ইন্দিরার মৃত্যুদূত ছিল একটি বাজপাখি

নভেম্বরে জন্ম, নভেম্বরে বাবার ভূমিকা, নভেম্বরে নিজের ভূমিকা, আর অক্টোবরের শেষ দিনে মৃত্যু। এটা কাকতালীয়। কিন্তু মানুষ কাকতালের মধ্যেও অর্থ খুঁজতে ভালোবাসে। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর তদন্তে উঠে এসেছিল একটি বাজপাখির কথা। শিখ ঐতিহ্যে বাজ সাধারণ পাখি নয়। বাজকে তারা পবিত্র জ্ঞান করে। এই গল্পের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা এখানেই - একটি পবিত্র প্রতীক কীভাবে একটি হত্যার বৈধতা হয়ে উঠতে পারে?

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪১ পিএম

১৯২৮ সালের গ্রীষ্ম। মুসৌরিতে দশ বছরের মেয়ে ইন্দিরা, এলাহাবাদে বাবা জওহরলাল নেহরু। দূরে থাকা মেয়েকে তিনি চিঠিতে বোঝাচ্ছেন পৃথিবীর ইতিহাস: নুড়িপাথর কীভাবে হয়, নদী কীভাবে বয়, মানুষ কীভাবে সভ্য হলো। সেই চিঠিগুলোই পরে ‘লেটার্স ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার’ নামে বই আকারে প্রকাশ হয়।

নেহরু চেয়েছিলেন মেয়ে প্রকৃতিকে পড়ুক যুক্তি আর পর্যবেক্ষণ দিয়ে। কোনো অলৌকিক বার্তা দিয়ে নয়।

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা তিনি লিখলেন ১৯২৯ সালের নভেম্বরে। নভেম্বর ইন্দিরার জন্মমাস, ১৯১৭ সালের ১৯এ নভেম্বর তার জন্ম। দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা এল ১৯৩১ সালের অক্টোবরে। তারপর ১৯৭৩ সালের পয়লা নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা নিজে বাবার বইয়ের নতুন সংস্করণের ভূমিকা লিখলেন। বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন, শুধু ভারতের নয়, সব মানুষের স্বাধীনতার কথা ভাবতে।

সেই ভূমিকা লেখার ঠিক ১০ বছর ১১ মাস ৩০ দিন পর, ১১ বছর পূর্ণ হতে মাত্র একদিন বাকি থাকতে, ১৯৮৪ সালের ৩১এ অক্টোবর, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাগানে গুলিতে নিহত হলেন ইন্দিরা। ৬৭তম জন্মদিনের তখনও ১৯ দিন বাকি।

নভেম্বরে জন্ম, নভেম্বরে বাবার ভূমিকা, নভেম্বরে নিজের ভূমিকা, আর অক্টোবরের শেষ দিনে মৃত্যু। এটা কাকতালীয়। কিন্তু মানুষ কাকতালের মধ্যেও অর্থ খুঁজতে ভালোবাসে।

ইন্দিরার মৃত্যুর তদন্তে উঠে এসেছিল একটি বাজপাখির কথা।

শিখ ঐতিহ্যে বাজ সাধারণ পাখি নয়।

শিখদের কাছে বাজ কেন পবিত্র

শিখ ঐতিহ্যে বাজ সাধারণ পাখি নয়। দশম গুরু গোবিন্দ সিংকে ছবিতে প্রায়ই দেখা যায় হাতে বাজ নিয়ে। বাজ সাহস, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। অনেক শিখ তাকে সৌভাগ্যের চিহ্ন মনে করেন, বাজ দেখলে থেমে প্রার্থনা করেন। এটা বিশ্বাসের স্বাভাবিক অংশ, সহিংসতার নয়।

এই কথাটা মনে রাখা জরুরি। কারণ এই গল্পের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা এখানেই: একটি পবিত্র প্রতীক কীভাবে একটি হত্যার বৈধতা হয়ে উঠতে পারে।

স্বর্ণমন্দিরের আগুন

আশির দশকের গোড়ায় পাঞ্জাব অশান্ত। শিখ নেতাদের একটি অংশ আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাবের ভিত্তিতে বেশি স্বায়ত্তশাসন চাইছিল। আন্দোলন করছিল আকালি দল। এর মধ্যেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন জার্নেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে। তার অনুসারীদের হাতে হত্যা, পাল্টা পুলিশি দমন, সহিংসতা বাড়তেই থাকে।

১৯৮৩ সালের শেষ দিক থেকে ভিন্দ্রানওয়ালে ও তার সশস্ত্র সঙ্গীরা অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির চত্বরে, শিখদের পবিত্রতম স্থানে, ঘাঁটি গাড়েন। অকাল তখত ঘিরে গড়ে ওঠে প্রতিরক্ষা, জমা হয় অস্ত্র।

১৯৮৪ সালের পয়লা জুন থেকে সেনাবাহিনী চত্বরটি ঘিরে ফেলে। অভিযানের নাম ‘অপারেশন ব্লু স্টার’। মূল আক্রমণ চলে ৫ই থেকে ৬ই জুন রাতে, ট্যাংক ও কামান নিয়ে। তখন মন্দির চত্বরে ছিলেন বহু তীর্থযাত্রী, কারণ সময়টা ছিল শিখদের এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিবসের।

ভিন্দ্রানওয়ালে নিহত হন। অকাল তখত বিধ্বস্ত হয়। শিখ রেফারেন্স লাইব্রেরি পুড়ে যায়, ছাই হয় বহু পুরোনো পাণ্ডুলিপি। সরকারি শ্বেতপত্রে সেনাবাহিনীর ৮৩ জনের মৃত্যুর কথা আছে, আর সাধারণ মানুষ ও জঙ্গি মিলিয়ে নিহত ৪৯৩ জন। শিখ সংগঠন ও স্বাধীন সূত্রগুলো বলে, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি, বিশেষ করে তীর্থযাত্রীদের।

দেশে-বিদেশে শিখ সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সরকারের সমর্থকেরা বলেন, জঙ্গিদের সরাতে আর কোনো পথ ছিল না। সমালোচকেরা বলেন, পবিত্র স্থানে সেনা পাঠানোর আবেগীয় ও রাজনৈতিক মূল্য হিসাব করা হয়নি। সেই বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, দুজনের কার্যকর হয়েছে, একজন ফিরেছেন। বিচার শেষ হয়েছিল চার বছরে।

বাজ দেখা গেল

ওই ক্ষোভের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর দুই নিরাপত্তারক্ষী, বিয়ন্ত সিং ও সৎবন্ত সিং, হত্যার পরিকল্পনা করেন।

তদন্তকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে একটি গাছে একটি বাজ এসে বসে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিযুক্ত সাব-ইন্সপেক্টর বলবীর সিং সেটি দেখে সহকর্মী বিয়ন্ত সিংকে ডাকেন। অভিযোগ ছিল, তারা প্রার্থনা করেন এবং পাখিটির আসাকে ঐশ্বরিক ইঙ্গিত মনে করেন। ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউপিআইয়ের খবরেও তদন্তকারীদের এই অভিযোগের উল্লেখ ছিল।

অর্থাৎ বাজপাখির গল্প কেবল সংবাদমাধ্যমের কল্পনা নয়। সেটি তদন্ত ও বিচারের অংশ। অভিযুক্তদের একাংশের মনে পাখিটিই হয়ে উঠেছিল ইন্দিরার মৃত্যুদূত।

এই প্রার্থনাই বলবীর সিংয়ের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মোড় হয়ে দাঁড়ালো। ১৯৮৪ সালের ৩রা ডিসেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হলেন। ১৯৮৬ সালের ২২এ জানুয়ারি বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন, হাইকোর্টও তা বহাল রাখলো। ১৯৮৮ সালের ৩রা আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট বলল, শিখ ঐতিহ্যে বাজ পবিত্র, বাজ দেখে প্রার্থনা করলেই কেউ হত্যার ষড়যন্ত্রকারী হয়ে যায় না। তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ মেলেনি। বলবীর সিং খালাস পেলেন। তাকে প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছিল, তার বেশির ভাগ সময় ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে।

এখানে একটা সূক্ষ্ম ব্যবধান আছে। একটি পাখি দেখা এক ব্যাপার, আর সেই দেখাকে খুনের আদেশ বলে ধরে নেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। পাখির আদেশ দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। আদেশটা আসে মানুষের ভেতর থেকে, আর সে নিজের সিদ্ধান্তের দায় ঈশ্বরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।

শেষ ভাষণ, শেষ সকাল

হত্যার আগের দিন, ৩০এ অক্টোবর, ওড়িশার ভুবনেশ্বরে জনসভায় ইন্দিরা নিজের মৃত্যুর কথা বলেছিলেন। আজ আছেন, কাল হয়তো থাকবেন না। দেশের সেবায় প্রাণ গেলে তার গর্ব হবে, তার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা ভারতকে শক্তিশালী করবে।

অনেকে একে পূর্বাভাস বলেন। জীবনীকারদের মতে ব্যাখ্যা সরল: ব্লু স্টারের পর তিনি জানতেন, তার জীবন হুমকির মুখে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা শিখ রক্ষীদের সরাতে বলেছিলেন। ইন্দিরা রাজি হননি। তার যুক্তি ছিল, তাতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতিই ভেঙে পড়বে।

৩১এ অক্টোবর, বুধবার, সকাল প্রায় ৯টা ১০ মিনিট। ১ নম্বর সফদরজং রোডের বাসভবন থেকে পাশের ১ নম্বর আকবর রোডের কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন ইন্দিরা। সেদিন তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল ব্রিটিশ অভিনেতা ও নির্মাতা পিটার উস্তিনভের। নিরাপত্তাচৌকির কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিয়ন্ত ও সৎবন্ত। ইন্দিরা এগোতেই বিয়ন্ত পিস্তল বের করে গুলি চালান, সৎবন্ত চালান স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। কয়েক সেকেন্ডে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এইমস হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো যায়নি।

পরিহাস এই: যাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সরাতে তিনি রাজি হননি, তাদেরই দুজনের হাতে তার মৃত্যু হলো।

 ৩০এ অক্টোবর, ওডিশার ভুবনেশ্বরে জনসভায় ইন্দিরা নিজের মৃত্যুর কথা বলেছিলেন।

কার কী শাস্তি হলো

এই হত্যার বিচারে শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল:

বিয়ন্ত সিং ঘটনাস্থলেই অন্য রক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। সৎবন্ত সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সরাসরি খুনের। কেহর সিং ছিলেন বিয়ন্তের আত্মীয়, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ষড়যন্ত্রের। দুজনই মৃত্যুদণ্ড পান, সুপ্রিম কোর্টও তা বহাল রাখে, আর ১৯৮৯ সালের ৬ই জানুয়ারি তিহার কারাগারে দুজনের ফাঁসি হয়। ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তৃতীয় আসামি বলবীর সিং নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড পেয়েও সুপ্রিম কোর্টে খালাস পান।

অর্থাৎ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, দুজনের কার্যকর হয়েছে, একজন ফিরেছেন। প্রধানমন্ত্রী হত্যার বিচার মাত্র চার বছরে শেষ হয়ে গিয়েছিল।

নিরপরাধের রক্ত

কিন্তু ইন্দিরার হত্যাকারী ছিলেন দুজন। পরের কয়েক দিনে দিল্লিসহ ভারতের নানা শহরে শিখরা আক্রান্ত হলেন, কেবল শিখ হওয়ার অপরাধে।

বাড়িতে আগুন, দোকান লুট। রাস্তায় ধরে ধরে পুরুষদের হত্যা, অনেক জায়গায় গলায় টায়ার পরিয়ে পুড়িয়ে মারা। নারীরা যৌন সহিংসতার শিকার হলেন। কোনো কোনো পাড়ায় গোটা পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

সরকারি হিসাবে সারা দেশে নিহত ৩,৩২৫ জন, তার মধ্যে দিল্লিতেই ২,৭৩৩ জন। কিন্তু এ হিসাব নিয়ে কেউ নিশ্চিন্ত নন। মানবাধিকার সংগঠন ও শিখ সংগঠনগুলোর মতে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি, কোনো কোনো হিসাবে আট হাজারেরও ওপরে। বহু লাশ নথিতে ওঠেনি, বহু পরিবারে খবর দেওয়ার মতো কেউ বেঁচে ছিল না। অভিযোগ ছিল, পুলিশ নিষ্ক্রিয় থেকেছে এবং কংগ্রেসের কিছু নেতা জনতাকে উসকানি দিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কংগ্রেস নেতা সাজ্জন কুমার ছিলেন সেই অভিযোগের কেন্দ্রে। তিনবারের সংসদ সদস্য। ২০১৩ সালে নিম্ন আদালত একটি মামলায় তাকে খালাস দেয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দিল্লি হাইকোর্ট সেই খালাস বাতিল করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়। রায়ে আদালত বলেছিল, অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছে এবং পুলিশ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরেক মামলায় আবার যাবজ্জীবন। ২০২৬ সালের ২০এ অগাস্ট, ৮০ বছর বয়সে, কারাবন্দি অবস্থায় তিনি মারা যান।

ওদিকে ইন্দিরার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বলবীর সিং। শোনা যায়, বাজপাখি  দেখে তিনি প্রার্থনা করেছিলেন। এই সূত্রেই তিনি ফেঁসে যান ইন্দিরা হত্যাকাণ্ডে। অবশ্য হত্যাকারী একজনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বও ছিল। ১৯৮৮ সালের ৩রা অগাস্ট ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তাকে এই মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস ঘোষণা করে। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। অন্যদিকে হাজারো হত্যার নেতৃত্বের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তিনি সংসদে বসেছেন, আর সাজা পেয়েছেন ৩৪ বছর পর। যে রাষ্ট্র একজন রক্ষীর বিচার চার বছরে শেষ করতে পারে, হাজার হাজার হত্যার বিচারে তার লেগেছে চার দশক। এই তুলনা বিচারের গতির, কোনো ব্যক্তির নয়।

১৯৭৫ সালের ২৫এ জুন জরুরি অবস্থা জারি করেন ইন্দিরা। বিরোধী নেতাদের জেলে পোরেন, সংবাদপত্রে সেন্সর লাগে, নাগরিক অধিকার হয় স্থগিত।

বন্ধু ইন্দিরা, শাসক ইন্দিরা

ইন্দিরার চরিত্রে একটি বৈপরীত্য আছে, যা না বললে তার জীবনের প্রতিচ্ছবি অসম্পূর্ণ থাকে।

একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইন্দিরা হয়ে উঠেছিলেন মানবতার মূর্ত প্রতীক, অকৃত্রিম বন্ধু। কোটি শরণার্থীর জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

সেই ইন্দিরার সরকারের বাহিনী নিজ দেশে নকশাল দমনে চালিয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থান থেকে যে আন্দোলনের শুরু, তা মাওবাদী বিপ্লবের রূপ নেয়। ১৯৭০ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসনের পর কেন্দ্র দায়িত্ব নেয়। ১৯৭১ সালের জুলাই-আগস্টে সেনা, সিআরপিএফ ও স্থানীয় পুলিশ মিলে চলে ‘অপারেশন স্টিপলচেজ’। ১৯৭২ সালের মার্চে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্য পুলিশের দমন আরও বাড়ে। জুলাই ১৯৭২-এ চারু মজুমদার গ্রেপ্তার হন, ১২ দিনের মধ্যে পুলিশ হেফাজতে মারা যান।

একটি গবেষণাভিত্তিক হিসাবে ১৯৭০ সালের মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের অগাস্ট পর্যন্ত কলকাতা ও আশপাশে নিহত নকশাল সদস্য ও সমর্থকের সংখ্যা ১,৭৮৩। বহু তরুণকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে ‘সংঘর্ষে মৃত্যু’র গল্প সাজানোর অভিযোগ ইতিহাসে রয়ে গেছে। এই অভিযোগ থেকেই জন্ম নেয় নাগরিক অধিকার সংগঠন এপিডিআর।

তারপর ১৯৭৫ সালের ২৫এ জুন জরুরি অবস্থা জারি করেন ইন্দিরা। বিরোধী নেতাদের জেলে পোরেন, সংবাদপত্রে সেন্সর লাগে, নাগরিক অধিকার হয় স্থগিত।

মা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর দিনই প্রধানমন্ত্রী হন রাজনীতিতে অনিচ্ছুক ছেলে রাজীব গান্ধী।

নিয়তি

ইন্দিরার সন্তানদের জীবনেও ইতিহাস রেহাই দেয়নি। বড় আশা ছিলেন ছোট ছেলে সঞ্জয়। জরুরি অবস্থায় তিনিই ছিলেন ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র, জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ ও উচ্ছেদ অভিযান যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৮০ সালের ২৩এ জুন, ইন্দিরা ক্ষমতায় ফেরার মাত্র মাস পাঁচেক পর, ৩৩ বছর বয়সে সঞ্জয় বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন অনিচ্ছুক রাজনীতিতে টেনে আনা হয় বড় ছেলে রাজীবকে, পেশায় যিনি ছিলেন বিমানচালক। মায়ের মৃত্যুর দিনই তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯১ সালের ২১ মে, নির্বাচনী প্রচারে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমবুদুরে, ৪৬ বছর বয়সে, আত্মঘাতী বোমায় নিহত হন তিনিও।

পরিবারের যারা বেঁচে, রাজীবের স্ত্রী সোনিয়া, সন্তান রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা কংগ্রেসের রাজনীতিতে, আর সঞ্জয়ের স্ত্রী মেনকা ও ছেলে বরুণ অন্য রাজনৈতিক শিবিরে। ক্ষমতার পরিবারে কেউই নিরাপদ ছিলেন না। নিয়তি যেন ইতিহাসের হিসাব মেলাতে বসেছিল।

গান্ধী নামের ভার

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেস। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু ছিলেন ইন্দিরার বাবা। ‘গান্ধী’ পদবি এসেছে স্বামী ফিরোজ গান্ধীর কাছ থেকে, মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক ছিল না। তবু এই নামের সঙ্গে অহিংসা আর মানুষের মর্যাদার যে নৈতিক ঐতিহ্য ভারতের মনে জড়িয়ে ছিল, তার ছায়া পরিবারটির ওপর পড়েছিল।

সেই ধারারই উত্তরাধিকারী ইন্দিরার শাসনামলে নিজ দেশের মাটিতেই রাষ্ট্রের হাতে মানুষ মরেছে: নকশাল দমনে, জরুরি অবস্থায়, স্বর্ণমন্দিরের অভিযানে। আর তার মৃত্যুর পর কংগ্রেসেরই কিছু নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, হাজার হাজার নিরপরাধ শিখকে হত্যার নেতৃত্ব দেওয়ার। নেহরু মেয়েকে শিখিয়েছিলেন সব মানুষের স্বাধীনতার কথা ভাবতে। ইতিহাস সেই শিক্ষার একটা তিক্ত হিসাব রেখে গেল।

৩১এ অক্টোবর ২০২৬, ইন্দিরা হত্যার ৪২ বছর পূর্ণ হলো।

১৯৮৪ সালের ৩১এ অক্টোবর, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাগানে গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী।

সিজারের অমঙ্গল থেকে ইন্দিরার বাজপাখি

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার সঙ্গে বাজপাখির সম্পর্ক ইতিহাসের একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শাসকের মৃত্যুকে ঘিরে পশুপাখির উপস্থিতি বা অস্বাভাবিক আচরণের গল্প বহু প্রাচীন।

রোমান শাসক জুলিয়াস সিজারের হত্যাকাণ্ডের আগেও নানা অমঙ্গলের লক্ষণের কথা প্রচলিত ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালের ১৫ মার্চ রোমান সিনেটের একদল সদস্য সিজারকে হত্যা করেন। প্রাচীন লেখক প্লুতার্ক ও সুয়েতোনিয়াসের বিবরণে তার মৃত্যুর আগে অস্বাভাবিক ঘটনা, অশুভ স্বপ্ন এবং বলিদানের পশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অমঙ্গলের চিহ্ন পাওয়ার কথা রয়েছে।

বলি দেওয়া পশুর হৃৎপিণ্ড অনুপস্থিত থাকার কাহিনিও এই ঐতিহ্যের অংশ।

তবে এসব ঘটনা সিজারের মৃত্যুর সমসাময়িক বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা তথ্য নয়। এগুলো প্রাচীন ইতিহাসলেখকদের সংরক্ষিত বিবরণ, যেখানে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোককথা মিশেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল ভবনেও ‘ডেমন ক্যাট’ নামে একটি রহস্যময় বিড়ালের কিংবদন্তি রয়েছে। কথিত আছে, বড় জাতীয় বিপর্যয়ের আগে বিড়ালটি দেখা দেয়। কিন্তু জন এফ কেনেডির হত্যার আগে বিড়ালটির উপস্থিতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

এই উদাহরণগুলোর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর বাজপাখির পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

সিজারের ক্ষেত্রে অমঙ্গলের লক্ষণগুলো মূলত তার আসন্ন মৃত্যুর পূর্বাভাস হিসেবে বর্ণিত। কিন্তু ইন্দিরার ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা অভিযোগ করেছিলেন, পাখিটির উপস্থিতি হত্যার পরিকল্পনাকারীদের একাংশের কাছে প্রতিশোধের বার্তা হয়ে উঠেছিল।

অর্থাৎ, একটি ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে। অন্যটিতে প্রকৃতির প্রতীককে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক হত্যার নৈতিক বৈধতা তৈরির সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে।

যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় প্রতীককে সম্মান জানানো আর হত্যার ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়।