তুরস্কের ইউরেশীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে বাংলাদেশ যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি

‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ - বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অংশকে জুড়ে দিয়ে আঁকা একটি মানচিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় এক বছর আগে, প্রফেসর ইউনূসের শাসনামলে। আর এ নিয়ে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ায় ভারত ও তুরস্ক। এর মধ্যে আবার তুরস্ক এলো কোথা থেকে?

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

নতুন সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ সফরে আসেন তুরস্কের প্রেসিডেন্টের ছেলে বিলাল এরদোহান, সঙ্গে এনেছিলেন ফুটবল সুপারস্টার মেসুট ওজিলকে।

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম তারকা ছিলেন ওজিল। একসময় জার্মানীর জাতীয় দলের হয়ে ফুটবল খেলেছেন, বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

তুর্কি বংশোদ্ভূত এই তারকা ২০২৩ সালে অবসর নেয়ার আগের দুবছর খেলেছেন তুরস্কের একটি ক্লাবের হয়ে। আর অবসর নেওয়ার পর যোগ দিয়েছে রাজনীতিতে, প্রেসিডেন্ট এরদোহানের ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) পদ নিয়েছেন।  

ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা সফরে এসে বিলাল এরদোহান ও মেসুট ওজিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মেডিকেল সেন্টারের সংস্কারকাজ উদ্বোধন করেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান এবং বিভিন্নজনের সাথে বৈঠক করেন। ঢাকার একটি বিজ্ঞাপনে মডেলও হয়েছেন ওজিল।

স্বাভাবিকভাবে এটাকে একটা নির্দোষ হাইলেভেল সফর মনে হতে পারে। কিন্তু ‘আপাত নির্দোষ’ সফরটিকে ভাল চোখে দেখেনি বাংলাদেশের পাশের দেশ ভারত। দেশটির কূটনৈতিক পাড়ার যারা বাংলাদেশ নিয়ে ডিল করেন, তারা এই সফরটি নিয়ে যে অস্বস্তি গোপন রাখেননি, সে খবরও বেরিয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র - একসময় বাংলাদেশের ভূরাজনীতির অঘোষিত ত্রিভুজ মনে করা হত এই তিন শক্তিকে। কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য- সর্বত্র তাদের প্রভাব।
কিন্তু কয়েকবছর ধরে এই ত্রিভুজে যোগ হয়েছে নতুন এক ভুজ - যা ত্রিভুজটিকে চতুর্ভুজে পরিণত করেছে - আর সেই চতুর্থ ভুজটি হচ্ছে তুরস্ক।

সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ থেকে রোহিঙ্গা সংকটে সক্রিয় ভূমিকা, নানাভাবে - নানা উপায়ে ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ক যেন নতুন গতিপথে এগোচ্ছে।

উঠতে বসতে, রাজনীতির অলিগলিতে আজকাল শোনা যাচ্ছে তুর্কি প্রভাবের কথা। এই প্রভাবে তুরস্কের বিপরীত প্রান্তে রয়েছে ভারত।

‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর একটি কথিত মানচিত্র নিয়ে গত বছর কূটনৈতিক অস্বস্তিতে জড়িয়ে পড়েছিল দুই দেশ।

প্রশ্ন উঠছে, সোয়া ছয় হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশে তুরস্কের স্বার্থ কী? তারা কি স্রেফ বন্ধুত্ব জোরদার করতে চায়? নাকি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভূখণ্ড বাংলাদেশে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় কথিত ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্র। উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত। সামনে আসে সালতানাত-ই-বাংলা নামের একটি গোষ্ঠীর বাংলাদেশে তৎপরতা চালানোর অভিযোগ।

‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্র নিয়ে দিল্লি-আঙ্কারা উত্তেজনা

বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু এলাকা নিয়ে তৈরি একটি মানচিত্রের ছবি সামনে আসে ২০২৫ সালে পহেলা বৈশাখের সময়। এই মানচিত্রটি উত্তেজনা সৃষ্টি করে ভারত ও তুরস্কের মধ্যে।

ইংরেজিতে এই মানচিত্রের নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’। অনেকেই এটাকে বলছেন, ‘সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ’ বা ‘বাঙ্গালাহ সালতানাত’।

এই মানচিত্রের পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ছিলেন মধ্যযুগের ইলিয়াস শাহি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং অবিভক্ত বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান।

তখনকার সোনারগাঁও, লখনৌতি ও সাতগাঁও একত্রিত করে ‘বাঙ্গালাহ’ নামে বিরাট এক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেটিই ইতিহাসে পরিচিত বাঙ্গালাহ সালতানাত হিসেবে।

বাংলাকে দিল্লির প্রভাব বলয় থেকে বের করেছিলেন শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। বাঙ্গালাহ সালতানাত ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ধনী, শক্তিশালী এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র।

আর পুরো বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল এখনকার ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম ও ওড়িশার কিছু অংশ।

ছয়শ বছর আগের সুলতানি আমলের সেই অঞ্চল নিয়ে তৈরি করা মানচিত্র সম্প্রতি আবার ফিরে আসে এবং ভূরাজনৈতিক মঞ্চে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। 
উত্তেজনার ঢেউ লাগে ভারতের পার্লামেন্টে। ২০২৫ সালের ৩১এ জুলাই রাজ্যসভায় 'গ্রেটার বাংলাদেশ' মানচিত্র নিয়ে আলোচনা হয়।

যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সরকারি ফ্যাক্ট-চেকিং প্লাটফর্ম এই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য ও অবস্থান তুলে ধরে।

এক বছর আগে উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি ঐতিহাসিক প্রদর্শনীতে ‘বিতর্কিত’ মানচিত্রটি আলোচনায় আসে। সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় সমালোচনা।

মানচিত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে দেখা যায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার কিছু অংশ এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকেও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় কথিত ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্র। উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত। সামনে আসে সালতানাত-ই-বাংলা নামের একটি গোষ্ঠীর বাংলাদেশে তৎপরতা চালানোর অভিযোগ।    

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে দেশটির সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, সালতানাত-ই-বাংলা' নামের একটি গোষ্ঠী এই মানচিত্র প্রচার করেছে। তাদের সমর্থন করছে তুরস্কের এনজিও 'টারকিশ ইউথ ফেডারেশন'।

কিন্তু জয়শঙ্করের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ সরকারের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিষয়ে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনার কাজ করে সংস্থাটি।

পিআইবি'র ফ্যাক্ট চেক, মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস টিমের নাম বাংলা ফ্যাক্ট। ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফ্যাক্ট চেক টিম চালু করা হয়।

‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ নিয়ে ভারতের উত্তেজনার মধ্যে বিতর্কে প্রবেশ করে পিআইবি। বাংলা ফ্যাক্ট টিম দাবি করে, “সালতানাত-ই-বাংলা নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব বা কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায়নি। তবে গত পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- শিক্ষক কেন্দ্রে ‘ভালো কাজের হালখাতা’ নামে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ বা সিবিএস নামের একটি সংগঠন।”

সেখানে বাংলা সালতানাতের মানচিত্র প্রদর্শনী করা হয় বলে জানায় বাংলা ফ্যাক্ট।

তারা আরো দাবি করে, ঐতিহাসিক মানচিত্র হিসেবেই তা প্রদর্শনী করা হয়, তথাকথিত গ্রেটার বাংলাদেশ-এর মানচিত্র হিসেবে নয়।”

এই ঘটনা সেখানেই থেমে যেতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বিভিন্ন জার্নাল ও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসতে থাকে গ্রেটার বাংলাদেশের মানচিত্র ও তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের খবর, বিশ্লেষণ ও মতামত।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা হয়। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে সেই আলোচনা।

ধর্মীয় দক্ষিণপন্থা, অন্তর্বর্তী সরকার ও তুরস্ক

দ্য ক্রেডল হলো- লেবাননভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন। পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ নিয়ে ২০২৫ সালের জুলাই মাসের একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে দ্য ক্রেডল লিখেছে, “তুরস্কের ইউরেশীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে বাংলাদেশ একটি অগ্রগণ্য ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারত ও মিয়ানমারের মাঝে এবং জনসংখ্যা মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।”

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থাণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এরপর বিদায় নিয়েছেন তিনি।

কিন্তু ইউনূসের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা হয়। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে সেই আলোচনা।  

দ্য ক্রেডলের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, “২০২৪ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের উত্থানকে আঙ্কারাপন্থি ও ইসলামপন্থিদের সহানুভূতিশীল প্রশাসন হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই সরকার তুরস্ক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের জন্য বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার পথ সুগম করে দিয়েছে।”

“তুরস্ক কেবল উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও সক্রিয় হয়।”

গ্লোবাল ইনফ্লুয়েন্স অপারেশনস রিপোর্ট এমন একটি সংস্থা, যাদের প্রধান লক্ষ্য পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি বৈশ্বিক যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া। বৈশ্বিক এই প্ল্যাটফর্মেও উঠে আসে, তুর্কি এনজিও সালতানাত-ই-বাংলার কথা, যারা বৃহৎ বাংলার মানচিত্র প্রকাশ করেছে বলে দাবি করা হয়।

অস্ত্র বিক্রির জন্য বাংলাদেশকে অন্যতম গন্তব্য মনে করছে তুরস্ক।

বাংলাদেশকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহায়তা

লেবাননের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর হলো বেইরুত। ভূমধ্যসাগরের তীরের শহরটি বহু সহস্রাব্দের ইতিহাস, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও সংঘাতের সাক্ষী। একসময় এটিকে বলা হতো মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস।

২০২০ সালের ৪ঠা অগাস্ট বেইরুত বন্দরের একটি গুদামে দুটি বিরাট বিস্ফোরণ ঘটে। কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় প্রাচীন শহরটির একটা অংশ।

তখন বন্দরের পাশেই ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বানৌজা বিজয়। ২০১০ সাল থেকে লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করে আসছিল।

বিস্ফোরণের সময় বেইরুত বন্দরের কাছেই ছিল জাহাজটি। ভয়াবহ বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিজয়। সংকটময় সেই সময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় তুরস্ক।

বিস্ফোরণের পরপরই তুরস্কের নৌবাহিনীর একটি ডুবুরি দল লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশে বানৌজা বিজয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে।

ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটি চলাচলের অনুপযুক্ত হওয়ায় তুরস্কের নৌবাহিনীর টাগবোট দিয়ে টেনে প্রায় ৪৫০ মাইল সমুদ্রপথ অতিক্রম করে তুরস্কে নিয়ে যাওয়া হয়।

তুরস্কের আকসাজ নেভাল ডকইয়ার্ডে কারিগরি ও যান্ত্রিক মেরামত সম্পন্ন করা হয়। আর এই কাজ করা হয় তুর্কি নৌবাহিনীর নিজস্ব কারিগরি সহায়তায়।

শুধু নৌবাহিনীর ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ মেরামতই নয়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে সামরিক সরঞ্জামাদি সরবরাহে তুরস্কর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে কী কী ধরনের সমরাস্ত্র তুরস্ক রপ্তানি করে, তা উঠে এসেছে পলিটিক্স টুডে’র একটি বিশ্লেষণে।

সেখানে লেখা হয়েছে, সরবরাহ পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ওতোকার কোবরা নামের হালকা সাঁজোয়া যান, গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট এবং ‘টিআরজি-৩০০ কাপলান’ সিরিজেরে মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। এসব ব্যবস্থায় তুর্কি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে অবস্থান করে সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণও দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে লেখা হয়, “২০২০ সালে বেইরুত বন্দর বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ মেরামতেও তুরস্ক সহায়তা দেয়। এর পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশি গোলাবারুদ কারখানায় আর্টিলারি শেল উৎপাদন লাইন স্থাপন, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা শিল্প ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে তুরস্কের একটি প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ।

বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক ও জামায়াতে ইসলামী

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের শুরু ৫২ বছর আগে, ১৯৭৪ সালের ২২এ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের লাহোরে ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। এর দুই বছর পর ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তুরস্কের দূতাবাস কার্যক্রম শুরু করে।

১৯৭৮ সালে তখনকার রাষ্ট্রপতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তুরস্ক সফর করেন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার নীতি গ্রহণ করেন তিনি। সেই সফর ছিল তারই অংশ।

সফরের পর ১৯৮১ সালে তুরস্কে চালু হয় বাংলাদেশের দূতাবাস। দুই দেশের সম্পর্কের বড় পরিবর্তন আসে ২০১০ সালে।

আবদুল্লাহ গুল তখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরে আসেন তিনি। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।

একই বছরের নভেম্বরে ঢাকায় আসেন তুরস্কের তখনকার প্রধানমন্ত্রী রেচেপ তায়েপ এরদোহান। সেই সময়ই সম্পর্কের বড় ধরনের অগ্রগতির আভাস পাওয়া গিয়েছিল।

২০১৫ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্পর্কের উঞ্চতার মধ্যে ২০১২ সালের এপ্রিলে তুরস্ক সফর করেন বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তবে এর কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ-তুরস্কের সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে টানাপোড়েন দেখা দেয় বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্নালের বিচার পর্যবেক্ষণ করতে তুরস্কের একটি ইসলামপন্থি এনজিও'র ১৪ সদস্যের দল ঢাকায় আসে। পরিচয় গোপন করার অভিযোগে তখন তাদের আটক করে তুরস্কে ফেরত পাঠায় বাংলাদেশ সরকার।

২০১৬ সালে বাংলাদেশকে প্রকাশ্যে নিন্দা জানায় তুরস্ক। অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের ক্ষমা করতে তখনকার রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কাছে চিঠি দেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।

জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও তৎকালীন আমীর মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে রেচেপ তায়েপ এরদোহান বিচারিক প্রক্রিয়ার নিন্দা জানিয়ে বক্তব্য দেন।

ঢাকায় নিযুক্ত তখনকার রাষ্ট্রদূতকে তুরস্কে ফিরতে নির্দেশ দেওয়া হয়। দিল্লিতে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত নিন্দা জানিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশ-তুরস্কের যে শীতলতা তৈরি হয়, তা অবশ্য অল্প দিনেই কেটে যায় অন্য একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে।

২০১৬ সালের ১৬ই জুলাই। তুরস্কের সেনাবাহিনীর একটি অংশ প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোহান এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান চেষ্টা চালায়। সেই সময় এরদোহান ছুটি কাটাচ্ছিলেন মারমারিসে।

তিনি সিএনএন তুর্ক-এ ফেসটাইমের মাধ্যমে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং জনগণকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে এবং রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বাধা দেয়। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়।

ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে এরদোহানকে বার্তা পাঠান শেখ হাসিনা। এরপর সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

তুরস্কের থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ-এর উপদেষ্টা সেলচুক কোলাগ্লু মিডল-ইস্ট ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২০১১ সালে ইসলামভিত্তিক রাজনীতির মতাদর্শ গ্রহণ করেছিল। এরই অংশ হিসেবে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলটি মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে যেমন সমর্থন দিয়েছিল, তেমনি বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর প্রতিও তাদের সমর্থন ছিল।

বাংলাদেশ সফরে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনি এরদোহান।

রোহিঙ্গা, সংস্কৃতি ও অস্ত্র নিয়ে তুরস্কের আগ্রহ

২০১৭ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সফরে আসেন এমিনি এরদোহান। তিনি তুরস্কের ফার্স্ট লেডি, প্রেসিডেন্ট এরদোহানের স্ত্রী। তখন বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের ঢল নেমেছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। প্রাণভয়ে রাখাইন থেকে পালাচ্ছেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা।

কক্সবাজারের উখিয়ার উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এমিনি এরদোহান। আগের দিন একটি বিশেষ বিমানে ঢাকায় আসেন তিনি।

সেই সফরে এমিনির সাথে ঢাকায় আসেন তুরস্কের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসোগলু। পরিবার ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী ফাতমা বেতুল সায়ান কায়া এবং বিলাল এরদোহান।

বিলাল এরদোহান সম্প্রতি সাবেক ফুটবল তারকা ওজিলকে নিয়ে বিলাল আরো একবার ঢাকা ঘুরে গেছেন, সেই ঘটনা আগেই বলেছি।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের ততকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ওআইসির বিশেষ জরুরি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ইস্তাম্বুলে যান।

সম্মেলনের ফাঁকে ইস্তাম্বুল কংগ্রেস অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে রাষ্ট্রপতি হামিদ ও প্রেসিডেন্ট এরদোহানের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তুরস্কের সক্রিয় ভূমিকার জন্য প্রেসিডেন্ট এরদোহানকে ধন্যবাদ জানান এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

সেই ঘটনার কয়েকদিন পরই দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় আসেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং দুটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন।

২০২১ সালের ২৯এ জুন তুরস্কের সঙ্গে ঐতিহাসিক এক চুক্তি করে বাংলাদেশ। সই করা হয় সরকারি পর্যায়ে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কেবল পণ্য কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্বের দিকে যাত্রা শুরু করে।

এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সামরিক সরঞ্জামের জন্য চীন ও রাশিয়ার ওপর দীর্ঘদিনের একক নির্ভরতা কমিয়ে তুরস্কের মতো নেটো-মানসম্পন্ন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর, সরকারি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় তুরস্কের বিখ্যাত অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রকেটসান-এর সাথে একটি চুক্তি হয়। এর ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে বিভিন্ন পাল্লার এবং আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট সিস্টেম সংগ্রহের সুযোগ পায়।

২০২১ সালের জুনেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে ৩ রেজিমেন্ট পরিমাণ টিআরজি-৩০০ মডেলের টাইগার মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম বা এমএলআরএস গ্রহণ করে। বাংলাদেশের ৪১ জন সামরিক সদস্য তুরস্কে টাইগার এমএলআরএস সিস্টেমের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।

তুরস্কের তৈরি বায়রেক্টার টিবি-২ ড্রোন এখন সারাবিশ্বেই আলোচিত। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি ও নির্ভুল হামলার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

বিশ্বের বহু দেশে এই ড্রোন রপ্তানি করে তুরস্ক। বাংলাদেশও তুরস্ক থেকে এই ড্রোন কেনার চুক্তি করেছে এবং যৌথভাবে ড্রোন তৈরির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাও হয়েছে।

আঙ্কারায় একটি সড়ক রয়েছে, যার নাম ‘বঙ্গবন্ধু বুলেভার্ড’। সড়কের পাশের একটি পার্কের নামও রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু নামে। সেখানে আছে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য।ৎ

বাংলাদেশে তুর্কি সিরিজের জনপ্রিয়তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ করেছে। বুরাক ওজচিভিট টার্কিশ অভিনেতা দুইবার বাংলাদেশ সফর করেন।

২০২১ সালে ভাস্কর্যটি স্থাপনের পর ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ সংলগ্ন পার্কের নাম রাখা হয় কামাল আতাতুর্ক পার্ক। আঙ্কারার চানকায়া এলাকায় 'জিয়াউর রহমান ক্যাডেসি' নামে রয়েছে আরেকটি সড়ক।

ফেনীর একটি স্কুলের নাম আতাতুর্ক মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক-এর নামে স্কুলটির নাম রাখা হয়েছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি স্থানকে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ নামে নামকরণ করা হয়। ঢাকায় মুস্তফা কামাল তুর্কি ভাষা কেন্দ্র নামে একটি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বুরাক ওজচিভিট সাম্প্রতিককালের জনপ্রিয় একজন টার্কিশ অভিনেতা। তুর্কি ভাষার 'কুরুলুস ওসমান' সিরিজে তার অভিনয় বাংলাদেশি দর্শকদের মন কেড়েছে। এই তারকা দুইবার বাংলাদেশ সফর করেন।

বাংলাদেশে তুর্কি সিরিজের জনপ্রিয়তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ করেছে। তুর্কি সিরিজের জোয়ার শুরু হয় বেসরকারি টেলিভিশনের মাধ্যমে। ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের ইতিহাস এবং মুসলিমদের বীরত্বের কাহিনি বাংলাদেশি দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করে।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এবং ইউটিউবে তুর্কি সিরিজের বাংলা সংস্করণগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পাচ্ছে। তুর্কি সিরিজের চোখ ধাঁধানো দৃশ্য ও লোকেশন দেখে বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে তুরস্ক ভ্রমণের প্রবণতা কয়েকগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশে তুর্কি পোশাকের স্টাইল এবং তুর্কি কফি বা কুইজিনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে এই সিরিজগুলো বড় ভূমিকা রাখছে।

তবে তুরস্কের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গা। সেখানে বারবার আসেন, এরদোহানের স্ত্রী, সন্তান। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তুরস্ক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে সবসময়।

১৮ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই ঢাকায় আসেন জার্মানির সাবেক তারকা ফুটবলার মেসুট ওজিল। সাবেক এই ফুটবলার তুরস্কের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য তিনি। ওজিলের সঙ্গে আসেন প্রেসিডেন্ট এরদোহানের ছেলে বিলাল এরদোহান।

তুরস্কের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি সংস্কার করা 'শহীদ বুদ্ধিজীবী মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার' উদ্বোধন করেন তিনি। পরেরদিন তারা যান কক্সবাজারে। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান পরিস্থিতি এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন। তারা মধুরছড়া খেলার মাঠে আরাকান রোহিঙ্গা ফুটবল ফেডারেশন (এআরএফএফ) আয়োজিত রোহিঙ্গা খেলোয়াড়দের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ দেখেন। খেলায় কিছু সময়ের জন্য নিজেও অংশ নেন মেসুত ওজিল।

তুরস্কের প্রভাব এড়াতে পারবে বাংলাদেশ?

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরেশিয়ায় আঙ্কারার বিস্তার একটি সুচিন্তিত সফট পাওয়ার কৌশলের ওপর নির্ভরশীল। টার্কিশ কোঅপারেশন অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন এজেন্সি (টিকা) শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।

অন্যদিকে টার্কিশ রিলিজিয়াস ফাউন্ডেশন বিদেশে মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় কেন্দ্র অর্থায়ন এবং তুর্কি ভাষাভিত্তিক ইসলামি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

পাশাপাশি বিদেশে প্রতিষ্ঠিত তুর্কি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন এক নতুন প্রজন্মের অভিজাত শ্রেণি গড়ে তুলছে, যারা আঙ্কারার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেলে।

বাংলাদেশে এই প্রচেষ্টা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে, যেখানে তুর্কি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম কল্যাণমূলক উদ্যোগের আড়ালে একটি রাজনৈতিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।

এসব উদ্যোগ কেবল দাতব্য কার্যক্রম নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক আনুগত্য তৈরির বিনিয়োগ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ভারতের সঙ্গে তুরস্কের যে বিরোধে চলছে, সেখানে বাংলাদেশকেও ক্ষেত্র বানিয়েছে দেশটি। ভারতের সঙ্গে বিরোধে পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক।

‘অপারেশন সিঁদুরের সময় ইসলামাবাদকে কূটনৈতিক সমর্থন দেয় আঙ্কারা। এদিকে আঙ্কারার সঙ্গে টানাপোড়েন রয়েছে এমন পক্ষগুলোর সাথে সংহতি প্রকাশ করছে দিল্লি।

ঐতিহাসিকভাবে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি ছিল পশ্চিমমুখী। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার মতো পূর্বের দূরবর্তী অঞ্চলে তার সম্পৃক্ততা সীমিত ছিল।

তবে ২০১৯ সালে ‘এশিয়া অ্যানিউ’ নীতি চালুর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। বিশেষ করে ২০২৫ সালকে এমন একটি বছর হিসেবে দেখা হয়, যখন আঙ্কারার ‘এশিয়া অ্যনিউ’ উদ্যোগে কৌশলগত ধারাবাহিকতা এবং বাংলাদেশের প্রচলিত অংশীদারদের বাইরে গিয়ে নতুন সম্পর্ক সম্প্রসারণের স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান এক বিন্দুতে মিলিত হয়।

ফলে ২০২৫ নাগাদ তুরস্ক–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে, যা বিশেষত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় দৃশ্যমান।

যদিও আঙ্কারা ও ঢাকার প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা নতুন নয়—এটি কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তবুও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ সহযোগিতা কেবল অস্ত্র বাণিজ্য থেকে সরে এসে একটি সমন্বিত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে।

এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকার এখন কোথায় নিয়ে যাবে?

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা খলিলুর রহমান কীভাবে তাদের আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতি সাজাচ্ছেন, সেখানেই হয়তো মিলবে এই প্রশ্নের উত্তর।