রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

শিশুদের জাতীয়তা বদল: প্রতিকার ও বিচার কতদূর?

এই গল্পটি আরতামের, যাকে তিন বছর আগে একদিন ক্লাসরুম থেকে অপহরণ করেছিল রুশ সৈন্যরা। তারপর থেকে ইউক্রেনের আরতাম ও তার মত হাজার হাজার শিশু রাশিয়ার এতিমখানায় বন্দী। তাদের পরতে হয় রুশ পোশাক, বলতে হয় রুশ ভাষা, গাইতে হত রুশ গান। এভাবে ইউক্রেনের এই শিশুদের নিষ্ঠুর, অমানবিক এক প্রক্রিয়ায় ‘রুশকরণ’ করা হচ্ছিল। চলুন ঘুরে আসি রাষ্ট্রের স্পন্সরে নির্মম শিশু নিপীড়ণের এক সিরিয়াল উপাখ্যানের গভীর থেকে - চিনি এই ঘটনার ভিলেনদের - খুঁজি এই অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার ভবিষ্যত কী। আলাপের বিশেষ প্রতিনিধি শেরিফ আল সায়ার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে।

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম

ইউক্রেনের একটি স্কুলে ক্লাসে মনোযোগী আরতাম হঠাৎ দেখতে পায় রুশ সেনাবাহিনী ঢুকে পড়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৈন্যরা আরতামসহ স্কুলের বেশ কিছু শিশুকে ধরে নিয়ে যায়। কেউ বুঝে উঠতে পারছিল না, ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পৌঁছানোর পর ১৭ বছর বয়সী আরতাম বুঝতে পারে তারা এখন এতিমখানায়।  

রুশ নিয়ন্ত্রিত এতিমখানাতেই শুরু হয় আরতামের নতুন জীবন। সেখানেই পড়াশোনার ব্যবস্থা হয় তার, তবে রুশ ভাষায়। কিন্তু আরতামের ভাষা তো ইউক্রেনীয়! তবুও জোর করা হয় রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে। শুধু তাই নয়, গাওয়ানো হয় রুশ জাতীয় সঙ্গীত। এমনকি স্কুলে কোনো বড় কর্তা কিংবা সামরিক কর্তা এলে তাদের পরানো হতো রুশ পোশাক।

ইউক্রেনীয় শিশুদের উদ্ধারে কাজ করা উদ্যোগ ‘ব্রিং কিডস ব্যাক’ এর কাছে আরতাম জানায়, ‘বারবার আমাকে বলা হতো রুশ পরিবারের কাছে পালক হিসেবে পাঠানো হবে। আমি আর কখনো বাড়ি ফিরতে পারব না”।

অভিযোগ আছে আরতামের মতো এমন অসংখ্য শিশুদের ‘রুশকরণের’ অংশ হিসেবে অপহরণ করছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটা যুদ্ধাপরাধের শামিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে ইউক্রেন পরিস্থিতির জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের শিশু অধিকার বিষয়ক কমিশনার মারিয়া লোভোভা-বিলোভা’র বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি।

তিন বছর পেরিয়ে গেলেও, আরতামদের মতো শিশুদের মাত্র ২০ শতাংশ ফিরে এসেছে—বাকিদের অবস্থান এখনো অজানা। এছাড়াও এই ধরনের অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।  

ইউক্রেনীয় শিশুদের অবৈধ স্থানান্তরের অভিযোগ নিয়ে যা জানা গেলো

ইউক্রেনীয় শিশুদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া এবং বিচার নিশ্চিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন কাতেরিনা রাশেভস্কা। তিনি ইউক্রেনভিত্তিক রিজিওনাল সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের লিগ্যাল এক্সপার্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একইসঙ্গে তিনি ইউক্রেনীয় শিশুদের অবৈধ নির্বাসন ও জোরপূর্বক স্থানান্তর বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে একাধিক অভিযোগ দাখিল করেন। যার কিছু মামলার ভিত্তিতে আইসিসি ১৭ই মার্চ ২০২৩ সালে ভ্লাদিমির পুতিন ও মারিয়া লোভোভা-ভিলোভা’র বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

লিগ্যাল এক্সপার্ট

কাতেরিনা রাশেভস্কা আলাপ-কে বলেন, “এই প্রক্রিয়া তথাকথিত ‘ক্রাইমিয়া মডেল’ অনুসরণ করে পরিচালিত হয়েছে। যেখানে রুশ নাগরিকরা পরিকল্পিতভাবে দখলকৃত অঞ্চলে গিয়ে এতিম ইউক্রেনীয় শিশুদের দত্তক নেওয়া বা অবৈধভাবে অভিভাবকত্ব নেয়ার চেষ্টা করেছে”।

ইয়েল হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাবের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইউক্রেন থেকে ১৯ হাজারের বেশি শিশুকে জোরপূর্বক স্থানান্তরিত করা হয়েছে। যার মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২৩৬ জন শিশুকে ইউক্রেনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এই প্রতিবেদনে আশঙ্কা করে বলা হয়, অপহৃত শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও অনেক বেশি। 

ইয়েল ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮ হাজার ৪০০-এর বেশি ইউক্রেনীয় শিশুদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। যাদের কমপক্ষে ৫৭টি স্থানে পরিকল্পিতভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি বেলারুশে এবং ৪৩টি রাশিয়া ও রাশিয়া-অধিকৃত অঞ্চলে অবস্থিত।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমি ইমেইলে যোগাযোগ করি ইউক্রেন বিষয়ক জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের এর সঙ্গে।

“আরতামদের মতো অনেক শিশু ফিরে এসেছে তাদের পরিবারে। অনেকে ফিরে এসে পরিবারের ছোঁয়াও পায়নি। তারপরও কতজন শিশু ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে”? - এই প্রশ্নের জবাবে ইউক্রেন বিষয়ক জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন আলাপকে ফিরতি ইমেইলে জানিয়েছে, “কমিশন নিশ্চিত করেছে ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে রুশ কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ২০৫ জন শিশুকে রাশিয়ান ফেডারেশন বা তাদের দখলকৃত অন্যান্য এলাকায় নির্বাসিত বা স্থানান্তর করেছে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তিনটি স্বাধীন উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে কমিশন এই তদন্ত করেছে। কমিশন মনে করে বাস্তবে নির্বাসিত বা স্থানান্তরিত শিশুদের সংখ্যা প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও বেশি”। 

তারা ইমেইলে আরো লিখেছে, “নথিভুক্ত এসব ঘটনার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ শিশু ফিরেছে। এছাড়া কমিশনের মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত ৮০ শতাংশ শিশু এখনো ফিরে আসেনি”।

শিশুদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কতটা সম্ভব

আরতামের ফিরে আসার গল্পটাও সহজ নয়। তার বন্ধু দিমা’র হাতে একদিন সে ফোন দেখতে পায়। দিমা তাকে জানায়, আমাদের মায়েরা খুব দ্রুত নিতে আসবে। বন্ধুর কাছ থেকে ফোন নিয়ে মাকে ফোন দেয় আরতাম।

মা জিজ্ঞেস করলেন, কে? বললাম, আমি, আরতাম। মা কেঁদে ফেললেন। বললেন, শিগগিরই আমাদের নিয়ে যাবেন”, ‘ব্রিং কিডস ব্যাক’কে বলেছে আরতাম।

এই টেলিফোন কলের চারদিন পর এতিমখানার পরিচালক তাদের নিচে যেতে বললেন। সেখানে আমাদের অনেকের মা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“আমরা তাদের দেখেই দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরি, কাঁদতে থাকি। তখন মনে হয়েছিল, আমি আবার মায়ের কাছে, নিরাপদে আছি”, জানিয়েছে আরতাম।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে

আরতামদের ফিরে আসা মোটেও সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়। রাশিয়ান ফেডারেশনের নানান দাপ্তরিক জটিলতার মধ্যে দিয়ে প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করছে অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।

শিশুদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন আলাপ-কে জানায়, “শিশু প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত এই প্রক্রিয়া সমন্বয় করতে কয়েক মাস, এমনকি বছরও লাগছে।” 

তারা আরও জানায়, “রুশ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক নথিপত্র—যেমন, সরকারি সনদের অনুলিপি বা বিচারিক প্রত্যয়ন চেয়েছে, যা সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। চলমান সশস্ত্র সংঘাতের কারণে রাশিয়ান ফেডারেশন বা ইউক্রেনের রুশ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যাওয়া কঠিন; এতে একাধিক আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাড়ি দিতে হয়, পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি ও উচ্চ ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। যেখানে শিশুদের রাখা হয়েছিল, কিছু পরিবারকে সেই এলাকায় প্রবেশের অনুমতিও দেওয়া হয়নি।”

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে কাতেরিনা রাশেভস্কা আলাপ-কে বলেন, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের “রিটার্ন টু ইউক্রেনিয়ান চিলড্রেন’ প্রস্তাবের পক্ষে ৯১টি রাষ্ট্র ভোট দিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে এটি ‘রাশিয়াবিরোধী পশ্চিমা প্রচারণা’র কোনো বয়ান নয়।“

তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এই উদ্যোগ সব শিশুর প্রত্যাবাসনের জন্য যথেষ্ট নয়। এই উদ্যোগটি তখনই সম্ভব হবে, যখন এসব অঞ্চল দখলমুক্ত হয়ে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ বর্তমানে আনুমানিক ১৬ লাখ শিশু দখলকৃত অঞ্চলে অবস্থান করছে।” 

রাশিয়া যদিও জোরপূর্বক স্থানান্তর বলতে রাজি নয়। তারা আন্তর্জাতিকভাবে বলে আসছে যুদ্ধাবস্থা থেকে শিশুদের নিরাপদে তারা ‘উদ্ধার’ কিংবা ‘সরিয়ে’ নিচ্ছে।

ইউক্রেন বিষয়ক জাতিসংঘ তদন্ত কমিশন

জাতিসংঘ তদন্ত কমিশন আলাপ-কে ইমেইল বার্তায় লিখেছে, “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে ইউক্রেন থেকে শিশুদের সরিয়ে নেওয়াকে ‘উদ্ধার’ হিসেবে বলা যায় না, কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি শর্তগুলো পূরণ করা হয়নি—বিশেষ করে, এ ধরনের ‘সরিয়ে নেওয়া’ অবশ্যই সাময়িক হতে হয়। তদন্ত করা ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে কমিশন এই সিদ্ধান্ত হলো- রুশ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় শিশুদের জোরপূর্বক স্থানান্তর ও নির্বাসন যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে”।

কমিশন আরও মনে করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী শিশু প্রত্যাবর্তন দ্রুত করার জন্য রুশ কর্তপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। 

যদিও দাবি করা হয় শিশুদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া এখন আর নেই। তবে কাতেরিনা জানাচ্ছেন, এই প্রক্রিয়া এখনও চলমান। 

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “২০২৪–২০২৫ সালে উন্মুক্ত সূত্রে নথিভুক্ত তিনটি ঘটনায় মোট পাঁচজন ইউক্রেনীয় শিশুকে রুশ পরিবারের কাছে স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। যাদের সবাই ছেলে এবং বয়স ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে দুইজন শিশুকে রুশ সামরিক সদস্যদের পরিবারের কাছে রাখা হয়েছে। বর্তমানে তারা রাশিয়ার মস্কো, নোভোসিবির্স্ক এবং পসকভ অঞ্চলে বসবাস করছে।”

এদিকে ইউক্রেনের শিশুদের সুরক্ষা প্রসঙ্গে ইউনিসেফ ইউক্রেন আলাপ-কে বলেছে, তারা সব পক্ষকে শিশুদের সর্বোচ্চ স্বার্থ বিবেচনায় পরিবারকে খুঁজে বের করা এবং পুনর্মিলন প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে।

সংস্থাটি বলছে, “ইউক্রেন সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ফিরে আসা শিশুদের জন্য পুনর্বাসন সহায়তা দিচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে সমন্বিত সামাজিক সেবা, পরিবারভিত্তিক পরিচর্যা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ভূমিকা

আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অপরাধের বিচার সাধারণত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির দ্বারস্থ হতে হয়। সে অনুযায়ী আইসিসি’র প্রি-ট্রায়াল চেম্বার ২০২৩ সালের ২২এ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের আবেদনগুলোর ভিত্তিতে বিবেচনা করে দেখেছে দখলকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল থেকে শিশুদের অবৈধ নির্বাসন ও স্থানান্তরের ঘটনা সত্য।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের শিশু অধিকার বিষয়ক কমিশনার মারিয়া লোভোভা-বিলোভা

একইসঙ্গে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যুদ্ধাপরাধে দায়ী হওয়ার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রয়েছে বলেও দাবি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।

আইসিসি’র এই তদন্তের শুধু বিচার নয় শিশুদের অধিকার ও মর্যাদাও প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। এই প্রসঙ্গে গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের শিশু অধিকার বিষয়ক লিগ্যাল অ্যাডভাইজার দানিয়েল দেরোহানেশিয়ান আলাপ-কে বলেন, “এই মামলাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক আইনে প্রথমবারের মতো শিশুদের ভুক্তভোগী হিসেবে কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ফলে বিচার শুধু চূড়ান্ত রায়ে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও এর অংশ।”

ইউক্রেনের শিশুদের জোরপূর্বক স্থানান্তর মামলার অগ্রগতি ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউশন দপ্তরের কাছে জানতে চাওয়া হয়।

“ইউক্রেনে সংঘটিত অপরাধের মামলার শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার কাজ করা হচ্ছে। প্রমাণ সংগ্রহের জন্য মাঠপর্যায়ে ভুক্তভোগী, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে আইসিসি। তদন্তের শুরু থেকেই শিশুদের নির্বাসন বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে”, ইমেইল বার্তায় জানিয়েছে আইসিসি।

এই তদন্তকে সহায়তা করার জন্য এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ সংখ্যক জনবল মোতায়েন করেছে আইসিসি। পাশাপাশি ইউরোজাস্টের আওতায় সাতটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। যা আইসিসির ২০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম বলে আলাপের কাছে দাবি করে আইসিসি। 

তবে চলমান তদন্ত কার্যক্রমের বিষয়ে, বিশেষ করে সম্ভাব্য নির্দিষ্ট অভিযোগ বা ভবিষ্যত পদক্ষেপ সম্পর্কে দপ্তরটি অতিরিক্ত তথ্য দিতে অপরাগতা জানায়।

“এই গোপনীয়তার উদ্দেশ্য সাক্ষী ও তথ্যসূত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা", আলাপকে লিখেছে আইসিসি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

ইউক্রেন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, তা বাস্তবায়নে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয় বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। 

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত

কাতেরিনা রাশেভস্কা আলাপ-কে বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিজস্ব কোনো পুলিশ বা বলপ্রয়োগকারী সংস্থা নেই। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভর করে”।

রোম সংবিধির আওতাভুক্ত ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্র ও আদালতের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ অন্যান্য সহযোগী দেশগুলোর দায়িত্ব অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে আদালতে হস্তান্তর করা। এই বাধ্যবাধকতা রোম সংবিধির ৮৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে। যেখানে রাষ্ট্রগুলোকে আদালতের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ৮৯ নম্বর অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তার ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কাতারিনা জোর দিয়ে বলেন, “আইসিসি ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানদের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের দায়মুক্তি নেই, যা গ্রেপ্তারে বাধা হতে পারে।”

আইসিসি’র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নে আইনি চ্যালেঞ্জ নিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মো. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, “আইনগতভাবে বড় কোনো জটিলতা নেই। আইসিসি’র ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা আছে। অনেক সময় কিছু রাষ্ট্র এই বাধ্যবাধকতা পালন করে না। যেমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গোলিয়া সফর করেন, কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।” 

আইসিসির কিছু দেশের প্রতি নমনীয় আবার কিছু দেশের প্রতি কঠোর হওয়া নিয়েও আছে সমালোচনা। এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. মোস্তফা হুছাইন বলেন, “বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল আইসিসি’র গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। কিন্তু এই পরোয়ানার পর আইসিসি’র প্রসিকিউটর ও বিচারকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ থেকেই বোঝা যায় রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ছাড়া আইসিসির ভূমিকা সীমিত হয়ে যায়।” 

একই প্রসঙ্গে গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের শিশু অধিকার বিষয়ক লিগ্যাল অ্যাডভাইজার দানিয়েল দেরোহানেশিয়ান যোগ করেন, “আইসিসির বড় সীমাবদ্ধতা হলো উচ্চপর্যায়ের অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে না পারা। তবে এই অচলাবস্থা যে স্থায়ী নয়। ক্ষমতাবান নেতারাও বিচারের আওতায় আসতে পারেন, ইতিহাসে এমন প্রমাণও আছে। যেমন, রদ্রিগো দুতার্তে’র গ্রেপ্তার তেমনই একটি ঘটনা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোস্তফা হুছাইন বলছেন, “আইভরি কোস্টের সাবেক রাষ্ট্রপতি লোহন্ত ব্যাগবো’র মামলায় রাষ্ট্র আইসিসিকে সহযোগিতা করেছিল। ফলে আইসিসিতে বিচার সম্ভব। যদিও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই তিনি খালাস পান। পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি সফল হয়েছিল মূলত রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার কারণে।”

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজওয়ানুল ইসলাম মনে করেন, “আইসিসির এ ধরনের গ্রেফতারি পরোয়ানার কারণে অনেক সময় অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক চলাচলও সীমিত হয়ে পড়ে”। 

এক্ষেত্রে আইসিসি’র কার্যকারিতা আরো বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক বা নীতিগত কোনো সংস্কার প্রয়োজন আছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আইসিসি’র কার্যক্রমের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া কিছু রাষ্ট্রের আইসিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়া আদালতের কার্যপরিধিকে সীমিত করে ফেলেছে। কারণ, যারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়, তাদের ওপর আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।”

“যদি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কোনো প্রস্তাব পাস করে, তাহলে আইসিসি’র সদস্য নয় এমন রাষ্ট্রগুলোও সেক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে আইনগতভাবে বাধ্য।” যোগ করে বলেন অধ্যাপক মো. রিজওয়ানুল ইসলাম।

তবে কাতেরিনা সতর্ক করে বলেন, “কোনো একটি ক্ষেত্রে অসহযোগিতা পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই আইসিসি’র সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক ঐক্য রক্ষার সঙ্গেও জড়িত।”

দানিয়েল দেরোহানেশিয়ান মনে করেন, “এই বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা ও সিভিল সোসাইটিকে শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ তারাই ভুক্তভোগীদের সবচেয়ে দ্রুত সহায়তা দেন।”