খড়্গে ইউপিএল: প্রকাশকদের রাজনীতি নাকি বাজার দখলের খেল?

যে কেউ চাইলেই বই কেনবেচা বন্ধ করতে পারাটা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। আমরা কি সেই সমস্যার সমাধান খুঁজছি, নাকি প্রতিটি ঘটনায় নতুন পালটা বয়ান তৈরি করতে করতে এমন এক পরিচয়-সংঘাতে ঢুকে পড়ছি, যেখানে সমাধানের চেয়ে ক্ষোভ বেশি দৃশ্যমান, আর উগ্র ভাষাই বেশি পুরস্কৃত হচ্ছে?

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

ড্যান ব্রাউনের সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘দ্য সিক্রেট অব সিক্রেটস’ প্রকাশ হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। থ্রিলার উপন্যাসটি এগিয়েছে বইটির অন্যতম প্রধান চরিত্র বিজ্ঞানী ক্যাথরিন সলোমনের একটি বইকে কেন্দ্র করে। যে বইটিতে তিনি মানুষের চেতনা নিয়ে এমন কিছু আবিষ্কারের কথা লিখেছেন, যা প্রকাশিত হলে বহু প্রতিষ্ঠিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তার পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের সার্ভারে রাখা। একসময় সেই পাণ্ডুলিপি এবং ব্যাকআপ মুছে দেওয়া হয়। বইটির সম্পাদক জোনাস ফকম্যানের কাছে ছাপা একটি কপি থাকার কারণে তাকেও অপহরণ করা হয়। উদ্দেশ্য, বইটি যেন কোনোভাবেই প্রকাশ না হয়। 

বাংলাদেশে বই প্রকাশের জন্য একজন প্রকাশককে জীবনও দিতে হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১এ অক্টোবর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতির কার্যালয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ফয়সল আরেফিন দীপনকে। জাগৃতি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অভিজিৎ রায়ের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’। একই দিন লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলের কার্যালয়েও হামলা হয়। আহত হন টুটুল, রণদীপম বসু ও তারেক রহিম। আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকনটিনেন্ট (একিউআইএস)পরে দুই হামলার দায় স্বীকার করেছিল বলে জানিয়েছিল কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস।

বই, লেখক আর প্রকাশককে ঘিরে বাংলাদেশের সহিংস ইতিহাস অবশ্য দীপনের হত্যারও বহু আগের। দাউদ হায়দারের একটি কবিতা তাকে দেশছাড়া করেছিল। তসলিমা নাসরিনের বই নিষিদ্ধ হয়েছিল, তার মৃত্যুদণ্ডের দাবি উঠেছিল। হুমায়ুন আজাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল। এই ঘটনাগুলোর বড় অংশে ধর্ম, ধর্মীয় অনুভূতি এবং উগ্রবাদের প্রশ্ন ছিল সামনে। কিন্তু গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে এর আরেকটি রূপ ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে। বইয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর পাশাপাশি প্রকাশকরাও যোগ হয়েছেন। কখনো বইমেলার স্টল নিয়ে, কখনো সরকারি টাকায় বই কেনা নিয়ে, কখনো প্রকাশক সমিতির সদস্যপদ নিয়ে। আর এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে যখন দলীয় রাজনীতি যুক্ত হচ্ছে, তখন বইয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নের পাশে আরেকটি প্রশ্ন এসে দাঁড়াচ্ছে।

বইয়ের বাজারের দরজা কে পাহারা দেবে?

আদর্শ: বই নিষিদ্ধ নয়, তবু মেলায় বিক্রি করা যাবে না

এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ছবি দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায়। আদর্শ প্রকাশনীকে সে বছর প্রথমে কোনো স্টলই বরাদ্দ দেয়নি বাংলা একাডেমি। আপত্তির কেন্দ্রে ছিলো তিনটি বই- ফাহাম আবদুস সালামের ‘বাঙালির মিডিয়োক্রিটির সন্ধানে’, জিয়া হাসানের ‘উন্নয়ন বিভ্রম’ এবং ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ‘অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অভাবনীয় কথামালা’। বই তিনটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলো না। কিন্তু বাংলা একাডেমির সূত্রের বরাতে তখন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, একদল লেখক ও প্রকাশক বই তিনটির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। একই সূত্র তিন লেখককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সরকারবিরোধী’ মুখ হিসেবেও বর্ণনা করেছিল।

আদর্শ আদালতে যায়। হাইকোর্ট আদর্শকে বইমেলায় স্টল দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সঙ্গে একটি শর্ত ছিলো– ওই তিনটি বই মেলায় প্রদর্শন বা বিক্রি করা যাবে না। অর্থাৎ বইগুলো দেশে নিষিদ্ধ নয়, অথচ দেশের সবচেয়ে বড় বইমেলায় রাখা যাবে না। পরে বাংলা একাডেমি আপিল করলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে। শেষ পর্যন্ত আদর্শ বইমেলায় অংশ নিতে পারেনি। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু আদর্শ প্রকাশনীর জন্য নয়। এখানে নিষেধাজ্ঞাটি ছিলো এক ধরনের মধ্যবর্তী ব্যবস্থা। বই রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ না করে দোকানে বিক্রি করা যাবে, কিন্তু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে বাজার সঙ্কুচিত করার চেষ্টা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে সময় আদর্শের প্রকাশনার স্বাধীনতার পক্ষে যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশ্যে দাঁড়িয়েছিল, তাদের একটি ছিল ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ইউপিএল। তিন বছর পর অন্য এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ইউপিএলকেই একটি বৈধ বই বিক্রি করার জন্য হেনস্তার মুখে পড়তে হলো।

বাপুসের নেতৃত্বে রাজনীতির ছায়া

এই জায়গা থেকে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস) এর ভেতরের রাজনীতির দিকে তাকানো দরকার। আর সেটি গভীরে যাওয়ার আগে তিনটি তথ্য জানিয়ে নেওয়া ভালো:

১. আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছরগুলোতে সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন মো. আরিফ হোসেন ছোটন। তিনি শুধু বাপুস-এর নেতা ছিলেন না, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৩ নাম্বার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাও ছিলেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর জুলাই-অগাস্টের সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের ঘটনায় করা একাধিক মামলায় তার নাম আসামির তালিকায় এসেছে।

২. বর্তমান বাপুস সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা, যিনি ৫ই অগাস্টের পরে বাপুস-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি একই সঙ্গে বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া বগুড়া ৬ আসন থেকে উপনির্বাচন করে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। বাদশা ১৯৮০-এর দশক থেকে ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি বগুড়ার স্থানীয় ব্যবসা ও প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বহু বছর ধরে বাপুস বগুড়া জেলা শাখার নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাদশা ও পরিবারের প্রকাশনীর নাম রুদাবা পাবলিকেশন।

৩. ৫ই অগাস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রকাশকদের একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের সংগঠন সামনে আসে। নভেম্বর ২০২৪-এ ‘জাতীয়তাবাদী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’র আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। প্রকাশিত তালিকায় সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন জাসাসের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান সরদার এবং কেন্দ্রীয় জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক মো. জহির দীপ্তি। লাবণী, অনন্যা, এশিয়া পাবলিকেশন্স, প্রান্ত, বর্ণমালা, মেরিট ফেয়ার, কলি, বাবুই ও কালিকলম প্রকাশনার প্রতিনিধিরাও ছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই জাতীয়তাবাদী সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ, বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এবং বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি যৌথভাবে বাংলা একাডেমির কাছে দাবি জানায়। দাবির একটি ছিলো, আগের সরকারের ‘দোসর’ ও সুবিধাভোগী হিসেবে তারা যেসব প্রকাশককে চিহ্নিত করছেন, তাদের বইমেলায় প্যাভিলিয়ন না দেওয়া।

পরের বইমেলায় প্যাভিলিয়ন ও স্টল বরাদ্দ নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে প্রকাশ্য বিভক্তিও দেখা যায়। যারা বরাদ্দ হারিয়েছিলেন বা ছোট স্টল পেয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ পাল্টা অভিযোগ করেন, নতুন প্রকাশক নেতাদের চাপেই এসব ঘটছে। বইমেলা কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলে, বরাদ্দ উপকমিটির সম্মিলিত সিদ্ধান্তে হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে প্রকাশকদের সংগঠন এবং দাবি-দাওয়ার ভাষাও বদলেছে। তবে এই পরিবর্তন বোঝার জন্য আরেকটু পেছনে যাওয়া দরকার।
 
শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে প্রকাশক ইউপিএল বিপদে পড়ার পেছনে উপরের তিনটি তথ্য থেকে আমরা কী পাই? প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরে রাজনৈতিক ছত্র-ছায়ায় কিছু প্রকাশক ‘ট্যাগ’- এর রাজনীতি কায়েম করে মূলত বাজার ধরার চেষ্টা করছেন না তো!

কিন্তু এখানেই একটি বিষয় আলাদা করে বলা দরকার। এই প্রতিবেদনের জন্য আলাপ-এর সঙ্গে কথা বলা একাধিক প্রকাশকের প্রায় অভিন্ন বক্তব্য হলো, রেজাউল করিম বাদশাকে শুধু তার বিএনপি পরিচয় দিয়ে বর্তমান সংকটের মূল ব্যক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, তিনি বাপুস এর এই দায়িত্ব নিতে খুব আগ্রহীও ছিলেন না। মানুষ হিসেবে তাকে তারা সজ্জন বলেই মনে করেন। এসব প্রকাশকের অভিযোগ বরং সংগঠনের ভেতরের আরেকটি স্তর নিয়ে। তাদের ভাষ্য, বাপুসের কিছু সক্রিয় ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী এমনভাবে সংগঠনের দৈনন্দিন প্রভাববলয় নিয়ন্ত্রণ করছেন যে কখনো কখনো সভাপতির কাছ পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু বাপুস সভাপতির রাজনৈতিক পরিচয় নয়। প্রশ্নটি হলো, বাপুসের মধ্যে এজেন্ডা তৈরি করছেন কারা?

গাইড বইয়ের বাজারে ২০১৬ সালের হুমকি

বাংলাদেশের প্রকাশনা ব্যবসা এক ধরনের ব্যবসা নয়। একদিকে সাহিত্য, গবেষণা, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং সৃজনশীল বা মননশীল বইয়ের প্রকাশনা। অন্যদিকে নোট, গাইড, অনুশীলন ও সহায়ক বইয়ের বিশাল বাজার। দুই বাজারের অর্থনীতি আলাদা। স্বার্থও অনেক সময় আলাদা। ২০১৬ সালে সেই দ্বন্দ্ব খুব খোলামেলাভাবে সামনে আসে। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে এনসিটিবির অনুমোদন ছাড়াই সহায়ক বই প্রকাশের সুযোগ রাখার বিরোধিতা করেছিলেন ৩৪ জন শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক। তাদের আশঙ্কা ছিলো, এতে শিক্ষার্থীদের কোচিং এবং সহায়ক বইয়ের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। প্রতিক্রিয়ায় ওই বছরের ২৪এ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বাপুস। সেখানে সমিতির নেতারা বলেন, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না এলে সমিতির সদস্যরা তাদের লেখা বইয়ের ‘প্রকাশ, ক্রয়-বিক্রয় ও সংরক্ষণ’ বন্ধ করে দেবেন।

এই একটি বাক্য বাংলাদেশের প্রকাশনা ব্যবসার একটি পুরোনো সমস্যাকে খুব স্পষ্ট করে। রাষ্ট্র  কিংবা আদালত বলেনি- বই নিষিদ্ধ হবে। লেখকের বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবসায় যারা আছেন, তাদের সংগঠন বলেছে, তারা লেখকের বাজার বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে প্রকাশকের হাতে আরেক লেখক বা প্রকাশকের বাজার বন্ধ করার চিন্তাটি ৫ই অগাস্টের পরে নতুন করে জন্মায়নি। রাজনৈতিক রং বদলাতে পারে, ব্যবসায়িক শক্তির এই ব্যবহার আরও পুরোনো।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে কী হয়েছিল

ইউপিএলের কর্মীদের পুলিশে আটকের ঘটনাটি ঘটেছে ২৮এ সেপ্টেম্বর বিকালে। তার আগেই সকালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে ঘটে আরেকটি ঘটনা। সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিলো খুবই টেকনিক্যাল একটি বিষয় নিয়ে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বেসরকারি গ্রন্থাগারের জন্য প্রকাশকদের কাছ থেকে বই কেনে। প্রকাশকদের অভিযোগ ছিলো, বই জমা দেওয়া, কাগজপত্র নিয়ে গুলিস্তানের অফিসে যাওয়া এবং পুরো ক্রয়প্রক্রিয়াটি ঝামেলাপূর্ণ। সেই প্রক্রিয়া অনলাইনে আনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল ‘বুক প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সফটওয়্যার’। সকাল ১১টায় সেই সফটওয়্যারের পরিচিতি, পর্যালোচনা ও মতামত নেওয়ার সভা ডেকেছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য, সম্প্রচার ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

কিন্তু সফটওয়্যার নিয়ে আলোচনা শুরুই করা যায়নি। প্রকাশকদের একাংশের তীব্র প্রতিবাদে সভাটি শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাদের অভিযোগের মধ্যে ছিলো, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম ‘জুলাইয়ের পক্ষের’ প্রকাশকদের দাবিতে যথেষ্ট সাড়া দেননি; তারা যেসব প্রকাশককে আওয়ামী লীগপন্থি বা জুলাই আন্দোলনের বিরোধী বলে মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। বরং জেলা বইমেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন। বই কেনার তালিকা, কোন বই কত কপি কেনা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিটির ভূমিকা প্রকাশের দাবিও তারা করেন। কিন্তু সেদিন হলরুমের ভেতরে পরিস্থিতি ঠিক কতটা উত্তপ্ত হয়েছিল, তার আরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন উপস্থিত ইরফান শেখ।

ইরফান শেখ লেখক ও গবেষক। তার প্রকাশিত পরিচিতি অনুযায়ী তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং আদিত্য গ্রে ফাইলস যৌথ উদ্যোগের সহপ্রতিষ্ঠাতা। তার নিজের বইও প্রকাশিত হয়েছে। ২৯এ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে তিনি আগের দিনের সভার দীর্ঘ বিবরণ দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক মঞ্চে বসেছিলেন। কিন্তু প্রকাশকদের একাংশ হট্টগোল শুরু করেন। 

উপস্থাপককে অনুষ্ঠান চালাতে না দিয়ে তারা আগে নিজেদের বক্তব্য শোনার দাবি করেন। ইরফান শেখের বর্ণনায়, উপদেষ্টা বারবার তাদের একজন একজন করে কথা বলতে বলেন। হাত তুলে থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু একসঙ্গে একাধিক মানুষ কথা বলতে থাকেন। কয়েকজন চেয়ার ছেড়ে মঞ্চের সামনে পর্যন্ত চলে যান।

এই পর্যায়ে তাদের দাবিগুলোও সামনে আসে। ইরফানের পোস্ট অনুযায়ী, প্রকাশকদের একাংশের বক্তব্য ছিল, যারা প্রায় ৫০ হাজার টাকা দিয়ে পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সদস্য হননি, তারা প্রকাশক নন এবং তাদের কাছ থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বই কিনতে পারবে না। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র নিজে সরাসরি প্রকাশকদের আমন্ত্রণ জানাতে পারবে না। সমিতি যাকে ‘যোগ্য’ মনে করবে, কেবল তাকেই ডাকতে হবে। প্রকাশকদের জন্য উন্মুক্ত গুগল ফর্ম দেওয়া যাবে না। আর যেসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আগে শেখ মুজিবুর রহমান বা আওয়ামী লীগ আমলের রাজনৈতিক বই প্রকাশ করেছে, তাদের সরকারি সভায় ডাকা উচিত নয়। ইরফানের বর্ণনায় ইউপিএল, প্রথমা ও তাম্রলিপির মতো প্রতিষ্ঠানের নামও এ প্রসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল।

আরও গুরুতর একটি বর্ণনা রয়েছে তার পোস্টে। তার দাবি, একপর্যায়ে উপদেষ্টার সামনেই বলা হচ্ছিল, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাজ মূলত প্রকাশকদের বই কেনা এবং প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশকদেরই প্রতিষ্ঠান, ফলে পরিচালককে প্রকাশকদের কথামতো চলতে হবে। ইরফান শেখ লিখেছেন, তিনি পরিস্থিতি দেখে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং নিজের প্রকাশনার একজন গবেষণা কর্মকর্তাকে ভিডিও করতে বলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় বিশ মিনিট ধরে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেও উপদেষ্টা ও পরিচালক শেষ পর্যন্ত হল ছেড়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি। ইরফানের দাবি, তাদের চলে যাওয়ার পরও প্রকাশকদের একটি অংশ প্রায় এক ঘণ্টা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মিলনায়তনে নিজেদের সভা চালান। অনুষ্ঠানের জন্য রাখা খাবার খান। পরে আরেকটি সেমিনার কক্ষ খুলে দেওয়ার দাবি করেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেটি না খুললে দরজায় লাথি মেরে চলে যাওয়ার ঘটনাও তিনি বর্ণনা করেছেন।

এসব নির্দিষ্ট আচরণ এবং সংলাপ ইরফান শেখের প্রত্যক্ষদর্শী বয়ান। প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। তবে সভাটি প্রকাশকদের তীব্র প্রতিবাদে স্থগিত হওয়া, আফসানা বেগমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ এবং সরকারি বই কেনার তালিকা নিয়ে প্রকাশকদের দাবি সংবাদমাধ্যমেও এসেছে।

আফসানা বেগমের পুরোনো অভিজ্ঞতা

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই কেনাকে ঘিরে বর্তমান এই দ্বন্দ্ব বুঝতে পরিচালক আফসানা বেগমের কয়েক মাস আগের একটি লেখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আফসানা বেগম নিজেই লিখেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকাশকদের সঙ্গে তার কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, অনেকে বই সম্পাদনার মান, নতুন পাণ্ডুলিপি কিংবা পাঠকের জন্য প্রয়োজনীয় বই নিয়ে কথা বলার চেয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কত কপি বই কিনবে, সেই বিষয়েই বেশি আগ্রহী। তার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বছরে দুই কোটি টাকার সামান্য বেশি বই কিনতো। অথচ কোনো প্রকাশকের বই অন্য প্রকাশকের চেয়ে একটি বা দুটি কম কেনা হলেও সেই প্রকাশক গ্রন্থকেন্দ্রে ছুটে আসতেন। তিনি এটিকে শুধু বই বিক্রির প্রয়োজন নয়, অনেক ক্ষেত্রে ‘আধিপত্যের সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তার লেখায় আগের আওয়ামী লীগ সরকারের বই কেনার ব্যবস্থারও সমালোচনা আছে। আফসানা বেগমের দাবি, শেখ হাসিনার লেখা কিছু বই বিশেষ কোটায় প্রতিটি ৭ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে কেনার নজির তিনি পেয়েছেন। আবার জুলাই-পরবর্তী সময়ে নিম্নমানের বা ভুল তথ্যে ভরা জুলাইবিষয়ক বইও কেনানোর চাপ পেয়েছেন। ১৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি নিম্নমানের বই চাপ থাকা সত্ত্বেও কেনেননি বলেও তিনি লিখেছেন।

আফসানা আহমেদের অভিজ্ঞতা একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র নিয়ে প্রকাশকদের উত্তেজনার কেন্দ্রে আসলে কি শুধু সংস্কৃতি, বই কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা? নাকি এর নিচে রয়েছে সরকারি টাকায় কে কত বই বিক্রি করবে, সেই প্রতিযোগিতাও?

সেদিন বিকেলেই ইউপিএল

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ওই উত্তপ্ত সভার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলাবাজারে আরেক ঘটনা ঘটে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে দুজন যুবক ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ চান। বিক্রয়কর্মীরা বই বের করে দেন। তারপরই ওই দুই ব্যক্তি প্রশ্ন তোলেন, নিষিদ্ধ বই বিক্রি করা হচ্ছে কেন। ইউপিএলের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর আরও মানুষ জড়ো হন। বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে তালা দেওয়া হয়। দুই কর্মী আমিনুল ইসলাম ও হুমায়ূন কবীরকে সেখান থেকে নিয়ে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে দেওয়া হয়। এখানে কয়েকটি অস্বাভাবিক বিষয় আছে। প্রথমত, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ বই নয়। 

দ্বিতীয়ত, থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। সূত্রাপুর থানার ওসি মতিউর রহমান জানিয়েছেন, দুই ইউপিএল কর্মীকে থানায় নেওয়া হয়নি, ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, পুলিশের একটি বক্তব্য আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংবাদমাধ্যমে ওসির বরাতে এসেছে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ আর বিক্রি না করার শর্তে কর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ বইটি নিষিদ্ধ নয় এবং কোনো লিখিত অভিযোগও ছিলো না। অর্থাৎ প্রশ্ন দাঁড়ায়, আইনত নিষিদ্ধ নয় এমন একটি বই বিক্রি না করার ‘শর্ত’ পুলিশ কীভাবে দিতে পারে?

একই দিনের দুই ঘটনা কি সম্পর্কিত?

ইরফান শেখ তার পোস্টে এই প্রশ্নটিই তুলেছেন। সকালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে একদল প্রকাশক ইউপিএলসহ কিছু প্রতিষ্ঠানকে ‘আওয়ামী প্রকাশনী’ হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি তুলেছেন বলে তার অভিযোগ। কয়েক ঘণ্টা পর ইউপিএলের দোকানে দুজন ‘ক্রেতা’ গিয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ চেয়েছেন। বই বের করার পর সেটিকে নিষিদ্ধ দাবি করে দোকান বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সময়ক্রমটি অস্বস্তিকর। কিন্তু এই দুই ঘটনাকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রমাণ করার মতো কোনো নথি এখন পর্যন্ত নেই। কারা দুই যুবককে পাঠিয়েছিল, কেউ পাঠিয়েছিল কি না, বাপুস বা কোনো প্রকাশক সংগঠনের সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক সম্পর্ক আছে কি না, কোনো সংবাদমাধ্যম তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

ইউপিএলের সম্পাদকীয় বিভাগের পরিচালক ফিরোজ আহমেদও আলাপ-কে বলেছেন, তিনি জানেন না কারা ‘ক্রেতা’ সেজে দোকানে গিয়েছিলেন। তবে তার সন্দেহ ঘটনাটি উদ্দেশ্যহীন নয়।

“আমি এটাকে শুধু মব বা অন্য কিছু হিসেবে দেখছি না। কিছু প্রকাশক এবং ব্যক্তি স্রেফ রাজনৈতিক পরিচয় খাটিয়ে ব্যবসায়িক মুনাফা করতে চাচ্ছে।”

বই নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে তার অবস্থানও পরিষ্কার।

“প্রকাশনী রাষ্ট্রের নিয়মে চলে। রাষ্ট্র আইন মেনে বই নিষিদ্ধ করলে আমাকে তা মানতেই হবে। কিন্তু দর্শনগতভাবে আমি কোনো বই নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই।”

কারা ইউপিএলে গিয়েছিলেন, এমন প্রশ্নে তিনি আলাপ-কে বলেন, “আমি জানি না কারা গিয়েছিল। কিন্তু যারা গিয়েছিল, তাদের দুরভিসন্ধি ছিলো। তারা টার্গেট করেই গিয়েছিল।”

এই জায়গায় আদর্শ প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী মাহবুবুর রাহমানের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২৩ সালে তার প্রতিষ্ঠান বইমেলা থেকে বাদ পড়েছিল। সে সময় ইউপিএলের মাহরুখ মহিউদ্দীন প্রকাশ্যে আদর্শ প্রকাশনীর স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ইউপিএল ঘটনার পর মাহবুবুর রাহমান আলাপ-কে বলেন, তার প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তিগত ঋণ শোধ নয়।

“২০২৩ সালে আদর্শ’র স্টল বরাদ্দ বাতিল করা হলে ইউপিএলের মাহরুখ মহিউদ্দীন আমাদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু আমি আজ ইউপিএলের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি শুধু সেই কারণে নয়। আওয়ামী লীগের আমলেও এটা হচ্ছিল। আমরা এখনো সেই সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারিনি। আমি এর প্রতিবাদ করি শুধু ভুক্তভোগী প্রকাশক হিসেবে নয়, দর্শনগতভাবেও।”

“নিজের জন্য যে স্বাধীনতা চাই, অন্যের জন্যও সেই স্বাধীনতার পক্ষেই আমার দৃঢ় অবস্থান,” আলাপ-কে বলেন মাহবুব। 

আদর্শ আর ইউপিএলের ঘটনার মিল সম্ভবত ঠিক এখানেই। ২০২৩ সালে বই তিনটি আইনত নিষিদ্ধ ছিলো না। কিন্তু আদর্শকে বইমেলায় জায়গা দেওয়া হয়নি এবং আদালতের এক পর্যায়ের আদেশেও বই তিনটির বিক্রি ও প্রদর্শন সীমিত ছিলো। ২০২৬ সালে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ নয়। তবু সেটি বিক্রির কারণে ইউপিএলের দোকানে হট্টগোল হলো এবং দুই কর্মী পুলিশ ফাঁড়িতে গেলেন। 

ক্ষমতার রাজনৈতিক কেন্দ্র বদলেছে। ‘আপত্তিকর’ বই বদলেছে। ভুক্তভোগী প্রকাশক বদলেছে। কিন্তু প্রকাশকের বাজারে প্রবেশ বা বই বিক্রির অধিকারকে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করার প্রবণতা পুরোপুরি বদলায়নি।

বিতর্ক যখন বই থেকে পরিচয়ে সরে যায়

ইউপিএলের দোকানে কী হয়েছিল, সেই প্রশ্নের সঙ্গে ২৯এ সেপ্টেম্বর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে আরও কয়েকটি প্রশ্ন জুড়ে যায়। ইউপিএল কেন শেখ মুজিবের বই প্রকাশ করেছে, তারা আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে সুবিধা পেয়েছিল কি না, অসমাপ্ত আত্মজীবনী সত্যিই শেখ মুজিবের লেখা কি না—এসব সামনে আসে। আবার উল্টো দিক থেকে প্রশ্ন ওঠে, ইউপিএল কেন মওদুদ আহমদ কিংবা জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের বই প্রকাশ করেছে।

এসব প্রশ্নের আলাদা মূল্য থাকতে পারে। কিন্তু এগুলো মূল ঘটনার উত্তর নয়। প্রশ্নটি ছিলো, আইনত নিষিদ্ধ নয় এমন একটি বই বিক্রি করার কারণে দোকান বন্ধ করা এবং দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া বৈধ কি না। অথচ আলোচনার একটি অংশ দ্রুতই ইউপিএলকে রাজনৈতিক পরিচয়ে ট্যাগ করার দিকে চলে যায়। জনআলোচনায় এমন প্রবণতা নতুন নয়; ঘটনার বদলে আক্রান্ত পক্ষের অতীত বা পরিচয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে মূল দায়ের প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়।

রাজনৈতিক বিতর্কে এর একটি পরিচিত কৌশল ‘হোয়াটঅ্যাবাউটিজম’—কোনো অভিযোগের সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাল্টা বলা, ‘কিন্তু ওরা কী করেছে?’ পাল্টা তথ্যটি সত্যও হতে পারে। তবু সেটি প্রথম প্রশ্নের উত্তর নয়। ইউপিএল মওদুদ আহমদ বা আবদুর রাজ্জাকের বই ছেপেছে—এটি সত্য হতে পারে; কিন্তু অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রি বন্ধ করার বৈধতা তৈরি করে না।

যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় এখানে ‘কাউন্টার-ফ্রেমিং’ও কাজ করে। প্রথম ফ্রেম যদি হয়, ‘বৈধ বই বিক্রি করায় প্রকাশক ও কর্মীদের হেনস্তা’, পাল্টা ফ্রেম দাঁড়ায়, ‘আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী প্রকাশনাকে নিয়ে অযথা সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে।’ সমস্যা পাল্টা ব্যাখ্যায় নয়; সমস্যা তখন, যখন নতুন ফ্রেমটি মূল প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নকেই সরিয়ে দেয়।

সোশাল মিডিয়ায় এই প্রবণতা আরও দ্রুত কাজ করে। ‘বইটি নিষিদ্ধ কি না’—এর চেয়ে ‘ওরা আওয়ামী’, ‘ওরা জাতীয়তাবাদী’, ‘ওরা জামায়াতের লোক’ ধরনের পরিচয়ভিত্তিক ভাষা বেশি প্রতিক্রিয়া আনে। ক্লিক, মন্তব্য, শেয়ার বাড়ে। ফলে সংঘাতের ফ্রেমটিই আরও দৃশ্যমান হয়।

এখানেই বিপদ। জাতীয়তাবাদী উগ্রতা, পপুলিস্ট ‘আমরা বনাম তারা’ ভাষা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ এক জিনিস নয়। কিন্তু তিন ধরনের বয়ানই জটিল সমস্যাকে সহজ শত্রু-পরিচয়ে নামিয়ে আনতে পারে। তখন পুলিশ কোন আইনে বই বিক্রি বন্ধের শর্ত দিলো, প্রকাশক সমিতির ক্ষমতার সীমা কোথায়, সরকারি বই কেনা কতটা স্বচ্ছ—এসব প্রশ্ন পিছিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত নতুন প্রতিপক্ষ তৈরি হয়, নতুন ক্ষোভ জন্মায়। কিন্তু পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থেকে যায়। ইউপিএল বিতর্কের বড় প্রশ্নটি তাই হয়তো এটিই: আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজছি, নাকি প্রতিটি ঘটনায় নতুন রাজনৈতিক পরিচয় বসিয়ে শত্রু খুঁজছি?

বই নিষিদ্ধ করতে পারে আসলে কে?

বাংলাদেশে কোনো ব্যক্তি, পুলিশ কর্মকর্তা, প্রকাশক সমিতি বা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ইচ্ছামতো একটি বইকে দেশব্যাপী নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯ (এ) ধারায় নির্দিষ্ট ধরনের বেআইনি বিষয়বস্তু থাকলে সরকার সরকারি গেজেটে কারণ জানিয়ে কোনো বই বা প্রকাশনার কপি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করতে পারে। এরপর পুলিশ সেই কপি জব্দ করতে পারে। আর ৯৯ (বি) ধারায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই সিদ্ধান্ত হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রও যা খুশি তা করতে পারে না। একটি আইনি প্রক্রিয়া আছে। বিচারিক পর্যালোচনাও আছে। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণগুলোর একটি ১৯৯৩ সালের সদরুদ্দিন আহমেদ চিশতির মামলা।

ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সদরুদ্দিন আহমেদ চিশতির মোট আটটি বই বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। চিশতি হাইকোর্টে যান। হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ বইগুলো পরীক্ষা করে দুটির ক্ষেত্রে সরকারি আদেশ বাতিল করে দেয়। বই দুটি ছিল ‘এলমে মারেফত’ এবং ‘মারেফতের গোপন আলাপ’। অন্য ছয়টির নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। পরে আপিল বিভাগও ওই ছয়টির বিষয়ে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেনি। এই মামলার শিক্ষা খুব সাধারণ। একজন লেখককে অপছন্দ করা যথেষ্ট নয়। একটি নির্দিষ্ট বইয়ের নির্দিষ্ট বক্তব্যকে আইনের মানদণ্ডে বিচার করতে হয়। আর সরকারের সিদ্ধান্তও আদালত পাল্টে দিতে পারে।

বাংলাদেশের নিষিদ্ধ বইয়ের পুরোনো ইতিহাস

এই ভূখণ্ডে বই নিষিদ্ধের ইতিহাস পাকিস্তান আমল থেকেই। ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলন প্রকাশের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পাকিস্তান সরকার সেটি নিষিদ্ধ করে। এটি ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক নিষেধের উদাহরণ।

স্বাধীনতার পর ধর্মীয় প্রশ্ন ক্রমে বড় হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালে দাউদ হায়দারের ‘কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়’ কবিতা প্রকাশের পর তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ ওঠে। তাকে আটক করা হয়। পরে তিনি দেশ ছাড়েন। ১৯৯৩ সালে তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ নিষিদ্ধ হয়। তার আরও বই পরে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। পরে আদালতে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।

অর্থাৎ বাংলাদেশে বই নিষিদ্ধ বা লেখককে চাপ দেওয়ার বড় অংশে ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন এসেছে। কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়। রাজনীতি, রাষ্ট্রের ইতিহাসের বয়ান এবং সরকারবিরোধী বক্তব্যও বই দমনের কারণ হয়েছে।

বই নিষিদ্ধের প্যারাডক্স: ভয়ংকর বই, আরও ভয়ংকর ক্ষমতা

বই নিষিদ্ধ করার ইতিহাস বহু পুরোনো। প্রাচীনতম পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি গ্রিক দার্শনিক প্রোটাগোরাসের অন দ্য গডস। দেবতাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা যায় কি না, তিনি সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরবর্তী প্রাচীন সূত্রে তার লেখা পুড়িয়ে দেওয়া এবং তাকে এথেন্স ছাড়তে বাধ্য করার কথা পাওয়া যায়। আধুনিক গবেষকেরা অবশ্য এই কাহিনির সব অংশকে নিশ্চিত ইতিহাস মনে করেন না। তারপরও ঘটনাটি একটি পুরোনো সত্য মনে করিয়ে দেয়: ক্ষমতার কাছে বিপজ্জনক মনে হওয়া ধারণাকে থামানোর সবচেয়ে পুরোনো উপায়গুলোর একটি ছিলো বই থামানো।

কিন্তু এখানেই প্যারাডক্স। সব বই নিরীহ নয়। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে হাইনরিখ ক্রেমারের মালেউস ম্যালেফিকারাম বা হ্যামার অব উইচেস ইউরোপে ডাইনি নিয়ে ভয়, বিচার ও নিপীড়নের ধারণাকে সংগঠিত করতে ভূমিকা রেখেছিল। ১৪৫০ থেকে ১৭৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ডাইনিবিদ্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হন, আনুমানিক ৪৫ হাজারের মৃত্যুদণ্ড হয়। এই মৃত্যুর সব দায় একটি বইয়ের নয়, কিন্তু বইয়ের ধারণা যে বাস্তব সহিংসতায় ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও ইতিহাস। হিটলারের মাইন কাম্পফ আরও পরিচিত উদাহরণ।

তাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি কখনো এত সরল নয় যে, ‘সব বই ভালো, তাই সব বইকে ছেড়ে দিতে হবে।’ বরং কঠিন প্রশ্নটি হলো, কোনো বই ক্ষতিকর হলে তার বিচার করবে কে এবং কোন প্রক্রিয়ায়? কারণ বই বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু ‘বিপজ্জনক বই’ নির্ধারণের ক্ষমতা যদি রাজনৈতিক দল, উগ্রবাদী গোষ্ঠী বা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ীর হাতে চলে যায়, সেই ক্ষমতাও কম বিপজ্জনক নয়।

এই কারণেই বই নিষিদ্ধের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত বইয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। প্রশ্নটি হয়- একটি ধারণা কতটা ক্ষতিকর, আর সেই ক্ষতি নির্ধারণের অধিকার কার? আইন ও আদালতের, নাকি যার হাতে তখন বেশি ক্ষমতা?

গোথেনবার্গে প্রকাশক বনাম প্রকাশক

এই দ্বন্দ্ব বাংলাদেশেই শুধু দেখা যায়নি। সুইডেনের গোথেনবার্গ বইমেলায় ২০১৬-১৭ সালে ডানপন্থি ‘নিয়া টাইডার’-কে প্রদর্শক হিসাবে নেওয়া নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এরসাৎস জানিয়ে দেয়, ‘নিয়া টাইডার’ থাকলে তারা মেলায় অংশ নেবে না। বহু লেখকও বয়কটের ঘোষণা দেন। অন্য পক্ষের যুক্তি ছিলো, আইনত বৈধ একটি মতকে বইমেলা থেকে বের করে না দিয়ে আরও বক্তব্য দিয়েই তার মোকাবিলা করা উচিত। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের মেলায় ‘নিয়া টাইডার’-কে আর স্টল দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের সঙ্গে ঘটনাটি এক নয়। সুইডেনে অন্য প্রকাশকের ব্যবসা দখলের জন্য এই চাপ দেওয়া হয়েছিল, এমন প্রমাণ নেই। আপত্তিটি ছিল মূলত রাজনৈতিক ও নৈতিক।

কিন্তু একটি শিক্ষা আছে। রাষ্ট্র কোনো বই নিষিদ্ধ না করলেও প্রকাশক, লেখক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত চাপ একটি প্রকাশনাকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার থেকে সরিয়ে দিতে পারে।

আসল দ্বন্দ্ব কি বইয়ের নাকি সরকারি বই কেনার বাজারের?

বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে সম্ভবত এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রকাশিত নিয়মে বই বিক্রির জন্য বাপুস সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। অথচ ইরফান শেখের বর্ণনা অনুযায়ী সভায় দাবি উঠেছে, সমিতির সদস্য না হলে তাকে প্রকাশক হিসেবে গণ্য করা যাবে না এবং তার কাছ থেকে সরকার বই কিনতে পারবে না। আফসানা বেগমের নিজের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকাশকদের বড় একটি অংশের কাছে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মানেই বই বিক্রির একটি সরকারি বাজার এবং সেখানে কে কত বই বিক্রি করবেন, তা নিয়েই অনেক চাপ। ২০১৬ সালের ইতিহাস বলছে, প্রকাশক সমিতি প্রয়োজন হলে বিরোধিতাকারী বুদ্ধিজীবীদের বই প্রকাশ ও বিক্রি বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছে। আর ৫ই অগাস্টের পর প্রকাশ্যে দলীয় পরিচয়ের নতুন প্রকাশক সংগঠন গড়ে উঠেছে।

সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে কি প্রকাশনা জগতের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক পরিচয়কে বাজারে প্রবেশের পাসপোর্ট হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে?

নিজের পছন্দের বইয়ের স্বাধীনতার কথা বলা সহজ। আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বইটি যদি আইনত বৈধ হয়, তার বিক্রির স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে পারা অনেক কঠিন। এই কারণেই মাহবুবুর রাহমানের একটি বাক্য সম্ভবত পুরো বিতর্কটির সবচেয়ে ছোট সারাংশ–

“নিজের জন্য যে স্বাধীনতা চাই, অন্যের জন্যও সেই স্বাধীনতার পক্ষেই আমার দৃঢ় অবস্থান।”

যে কেউ চাইলেই বই কেনবেচা বন্ধ করতে পারাটা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। আমরা কি সেই সমস্যার সমাধান খুঁজছি, নাকি প্রতিটি ঘটনায় নতুন পাল্টা বয়ান তৈরি করতে করতে এমন এক পরিচয়-সংঘাতে ঢুকে পড়ছি, যেখানে সমাধানের চেয়ে ক্ষোভ বেশি দৃশ্যমান, আর উগ্র ভাষাই বেশি পুরস্কৃত হচ্ছে?