাবে মাথা নাড়লেন তিনি। তারপর বললেন, তোয়ালে নিঙড়ানো যাবে না। বাচ্চাকে পলিথিন ধরণের একট পানি নিরোধকের ওপর শোয়াবেন। তারপর তার শরীর থেকে যথাসম্ভব জামাকাপড় খুলবেন। তারপর একটি তোয়ালে ভিজিয়ে না নিঙড়ে বাচ্চার শরীরের যথাসম্ভব এলাকা ঢেকে দেবেন। তোয়ালে শুকিয়ে গেলে বা গরম হয়ে গেলে ওপর থেকে পানি ঢেলেই তোয়ালে আবার ভিজিয়ে দেবেন। 

ডক্টর আরো বললেন, শরীরের যেখানে যেখানে হাত দিয়ে উত্তাপ পাবেন, সেখানে সেখানেই ভেজাবেন। কোথাও তাপ জমতে দেয়া যাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত তাপ না কমবে, ততক্ষণ চালাতে হবে এমন। 

আর শরীরের ভেতরে তা জমে শরীরকে ডিহাইড্রেটেড বা শুষ্ক করে ফেলে। মানুষের শরীরের বেশিরভাগ অংশই যেহেতু পানি, তাই শুকিয়ে গেলে শরীরের অন্তর্বতী ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে। এটা থেকে সুরক্ষা পেতে আক্রান্তকে বেশি বেশি লিকুইড খাওয়াতে হবে। লিকুইড শরীরের অন্তর্বর্তী শুষ্ক অবস্থা দূর করবে। 

ডক্টর প্রেসক্রিপশনে লিখলেন - “পরবর্তী চার ঘণ্টায় বাবুকে ১৮০০ মিলিলিটার পানি বা অন্যান্য খাওয়াতে।”

১৮০০ মিলিলিটার! মানে পৌনে দুই লিটারের বেশি! অন্তত সাত গ্লাস!

হ্যাঁ, এতটাই খাওয়াতে হবে। কিন্তু একবারে খাওয়ানোর চেষ্টা করা যাবে না। তাতে বমি করে আবার হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই, চার ঘন্টা সময়ের মধ্যে ভাগ করে কিছু পরপর একটু একটু করে খাওয়ানোর পরামর্শ ড. তৌফিকের। 

তারপর বাবুর পেট টিপেটুপে, গলার মধ্যে টর্চ মেরে বললেন, এমনিতে ঠিক আছে। জিহ্বায় একটু ঘা আছে, ডিহাইড্রেশনের কারণে। পেটে যেহেতু ব্যথা নেই, আপাতত তেমন ভয়ের কিছু নেই। 

এই জ্বরটা ছয় দিনের মত ভোগায়, বললেন ডক্টর। সেদিন ছিল চতুর্থ দিন। আজ এই লেখা যখন লিখছি তখন বাবুর জ্বরের পঞ্চম দিন চলছে। 

ভয়ের এই সময়টাতে বাবুকে নিয়ে প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি দিন কীভাবে পার হচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতা না হয় আরেকদিন।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, আলাপ