এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক বহিষ্কার, কী হয়েছিল
ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক দুই শিক্ষককে বহিষ্কার করেছে। তবে শিক্ষকরা বলছেন, তদন্ত ছাড়াই ও আন্দোলনের চাপে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএমআপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
একটি ছবিকে ঘিরে শুরু, তারপর অভিযোগ, আন্দোলন, আর শেষ পর্যন্ত দুই শিক্ষক বহিষ্কার।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে একটা ছবিকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত দুই শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। তবে শিক্ষকরা বলছেন, তদন্ত ছাড়াই আন্দোলনের মুখে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।
ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ এনে শিক্ষার্থীদের ডাকা টানা আন্দোলনের মুখে রবিবার রাতে দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মিমু চাকমা বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেকদিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। সবকিছু মিলে হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। বহিষ্কার করা হয়েছে একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এএসএম মহসিনকেও।”
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “একজনের সঙ্গে অন্যজনের শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য আছে বলে, সুপরিকল্পিতভাবে ও নানান অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে তাকে চাকুরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।”
যেভাবে শুরু
শিক্ষার্থীরা জানান, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট জুম্মার নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শমসাদ আহমেদ কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের শায়খ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে দেখা করেন এবং একটি গ্রুপ ছবি তোলা হয়।
সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধ্যাপককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষের অভিযোগ আনেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শোকজ প্রত্যাহার এবং হিজাব ও নিকাব পরিধানের কারণে মুসলিম শিক্ষার্থীদের হেনস্তার অভিযোগে শিক্ষিকা লায়েকা বশীরের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানায় তারা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ব্যাসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরের একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তার নামে একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়।
সেই ফটোকার্ডে বলা হয়েছিল, “মুখ ঢাকার সংস্কৃতি (নিকাব) নিঃসন্দেহে সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াবে।”
তার আইডিতে গিয়ে সেই পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সেই পোস্টের একটি স্ক্রিনশট ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
সেখানে লেখা, “সমস্ত মুখমণ্ডল ঢেকে পর্দা করার পক্ষে আমি অন্তত নই! সারা শরীর ঢাকেন, হাত মোজা, পা-মোজা পরেন, সমস্যা নাই। কিন্তু মুখমণ্ডল দেখাতেই হবে। ধর্মেও, যতদূর জানি, সারা মুখ মমি বানিয়ে রাখতে বলা হয়নি। আসল কথা হলো, অন্ততপক্ষে আপনি কেডা, কার সাথে আমি কথা বলছি, আপনার মুখ দেখলে যেন আমি চিনতে পারি।”
ইউনিভার্সিটির ক্লাসে অনেক নারী-শিক্ষার্থী মুখ ঢেকে বসে থাকে উল্লেখ করে পোস্টে লেখা, “এটাকে আমার কাছে অভদ্রতা বলেই মনে হয়। কথা বলবে, অথচ মুখ দেখাবে না? এ ভয়ানক আপত্তিকর আচরণ! পরীক্ষা দেবে, মুখ ঢেকে রাখবে! এসবই অপরাধ-প্রবণতা বাড়ার অনুকূলে কাজ করবে বলে মনে করি। এদের বিশ্বাস করতে তাই আমার বাধে। আমার পরিচিত বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মীদের অনেকেই আজ এই দলের অন্তর্গত। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সামগ্রিকভাবেই এই মুখ-ঢাকার সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াবে।”
এরপর মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে আনেন লায়েকা বশীর। তিনি বলেন, “চারদিন আগে কাজে যোগ দেওয়া যে-গৃহকর্মী মা-মেয়েকে খুন করে পালাল, সিসিটিভিতে দেখা যায়, সে আসতে-যেতে পোশাক পাল্টালেও মুখের আবরণ সরায়নি। এখন এরে কেমনে খুঁজে বের করবেন? দেখেন, যা ভালো মনে করেন।”
বিষয়টি নিয়ে তখন প্রচুর সমালোচনা হলে তিনি আবার একটি স্ট্যাটাস দেন।
সতেরোই ডিসেম্বর দেওয়া সেই পোস্টে লেখা, “মুখ ঢাকা বিষয়ে পূর্বের পোস্টে যা লিখেছিলাম তা ব্যক্তির নিরাপত্তার জায়গা থেকে ভেবে লিখেছি। এখানে কাউকে ছোটো করা বা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে পোশাক পরাকে প্রশ্ন করা হয়নি। মোহাম্মদপুরের জোড়া-খুনের ঘটনার পর দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এটি আমার ব্যক্তিগত মত ছিল। এর সাথে আমার কর্মস্থল ইউএপি-র কোন সম্পর্ক নেই। এটি নিয়ে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি দুঃখজনক। কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা
রবিবারের আন্দোলনে নতুন করে আবার লায়েকা বশীরের বক্তব্যকে সামনে আনা হয়। শিক্ষার্থীরা তার স্থায়ী বহিষ্কার চান। একইসঙ্গে কারণ দর্শানোর নোটিশের মাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনতি এবং ১৯ অগাস্ট ২০২৪-এর দাবিগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় নিয়ে উপাচার্য (ভিসি) কামরুল আহসানেরও পদত্যাগের দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা।
এমন পরিস্থিতে রবিবার রাতে লায়েকা বশীরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একই বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. এএসএম মহসিনকেও বহিষ্কার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এবং সমস্ত প্রাসঙ্গিক তথ্য ও পরিস্থিতি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করার পর, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিসেস লায়েকা বশীর এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. এএসএম মহসিনকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।”
পাবলিক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ নামক ফেসবুক পেইজে বলা হয়, আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়, ইসলামবিদ্বেষী আচরণ ও হিজাব নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে লায়েকা বশীরকে এবং আওয়ামী রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সায়েম মহসিনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানান, আলাদা ব্যক্তির পদত্যাগের পাশাপাশি, তারা একটি টেকসই ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা চান।
পোস্টে আরও বলা হয়, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন ও সকল একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
সোমবার সকালে দেওয়া আরেকটি পোস্টের মাধ্যমে ভেরিফায়েড এই পেজটি থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান রেজিস্ট্রার ছুটিতে আছেন। আর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের নাম্বার দিতে চাইলেও পরে আর সাড়া দেননি।
অভিযুক্তরা যা বলছেন
লায়েকা বশীর আলাপকে বলেন, “আমার একটা ফেসবুক পোস্টের উপর ভিত্তি করে অনলাইন মব তৈরি হয়েছে আর তার ফলে গতকাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমার টার্মিনেশন ঘোষণা করে। আমি মনে করি যে এটা সম্পূর্ণ অন্যায় একটা আচরণ।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেই অভিযোগগুলো এসেছিল, তার জন্য একটা তদন্ত কমিটি তৈরি হয়েছিল। সে তদন্ত কমিটি তার কাজ করছিল।”
সেই কাজের মাঝখানে কেন তাকে বহিষ্কার করা হলো প্রশ্ন তোলেন লায়েকা বশীর।
লায়েকা বশীর বলেন, “মূলত প্রাক্তন ছাত্রদের দ্বারা যে মবটা তৈরি হয়েছে, সেই মবের চাপে পড়ে ইউনিভার্সিটি। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিল এটা খুবই দুঃখজনক, ভীষণ দুঃখজনক।”
এরপর তার অবস্থান কী জানতে চাইলে এই শিক্ষিকা বলেন, “আমি এখনো কোনো স্টেপ নেইনি। তবে লিগ্যাল স্টেপ নিতে পারি।”
তবে টার্মিনেশনের কোনো চিঠি পাননি বলে জানিয়েছেন ড. এএসএম মহসিন। আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমি কোনো চিঠি পাই নাই। আমি এটা ফেইসবুকে দেখলাম যে, গতকাল সাড়ে আটটার দিকে সম্ভবত আমাকে আর লায়েকা বশীরকে টার্মিনেট করা হয়েছে।”
তিনি জানান, “গতকাল সারাদিন ধরেই আমাদের ক্যাম্পাস দখল করে স্লোগান, দেওয়া হয়েছে। এটার মধ্যে অ্যালামনাইও ছিল, কারেন্ট স্টুডেন্ট ছিল। সন্ধ্যার পরে তারা ভিসি অফিস ঘেরাও করে এবং তারপরে সাড়ে আটটার দিকে এই ডিক্লারেশনটা আসে।”
বিষয়টি নিয়ে কী করতে চান জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এখনো ট্রমার মধ্যে আছি। কী করবো এখনই বলতে পারছি না।”
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে ড. মহসিন বলেন, তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হওয়ায় তাকে ঘটনাটির সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। তাকে 'আওয়ামী লীগ-যুবলীগ' বলা হলেও এই শিক্ষকের দাবি তিনি নিজেই আওয়ামী লীগ আমলে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
পুরোনো 'ট্যাগিং'
ড. মহসিন বলেন, “আমাকে ফ্যাসিস্টদের দোসর বলার কারণ পুরোনো।”
তিনি জানান, ২০২৪ সালের অগাস্টে শিক্ষার্থীরা ইসলামি ক্লাব করতে চেয়েছিল, সিরাত কনফারেন্স করতে চেয়েছিল। সেসময় তিনি ছাত্র কল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন। এই সেলই ক্লাব কার্যক্রম দেখে।
তবে নতুন ক্লাব করার সিদ্ধান্ত এই অধিদপ্তরের না জানিয়ে ড. মহসিন বলেন, “আমি ব্যাপারটা তাদের জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা ভেবেছে আমি ক্লাব খুলতে দিচ্ছি না। সেজন্য আমাকে দোসর হিসেবে ট্যাগিং করা হয়।”
পুরোনো সেই ঘটনাই সাম্প্রতিক আন্দোলনে আবার ইস্যু করা হয় বলে দাবি করেন ড. মহসিন। তিনি বলেন, “লায়েকা ম্যাডামের বিষয়টি সামনে আসার পর আবার আমাকে জড়ানো হয়।”
এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক বহিষ্কার, কী হয়েছিল
ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক দুই শিক্ষককে বহিষ্কার করেছে। তবে শিক্ষকরা বলছেন, তদন্ত ছাড়াই ও আন্দোলনের চাপে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে
একটি ছবিকে ঘিরে শুরু, তারপর অভিযোগ, আন্দোলন, আর শেষ পর্যন্ত দুই শিক্ষক বহিষ্কার।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে একটা ছবিকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত দুই শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। তবে শিক্ষকরা বলছেন, তদন্ত ছাড়াই আন্দোলনের মুখে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।
ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ এনে শিক্ষার্থীদের ডাকা টানা আন্দোলনের মুখে রবিবার রাতে দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মিমু চাকমা বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেকদিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। সবকিছু মিলে হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। বহিষ্কার করা হয়েছে একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এএসএম মহসিনকেও।”
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “একজনের সঙ্গে অন্যজনের শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য আছে বলে, সুপরিকল্পিতভাবে ও নানান অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে তাকে চাকুরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।”
যেভাবে শুরু
শিক্ষার্থীরা জানান, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট জুম্মার নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শমসাদ আহমেদ কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের শায়খ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে দেখা করেন এবং একটি গ্রুপ ছবি তোলা হয়।
সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধ্যাপককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষের অভিযোগ আনেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শোকজ প্রত্যাহার এবং হিজাব ও নিকাব পরিধানের কারণে মুসলিম শিক্ষার্থীদের হেনস্তার অভিযোগে শিক্ষিকা লায়েকা বশীরের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানায় তারা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ব্যাসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরের একটি ফেসবুক পোস্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তার নামে একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়।
সেই ফটোকার্ডে বলা হয়েছিল, “মুখ ঢাকার সংস্কৃতি (নিকাব) নিঃসন্দেহে সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াবে।”
তার আইডিতে গিয়ে সেই পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সেই পোস্টের একটি স্ক্রিনশট ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
সেখানে লেখা, “সমস্ত মুখমণ্ডল ঢেকে পর্দা করার পক্ষে আমি অন্তত নই! সারা শরীর ঢাকেন, হাত মোজা, পা-মোজা পরেন, সমস্যা নাই। কিন্তু মুখমণ্ডল দেখাতেই হবে। ধর্মেও, যতদূর জানি, সারা মুখ মমি বানিয়ে রাখতে বলা হয়নি। আসল কথা হলো, অন্ততপক্ষে আপনি কেডা, কার সাথে আমি কথা বলছি, আপনার মুখ দেখলে যেন আমি চিনতে পারি।”
ইউনিভার্সিটির ক্লাসে অনেক নারী-শিক্ষার্থী মুখ ঢেকে বসে থাকে উল্লেখ করে পোস্টে লেখা, “এটাকে আমার কাছে অভদ্রতা বলেই মনে হয়। কথা বলবে, অথচ মুখ দেখাবে না? এ ভয়ানক আপত্তিকর আচরণ! পরীক্ষা দেবে, মুখ ঢেকে রাখবে! এসবই অপরাধ-প্রবণতা বাড়ার অনুকূলে কাজ করবে বলে মনে করি। এদের বিশ্বাস করতে তাই আমার বাধে। আমার পরিচিত বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মীদের অনেকেই আজ এই দলের অন্তর্গত। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সামগ্রিকভাবেই এই মুখ-ঢাকার সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াবে।”
এরপর মোহাম্মদপুরে মা-মেয়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে আনেন লায়েকা বশীর। তিনি বলেন, “চারদিন আগে কাজে যোগ দেওয়া যে-গৃহকর্মী মা-মেয়েকে খুন করে পালাল, সিসিটিভিতে দেখা যায়, সে আসতে-যেতে পোশাক পাল্টালেও মুখের আবরণ সরায়নি। এখন এরে কেমনে খুঁজে বের করবেন? দেখেন, যা ভালো মনে করেন।”
বিষয়টি নিয়ে তখন প্রচুর সমালোচনা হলে তিনি আবার একটি স্ট্যাটাস দেন।
সতেরোই ডিসেম্বর দেওয়া সেই পোস্টে লেখা, “মুখ ঢাকা বিষয়ে পূর্বের পোস্টে যা লিখেছিলাম তা ব্যক্তির নিরাপত্তার জায়গা থেকে ভেবে লিখেছি। এখানে কাউকে ছোটো করা বা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে পোশাক পরাকে প্রশ্ন করা হয়নি। মোহাম্মদপুরের জোড়া-খুনের ঘটনার পর দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এটি আমার ব্যক্তিগত মত ছিল। এর সাথে আমার কর্মস্থল ইউএপি-র কোন সম্পর্ক নেই। এটি নিয়ে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি দুঃখজনক। কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা
রবিবারের আন্দোলনে নতুন করে আবার লায়েকা বশীরের বক্তব্যকে সামনে আনা হয়। শিক্ষার্থীরা তার স্থায়ী বহিষ্কার চান। একইসঙ্গে কারণ দর্শানোর নোটিশের মাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনতি এবং ১৯ অগাস্ট ২০২৪-এর দাবিগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় নিয়ে উপাচার্য (ভিসি) কামরুল আহসানেরও পদত্যাগের দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা।
এমন পরিস্থিতে রবিবার রাতে লায়েকা বশীরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একই বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. এএসএম মহসিনকেও বহিষ্কার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এবং সমস্ত প্রাসঙ্গিক তথ্য ও পরিস্থিতি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করার পর, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিসেস লায়েকা বশীর এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. এএসএম মহসিনকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।”
পাবলিক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ নামক ফেসবুক পেইজে বলা হয়, আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়, ইসলামবিদ্বেষী আচরণ ও হিজাব নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে লায়েকা বশীরকে এবং আওয়ামী রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সায়েম মহসিনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানান, আলাদা ব্যক্তির পদত্যাগের পাশাপাশি, তারা একটি টেকসই ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা চান।
পোস্টে আরও বলা হয়, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন ও সকল একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
সোমবার সকালে দেওয়া আরেকটি পোস্টের মাধ্যমে ভেরিফায়েড এই পেজটি থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান রেজিস্ট্রার ছুটিতে আছেন। আর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের নাম্বার দিতে চাইলেও পরে আর সাড়া দেননি।
অভিযুক্তরা যা বলছেন
লায়েকা বশীর আলাপকে বলেন, “আমার একটা ফেসবুক পোস্টের উপর ভিত্তি করে অনলাইন মব তৈরি হয়েছে আর তার ফলে গতকাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমার টার্মিনেশন ঘোষণা করে। আমি মনে করি যে এটা সম্পূর্ণ অন্যায় একটা আচরণ।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেই অভিযোগগুলো এসেছিল, তার জন্য একটা তদন্ত কমিটি তৈরি হয়েছিল। সে তদন্ত কমিটি তার কাজ করছিল।”
সেই কাজের মাঝখানে কেন তাকে বহিষ্কার করা হলো প্রশ্ন তোলেন লায়েকা বশীর।
লায়েকা বশীর বলেন, “মূলত প্রাক্তন ছাত্রদের দ্বারা যে মবটা তৈরি হয়েছে, সেই মবের চাপে পড়ে ইউনিভার্সিটি। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিল এটা খুবই দুঃখজনক, ভীষণ দুঃখজনক।”
এরপর তার অবস্থান কী জানতে চাইলে এই শিক্ষিকা বলেন, “আমি এখনো কোনো স্টেপ নেইনি। তবে লিগ্যাল স্টেপ নিতে পারি।”
তবে টার্মিনেশনের কোনো চিঠি পাননি বলে জানিয়েছেন ড. এএসএম মহসিন। আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমি কোনো চিঠি পাই নাই। আমি এটা ফেইসবুকে দেখলাম যে, গতকাল সাড়ে আটটার দিকে সম্ভবত আমাকে আর লায়েকা বশীরকে টার্মিনেট করা হয়েছে।”
তিনি জানান, “গতকাল সারাদিন ধরেই আমাদের ক্যাম্পাস দখল করে স্লোগান, দেওয়া হয়েছে। এটার মধ্যে অ্যালামনাইও ছিল, কারেন্ট স্টুডেন্ট ছিল। সন্ধ্যার পরে তারা ভিসি অফিস ঘেরাও করে এবং তারপরে সাড়ে আটটার দিকে এই ডিক্লারেশনটা আসে।”
বিষয়টি নিয়ে কী করতে চান জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এখনো ট্রমার মধ্যে আছি। কী করবো এখনই বলতে পারছি না।”
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে ড. মহসিন বলেন, তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হওয়ায় তাকে ঘটনাটির সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। তাকে 'আওয়ামী লীগ-যুবলীগ' বলা হলেও এই শিক্ষকের দাবি তিনি নিজেই আওয়ামী লীগ আমলে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
পুরোনো 'ট্যাগিং'
ড. মহসিন বলেন, “আমাকে ফ্যাসিস্টদের দোসর বলার কারণ পুরোনো।”
তিনি জানান, ২০২৪ সালের অগাস্টে শিক্ষার্থীরা ইসলামি ক্লাব করতে চেয়েছিল, সিরাত কনফারেন্স করতে চেয়েছিল। সেসময় তিনি ছাত্র কল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন। এই সেলই ক্লাব কার্যক্রম দেখে।
তবে নতুন ক্লাব করার সিদ্ধান্ত এই অধিদপ্তরের না জানিয়ে ড. মহসিন বলেন, “আমি ব্যাপারটা তাদের জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা ভেবেছে আমি ক্লাব খুলতে দিচ্ছি না। সেজন্য আমাকে দোসর হিসেবে ট্যাগিং করা হয়।”
পুরোনো সেই ঘটনাই সাম্প্রতিক আন্দোলনে আবার ইস্যু করা হয় বলে দাবি করেন ড. মহসিন। তিনি বলেন, “লায়েকা ম্যাডামের বিষয়টি সামনে আসার পর আবার আমাকে জড়ানো হয়।”