মে দিবস : 'এনক্লোজার মুভমেন্ট' থেকে হে মার্কেট ট্রাজেডি, পুঁজিবাদের রূপান্তর ও আধুনিক শ্রমিকের 'অ্যালিনেশন'
উনিশ শতকের শ্রমিক ছিলো কারখানার কর্মী। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছে ‘প্রিকারিয়েট’ নামক সর্বহারা শ্রেণির শ্রমিক। গিগ ইকোনমিতে ‘অ্যালগরিদম’ নামক অদৃশ্য বুর্জোয়ার হাতে ২৪ ঘণ্টাই বন্দি থাকছে রাইড শেয়ার, ডেলিভারি বয় থেকে শুরু করে হাজারো পেশার মানুষ।
কামরুজ্জামান পৃথু
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ০৯:২৩ এএমআপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। জেমস ওয়াট আবিষ্কার করলেন বাষ্পীয় ইঞ্জিনের উন্নত এক সংস্করণ। এই একটিমাত্র আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে দাঁড় করিয়ে দিলো তার ইতিহাসের অভূতপূর্ব এক সন্ধিক্ষণে। কুটির শিল্পনির্ভর উৎপাদন থেকে তৈরি হলো বিশাল মিল ও কারখানা। শুরু হলো ‘শিল্প বিপ্লব’। আর এই শিল্প বিপ্লব বদলে দিলো পুরো পৃথিবীর 'সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো’।
নতুন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থায় কারখানা তৈরির জন্য দরকার ছিল বিপুল অর্থের। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগালো ‘মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিস্ট’রা। তাদের হাতে আগে থেকেই জমা সম্পদ ব্যবহার করে তারাই হয়ে বসল উৎপাদন ব্যবস্থার সর্বময় কর্তা। উদ্ভব হলো ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটালিস্ট’ শ্রেণির।
পুঁজিপতিদের কারখানার চাকা সচল রাখতে প্রয়োজন হলো একদল মানুষের। আর সেই মানুষ জোগাড় করতে ১৮০১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পাস হয় 'জেনারেল এনক্লোজার অ্যাক্ট' নামের এক কালো আইন। এই আইনের মাধ্যমে ধনিক শ্রেণির ভূস্বামীরা সাধারণ কৃষকদের 'কমন ল্যান্ড'গুলোতে বেড়া দিয়ে দাবি করলো, এই জমি এখন থেকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
এনক্লোজার মুভমেন্টে জমি হারানো এই কৃষকদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। না খেয়ে মরা অথবা শহরে গিয়ে কারখানায় সস্তায় শ্রম দেওয়া।
ইতিহাসবিদ ই. পি. টমসন তার ‘দ্য ম্যাকিং অফ দ্য ইংলিশ ওয়ার্কিং ক্লাস’ বইতে দেখান, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে শহরে ঠেলে দেওয়া এই নিঃস্ব মানুষগুলোই ছিল শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় 'সস্তা শ্রমিক', যাদের শ্রম শোষণ করে পুঁজিবাদ তার প্রাসাদ গড়েছে।
কার্ল মার্ক্স তার 'ক্যাপিটাল' বইয়ে একে বললেন, ‘রক্ত ও আগুনের অক্ষরে লেখা ইতিহাস’।
নতুন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিক হয়ে উঠল মেশিনের ‘নাট-বোল্ট’ এর মতো পুঁজি গড়ার একটি প্রাণহীন উপকরণ। পুঁজিবাদ শ্রমিকের সৃজনশীল সত্তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো তার উৎপাদিত পণ্য, তার প্রকৃতি এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব থেকে।
শ্রম যখন পণ্য
শিল্প বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ে একজন ব্যক্তি তার শ্রম ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করতো। সেই পণ্য বিক্রি করে পেত অর্থ। মানুষ যখন শ্রম দিয়ে কোন পণ্য তৈরি করে, সেটির মধ্যে মিশে থাকে সেই ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতা। ব্যক্তির নিজের ইচ্ছায় এবং আনন্দের সাথে উৎপাদন করা পণ্যে থাকে তার ব্যক্তিগত মালিকানা। কার্ল মার্ক্স এই বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন ‘ডিগনিটি অব লেবার’ হিসেবে।
কিন্তু পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমকেই ‘পণ্যে’ পরিণত করে। যেখানে শ্রমিক উৎপাদিত পণ্যের বিনিময়ে নয়, বরং শ্রমকেই বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তৈরি সেই পণ্যে থাকে না তার কোনো মালিকানা।
এই ব্যবস্থায় শ্রমিক উৎপাদনের ক্ষুদ্র একটি অংশের সাথে যুক্ত থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি পোষাক কারখানায় কোন একজন শ্রমিকের কাজ হয় শুধুমাত্র বোতাম লাগানো, বা পকেট সেলাই করা। ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তার ‘দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস’ বইয়ে এই ব্যবস্থার নামকরণ করেন ‘ডিভিশন অব লেবার’ বা শ্রম বিভাজন।
অ্যাডাম স্মিথ অল্প সময়ে অনেক বেশি পণ্য উৎপাদনে ‘ডিভিশন অব লেবার’কে কার্যকরী বললেও কার্ল মার্ক্স দেখান এই ব্যবস্থার অন্ধকার দিক। মার্ক্স বলেন, উৎপাদনের ক্ষুদ্র একটি অংশে একই কাজ মানুষকে একটি 'জীবন্ত যন্ত্রে' পরিণত করে।
মার্ক্সের মতে, মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো সৃজনশীলতা। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমিকের মানবিক বৈশিষ্ট্য, সুপ্ত প্রতিভা এবং নিজের ইচ্ছাকে দমন করে। ফলে শ্রমিক নিজের আসল সত্তা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
একইসাথে পুঁজিবাদ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। শ্রমিকরা একে অপরকে সহকর্মীর বদলে দেখতে শুরু করে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। এতে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অন্য মানুষের কাছ থেকে। ফলে সমাজে তার অর্থপূর্ণ কোন সম্পর্ক তৈরি হয় না। মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় কেবল তার শ্রম দেওয়ার সক্ষমতার ভিত্তিতে। ঠিক যেমন ফ্রানৎস কাফকার ‘দ্য মেটামরফোসিস’ গল্পের গ্রেগর সামসা শ্রম দেওয়ার ক্ষমতা হারানোয় নিজের পরিবারের কাছেও হয়ে উঠেছিলেন ‘উন্গেহয়-এরেন উন্গে-ৎসিফার’ বা ‘অপবিত্র পোকা’।
মার্ক্স তার ‘ইকোনমিক অ্যান্ড ফিলোসফিক্যাল ম্যানুস্ক্রিপ্টস’ বইয়ে এই অবস্থাকে বলেন অ্যালিনেশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ।
ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্রে তার ‘বিং অ্যান্ড নাথিংনেস’ বইয়ে বলেন, শ্রমিক যখন কোনো কারখানায় কাজ করে, তখন তার 'স্বাধীনতা' বা 'চেতনা' কেড়ে নেওয়া হয়। সে তখন আর একজন মানুষ থাকে না, সে একটি যন্ত্রের পার্টস বা হাতুড়ির মতো একটি জড়বস্তুতে পরিণত হয়। সার্ত্রে এর নামকরণ করেন শ্রমিকের বস্তুকরণ বা অবজেক্টিফিকেশন।
কার্ল মার্ক্স তার তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেন যে, একজন শ্রমিককে তার নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য যতটুকু কাজ করা দরকার, মালিকপক্ষ তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। এই অতিরিক্ত সময়ের শ্রমই হলো মালিকের মুনাফা। মার্ক্স এর নামকরণ করেন, ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ বা উদ্বৃত্ত মূল্য।
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তার ‘দ্য কন্ডিশন অফ দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড’ বইটিতে বর্ণনা করেন, কীভাবে ম্যানচেস্টারের কারখানায় শ্রমিকদের ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা খাটানো হতো। পুঁজিবাদী মালিকপক্ষের লক্ষ্য একটাই, শ্রমিকদের থেকে সর্বোচ্চ ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ নিংড়ে নেওয়া।
ক্যাপিটালিজম দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকের এই ‘চুরি করা শ্রমের’ ওপর। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষ আর মানুষ থাকল না, সে হয়ে উঠল বাজারের একটি দরদামযোগ্য পণ্য।
‘ঘড়ির দাস’ ও আট ঘণ্টার লড়াই
পুঁজিবাদের প্রথম ও প্রধান দস্যুতা ছিল শ্রমিকের সময় চুরি করা। আদিম মানুষ কাজ করত প্রয়োজন অনুযায়ী। পুঁজিবাদ তাকে বাধ্য করল ১২, ১৪ কিংবা ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে। শ্রমিক যখন দেখল সে তার শ্রমের মালিক নয়, বরং শৃঙ্খলিত এক ক্রীতদাস, তখনই শুরু হলো এক দ্বন্দ্বের ইতিহাসের। মার্ক্স এবং এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’তে ঘোষণা করলেন, ‘মানুষের ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস’। এই শ্রেণি সংগ্রামের ‘নায়ক’ হলো ‘প্রলেতারিয়েত’ বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণি।
সমাজতন্ত্রী চিন্তাবিদ রবার্ট ওয়েন ১৮১৭ সালে স্লোগান দেন ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম’।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি এই দাবিতে জোটবদ্ধ হতে শুরু করে আমেরিকার শিল্পাঞ্চলগুলোর শ্রমিকরা। এটি কেবল সময়ের দাবি ছিল না, এটি ছিল মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবি।
পুঁজিবাদী শক্তি এই দাবিকে দেখল তাদের মুনাফার ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে। তারা পুলিশ, আদালত এবং সংবাদপত্রকে ব্যবহার করে শ্রমিকদের ওপর শুরু করলো দমন-পীড়ন। তবে দমন যত বেড়েছে, শ্রমিকদের সংহতি হয়েছে ততই ইস্পাতকঠিন।
শিকাগোর রক্তক্ষরণ: হে মার্কেট ট্র্যাজেডি
শ্রমিকদের এই আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছায় ১৮৮৬ সালের মে মাসে ১ তারিখ। এদিন আমেরিকার শিকাগো শহরে রাস্তায় নেমে আসে কয়েক হাজার শ্রমিক। শিকাগোর শ্রমিকরা রাস্তায় নামলে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া পুঁজিপতি শ্রেণি। আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত থাকে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ৩রা মে। এইদিন ম্যাককরমিক হার্ভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে ধর্মঘটে শ্রমিকদের ওপর বিনা উসকানিতে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৪ঠা মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে ডাক দেওয়া হয় এক বিশাল জনসভার।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ পল অ্যাভরিচের বই ‘দ্য হে মার্কেট ট্র্যাজেডি’কে শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলন ওপর সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। বইয়ে অ্যাভরিচ লিখেন, সভা যখন শেষের পথে, তখন জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে হঠাৎ আক্রমণ চালায় পুলিশ। এরই মধ্যে একটি অজ্ঞাত বোমা বিস্ফোরিত হয়। পুলিশ উন্মত্ত হয়ে জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করে। এতে কতজন শ্রমিকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিলো তার সঠিক হিসাব আজও মেলেনি। এইদিন নিহত হয়েছিলেন কয়েকজন পুলিশও।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিক আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র। বিচারের নামে প্রহসন করে ফাঁসি দেওয়া হয় অগাস্ট স্পাইস, অ্যালবার্ট পারসনস, অ্যাডলফ ফিশার এবং জর্জ এঙ্গেলসকে। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অগাস্ট স্পাইস বলেছিলেন, "আজ আমাদের এই নীরবতা তোমাদের ওই কোলাহলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হবে, যা তোমরা আজ স্তব্ধ করতে চাইছ।"
স্পাইসের শেষ কথা মিথ্যা হয়নি। এই রক্তপাতই মে দিবসকে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির সংহতির প্রতীকে পরিণত করে।
শিকাগোর এই আন্দোলন শ্রমিকদের জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। তবে সেই পরিবর্তনের স্বরূপ নিয়ে ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও অর্থনীতিবীদদের মধ্যে আছে বিস্তর বিতর্ক।
কাঠামোগত ও আইনি পরিবর্তন: ‘যন্ত্র’ থেকে ‘মানুষ’ হওয়ার যাত্রা
আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ‘৮ ঘণ্টা কর্মদিবস’ এর ধারণাকে বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম তার ‘দ্য এজ অফ এম্পায়ার’ বইয়ে দেখিয়েছেন, এই আন্দোলনের ফলে শ্রমিকের এবং মালিকের সময়ের মধ্যে একটি পরিষ্কার সীমারেখা তৈরি হয়। এই ঘটনার আগে শ্রমিকের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মালিকের অধীনে।
এই আন্দোলনের চাপেই পরবর্তীতে ১৯১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা তাদের কনভেনশনে দিনে ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম পাস করতে বাধ্য হয়।
মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন: ‘ডিগনিটি অফ লেবার’ বা আত্মমর্যাদার জাগরণ
এই আন্দোলনের পরে শ্রমিকের আত্মপরিচয় বদলে যায়। কার্ল মার্ক্সের ‘ক্লাস কনশাসনেস’ বা শ্রেণি চেতনা তত্ত্বে বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায়। শ্রমিক প্রথমবার বুঝতে পারে যে, সে একা নয়। সে একটি বিশাল আন্তর্জাতিক শক্তির অংশ।
কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো কী প্রকৃতপক্ষেই শ্রমিকের জীবনমানের কোনো উন্নতি করেছে? অনেক দার্শনিক ও বিশ্লেষক মনে করেন, এই অর্জনগুলো আসলে পুঁজিবাদের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল বা ‘ধোঁকা’।
‘ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে’র দার্শনিকরা মনে করেন, পুঁজিবাদ শ্রমিককে ৮ ঘণ্টা কাজ, সাপ্তাহিক ছুটি বা বিমার মতো কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসলে তার ‘বিপ্লবী চেতনা’কে ভোঁতা করে দিয়েছে। পুঁজিবাদ বুঝতে পেরেছিল যে, শ্রমিকের পিঠ যদি দেওয়ালে ঠেকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে পুরো ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেবে। তাই শ্রমিককে কিছু ছাড় দিয়ে ‘সন্তুষ্ট’ রাখাটাই পুঁজিবাদের স্থায়িত্বের জন্য সুবিধাজনক।
পুঁজিবাদ ৮ ঘণ্টা কাজ নিশ্চিত করলেও শ্রমিককে ১৬ ঘণ্টার ‘ক্রেতা’য় পরিণত করেছে। অর্থাৎ, শ্রমিক ৮ ঘণ্টায় যা আয় করে, পুঁজিবাদের বানানো পণ্য কিনে তা আবার মালিকের পকেটেই ফেরত দেয়।
মে দিবসের বিশ্বায়ন ও রোজা লুক্সেমবার্গ
মে দিবসকে বৈশ্বিক রূপ দেওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখেন একজন নারী। তিনি হলেন নারীবাদী ও দার্শনিক রোজা লুক্সেমবার্গ। রোজা তার ‘রিফর্ম অর রেভল্যুশন’ বই এবং বিভিন্ন বক্তৃতায় মে দিবসকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে প্রচার করেন।
ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তিতে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে একটি সমাবেশের আয়োজন করে সমাজতান্ত্রিক এবং শ্রমিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক সংগঠন 'সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল'। এই সম্মেলনের ১লা মে তারিখকে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া। শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবির সাথে সংহতি জানাতেই নেওয়া হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত।
পরের বছর প্রথমবার আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় মে দিবস। আর তখন থেকেই এই দিনটি শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে অভাবনীয় সাড়া ফেলে।
মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম তার ‘দ্য এজ অফ এম্পায়ার’ বইয়ে দেখান কীভাবে মে দিবস ইউরোপ এবং আমেরিকা পার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশেও। হবসবমের মতে, এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র ‘আন্তর্জাতিক’ দিবস যা নিচুতলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছিল।
রাশিয়ার ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব মে দিবসকে এক নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দেয়। লেনিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন মে দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা শ্রমিকদের মুক্তির প্রেরণা জোগায় এই স্বীকৃতি।
ইতিহাস সবসময় রাজাদের নাম লিখে রাখে। জার্মান কবি ও নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেখট তার ‘পড়তে জানা শ্রমিকের প্রশ্ন’ কবিতায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘চীনের প্রাচীর বা ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান বানানো সেই শ্রমিকেরা কাজ শেষে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো?’
মে দিবস হলো নামহীন সেই শ্রমিকের নাম লেখার দিন। ইতিহাসের সেই মহান নায়কদের স্বীকৃতি দেওয়ার দিন, যাদের ঘামে সচল থাকে সভ্যতার রথের চাকা।
পুঁজিবাদের রূপান্তর ও সমকালীন সংগ্রাম
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পুঁজিবাদ তার রূপ বদলেছে। এখনকার ক্যাপিটালিজম কেবল কারখানায় আটকে নেই। আজকের পুঁজিবাদ আরও বেশি অদৃশ্য। আরও বেশি বিপজ্জনক।
আধুনিক অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং তার ‘দ্য প্রিকারিয়েট: দ্য নিউ ডেঞ্জারাস ক্লাস’ বইয়ে দেখিয়েছেন পুঁজিবাদ কীভাবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গিগ ইকোনমির মাধ্যমে নতুন ধরনের শ্রমিক শ্রেণি তৈরি করছে। এই শ্রমিকদের জীবিকা, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিচয় সবই অনিশ্চিত। যাদের নেই কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান বা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। গাই যাদের নাম দিয়েছেন ‘প্রিকারিয়েট’ বা অনিশ্চিত শ্রমিক।
দার্শনিক নোয়াম চমস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন, আধুনিক প্রযুক্তি শ্রমিককে আরও বেশি একা এবং বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। আগে মালিককে দেখা যেত। এখন মালিক অদৃশ্য এক সার্ভার বা অ্যাপ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার থেকে ডেলিভারি বয়, সবাই আজ পুঁজিবাদী অ্যালগরিদমের শেকলে বন্দি।
আধুনিক অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি তার ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ে গত ৩০০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, সম্পদের বৈষম্য এখন উনিশ শতকের চেয়েও বেড়েছে।
পিকেটি সতর্ক করে বলেছেন, পৃথিবী আবার ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া’ পুঁজিবাদের দিকে ফিরে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি নিজের প্রতিভা বা পরিশ্রমের চেয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে কত সম্পদ পেয়েছেন, সেটাই তার জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারক করে দেবে। মেরিটোক্রেসি বা যোগ্যতা পড়বে হুমকির মুখে ফেলছে।
মার্ক্সের বলা সেই ‘অ্যালিনেশন’ আজ আরও প্রকট। আজকে শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার পেয়েছে বটে, কিন্তু ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ‘অলওয়েজ অন’ সংস্কৃতির মাধ্যমে পুঁজিবাদ মানুষকে ২৪ ঘণ্টাই শ্রমিকের কাতারে নামিয়ে এনেছে। করপোরেট স্বার্থের কাছে আজও তুচ্ছ শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা।
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া কয়েক হাজার শ্রমিক আধুনিক পুঁজিবাদের সীমাহীন লোভের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এদেশের শ্রমিকরা আজও মে দিবসের পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারছে না। গার্মেন্টস কিংবা চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দীর্ঘ আন্দোলন প্রমাণ করে, এদেশের পুঁজিপতিরা আজও ১৮৮৬ সালের সেই শিকাগোর মালিকদের মানসিকতাই ধারণ করে।
কেবল দেশি মালিক নয়, এদেশের শ্রমিকদের শোষণ করছে পশ্চিমা বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোও। নামমাত্র মূল্যে শ্রম কিনে বিশাল মুনাফা লুটছে তারা। যা মার্ক্সের বলা ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম’ এরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
মে দিবসের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা
হে মার্কেটের সেই রক্তঝরা দিনগুলো থেকে দেড়শ বছর দূরে দাঁড়িয়ে, আট ঘণ্টা কাজ, বিমা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার পেয়ে যাওয়ার পর মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা কি সত্যিই আছে?
দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিকদের চোখ দিয়ে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে গভীরতর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মে দিবস আজ আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ পুঁজিবাদ আজ আরও শক্তিশালী, সূক্ষ্ম এবং ছদ্মবেশী।
উনিশ শতকের শ্রমিক ছিলো কারখানার কর্মী। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছে ‘প্রিকারিয়েট’ নামক সর্বহারা শ্রেণির শ্রমিকের। গিগ ইকোনমিতে ‘অ্যালগরিদম’ নামক অদৃশ্য বুর্জোয়ার হাতে ২৪ ঘণ্টাই বন্দি থাকছে রাইড শেয়ার, ডেলিভারি বয় থেকে শুরু করে হাজারো পেশার মানুষ। ১ শতাংশ মানুষের হাতে জমা হচ্ছে ৯৯ শতাংশ সম্পদ। মানুষের শ্রমকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। যে কোনো মুহূর্তে কাজ হারানোর অনিশ্চয়টায় যখন দিন কাটাচ্ছে বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ। তখনই আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে মে দিবসের চেতনা।
উত্তরণের পথ কী?
আজকের শ্রমিকদের শোষণমুক্ত হয়ে একটি মানবিক, সম্মানজনক জীবন পাওয়া কি খুব বেশি কঠিন? ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদরা গত দুই শতাব্দী ধরে শ্রমিকদের 'উত্তরণের পথ' নিয়ে দিয়েছেন অনেক তত্ত্ব ও দিকনির্দেশনা। তারা দেখিয়েছেন, শৃঙ্খল থেকে মুক্তির এই পথটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।
শ্রমিকের মুক্তির প্রথম ধাপ হলো তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়া। কার্ল মার্ক্স তার ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’তে স্পষ্ট করে বলেছেন, শ্রমিকরা যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের কেবল ‘ব্যক্তি’ হিসেবে দেখবে, ততক্ষণ তারা শোষিত হবে। শ্রমিককে বুঝতে হবে সে একটি বিশাল ‘শ্রেণি’র অংশ। মার্ক্স একে বলেছেন ‘ক্লাস ফর ইটসেলফ’। শ্রমিকরা যখন বিচ্ছিন্ন স্বার্থ ভুলে সামষ্টিক স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই তারা পুঁজিবাদের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
পুঁজিবাদ কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়েই শ্রমিককে শোষণ করে না, তারা মানুষের চেতনায় এই ধারণা ঢুকিয়ে দেয় যে ‘পুঁজিবাদই সেরা ব্যবস্থা’।
ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশি তার ‘প্রিজন নোটবুকস’ বইয়ে একে বলেছেন ‘হেজেমনি’। গ্রামশির মতে, শ্রমিকদের মধ্য থেকেই ‘অর্গানিক ইনটেলেকচুয়াল’ বা নিজস্ব বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তৈরি করতে হবে। শ্রমিকদের গড়ে তুলতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং চিন্তা যা পুঁজিবাদের শেখানো ‘জ্ঞান’কে চ্যালেঞ্জ করবে।
ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি শ্রমিকের মুক্তির জন্য একটি বিশেষ শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রমিককে কেবল ‘আজ্ঞাবহ’ বানানো হয়।
ফ্রেইরি ‘কনসায়েন্টাইজেশন’ বা ‘চেতনার উন্মেষ’ এর কথা বলেছেন। তার মতে, শ্রমিকের এমন শিক্ষা প্রয়োজন যা তাকে প্রশ্ন করতে শেখাবে কেন সে গরিব? কেন তার শ্রমের ফল অন্য কেউ ভোগ করছে? এই ‘সমস্যামূলক শিক্ষা’ই শ্রমিককে বিপ্লবের পথে পরিচালিত করবে।
অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিকল্প নেই। একজন শ্রমিক বিচ্ছিন্নভাবে দুর্বল। জোটবদ্ধভাবে তারা একটি শক্তিশালী পক্ষ। রোজা লুক্সেমবার্গ তার ‘মাস স্ট্রাইক’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, সাধারণ ধর্মঘট বা গণ-আন্দোলন শ্রমিককে রাজনৈতিকভাবে আরো প্রশিক্ষিত করে তোলে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন শ্রমিকের উত্তরণকে ‘আয়’ দিয়ে না দেখে দেখেছেন ‘সক্ষমতা’ হিসেবে। তার মতে, শ্রমিককে কেবল মজুরি দিলেই হবে না, তাকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, গুণগত শিক্ষা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতা দিতে হবে। একজন শ্রমিকের এই ‘সক্ষমতা’ তৈরি হলে সে আর সস্তা শ্রম দিতে বাধ্য থাকে না। আর তখনই সে শক্তি অর্জন মালিকের সাথে দর কষাকষির।
ধনীদের ওপর ‘প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্স’ বা প্রগতিশীল কর আরোপ করাকে একটি উপায় হিসেবে দেখিয়েছেন টমাস পিকেটি। সেই অর্থ শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা, আবাসন এবং পেনশনে ব্যয় করার কথা বলেছেন তিনি। রাষ্ট্রকে মালিকের পাহারাদার না হয়ে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার কথা বলেন পিকেটি।
শ্রমিকদের উত্তরণের চূড়ান্ত উপায় কেবল একটি তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করা। আইনি ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্রে বলেছিলেন, ‘মানুষ যা, তার জন্য সে নিজেই দায়ী’। শ্রমিকদের নিজেদের মুক্তির লড়াই নিজেকেই শুরু করতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতাবানরা কখনোই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয়নি, তাদের ক্ষমতা কেড়ে নিতে হয়েছে সংহতি এবং লড়াইয়ের মাধ্যমে।
ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হলো, শোষণ যখন চরমে পৌঁছায়, তখনই শোষিত শ্রেণি জেগে ওঠে। মে দিবস হলো সেই জাগরণের ইতিহাস। পুঁজিবাদ নামক রক্তচোষা দানবের হাত থেকে মানবতাকে মুক্ত করার শপথের দিন।
মে দিবসের সেই মহান নায়কেরা আজও লড়ে চলেছে। তাদের লড়াই এমন এক পৃথিবীর জন্য, যেখানে শ্রম আর পণ্য হবে না। যেখানে মানুষ শুধু উৎপাদনের উপকরণ হবে না। বরং ‘দুনিয়ার মজদুর এক’ হয়ে নিজেরাই লিখবে নিজেদের মুক্তির মহাকাব্য। যেখানে শোষণ নয়, সাম্যই হবে সভ্যতার মাপকাঠি।
মে দিবস : 'এনক্লোজার মুভমেন্ট' থেকে হে মার্কেট ট্রাজেডি, পুঁজিবাদের রূপান্তর ও আধুনিক শ্রমিকের 'অ্যালিনেশন'
উনিশ শতকের শ্রমিক ছিলো কারখানার কর্মী। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছে ‘প্রিকারিয়েট’ নামক সর্বহারা শ্রেণির শ্রমিক। গিগ ইকোনমিতে ‘অ্যালগরিদম’ নামক অদৃশ্য বুর্জোয়ার হাতে ২৪ ঘণ্টাই বন্দি থাকছে রাইড শেয়ার, ডেলিভারি বয় থেকে শুরু করে হাজারো পেশার মানুষ।
সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। জেমস ওয়াট আবিষ্কার করলেন বাষ্পীয় ইঞ্জিনের উন্নত এক সংস্করণ। এই একটিমাত্র আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে দাঁড় করিয়ে দিলো তার ইতিহাসের অভূতপূর্ব এক সন্ধিক্ষণে। কুটির শিল্পনির্ভর উৎপাদন থেকে তৈরি হলো বিশাল মিল ও কারখানা। শুরু হলো ‘শিল্প বিপ্লব’। আর এই শিল্প বিপ্লব বদলে দিলো পুরো পৃথিবীর 'সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো’।
নতুন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থায় কারখানা তৈরির জন্য দরকার ছিল বিপুল অর্থের। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগালো ‘মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিস্ট’রা। তাদের হাতে আগে থেকেই জমা সম্পদ ব্যবহার করে তারাই হয়ে বসল উৎপাদন ব্যবস্থার সর্বময় কর্তা। উদ্ভব হলো ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটালিস্ট’ শ্রেণির।
পুঁজিপতিদের কারখানার চাকা সচল রাখতে প্রয়োজন হলো একদল মানুষের। আর সেই মানুষ জোগাড় করতে ১৮০১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পাস হয় 'জেনারেল এনক্লোজার অ্যাক্ট' নামের এক কালো আইন। এই আইনের মাধ্যমে ধনিক শ্রেণির ভূস্বামীরা সাধারণ কৃষকদের 'কমন ল্যান্ড'গুলোতে বেড়া দিয়ে দাবি করলো, এই জমি এখন থেকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
এনক্লোজার মুভমেন্টে জমি হারানো এই কৃষকদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। না খেয়ে মরা অথবা শহরে গিয়ে কারখানায় সস্তায় শ্রম দেওয়া।
ইতিহাসবিদ ই. পি. টমসন তার ‘দ্য ম্যাকিং অফ দ্য ইংলিশ ওয়ার্কিং ক্লাস’ বইতে দেখান, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে শহরে ঠেলে দেওয়া এই নিঃস্ব মানুষগুলোই ছিল শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় 'সস্তা শ্রমিক', যাদের শ্রম শোষণ করে পুঁজিবাদ তার প্রাসাদ গড়েছে।
কার্ল মার্ক্স তার 'ক্যাপিটাল' বইয়ে একে বললেন, ‘রক্ত ও আগুনের অক্ষরে লেখা ইতিহাস’।
নতুন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিক হয়ে উঠল মেশিনের ‘নাট-বোল্ট’ এর মতো পুঁজি গড়ার একটি প্রাণহীন উপকরণ। পুঁজিবাদ শ্রমিকের সৃজনশীল সত্তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো তার উৎপাদিত পণ্য, তার প্রকৃতি এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব থেকে।
শ্রম যখন পণ্য
শিল্প বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ে একজন ব্যক্তি তার শ্রম ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করতো। সেই পণ্য বিক্রি করে পেত অর্থ। মানুষ যখন শ্রম দিয়ে কোন পণ্য তৈরি করে, সেটির মধ্যে মিশে থাকে সেই ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতা। ব্যক্তির নিজের ইচ্ছায় এবং আনন্দের সাথে উৎপাদন করা পণ্যে থাকে তার ব্যক্তিগত মালিকানা। কার্ল মার্ক্স এই বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন ‘ডিগনিটি অব লেবার’ হিসেবে।
কিন্তু পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমকেই ‘পণ্যে’ পরিণত করে। যেখানে শ্রমিক উৎপাদিত পণ্যের বিনিময়ে নয়, বরং শ্রমকেই বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তৈরি সেই পণ্যে থাকে না তার কোনো মালিকানা।
এই ব্যবস্থায় শ্রমিক উৎপাদনের ক্ষুদ্র একটি অংশের সাথে যুক্ত থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি পোষাক কারখানায় কোন একজন শ্রমিকের কাজ হয় শুধুমাত্র বোতাম লাগানো, বা পকেট সেলাই করা। ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তার ‘দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস’ বইয়ে এই ব্যবস্থার নামকরণ করেন ‘ডিভিশন অব লেবার’ বা শ্রম বিভাজন।
অ্যাডাম স্মিথ অল্প সময়ে অনেক বেশি পণ্য উৎপাদনে ‘ডিভিশন অব লেবার’কে কার্যকরী বললেও কার্ল মার্ক্স দেখান এই ব্যবস্থার অন্ধকার দিক। মার্ক্স বলেন, উৎপাদনের ক্ষুদ্র একটি অংশে একই কাজ মানুষকে একটি 'জীবন্ত যন্ত্রে' পরিণত করে।
মার্ক্সের মতে, মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো সৃজনশীলতা। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমিকের মানবিক বৈশিষ্ট্য, সুপ্ত প্রতিভা এবং নিজের ইচ্ছাকে দমন করে। ফলে শ্রমিক নিজের আসল সত্তা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
একইসাথে পুঁজিবাদ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। শ্রমিকরা একে অপরকে সহকর্মীর বদলে দেখতে শুরু করে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। এতে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অন্য মানুষের কাছ থেকে। ফলে সমাজে তার অর্থপূর্ণ কোন সম্পর্ক তৈরি হয় না। মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় কেবল তার শ্রম দেওয়ার সক্ষমতার ভিত্তিতে। ঠিক যেমন ফ্রানৎস কাফকার ‘দ্য মেটামরফোসিস’ গল্পের গ্রেগর সামসা শ্রম দেওয়ার ক্ষমতা হারানোয় নিজের পরিবারের কাছেও হয়ে উঠেছিলেন ‘উন্গেহয়-এরেন উন্গে-ৎসিফার’ বা ‘অপবিত্র পোকা’।
মার্ক্স তার ‘ইকোনমিক অ্যান্ড ফিলোসফিক্যাল ম্যানুস্ক্রিপ্টস’ বইয়ে এই অবস্থাকে বলেন অ্যালিনেশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ।
ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্রে তার ‘বিং অ্যান্ড নাথিংনেস’ বইয়ে বলেন, শ্রমিক যখন কোনো কারখানায় কাজ করে, তখন তার 'স্বাধীনতা' বা 'চেতনা' কেড়ে নেওয়া হয়। সে তখন আর একজন মানুষ থাকে না, সে একটি যন্ত্রের পার্টস বা হাতুড়ির মতো একটি জড়বস্তুতে পরিণত হয়। সার্ত্রে এর নামকরণ করেন শ্রমিকের বস্তুকরণ বা অবজেক্টিফিকেশন।
কার্ল মার্ক্স তার তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেন যে, একজন শ্রমিককে তার নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য যতটুকু কাজ করা দরকার, মালিকপক্ষ তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। এই অতিরিক্ত সময়ের শ্রমই হলো মালিকের মুনাফা। মার্ক্স এর নামকরণ করেন, ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ বা উদ্বৃত্ত মূল্য।
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তার ‘দ্য কন্ডিশন অফ দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড’ বইটিতে বর্ণনা করেন, কীভাবে ম্যানচেস্টারের কারখানায় শ্রমিকদের ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা খাটানো হতো। পুঁজিবাদী মালিকপক্ষের লক্ষ্য একটাই, শ্রমিকদের থেকে সর্বোচ্চ ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ নিংড়ে নেওয়া।
ক্যাপিটালিজম দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকের এই ‘চুরি করা শ্রমের’ ওপর। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষ আর মানুষ থাকল না, সে হয়ে উঠল বাজারের একটি দরদামযোগ্য পণ্য।
‘ঘড়ির দাস’ ও আট ঘণ্টার লড়াই
পুঁজিবাদের প্রথম ও প্রধান দস্যুতা ছিল শ্রমিকের সময় চুরি করা। আদিম মানুষ কাজ করত প্রয়োজন অনুযায়ী। পুঁজিবাদ তাকে বাধ্য করল ১২, ১৪ কিংবা ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে। শ্রমিক যখন দেখল সে তার শ্রমের মালিক নয়, বরং শৃঙ্খলিত এক ক্রীতদাস, তখনই শুরু হলো এক দ্বন্দ্বের ইতিহাসের। মার্ক্স এবং এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’তে ঘোষণা করলেন, ‘মানুষের ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস’। এই শ্রেণি সংগ্রামের ‘নায়ক’ হলো ‘প্রলেতারিয়েত’ বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণি।
সমাজতন্ত্রী চিন্তাবিদ রবার্ট ওয়েন ১৮১৭ সালে স্লোগান দেন ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম’।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি এই দাবিতে জোটবদ্ধ হতে শুরু করে আমেরিকার শিল্পাঞ্চলগুলোর শ্রমিকরা। এটি কেবল সময়ের দাবি ছিল না, এটি ছিল মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবি।
পুঁজিবাদী শক্তি এই দাবিকে দেখল তাদের মুনাফার ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে। তারা পুলিশ, আদালত এবং সংবাদপত্রকে ব্যবহার করে শ্রমিকদের ওপর শুরু করলো দমন-পীড়ন। তবে দমন যত বেড়েছে, শ্রমিকদের সংহতি হয়েছে ততই ইস্পাতকঠিন।
শিকাগোর রক্তক্ষরণ: হে মার্কেট ট্র্যাজেডি
শ্রমিকদের এই আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছায় ১৮৮৬ সালের মে মাসে ১ তারিখ। এদিন আমেরিকার শিকাগো শহরে রাস্তায় নেমে আসে কয়েক হাজার শ্রমিক। শিকাগোর শ্রমিকরা রাস্তায় নামলে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া পুঁজিপতি শ্রেণি। আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত থাকে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ৩রা মে। এইদিন ম্যাককরমিক হার্ভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে ধর্মঘটে শ্রমিকদের ওপর বিনা উসকানিতে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৪ঠা মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে ডাক দেওয়া হয় এক বিশাল জনসভার।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ পল অ্যাভরিচের বই ‘দ্য হে মার্কেট ট্র্যাজেডি’কে শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলন ওপর সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। বইয়ে অ্যাভরিচ লিখেন, সভা যখন শেষের পথে, তখন জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে হঠাৎ আক্রমণ চালায় পুলিশ। এরই মধ্যে একটি অজ্ঞাত বোমা বিস্ফোরিত হয়। পুলিশ উন্মত্ত হয়ে জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করে। এতে কতজন শ্রমিকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিলো তার সঠিক হিসাব আজও মেলেনি। এইদিন নিহত হয়েছিলেন কয়েকজন পুলিশও।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিক আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র। বিচারের নামে প্রহসন করে ফাঁসি দেওয়া হয় অগাস্ট স্পাইস, অ্যালবার্ট পারসনস, অ্যাডলফ ফিশার এবং জর্জ এঙ্গেলসকে। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অগাস্ট স্পাইস বলেছিলেন, "আজ আমাদের এই নীরবতা তোমাদের ওই কোলাহলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হবে, যা তোমরা আজ স্তব্ধ করতে চাইছ।"
স্পাইসের শেষ কথা মিথ্যা হয়নি। এই রক্তপাতই মে দিবসকে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির সংহতির প্রতীকে পরিণত করে।
শিকাগোর এই আন্দোলন শ্রমিকদের জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। তবে সেই পরিবর্তনের স্বরূপ নিয়ে ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও অর্থনীতিবীদদের মধ্যে আছে বিস্তর বিতর্ক।
কাঠামোগত ও আইনি পরিবর্তন: ‘যন্ত্র’ থেকে ‘মানুষ’ হওয়ার যাত্রা
আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ‘৮ ঘণ্টা কর্মদিবস’ এর ধারণাকে বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম তার ‘দ্য এজ অফ এম্পায়ার’ বইয়ে দেখিয়েছেন, এই আন্দোলনের ফলে শ্রমিকের এবং মালিকের সময়ের মধ্যে একটি পরিষ্কার সীমারেখা তৈরি হয়। এই ঘটনার আগে শ্রমিকের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মালিকের অধীনে।
এই আন্দোলনের চাপেই পরবর্তীতে ১৯১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা তাদের কনভেনশনে দিনে ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম পাস করতে বাধ্য হয়।
মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন: ‘ডিগনিটি অফ লেবার’ বা আত্মমর্যাদার জাগরণ
এই আন্দোলনের পরে শ্রমিকের আত্মপরিচয় বদলে যায়। কার্ল মার্ক্সের ‘ক্লাস কনশাসনেস’ বা শ্রেণি চেতনা তত্ত্বে বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায়। শ্রমিক প্রথমবার বুঝতে পারে যে, সে একা নয়। সে একটি বিশাল আন্তর্জাতিক শক্তির অংশ।
কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো কী প্রকৃতপক্ষেই শ্রমিকের জীবনমানের কোনো উন্নতি করেছে? অনেক দার্শনিক ও বিশ্লেষক মনে করেন, এই অর্জনগুলো আসলে পুঁজিবাদের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল বা ‘ধোঁকা’।
‘ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে’র দার্শনিকরা মনে করেন, পুঁজিবাদ শ্রমিককে ৮ ঘণ্টা কাজ, সাপ্তাহিক ছুটি বা বিমার মতো কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসলে তার ‘বিপ্লবী চেতনা’কে ভোঁতা করে দিয়েছে। পুঁজিবাদ বুঝতে পেরেছিল যে, শ্রমিকের পিঠ যদি দেওয়ালে ঠেকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে পুরো ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেবে। তাই শ্রমিককে কিছু ছাড় দিয়ে ‘সন্তুষ্ট’ রাখাটাই পুঁজিবাদের স্থায়িত্বের জন্য সুবিধাজনক।
পুঁজিবাদ ৮ ঘণ্টা কাজ নিশ্চিত করলেও শ্রমিককে ১৬ ঘণ্টার ‘ক্রেতা’য় পরিণত করেছে। অর্থাৎ, শ্রমিক ৮ ঘণ্টায় যা আয় করে, পুঁজিবাদের বানানো পণ্য কিনে তা আবার মালিকের পকেটেই ফেরত দেয়।
মে দিবসের বিশ্বায়ন ও রোজা লুক্সেমবার্গ
মে দিবসকে বৈশ্বিক রূপ দেওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখেন একজন নারী। তিনি হলেন নারীবাদী ও দার্শনিক রোজা লুক্সেমবার্গ। রোজা তার ‘রিফর্ম অর রেভল্যুশন’ বই এবং বিভিন্ন বক্তৃতায় মে দিবসকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে প্রচার করেন।
ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তিতে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে একটি সমাবেশের আয়োজন করে সমাজতান্ত্রিক এবং শ্রমিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক সংগঠন 'সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল'। এই সম্মেলনের ১লা মে তারিখকে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া। শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবির সাথে সংহতি জানাতেই নেওয়া হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত।
পরের বছর প্রথমবার আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় মে দিবস। আর তখন থেকেই এই দিনটি শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে অভাবনীয় সাড়া ফেলে।
মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম তার ‘দ্য এজ অফ এম্পায়ার’ বইয়ে দেখান কীভাবে মে দিবস ইউরোপ এবং আমেরিকা পার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশেও। হবসবমের মতে, এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র ‘আন্তর্জাতিক’ দিবস যা নিচুতলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছিল।
রাশিয়ার ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব মে দিবসকে এক নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দেয়। লেনিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন মে দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা শ্রমিকদের মুক্তির প্রেরণা জোগায় এই স্বীকৃতি।
ইতিহাস সবসময় রাজাদের নাম লিখে রাখে। জার্মান কবি ও নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেখট তার ‘পড়তে জানা শ্রমিকের প্রশ্ন’ কবিতায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘চীনের প্রাচীর বা ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান বানানো সেই শ্রমিকেরা কাজ শেষে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো?’
মে দিবস হলো নামহীন সেই শ্রমিকের নাম লেখার দিন। ইতিহাসের সেই মহান নায়কদের স্বীকৃতি দেওয়ার দিন, যাদের ঘামে সচল থাকে সভ্যতার রথের চাকা।
পুঁজিবাদের রূপান্তর ও সমকালীন সংগ্রাম
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পুঁজিবাদ তার রূপ বদলেছে। এখনকার ক্যাপিটালিজম কেবল কারখানায় আটকে নেই। আজকের পুঁজিবাদ আরও বেশি অদৃশ্য। আরও বেশি বিপজ্জনক।
আধুনিক অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং তার ‘দ্য প্রিকারিয়েট: দ্য নিউ ডেঞ্জারাস ক্লাস’ বইয়ে দেখিয়েছেন পুঁজিবাদ কীভাবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গিগ ইকোনমির মাধ্যমে নতুন ধরনের শ্রমিক শ্রেণি তৈরি করছে। এই শ্রমিকদের জীবিকা, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিচয় সবই অনিশ্চিত। যাদের নেই কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান বা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। গাই যাদের নাম দিয়েছেন ‘প্রিকারিয়েট’ বা অনিশ্চিত শ্রমিক।
দার্শনিক নোয়াম চমস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন, আধুনিক প্রযুক্তি শ্রমিককে আরও বেশি একা এবং বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। আগে মালিককে দেখা যেত। এখন মালিক অদৃশ্য এক সার্ভার বা অ্যাপ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার থেকে ডেলিভারি বয়, সবাই আজ পুঁজিবাদী অ্যালগরিদমের শেকলে বন্দি।
আধুনিক অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি তার ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ে গত ৩০০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, সম্পদের বৈষম্য এখন উনিশ শতকের চেয়েও বেড়েছে।
পিকেটি সতর্ক করে বলেছেন, পৃথিবী আবার ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া’ পুঁজিবাদের দিকে ফিরে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি নিজের প্রতিভা বা পরিশ্রমের চেয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে কত সম্পদ পেয়েছেন, সেটাই তার জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারক করে দেবে। মেরিটোক্রেসি বা যোগ্যতা পড়বে হুমকির মুখে ফেলছে।
মার্ক্সের বলা সেই ‘অ্যালিনেশন’ আজ আরও প্রকট। আজকে শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার পেয়েছে বটে, কিন্তু ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ‘অলওয়েজ অন’ সংস্কৃতির মাধ্যমে পুঁজিবাদ মানুষকে ২৪ ঘণ্টাই শ্রমিকের কাতারে নামিয়ে এনেছে। করপোরেট স্বার্থের কাছে আজও তুচ্ছ শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা।
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া কয়েক হাজার শ্রমিক আধুনিক পুঁজিবাদের সীমাহীন লোভের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এদেশের শ্রমিকরা আজও মে দিবসের পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারছে না। গার্মেন্টস কিংবা চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দীর্ঘ আন্দোলন প্রমাণ করে, এদেশের পুঁজিপতিরা আজও ১৮৮৬ সালের সেই শিকাগোর মালিকদের মানসিকতাই ধারণ করে।
কেবল দেশি মালিক নয়, এদেশের শ্রমিকদের শোষণ করছে পশ্চিমা বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোও। নামমাত্র মূল্যে শ্রম কিনে বিশাল মুনাফা লুটছে তারা। যা মার্ক্সের বলা ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম’ এরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
মে দিবসের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা
হে মার্কেটের সেই রক্তঝরা দিনগুলো থেকে দেড়শ বছর দূরে দাঁড়িয়ে, আট ঘণ্টা কাজ, বিমা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার পেয়ে যাওয়ার পর মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা কি সত্যিই আছে?
দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিকদের চোখ দিয়ে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে গভীরতর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মে দিবস আজ আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ পুঁজিবাদ আজ আরও শক্তিশালী, সূক্ষ্ম এবং ছদ্মবেশী।
উনিশ শতকের শ্রমিক ছিলো কারখানার কর্মী। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছে ‘প্রিকারিয়েট’ নামক সর্বহারা শ্রেণির শ্রমিকের। গিগ ইকোনমিতে ‘অ্যালগরিদম’ নামক অদৃশ্য বুর্জোয়ার হাতে ২৪ ঘণ্টাই বন্দি থাকছে রাইড শেয়ার, ডেলিভারি বয় থেকে শুরু করে হাজারো পেশার মানুষ। ১ শতাংশ মানুষের হাতে জমা হচ্ছে ৯৯ শতাংশ সম্পদ। মানুষের শ্রমকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। যে কোনো মুহূর্তে কাজ হারানোর অনিশ্চয়টায় যখন দিন কাটাচ্ছে বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ। তখনই আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে মে দিবসের চেতনা।
উত্তরণের পথ কী?
আজকের শ্রমিকদের শোষণমুক্ত হয়ে একটি মানবিক, সম্মানজনক জীবন পাওয়া কি খুব বেশি কঠিন? ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদরা গত দুই শতাব্দী ধরে শ্রমিকদের 'উত্তরণের পথ' নিয়ে দিয়েছেন অনেক তত্ত্ব ও দিকনির্দেশনা। তারা দেখিয়েছেন, শৃঙ্খল থেকে মুক্তির এই পথটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।
শ্রমিকের মুক্তির প্রথম ধাপ হলো তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়া। কার্ল মার্ক্স তার ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’তে স্পষ্ট করে বলেছেন, শ্রমিকরা যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের কেবল ‘ব্যক্তি’ হিসেবে দেখবে, ততক্ষণ তারা শোষিত হবে। শ্রমিককে বুঝতে হবে সে একটি বিশাল ‘শ্রেণি’র অংশ। মার্ক্স একে বলেছেন ‘ক্লাস ফর ইটসেলফ’। শ্রমিকরা যখন বিচ্ছিন্ন স্বার্থ ভুলে সামষ্টিক স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই তারা পুঁজিবাদের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
পুঁজিবাদ কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়েই শ্রমিককে শোষণ করে না, তারা মানুষের চেতনায় এই ধারণা ঢুকিয়ে দেয় যে ‘পুঁজিবাদই সেরা ব্যবস্থা’।
ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশি তার ‘প্রিজন নোটবুকস’ বইয়ে একে বলেছেন ‘হেজেমনি’। গ্রামশির মতে, শ্রমিকদের মধ্য থেকেই ‘অর্গানিক ইনটেলেকচুয়াল’ বা নিজস্ব বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তৈরি করতে হবে। শ্রমিকদের গড়ে তুলতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং চিন্তা যা পুঁজিবাদের শেখানো ‘জ্ঞান’কে চ্যালেঞ্জ করবে।
ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি শ্রমিকের মুক্তির জন্য একটি বিশেষ শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রমিককে কেবল ‘আজ্ঞাবহ’ বানানো হয়।
ফ্রেইরি ‘কনসায়েন্টাইজেশন’ বা ‘চেতনার উন্মেষ’ এর কথা বলেছেন। তার মতে, শ্রমিকের এমন শিক্ষা প্রয়োজন যা তাকে প্রশ্ন করতে শেখাবে কেন সে গরিব? কেন তার শ্রমের ফল অন্য কেউ ভোগ করছে? এই ‘সমস্যামূলক শিক্ষা’ই শ্রমিককে বিপ্লবের পথে পরিচালিত করবে।
অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিকল্প নেই। একজন শ্রমিক বিচ্ছিন্নভাবে দুর্বল। জোটবদ্ধভাবে তারা একটি শক্তিশালী পক্ষ। রোজা লুক্সেমবার্গ তার ‘মাস স্ট্রাইক’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, সাধারণ ধর্মঘট বা গণ-আন্দোলন শ্রমিককে রাজনৈতিকভাবে আরো প্রশিক্ষিত করে তোলে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন শ্রমিকের উত্তরণকে ‘আয়’ দিয়ে না দেখে দেখেছেন ‘সক্ষমতা’ হিসেবে। তার মতে, শ্রমিককে কেবল মজুরি দিলেই হবে না, তাকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, গুণগত শিক্ষা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতা দিতে হবে। একজন শ্রমিকের এই ‘সক্ষমতা’ তৈরি হলে সে আর সস্তা শ্রম দিতে বাধ্য থাকে না। আর তখনই সে শক্তি অর্জন মালিকের সাথে দর কষাকষির।
ধনীদের ওপর ‘প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্স’ বা প্রগতিশীল কর আরোপ করাকে একটি উপায় হিসেবে দেখিয়েছেন টমাস পিকেটি। সেই অর্থ শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা, আবাসন এবং পেনশনে ব্যয় করার কথা বলেছেন তিনি। রাষ্ট্রকে মালিকের পাহারাদার না হয়ে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার কথা বলেন পিকেটি।
শ্রমিকদের উত্তরণের চূড়ান্ত উপায় কেবল একটি তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করা। আইনি ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্রে বলেছিলেন, ‘মানুষ যা, তার জন্য সে নিজেই দায়ী’। শ্রমিকদের নিজেদের মুক্তির লড়াই নিজেকেই শুরু করতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতাবানরা কখনোই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয়নি, তাদের ক্ষমতা কেড়ে নিতে হয়েছে সংহতি এবং লড়াইয়ের মাধ্যমে।
ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হলো, শোষণ যখন চরমে পৌঁছায়, তখনই শোষিত শ্রেণি জেগে ওঠে। মে দিবস হলো সেই জাগরণের ইতিহাস। পুঁজিবাদ নামক রক্তচোষা দানবের হাত থেকে মানবতাকে মুক্ত করার শপথের দিন।
মে দিবসের সেই মহান নায়কেরা আজও লড়ে চলেছে। তাদের লড়াই এমন এক পৃথিবীর জন্য, যেখানে শ্রম আর পণ্য হবে না। যেখানে মানুষ শুধু উৎপাদনের উপকরণ হবে না। বরং ‘দুনিয়ার মজদুর এক’ হয়ে নিজেরাই লিখবে নিজেদের মুক্তির মহাকাব্য। যেখানে শোষণ নয়, সাম্যই হবে সভ্যতার মাপকাঠি।