ইরানের পাহলভি রাজবংশ: উত্থান, পতন ও পুনরুত্থান

এক সময় ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আধুনিক দেশ বানাতে চেয়েছিলেন শাহ পাহলভি। বোরখা নিষিদ্ধ, পাশ্চাত্য আধুনিকতা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রসার। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করা ইরানের পাহলভিরা কীভাবে পরিণত হলেন স্বৈরশাসকে? আর কীভাবে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল তাদের? সেই পাহলভিদের উত্তরাধিকার আবার কি ফিরছেন ইরানের রাজনীতিতে?

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম

দুইটি প্রজন্ম ইরানকে যেভাবে দেখে আসছেন, পাঁচ দশক আগেও দেশটির চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান মানেই ছিল আধুনিকতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার এক উর্বর ভূমি। 

দেশটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া এতটাই লেগেছিল যে, এক সময় তেহরানকে বলা হতো ‘মিডলইস্টের প্যারিস’। আর এরসঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের নাম - পাহলভি রাজবংশ।

বর্তমানের অস্থির ইরানে অনেকের মুখে মুখে ঘুরছে একটি নাম—রেজা পাহলভি। ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সাবেক এই যুবরাজ।

আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার আগে সম্প্রতি ইরান কাঁপিয়ে দেওয়া যে গণআন্দোলন, সেখানেও একাংশের কণ্ঠে স্লোগান উঠেছে রেজা পাহলভিকে নিয়ে। কেউ কেউ চাইছেন- ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে, ইরানে আবার ক্ষমতায় আসুক পাহলভির উত্তরাধিকার।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সময় ও পরিবেশ কি সত্যিই তাদের পক্ষে?

রেজা পাহলভির দাদা রেজা শাহ পাহলভি ছিলেন এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। সাড়ে পাঁচ দশক ইরান শাসন করেছেন বাপ ও ছেলে মিলে। তাদের আমলেই হাজার হাজার বছরের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা ভেঙে, ইরানিরা পা রেখেছিল আধুনিকতার পথে। বদলেছিল অবকাঠামো, রাষ্ট্র ব্যবস্থা। আমূল পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছিল সমাজ ও মানুষের মননে।

প্রথম পাহলভির আমলে ইরানে নিষিদ্ধ ছিল বোরখা ও হিজাব। দ্বিতীয় পাহলভি শুরু করেছিলেন শ্বেত বিপ্লব বা হোয়াইট রেভোল্যুশন, যা নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। কৃষি সংস্কার থেকে নারীর অধিকার। শিক্ষা, অর্থনীতি, শিল্প-সংস্কৃতিতে এসেছিল ব্যাপক পরিবর্তন। ইরানের চলচ্চিত্র ও সংগীতে দেখা গিয়েছিল অভূতপূর্ব এক জাগরণ।

কিন্তু পাহলভির শাসনের শ্বেত উন্নয়নের আড়ালে ধীরে ধীরে জমেছিল ক্ষোভ। বিরোধীদের দমনপীড়ন, মতপ্রকাশের টুটি চেপে ধরা, আলেম ও কৃষকদের ক্ষেপিয়ে তোলা এবং ক্রমবর্ধমান স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল জনগণ।

শেষমেষ গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। নির্বাসনেই মৃত্যু হয় তার। 

সেই শাহের একমাত্র উত্তরাধিকার রেজা পাহলভি। আমেরিকাতে বিলাসী জীবনযাপন করেন। সেখান থেকেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন গত কয়েক বছর ধরে। নিজেকে তুলে ধরছেন ইরানের বিকল্প নেতা হিসেবে।

কিন্তু ইরানের বাস্তবতা আসলে কেমন? আদৌ কি আবার ফিরতে পারবেন পাহলভির উত্তরাধিকার? আগে কেমন ছিল তাদের শাসন এবং কেন ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হয়েছিল? 

আর কীভাবেই বা গড়ে উঠেছিল বিশ শতকের অন্যতম আলোচিত শাহ পাহলভি রাজবংশ?

পাহলভিদের ফিরিয়ে আনতে চান ইরানিরা? ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ইরানের ক্ষমতায় সাবেক যুবরাজকে ফেরানোর দাবি ওঠে

আমেরিকা-ইসরায়ের হামলার ঠিক আগে বড় বিক্ষোভে কেঁপে ওঠে ইরান। গত ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন শহরে আন্দোলন শুরু হয়। 

দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থায় অতিষ্ঠ মানুষ। এর ওপর তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, ইরানি রিয়ালের দরপতন এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক সংকট। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ আগেই ছিল। অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন নিয়ে জনগণের ক্ষোভ জমে ছিল। 

ইরানে বহিঃশক্তির বাইরের হামলা হলে বেশিরভাগ সময়ই গণআন্দোলন দুর্বল হয়ে জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়। কিন্তু গত ডিসেম্বরে হয়েছিল উল্টো। 

ওই বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক হতাশারই বহিঃপ্রকাশ নয়। এর পেছনে রয়েছে- শাসকগোষ্ঠীর প্রতি আস্থাহীনতা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনাচার ও একঘেয়ে শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তি চায় ইরানের মানুষ। 

তেহরান থেকে ইসফাহান, তাবরিজ থেকে মাশহাদ- ইরানের প্রায় সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। নগর থেকে গ্রাম, রাজপথ থেকে অলিগলি, বাজার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়- সর্বত্র গণআন্দোলন।  

ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত নড়িয়ে দেয়। বহু শহরে গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। 

বিক্ষোভ দমনে করতে কঠোর পথে হেঁটেছে ইরান সরকার। ইন্টারনেট বন্ধ। বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ। বলি হয়েছে অসংখ্য প্রাণ। 

বিবিসির প্রতিবেদনে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহতের কথা বলা হয়। যদিও কিছু কিছু সংস্থা, মৃত্যুর সংখ্যা ৮ থেকে ২০ হাজার বলে উল্লেখ করে। 

প্রচণ্ড দমনপীড়নে কমেনি মানুষের অংশগ্রহণ। বিক্ষোভের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। আর তাদেরই একটা অংশ বলছে, স্বৈরাচারের অবসান ঘটিয়ে, তারা আবার ফিরে পেতে চায় পাহলভিদের উত্তরাধিকার। 

কিছু বিক্ষোভকারী প্রকাশ্যে স্লোগান দেন, “এটাই শেষ লড়াই। ফিরে আসবেন পাহলভি।” 

তারা আরও বলেন, “স্বৈরশাসকের পতন হোক, শাহ চিরজীবী হোন।”

কে এই রেজা পাহলভি

শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাষ্ট্রীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে পরিবারের সাথে যুবরাজ রেজা পাহলভি

ফারসি শব্দ শাহ- এর অর্থ হলো রাজা বা সম্রাট। এক সময় দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে ইরানের রাজা বা শাসক ছিলেন পাহলভি রাজবংশের দুইজন। 

১৯৭৯ সালে অবসান ঘটে রাজতন্ত্রের। রেজা পাহলভিকে হটিয়ে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেন খোমেনি। কিন্তু ৪৭ বছর পর আবার সেই শাসকদের উত্তরাধিকার ফিরিয়ে আনার দাবি উঠছে। 

রেজা পাহলভি হলেন ইরানের শেষ শাহের ছেলে। রেজার বাবা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবনযাপন করেন এই যুবরাজ।

আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রোপলিটন কমিউনিটি অঞ্চল অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত। সেখানেই আড়াই একর জমির ওপর তৈরি একটি বাংলাতে থাকেন রেজা।

মূল্যবান ওই বাড়িটির ভবনই রয়েছে সাড়ে ১১ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে। জর্জিয়ান ধাঁচের পাথর ও ইটের তৈরি বাড়িতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ, উঁচু ছাদ, চারটি ফায়ারপ্লেস এবং হার্ডউড ফ্লোরিং। সব মিলিয়ে নিরিবিলি পরিবেশে বাড়িটি যেন আভিজাত্যের নিখুঁত এক প্রতিচ্ছবি। 

রিয়েল এস্টেট বিষয়ক রিয়েলটর ডটকম লেখা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে এই এস্টেটে প্রায় ২০ লাখ ডলারের সংস্কারকাজ করা হয়েছে, বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ ২২ কোটি টাকার মতো। আর বাড়িটির দাম তিন মিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা ৩৩ কোটি টাকার মতো।

জর্জিয়ান ধাঁচের পাথর ও ইটের দৃষ্টিনন্দন এই বাড়িতে থাকেন নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি

এই বাড়িতেই রাজপরিবারের বিলাসিতায় জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন করেন রেজা পাহলভি।  

অনেক ইরানি বলেন, দেশ থেকে অর্থ লুট করে নিয়ে প্রবাসে বিলাসী জীবনযাপন করছেন শাহের পরিবার। 

এই বাড়িটি থেকেই তিনি যোগাযোগ রাখেন ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধীদের সঙ্গে। পার্সিয়ান ভাষায় একটি গণমাধ্যম চালান।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধের মধ্যে। 

সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি নিজের জন্মভূমি ইরানের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পক্ষে কথা বলছেন। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেইনি নিহত হওয়ার পর পাহলভি বলেছেন, তার বিশ্বাস বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। 

রেজা পাহলভি মনে করেন, গত ৪৭ বছর দেশটির বাইরে থাকলেও ইরানের মানুষ তাকে একজন অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে বিশ্বাস করে। 

“জীবনের প্রতিটি বছরই ইরান আমার মনে ছিল। প্রতিদিন সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠি, তখন আমার মনে প্রথম যে বিষয়টি আসে, সেটি হলো ইরান।” 

পাহলভি আরও বলেন, তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক কল্পনা করেন এবং তার বিশ্বাস, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ভেঙে ফেলা উচিত।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তিনি নির্বাসিত জীবনযাপন করেন? কেন নিজ দেশে আসতে পারেন না? 

রেজা পাহলভির বাবা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ইরানের ক্ষমতায় বসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো কঠিন এক সময়ে। ক্ষমতায় বসেই নিজের বাবাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কেন ও কীভাবে পাঠিয়েছিলেন সেই ঘটনায় আসব আরো পরে। 

আগে আরেকটি ঘটনা বলি। ১৯৬৭ সালে রাজকীয় একটি অনুষ্ঠান হয় তেহরানে। ওই অনুষ্ঠানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়। যদিও তিনি ইরানের শাহ হয়েছিলেন ১৯৪১ সালে। 

২৬ বছর পরের ওই অনুষ্ঠান ছিল অনেকটাই প্রতীকী। তবে রাষ্ট্রীয় জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক হয়েছিল এই আয়োজনের মাধ্যমেই। 

সেখানে রাজবেশে দেখা যায় শিশু যুবরাজ রেজা পাহলভিকে। তখন তার বয়স মাত্র সাত বছর। শাহ মোহাম্মদের ছিল তিন স্ত্রী। শেষ স্ত্রীর প্রথম সন্তান হলেন রেজা পাহলভি। 

সেদিনের আয়োজন প্রতীকী হলেও, সেখানে ঘটেছিল দুটি ঘটনা। নিজেকে শাহানশাহ বা রাজাদের রাজা ঘোষণা করেন মোহাম্মদ রেজা। আর শেষ স্ত্রী ফারাহ পাহলভিকে ইরানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্রাজ্ঞী বা শাহবানু হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়।

সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন ইরানের যুবরাজ রেজা পাহলভি

রেজা পাহলভি তরুণ বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে টেক্সাসের লাবক শহরের রিস এয়ারফোর্স বেসে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন তিনি। 

কিন্তু রেজার ভাগ্য সহায় ছিল না। দেশত্যাগের মাত্র কয়েক মাস পরই ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে সংঘটিত হয় ইরান বিপ্লব। 

সেই গণঅভ্যুত্থান ছুঁয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক, সামাজিক, আদর্শিক ও অর্থনৈতিকসহ সব শ্রেণিকে। কারণ ছিল শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির দমনমূলক শাসন। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই ইরানে অবসান ঘটে সাড়ে পাঁচ দশকের পাহলভিদের শাসন। এরপর থেকে পাহলভিদের আর কেউ দেশে ফিরতে পারেননি। 

কিন্তু সাড়ে পাঁচ দশকের দীর্ঘ শাসনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল কীভাবে? আর কীভাবেই বা ইরানের ক্ষমতায় বসেছিল শাহ পাহলভিরা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরতে হবে ইতিহাসে। 

ইরানে পাহলভিদের উত্তান

রেজা খান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠেন দেশটির শাহ বা রাজা

বিশ শতকের গোড়ার দিকে দ্বিমুখী সংকটে জড়িয়ে পড়ে ইরান। ঔপনিবেশিক শক্তির চাপের মুখে স্বাধীনতা রক্ষা কঠিন হয়ে যায়। এই সংকট আরও তীব্র হয় দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য।

দুই বড় শক্তি রাশিয়া ও ব্রিটেনের টানাটানির মধ্যে পড়ে যায় ইরান। দেশটি ভাগ করে নিতে চায় দুই দেশ। ইরান নিয়ে রাশিয়া ও ব্রিটেনের বলপ্রয়োগের এই ঘটনাকে বলা হয় ‘গ্রেট গেম’। 

১৯০৭ সালে দুই পরাশক্তি নিজেদের প্রভাববলয়ে ইরানকে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ইরানের উত্তরে রাশিয়া এবং দক্ষিণে ব্রিটেনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সংকট আরও গভীর হয়। অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। আর তখনই উত্থান হয় পাহলভি রাজবংশের। 

পাহলভি বংশের প্রতিষ্ঠাতা রেজা খানের জন্ম সাধারণ এক পরিবারে। যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। পারস্য কসাক ব্রিগেড ছিল ইরান মিলিটারির গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অংশ। 

১৮৭৯ সালে রাশিয়ার সহযোগিতায় গঠন করা হয় এই কসাক ব্রিগেড। এই ব্রিগেডের প্রধান ছিলেন রেজা খান। 

ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন ভীষণ জটিল। নবগঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটিশদের জন্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরানেও সোভিয়েত প্রভাব বাড়ছিল। ঠিক সে সময় ব্রিটিশদের সহায়তার এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান রেজা খান। 

১৯২১ সাল। কসাক ব্রিগেড নিয়ে রেজা খান প্রবেশ করেন তেহরানে। তখন ছিল কাজার রাজবংশের শাসন। রাজাকে দুটো প্রস্তাব দেন রেজা খান। মন্ত্রিসভা ভেঙে দিতে হবে এবং তাকে বানাতে হবে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রেজা খানের কথামতো নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং নিজে হন যুদ্ধমন্ত্রী।  

১৭৮৫ সাল থেকে ইরান শাসন করছিল কাজার রাজবংশ। আহমেদ শাহ ছিলেন অপেক্ষাকৃত দুর্বল শাসক। এর ওপর ব্রিটিশ-সোভিয়েত দ্বন্দ্ব। রেজা খান একের পর এক আবদার তোলেন। আর তা মেটাতে থাকেন দুর্বল শাহ। 

এভাবেই ১৯২৩ সালে রেজাকে বানানো হয় প্রধানমন্ত্রী। এরপর একদিন চিকিৎসার নাম করে হঠাৎ উধাও হয়ে যান রাজা। ইউরোপ চলে যান আহমেদ শাহ। আর কখনোই ইরানে ফেরেননি তিনি। আহমেদ শাহের উৎখাতের মধ্য দিয়ে ইরানে সমাপ্তি ঘটে কাজার রাজবংশের শাসন।   

১৯২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রেজা খানকে শাহ বা রাজা ঘোষণা করে মজলিশ। ইরানের পার্লামেন্টকে মজলিশ বলা হয়। এরপর রেজা খান পাহলভি নাম গ্রহণ করেন। 

শাহ নাম বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ইরানের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস, রাজকীয় ঐতিহ্য এবং ইসলামের আগে পারস্যের গৌরবময় অতীতের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চেয়েছিলেন রেজা খান। একইসঙ্গে ইরানকে পশ্চিমের আদলে আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে নতুন রাজতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। ক্ষমতা বসেই নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কারে হাত দেন রেজা শাহ পাহলভি। 

পাহলভিদের আমল, ইরানে বোরকা নিষিদ্ধ

ক্ষমতায় এসেই ‘কাশফ-ই হিজাব’  বা উন্মোচন নীতির পক্ষে প্রচার শুরু করেন রেজা শাহ পাহলভি

ট্রান্স-ইরানিয়ান রেলপথ দুইটি সাগরকে যুক্ত করেছে। পারস্য উপসাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর। ১৪০০ কিলোমিটারের বেশি এই রেল ট্রাক হলো- ইরানের অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অবকাঠামো। 

এই রেলপথ নির্মাণ ছাড়াও রেজা শাহের সময়, শিক্ষা ও আইন সংস্কার আনা হয়। ছেঁটে ফেলা হয় ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। শিক্ষা হয় বাধ্যতামূলক। শত শত স্কুল নির্মাণ এবং ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়। 

ইরানকে দ্রুত পাশ্চাত্যধাঁচে আধুনিক করতে গিয়ে তখন এমন একটি আইন করেন রেজা শাহ পাহলভি, যা নিয়ে দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তা হলো- ইরানে নিষিদ্ধ করা হয় বোরকা, হিজাব ও ওড়না। 

ক্ষমতায় এসেই ‘কাশফ-ই হিজাব’ বা উন্মোচন নীতির পক্ষে প্রচার শুরু করেন রেজা পাহলভি। এর অর্থ হলো- নারী শিক্ষিকা ও ছাত্রীরা বোরকা, হিজাব, ওড়না বা চাদর পরে স্কুলে যেতে পারবে না। 

একই সঙ্গে পুরুষদেরও পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক ও টুপি পরতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন রেজা শাহ পাহলভি। 

১৯৩৬ সালের ৮ জানুয়ারি শাহ পাহলভি এক ডিক্রি জারি করেন। আর এর মাধ্যমে নিষিদ্ধ হয় ঐতিহ্যবাহী ইসলামি পর্দা ও ওড়না।

কাশফ-ই হিজাব নীতির ফলে জনসমক্ষে নারীদের হিজাব/চাদর/ঘোমটা পরা নিষিদ্ধ হয়ে যায়, বহু নারী বছরের পর বছর ঘরের ভেতরই বন্দি হয়ে পড়েন

কাশফ-ই হিজাব নীতি চালু হওয়ার সাথে সাথে জনসমক্ষে নারীদের হিজাব/চাদর/ঘোমটা পরা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ জোর করে নারীদের হিজাব খুলে দিত বলে অভিযোগ ওঠে। 

ধর্মপ্রাণ ও রক্ষণশীল পরিবারগুলোর অনেক নারী ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দেন।

হিজাব নিষিদ্ধ হওয়ায় বহু নারী বছরের পর বছর ঘরের ভেতরেই বন্দি হয়ে পড়েন। পুলিশের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে অনেকে রাতের আধারে কিংবা ঢাকা দেওয়া গাড়িতে চড়ে বাইরে বের হতেন।

বয়স্ক খ্রিষ্টান ও ইহুদি নারীরাও মাথার ওড়না দেন। নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। 

নানা ধরনের উন্নয়ন ও সংষ্কারমূলক কাজের পাশাপাশি রেজা শাহ নিজের ক্ষমতাও কেন্দ্রীভূত করতে থাকেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে সাধারণ মানুষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ইরানের পরাধীনতা

ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী রেজা শাহ পাহলভিকে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য করে

এরমধ্যে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পারস্য উপসাগর ও ইরানের তেলসম্পদ ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রেজা শাহ নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেন। কিন্তু তলে তলে জার্মানির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। 

শেষমেষ ইরানের মিত্ররাই আক্রমণ করে বসে ইরানকে। ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী রেজা শাহ পাহলভিকে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য করে। এরপর তার যুবক ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ১৯৪১ সালে শাহ বানানো হয়। যিনি ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আগে টানা ৩৮ বছর ইরান শাসন করেছেন। 

মোহাম্মদ রেজা পাহলভি নতুন শাহ হওয়ার পরই নিজের পিতাকে নির্বাসনে পাঠান। প্রথমে তার ঠিকানা হয় মরিশাস দ্বীপ। পরে সেখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৪৪ সালে জোহানেসবার্গে মৃত্যুবরণ করেন পাহলভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রেজা শাহ পাহলভি। 

২২ বছর বয়সে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি সিংহাসনে বসেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ইরানের উত্তর অংশ দখল করে রাখে সোভিয়েত বাহিনী। পরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পরে তারা সরে যায়। 

কিন্তু তরুণ শাহ-এর সামনে তখন অনেক চ্যালেঞ্জ। দুর্বল সিংহাসন, বিভক্ত দেশ এবং জাতীয়তাবাদী আবেগের এক নেতা হাজির হন রাজনৈতিক মঞ্চে। 

জাতীয়তাবাদী মোসাদ্দেগ ও অপারেশন ‘অ্যাজাক্স’

পারস্য উপসাগর ও ইরানের তেলসম্পদ ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে

তখন ইরানের তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো–ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি। আর এই ঘটনাই গভীর ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে।

সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে নতুন এক রাজনৈতিক ডামাডোলে ঢুকে পড়ে ইরান। সিআইএ ও এমআই-৬-এর গুপ্তচররা ইরানে শাসরুদ্ধকর এক অভিযান চালিয়েছিল, যা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে অনেকের কাছে। 

মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ ছিলেন ইরানের তুখোড় এক জাতীয়তাবাদী নেতা। ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। শুধু জনপ্রিয়ই নন, মোসাদ্দেগ ছিলেন ইরানের প্রভাবশালী এক পরিবারের সন্তান। তার বাবা কাজার রাজবংশের অর্থমন্ত্রী এবং মা ছিলেন কাজার রাজপরিবারের রাজকুমারী।

মোসাদ্দেগ নিজেও ছিলেন ঝানু রাজনীতিবিদ। ১৯০৬ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি নবগঠিত পার্লামেন্ট বা মজলিশ-এর প্রবেশ করেন নির্বাচিত হয়ে। ফার্স ও আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।  

১৯২৫ সালে যখন রেজা খান নিজেকে শাহ হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন তীব্র বিরোধিতা করেন মোসাদ্দেগ। এর ফলে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হন। 

কিন্তু ১৯৪১ সালে রেজা শাহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, আবার রাজনীতির মাঠে ফিরে আসেন মোসাদ্দেগ। ১৯৪৯ সালে তিনি বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তির সমন্বয়ে গড়ে তোলেন 'ন্যাশনাল ফ্রন্ট' নামের রাজনৈতিক মোর্চা। এই জোটের প্রধান লক্ষ্য ছিল তেলের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক করা।

ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ

ইরানের তেল সম্পদ ব্রিটিশ কোম্পানির হাত থেকে জাতীয়করণ করতে আন্দোলন শুরু হয়। এতে নেতৃত্ব দেন মোসাদ্দেগ। 

১৯৫১ সালের মার্চ মাসে মজলিসে তেল জাতীয়করণ বিল পাস হয়। এর পরের মাসেই মোসাদ্দেগকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। 

তেল জাতীয়করণ নিয়ে ব্রিটেনের সাথে চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে ইরান। অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয় ইরানের ওপর এবং বিশ্বজুড়ে ইরানি তেল বর্জনের ডাক দেয় ব্রিটিশরা। 

মোসাদ্দেগের জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক নীতি ব্রিটিশ ও মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিনিরা ভয় পাচ্ছিল যে, মোসাদ্দেক হয়ত সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। 

১৯৫৩ সালের অগাস্টে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ এমআইসিক্স তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে,  যার নাম ছিল 'অপারেশন অ্যাজাক্স'।

এই অভিযানে আলোচিত একজন হলেন কারমিট রুজভেল্ট জুনিয়র। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের নাতি।

Kermit-CIA.jpg

কারমিট ছিলেন দুঁদে গুপ্তচর। সিআইএর হয়ে কাজ করতেন। মোসাদ্দেগকে হটানোর পুরো নকশা তার হাতেই তৈরি হয়।  

অভিযান চালানোর জন্য কারমিট রুজভেল্ট নিজেই তেহরানে হাজিন হন। গোপন ডেরায় অবস্থান নেন। অভিযান চালাতে প্রায় ১০ লাখ ডলার তেহরানে পাঠায় সিআইএ। 

ঘুষ দেওয়া শুরু হয় সামরিক নেতা ও রাজনীতিবিদদের। জোগাড় করা হয় ভাড়াটে দাঙ্গাকারী।

মোসাদ্দেগের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাতে ডলার দেওয়া হয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ও ধর্মীয় নেতাদেরকেও। তাকে 'কমিউনিস্ট-ঘেঁষা' এবং 'ইসলামবিরোধী' হিসেবে চিত্রিত করা হয়। 

অনুগত সেনা কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে, শাহকে দিয়ে মোসাদ্দেগের বরখাস্তের আদেশ বা ফরমান সই করানো হয়। 

১৫ই আগস্ট ১৯৫৩ সাল। শাহের পক্ষ থেকে মোসাদ্দেগকে বরখাস্তের আদেশ নিয়ে যান এক সেনা কর্মকর্তা। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিস্থিতি দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ভয় পেয়ে যান। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ইটালির রোমে। 

কিন্তু সিআইএর কারমিট রুজভেল্ট ছিলেন নাছোড়বান্দা প্রকৃতির এক লোক। শাহ পালিয়ে গেলেও হাল না ছেড়ে তেহরানেই থেকে যান তিনি এবং কৃত্রিম দাঙ্গা ও বিক্ষোভ সৃষ্টি করেন।

সিআইএ-র ভাড়াটে লোক এবং শাহপন্থী সেনারা রাস্তায় নেমে অরাজক পরিবেশ সৃষ্টি করে

সিআইএ-র ভাড়াটে লোক এবং শাহপন্থী সেনারা রাস্তায় নেমে অরাজক পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলে। সামরিক ইউনিটগুলো তেহরান দখল করে এবং প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেগের বাড়িতে হামলা চালায়। 

প্রচণ্ড সংঘর্ষে কয়েকশো মানুষ নিহত হয়। মোসাদ্দেগ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তাকে গ্রেফতার করে সামরিক আদালতে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আমৃত্যু নিজ গ্রামে গৃহবন্দি করে রাখা হয় তাকে।

মোসাদ্দেকের পতনের পর শাহ দেশে ফিরে আসেন এবং ইরানে আবারও স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেগের বাড়িতে হামলা চালিয়ে মোসাদ্দেগকে গ্রেফতার ও পরে সামরিক আদালতে বিচার করা হয়

তবে ওই ঘটনা ইরানিদের মধ্যে তীব্র পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। 

রেজা পাহলভির সংস্কার ও আধুনিক ইরান

তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত বিশেষ বাহিনী প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও চিকিৎসাসেবা দিতেন

ক্ষমতা আঁকড়ে থাকলেও শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ছিলেন একজন উচ্চাভিলাষী সংস্কারক। ১৯৬৩ সাল। ইরানে ‘শ্বেত বিপ্লব’ ঘোষণা করেন শাহ। ভূমি সংস্কার, বন জাতীয়করণ, নারীর ভোটাধিকার, সাক্ষরতা বাহিনী গঠনসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এখনও আলোচিত। 

আড়াই হাজার বছর রাজতন্ত্রের অধীনে থাকা ইরানের সমাজ ছিল ঘুঁনে ধরা এবং সামন্ততান্ত্রিক ঘরানার।

সেই সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে আধুনিক ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। 

জমিদারদের হাত থেকে ভূমির দখল কেড়ে নিয়ে বণ্টন করেন সাধারণ ও দরিদ্র কৃষকদের মাঝে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রসারে তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠন করা হয় বিশেষ বাহিনী। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও চিকিৎসাসেবা দিতেন।

এই বিপ্লবের ফলে ইরানের সামাজিক পরিমণ্ডলে এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতার জোয়ার আসে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নারীরা। তারা ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা পান। বাল্য বিয়ে ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। 

পোশাকের ওপর রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ আর রাখা হয় না। বাবার আমলের আইন শিথিল করেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। নারীদের পোশাকের বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দে পরিণত হয়। তারা হিজাব কিংবা পশ্চিমা ফ্যাশনের মিনি স্কার্ট ও জিন্স পরতে পারতেন।

১৯৬০ ও ৭০-এর দশককে ইরানি সিনেমার স্বর্ণযুগ বলা হয়। সে সময় জনপ্রিয় বা বাণিজ্যিক সিনেমা এবং শিল্পসম্মত সিনেমা- দুই ধারায় সমান্তরালভাবে এগিয়েছিল।

এই আধুনিকতার ছাপ সরাসরি পড়েছিল ইরানের চলচ্চিত্রেও। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশককে ইরানি সিনেমার স্বর্ণযুগ বলা হয়। সে সময় জনপ্রিয় বা বাণিজ্যিক সিনেমা এবং শিল্পসম্মত সিনেমা- দুই ধারায় সমান্তরালভাবে এগিয়েছিল। 

ইরানের চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনায় ছিল বৈচিত্র। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং রোমান্টিক কিংবা সাহসী সামাজিক গল্পগুলো, কোনোরকম ধর্মীয় সেন্সরশিপ ছাড়াই রুপালি পর্দায় উঠে আসত। 

তেহরান তখন হয়ে উঠেছিল শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র, যা বিশ্বজুড়ে 'মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

দাউদ মেহরজুইয়ের 'দ্য কাউ' এর মতো সিনেমা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা পায়। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও অভিনেত্রী গুগুশ সেই সময়ের ফ্যাশন আইকন ও নারী স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। 

সংস্কারক থেকে স্বৈরাচার পাহলভি

ইরানের শেষ শাহ বা রাজা মোহাম্মদ রেজা পাহলভি

তবে দ্রুতগতির আধুনিকায়ন ও পাশ্চাত্য রীতিনীতির প্রসার সব মহলে সমানভাবে সমাদৃত হয়নি। বিশেষ করে দেশটির রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতৃত্ব এই পরিবর্তনকে ইসলামি ঐতিহ্যের পরিপন্থি এবং পশ্চিমা শক্তির আগ্রাসন হিসেবে মনে করতে থাকে।

জমি হারানোর ফলে অসন্তুষ্ট ভূস্বামী এবং রাজনৈতিক প্রভাব হারানো আলেম সমাজ, শাহের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে শুরু করে। 

পেট্রো ডলারের বিনিময়ে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটলেও বৈষম্য ও সামাজিক সমস্যা বেড়ে যায়। দ্রুত দানা বাধতে শুরু করে গণঅসন্তোষ।

আর তখনই ব্যাপক বলপ্রয়োগ করে শাহ পাহলভীর তৈরি অত্যাচারী বাহিনী সাভাক। পুরো নাম- সাজামানে এতেলাত ভা আমনিয়াতে কেচভার। ইরানের পাহলভি রাজবংশের আমলের কুখ্যাত রাষ্ট্রীয় বাহিনী। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-এর সরাসরি কারিগরি ও প্রশিক্ষণ সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। 

মোসাদ্দেগের পতনের পর শাহের শাসনের বিরুদ্ধে হুমকি হতে পারে, এমন ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজরদারি চালানো এবং স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের প্রেক্ষাপটে ইরানে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও কমিউনিস্ট কর্মকাণ্ড রুখে দেওয়ার মতো দমনমূলক উদ্দেশ্য নিয়েই গঠন করা হয় সাভাক।  

নিষ্ঠুর নির্যাতন পদ্ধতি, বিনা বিচারে আটক এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিল এই বাহিনী। তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগার ছিল তাদের প্রধান বন্দিশালা। 

এক সময় ইরানে সাভাকের প্রায় ৬০,০০০ এজেন্ট ও তথ্যদাতার একটি বিশাল নেটওয়ার্ক ছিল। এই বাহিনীর নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক ও ঘুণা সৃষ্টি হয়েছিল। 

শাহ পাহলভির পতন ও ইসলামি বিপ্লব

১৯৭৮ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ ও আন্দোলন হয় 

সবমিলিয়ে ১৯৭৮ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয় ইরানে। পুলিশের গুলিতে বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর, সেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা ইরানজুড়ে।

১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি দেশ ত্যাগ করেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসন ত্যাগ করেননি। 

একটি গণভোটের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের পয়লা এপ্রিল ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।

দেশ থেকে পালিয়ে মিশর, মরক্কো, বাহামা ও মেক্সিকোতে অবস্থান করেন। পরে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। 

কিন্তু সেখানেও টিকতে পারেননি। তাকে আশ্রয় দেওয়ায় তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালায় বিপ্লবীরা। ৫২ জন আমেরিকার কূটনীতিক ও নাগরিককে আটক করে। 

এই জিম্মি ঘটনার জের গড়ায় বহুদূর। জিম্মি মুক্ত করতে না পারায় ভোটে হেরে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। রোনাল্ড রেগন জিতে যাওয়ার জিম্মিরা মুক্ত হন। 

তেহরানে মার্কিন কূটনীতিকদের জিম্মির ঘটনায় আমেরিকায় আশ্রয় পানামা হয়ে আবার কায়রোতে ফিরে যান শাহ পাহলভি।

সেখানে তাকে আশ্রয় দেন মিশরের তখনকার প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। ১৯৮০ সালে মারা যান শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। 

এই সময় আরেকটি ঘটনা ঘটে। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৮০ সালে কায়রোতে একটি প্রতীকী অভিষেক অনুষ্ঠান করে নিজেকে শাহ ঘোষণা করেন যুবরাজ রেজা পাহলভি। এরপর তিনি বিভিন্ন সময় নিজেকে শাহ বা ইরানের রাজা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। 

পাহলভিদের পুনরুত্থান কি সম্ভব

২০২৩ সালে ইসরায়েল সফর করেন পাহলভি

ব্রিটানিকার বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বিপ্লবের সময় পাহলভির বাবা ছিলেন অত্যন্ত অজনপ্রিয়। তবে বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি ইরানিদের হতাশা বাড়তে থাকলে পাহলভির পরিচিতি ও প্রভাব বাড়ে—বিশেষ করে তরুণ ইরানিদের মধ্যে।

রেজা পাহলভি নিজেও বদলেছেন। তিনি রাজা হিসেবে না, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পক্ষের শক্তি হয়ে ইরানে ফিরতে চান। 

বর্তমান ইরানের ভেতর পাহলভি পরিবারের বাস্তব কোনো শক্ত উপস্থিতি নেই। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট পাহলভিকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। 

২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তা পাহলভিকে আবারও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ২০২৩ সালে ইসরায়েল সফর করেন পাহলভি। সেখানে তিনি হলোকাস্ট স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এতে ইরানে মতবিরোধ আরও বাড়িয়ে তোলে। 

কেউ এই ঘটনাকে বাস্তববাদী কূটনীতি হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন এতে ইরানের আরব ও মুসলিম মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েল হামলা চালানোর পর পাহলভি ওই আক্রমণের নিন্দা জানাননি। বরং কয়েক দিন পর তিনি একটি ভিডিও বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেইনিকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন এবং ইরানিদের আশ্বস্ত করেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটলেও বিশৃঙ্খলায় পড়বে না ইরান। 

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করেছে। নিহত হয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা খামেইনিসহ শীর্ষ কমান্ডাররা। 

আয়াতোল্লাহ আলি খামেইনির নিহত হওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানান নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি। 

সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তিনি লেখেন, “আমরা দেখছি এমন একটি সহিংস ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, যা দশকের পর দশক ধরে আমাদের মানুষকে হত্যা করেছে, অবশেষে আঘাতের মুখে পড়েছে। আর ইরানের ভেতরে অনেক ইরানি এই ঘটনায় এক ধরনের বেদনামিশ্রিত স্বস্তি অনুভব করছেন।” 

রেজা পাহলভি ইরানের রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরতে চাচ্ছেন, তবে নিজেকে আর সিংহাসনের অপেক্ষমাণ রাজা হিসেবে ভাবছেন না। বরং জাতীয় পুনর্মিলনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চান তিনি। 

ইরানের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন ও নারীর সমান অধিকারের পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে রেজা পাহলভি। 

আর রাজতন্ত্র ফিরবে, নাকি প্রজাতন্ত্র হবে- সে সিদ্ধান্ত তিনি ছেড়ে দিতে চান জাতীয় ভোটের ওপর।

ইরানের সরকার তাকে হুমকি হিসেবে দেখলেও, উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিসর ও বিশ্বাসযোগ্য জরিপ না থাকায় রেজা পাহলভির প্রকৃত সমর্থন কতটা- তা পরিমাপ করা যায় না। তবে ইরানে এখনও কেউ কেউ তার পরিবারকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। 

তবে অনেকই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তারা মনে করেন- গণতন্ত্রের নামে আরেকজন অনির্বাচিত শাসককে কি আবার ক্ষমতায় বসানো হবে?

নির্বাসিত এই যুবরাজ আদৌ ইরানের ক্ষমতার ফিরবেন কিনা তা এখনো অমীমাংসিত বিষয়।